সেই মেয়েরা রুক্মাবাই উমা ভট্টাচার্য বসন্ত ২০১৮

সব লেখা একত্রে–উমা ভট্টাচার্য   

সেই মেয়েরা

উমা ভট্টাচার্য

মহারাষ্ট্রের এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক সূত্রধর পরিবারে জনার্দন পাণ্ডুরং আর জয়ন্তীবাইয়ের কন্যা রুক্মাবাই যে সময়ের ভারতর্ষে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে ছিল পরাধীন ভারত।তাঁর জন্মের সাত বছর আগে ঘটে গিয়েছে ভারতের প্রথম মহাবিদ্রোহ–সিপাহী বিদ্রোহ। পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ সারা ভারতকে  সেই বিপ্লববহ্নি লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে, ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। ইংলণ্ডেশ্বরী মহারানি   ভিক্টোরিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতের শাসনভার তুলে নিয়েছেন নিজের হাতে  ১৯৫৮ সালে।  

জাতপাতের ভেদাভেদদীর্ণ সারা ভারত। পূর্বভারতের মত পশ্চিমভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও হিন্দুধর্মের ধ্বজাধারীদের সামাজিক,সাম্প্রদায়িক,কুসংস্কারাচ্ছন্ন নানা কঠোর অনুশাসনের বেড়াজাল সমাজকে অজ্ঞানতার  কুয়াশায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে।সমাজ যেন নিস্তরঙ্গ পঙ্কিল এক বদ্ধ জলা। সমাজ়ে মেয়েদের অস্ত্বিত্ব  টিকে ছিল শুধু রান্নাঘরে, আর সন্তানপালনে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হৃদয়হীনতার চাপে মেয়েরা তখন অবোলা পোষা পশুর সমতুল্য জীবনযাপনকেই নিয়ম বলে মেনে  নিয়েছিল। সেই সমাজেরই এক দীনদরিদ্র পরিবারে্র একমাত্র সন্তান রুক্মাবাই জীবনের প্রতিপদে এসব টের পেয়েছেন।

রুক্মার মা জয়ন্তীবাইয়ের বিয়ে হয়েছিল ১৫বছর বয়সে,আর বিধবা হয়েছিলেন ১৭ বছর  বয়সে। দু’বছরের কন্যা রুক্মাকে  নিয়ে মায়ের অস্তিত্বের সংগ্রাম দেখেছিলেন শিশু থেকে কিশোরী হয়ে ওঠা রুক্মা। কিন্তু প্রবল সমাজকর্তাদের চাপে রুক্মার মাকেও বাধ্য হয়ে নাবালিকা রুক্মাকে মাত্র এগারো বছর বয়সে বিয়ে দিতে  হয়েছিল। তাঁদের সেই দুঃসময়ে মাতাকন্যার নিশ্চিত  অবলম্বন হয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ডাঃ সখারাম অর্জুন। সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে বিয়ে করেছিলেন জয়ন্তীবাইকে। দায়িত্ব নিয়েছিলেন রুক্মার পড়াশোনার।             

রুক্মারা যেখানে থাকতেন মেয়েদের শিক্ষার কোন স্কুল সেখানে ছিল না। পড়াশোনা করতেন বাড়িতেই। যে কোনও বই হাতে পেলেই গোগ্রাসে পাঠ করতেন। সবটুকু জ্ঞান আত্মস্থ করতেন। স্থানীয় ‘ফ্রি চার্চ মিশন লাইব্রেরি’ থেকে নানা ধরনের বইপত্র এনে পাঠ করতেন। তার পালক পিতা ছিলেন একজন সমাজকর্মী, বোম্বাই গ্র্যান্ড মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তার ও বোটানির অধ্যাপক। নারীদরদী এই মানুষটি ক্রমে হয়ে  উঠেছিলেন তাঁর ‘ফ্রেণ্ড, ফিলোজফার এন্ড গাইড’।

রুক্মার স্বামী বেকার যুবক দাদাজি ভিকাজি তাঁদের বাড়িতেই ঘরজামাই হয়ে থাকতেন, পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও ভিকাজি সে সুযোগ কাজে  লাগাননি। কিছুকাল বাদে তিনি উঠে যান তাঁর মামারবাড়িতে। তারপর শুরু হয় রুক্মাকে সেখানে নিয়ে যাবার জন্য জোরাজুরি। ওদিকে, রুক্মার ছিল পড়াশুনার প্রতি গভীর আগ্রহ। বড় ডাক্তার হয়ে সমাজের সেবা করা, মেয়েদের চিকিৎসা করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কিন্তু রুক্মার সময়ের সমাজে সে সুযোগ কোথায়? আর পাঁচটা বাল্যে বিবাহিত মেয়ের মতই নিজের বাল্যবিবাহ তাঁর জীবনে অভিশাপ হয়ে উঠছিল। পড়াশোনাও ঠিকমত করতে পারছিলেন না স্বামীর বিরক্তিকর আচরণে আর আবদারে।

এই অবস্থায় আগুনে  ঘৃতাহুতি দিল স্বামী দাদাজি  ভিকাজির নিজের স্বামীত্বের দাবি নিয়ে আদালতে যাওয়া। শ্বশুরঘরে যাওয়ার জন্য রুক্মাকে অনেকদিন ধরে পীড়াপীড়ি করে ব্যর্থ হয়ে ভিকাজি রুক্মা আর তাঁর পালকপিতা ডাঃ অর্জুনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। আবেদন ছিল আদালত  যেন তাঁর স্ত্রীকে তাঁর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে গিয়ে থাকতে বাধ্য  করেন। প্রতিবাদে রুক্মাও হার না মেনে আদালতের দ্বারস্থ হলেন বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে। 

সে সময় কোম্পানীর শাসনের অবসানে ভারতবর্ষে মহারানির শাসনের শুরু হলেও হিন্দুদের সামাজিক নিয়ম,আইনকানুন আর সংস্কারের বিষয়ে ব্রিটিশ শাসকেরা সাধারনতঃ বিশেষ হস্তক্ষেপ করতেন না।পূর্বভারতে  বিশেষতঃ বাংলায় রামমোহন রায়,বিদ্যাসাগরের মত সমাজসংস্কারকে্রা স্ত্রীশিক্ষার বিস্তার, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা, সতীদাহ নিবারণের চেষ্টা চালিয়ে  তখন অনেকটাই সফল। কিন্তু মহারাষ্ট্র, মধ্যভারত, পশ্চিমভারতের কট্টর হিন্দুপ্রধান সমাজে এইসব প্রথা বন্ধ করার কথা ভাবতেও  পারত না মানুষ। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে সমাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন এক হিন্দু মেয়ে রুক্মাবাই। সেই সময়ের  জগদ্দল সমাজের কাছে রুক্মার এই দৃঢ় পদক্ষেপটাই  ছিল এক বিরাট ধাক্কা। সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে তাঁর নিন্দায় সোচ্চার হল।

আদালতে যথারীতি সুবিচার পাননি রুক্মা, কারণ তাঁর প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলকের মত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। হিন্দুধর্মের  প্রবক্তা, বিখ্যাত ‘ঈঙ্গ-মারাঠা’ সংবাদপত্রের  সম্পাদক বিশ্বনাথ নারায়ণ মাণ্ডলিক তাঁর  পত্রিকায়, মহামান্য তিলক ‘দ্য মারাঠা’পত্রিকায়, নির্লজ্জ মেয়ে রুক্মার বিরুদ্ধে আর তাঁর অযোগ্য স্বামী দাদাজি ভিকাজির সমর্থনে লেখনী ধরলেন। হিন্দুধর্মের প্রচলিত  নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে আদালত যেন রুক্মাবাইকে সুবিচার না দেন,সেজন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখলেন না তাঁরা। রুক্মাবাইয়ের আবেদনের যৌক্তিকতা বিচার করে যেসব ইংরেজ বিচারক তাঁর প্রতি সুবিচারের পক্ষে রায় দিতে যাচ্ছিলেন তাঁদের তুলোধোনা করতে লাগলেন।

ভিকাজির দায়ের করা মামলা চলছিল ১৮৮৬ পর্যন্ত।   দু’বছর ধরে চলা ‘ভিকাজি বনাম রুক্মাবাই’ নামে এই মামলা উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসে তথা আইনের ইতিহাসে চলা সবচেয়ে স্মরণীয় মামলার দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। শুধু ভারত নয়,আমেরিকা, ইউরোপ, ইংলণ্ড প্রমুখ দেশ-বিদেশের সংবাদপত্রে  তর্ক-বিতর্কের ঝড় বয়ে গেল। মামলার রায় আর প্রতিবাদী রুক্মার বিষয়ে জানতে সবাই উন্মুখ। তখনই রুক্মা নারীবাদী হিসাবে পরিচিত হয়ে গেছেন বিদেশের সমাজের কাছে। দেশে বিদেশে সমকালীন সমাজ থেকে হাজার কদম এগিয়ে থাকা এক নারী হিসাবে পরিচিত হয়ে গেছেন তিনি।

হিন্দুসমাজের নেতাদের প্রবল বিরোধিতায় আদালতের রায় রুক্মার বিপক্ষে  গেল। তাঁকে জানানো হল, হয় তাঁকে স্বামী ভিকাজির সঙ্গে থাকতে হবে, নাহলে তাঁকে ছয়মাস কারাবাস করতে হবে। হার  মানবার মত স্বভাবের ছিলেন না এই সমাজসচেতন রুক্মা। তিনি বিনাদ্বিধায় কারাবাস স্বীকার করে নিতে চাইলেন।

রুক্মার স্বামী ভিকাজি দেখলেন রুক্মার কারাবাস হলে তাঁর কোন লাভ তো হবেই না বরং মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারাবেন। বউ নিয়ে ঘরে না ফিরতে পারলে মামাবাড়ির আশ্রয়টুকুও থাকবে না দেখে নিরুপায় ভিখাজি  ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ চাইলেন। আদালতের বাইরে ফয়সালা হল। ডাঃ অর্জুন ভিকাজির দাবিমত অর্থ ক্ষতিপূরণ দিয়ে তিনি পালিতা কন্যা, শিষ্যা, মেধাবী রুক্মাকে মুক্ত করলেন।

রুক্মা কিন্তু সেখানেই ক্ষান্ত হননি, নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সারা দেশের মেয়েদের পক্ষে খোদ মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে আবেদনপত্র পাঠিয়ে দিলেন তিনি। বিবাহবিচ্ছেদের স্বীকৃতির আবেদন ছাড়াও তাঁর দাবির মধ্যে ছিল মেয়েদের শিক্ষালাভের অধিকার, বাল্যবিবাহ আইন করে বন্ধ করে পারিবারিক শোষনের হাত থেকে শিশু ও বালিকাবধূদের রক্ষা করা, আর বিবাহের ক্ষেত্রে মেয়েদের সম্মতি দেয়ার অধিকারে দান। সেইসঙ্গে ছিল তাঁর নিজের  ডাক্তারি পড়ার অনুমতি চেয়ে  আবেদন। যে সময় খোদ ইংরেজ পরিবারের মেয়েরাও ডাক্তারি পড়বার কথা সম্ভবত কল্পনাও করে্নি সেই সময়ে পরাধীন ভারতের এক মেয়ে ডাক্তারি পড়বার চিন্তা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন।

তাঁর দাবি ও আন্দোলনের যৌক্তিকতা এতটাই তীব্র ছিল যে এরপর ১৮৯১ সালেই ভারতে পাশ হয়েছিল ‘বিয়ের বয়সের ব্যাপারে মেয়েদের সম্মতি দানের আইন’।এই আইন পাশ করার ক্ষেত্রে তাঁর দায়ের করা বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা ছিল এক সহযোগী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।   

বুদ্ধিমতী রুক্মা মহারানির কাছে তাঁর আবেদন করার উপযুক্ত সময় হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন মহারানির সিংহাসন আরোহনের ৫০ বছর পূর্তির উৎসব পালনের সময়টিকে। ইংরেজশাসিত ভারতেও সেই উৎসব পালিত  হবে। জানতেন এসব উৎসবের সময় রাজা বা রানিরা অনেক দানধ্যান করেন, আবেদন মঞ্জুর করেন। সৌভাগ্য এই যে এই ভারতীয় কন্যার সুবিচার চেয়ে লেখা মর্মস্পর্শী আবেদনপত্রটি ঠিক সময়ে পৌঁছেও  গেল সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার কাছে। সেই চিঠির বয়ান ছিল হতবাক করার মত।

মহারানি সাড়া দিলেন তাঁর  আবেদনে। তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ স্বীকৃতি পেল। তাঁকে জোর করে স্বামীর ঘরে পাঠানো যাবে না সেই নির্দেশ  জানালেন। আর রুক্মাবাই ইংলণ্ডে গিয়ে ডাক্তারি পড়তে পারবেন সেই অনুমতিও তাঁকে দিলেন। মহারানিকে লেখা তাঁর চিঠিটি ভারতের ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় প্রকাশিতও হতেই মারাঠি হিন্দু সমাজে নিন্দার ঢেউ উঠল। রুক্মাকে প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হল। রুক্মার তাতে কোন হেলদোল নেই। এই সময় রমাবাই রাণাডে,বেরহামজি  মালাবারি প্রমুখেরা তাঁকে অকুন্ঠ সমর্থন করেছেন। ‘ভিকাজি বনাম রুক্মাবাঈ’ মামলাটির সময় রুক্মার পক্ষে জনমত তৈরি করার জন্য তাঁরা চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।       

রুক্মা শৈশব থেকেই মায়ের সাথে নিয়মিত ‘স্থানীয় খ্রিস্টান মহিলা প্রার্থনা সমাজে’ যেতেন,পাঠ শুনতেন,সেখান থেকেই মেয়েদের অধিকার বিষয়ে,সমাজ বিষয়ে তাঁর স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি হয়েছিল। পরে  পালক পিতার কাছে থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা তাঁকে দিয়েছে মানসিক জোর,সৎসাহস আর সমাজসচেতন দৃষ্টিভঙ্গী।

কিন্তু নিজের লড়াইটা তিনি নিজেই লড়েছেন, সেখানে প্রকাশ্যে কখনই পালকপিতা ডাঃ সখারাম তাঁকে সাহায্য করেননি। আদালতে মামলা চলার  আগে থেকেই, ও মামলা চলার সময়েও ‘টাইমস্‌ অফ ইণ্ডিয়া’ কাগজে ‘হিন্দু লেডি’নামে এক মহিলার  লেখা নানা প্রবন্ধ ছাপা হতে থাকে। কে এই ‘হিন্দু লেডি’ তা জানা যায়নি তখনও, কেউ আন্দাজও করতে পারেনি। কিন্তু সবগুলি প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় ছিল ভারতীয় হিন্দু সমাজে মেয়েদের অসহায় অবস্থার কথা, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে  প্রচার, মেয়েদের শিক্ষার অধিকারের দাবি,নিজের বিয়ের বয়সের ব্যাপারে মেয়েদের সম্মতি দানের অধিকার প্রভৃতি নিয়ে।

আসলে রুক্মা নিজেই নিজের বক্তব্যের সমর্থনে  ছদ্মনামে সেইসব প্রবন্ধ লিখে গেছেন। সমাজে সেসব প্রবন্ধ পাঠের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছেন আড়াল  থেকে। জনগণের অনেকেই তাঁর প্রবন্ধে লেখা অনেক বিষয়ের যুক্তি  মেনে নিচ্ছিলেন। অনেক পরে জানা গিয়েছিল সেইসব প্রবন্ধের লেখিকা রুক্মাবাই।

মহারানি রুক্মার আবেদনের প্রত্যেকটিই মেনে নিয়েছেন। এসবের  মধ্যেই ভিকাজি পর্ব মিটে গেছে। এরপর ডাক্তারি পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হল।

১৮৭৫ সালে বিয়ের পর থেকে ১৮৮৮ সালে বিয়ের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ, আর মহারানির সমর্থন পাওয়ার পর শুরু হল তাঁর বিলেতে গিয়ে ডাক্তারি পড়ার অধ্যায়। সেও এত সহজে হয়নি, আর্থিক সহায়তার  প্রয়োজন ছিল তাঁর।ডাক্তারি পড়তে যাবার আগের ১৪টা বছরের ঘটনাবলীই  রুক্মার জীবনের এক ‘ওডিসি’-এক মহাকাব্যের মত। ঘটনাবহুল লাগাতার এক সংগ্রামের ইতিহাস।

এরপর শুরু হল তাঁর ডাক্তারি পড়ার সংগ্রাম। তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন বম্বের কামা হাসপাতালের ডিরেক্টর এডিথ পে ফিপসন। তিনি রুক্মাবাইকে শুধু উৎসাহিতই করেন নি, তাঁর পড়ার খরচ চালাবার প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের জন্য অর্থসাহায্যের আবেদন করেছেন সংবেদনশীল মানুষদের কাছে। তহবিল গড়ে তুলেছেন। শিবাজীরাও হোলকার তাঁকে ৫০০ টাকা অর্থ সাহায্য করলেন। বিলেতে বিভিন্ন মানুষেরাও  তাঁর পড়াশোনা ও থাকার খরচ চালাবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অর্থ তহবিল গঠন করার  জন্য স্থাপন করেছিলেন “দি  রুক্মাবাই  ডিফেন্স কমিটি”।

বিদেশ যাবার আগে রুক্মা বোম্বেতে স্বল্পদিনের একটি ইংরেজী ভাষা শিক্ষার ক্লাসে ভর্তি হলেন। তারপর ১৮৮৯ সালেই ডাক্তারি পড়বার জন্য লন্ডন যাত্রা করলেন। ভর্তি হলেন ‘লন্ডন স্কুল অফ মেডিসিন ফর ওমেন’স’ কলেজে। ১৮৯৪ সালে সেখান থেকে ডাক্তারি পাশ করলেন। এই চারবছরের মধ্যে রয়্যাল ফ্রি হাসপাতাল, এডিনবার্গ, গ্লাসগো আর ব্রাসেলস্‌ থেকেও নানা পরীক্ষা পাশ করে ডিগ্রি নিয়েছেন। শিক্ষাশেষে বিদেশে ভালো কাজের আহ্বান প্রত্যাখান করে ১৮৯৫ সালে ফিরে এসেছেন মাতৃভূমি ভারতে।  

ভারতে এসে প্রথমে যোগ দিলেন সুরাটের ‘ওমেন’স মেডিক্যাল হাসপাতালে’, চিফ মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে। একেবারে ১৯২৯ সালে অবসরের দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন রাজকোটের ‘জেনানা স্টেট হাসপাতালে’। এই কাজের জন্য তিনি ১৯১৮ সালে হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ওম্যান’স মেডিক্যাল সার্ভিসে যোগ দেবার  লোভনীয় আহ্বান। তাঁর মন সর্বদাই কাঁদত নিজের দেশের মেয়েদের খারাপ অবস্থার জন্য।অসুস্থ মেয়েদের চিকিৎসা করার জন্য,তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য অনেক কষ্ট,অপমান সহ্য করেও কাজ করে গেছেন আজীবন।

দেশে ফেরার পর তাঁর কাছে কেউ চিকিৎসা করাতে চাইত না। তাঁকে ডাইনি  বলতেও দ্বিধা করেনি তাঁর এলাকার মানুষেরা। এছাড়া সে-সময়  মানুষের ধারনা ছিল হাসপাতালে গেলেই মানুষ মরে যায়। মেয়েদের তো আবার হাসপাতালে পুরুষ ডাক্তারের কাছে পাঠানোও যায় না। তাই তিনি মেয়েদের জন্যই ডাক্তার হতে  চেয়েছিলেন, আর সারা জীবন শত কষ্ট, অপমান সহ্য করেও মেয়েদের চিকিৎসা করে গেছেন। শুধু তাই নয় সারাজীবন  মেয়েদের স্বাধীনতা,শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য  লেখনী চালিয়ে গেছেন।  

সমাজের সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের জ্ঞানবুভুক্ষা,সাহস আর ইচ্ছাশক্তির জোরে সব বাধা পেরিয়ে তিনি চিকিৎসক হয়েছিলেন আর দীর্ঘ ৩৫ বছর চিকিৎসা করে গেছেন।আজীবন নিঃসঙ্গ একাকী রয়ে গেছেন। আমৃত্যু সমাজের মেয়েদের জন্য কাজ করে গেছেন।   

আমরা জনি তাঁর আগে ভারতে আরও দুজন মহিলা চিকিৎসক হয়েছিলেন। তাহলে ডাক্তার রুক্মা কৃতিত্ব কী?তাঁর পূর্বজদের মধ্যে আনন্দীবাই যোশীকে কিছুটা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ডাক্তারী পড়তে হয়েছিল, কিন্তু মৃত্যু এসে তাঁকে টেনে নেওয়ায় তিনি চিকিৎসা করার সুযোগ পাননি। কিন্তু ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক বাংলার কাদম্বিনী গাঙ্গুলী পেয়েছিলেন স্বামীর দৃঢ় সমর্থন আর সহায়তা। তাঁকে না আর্থিক না সামাজিক কোন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়নি। কিন্তু ভারতের দ্বিতীয় সফল মহিলা চিকিৎসক রুক্মাবাইয়ের জীবনটা ছিল আগাগোড়া সংগ্রামের। সংসার সমাজ,আর্থিক সমস্যা সব কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে নিজের পথ করে নিয়ে তাঁকে এগোতে হয়েছে।

১৯০৪ সালে স্বামী ভিকাজির মৃত্যুর পর থেকে আমৃত্যু সাদা শাড়িতে হিন্দু বিধবার জীবনই যাপন করেছেন। তবে তাঁর লেখনী থামেনি কখনো। অবসরের পর তিনি মেয়েদের পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে লেখনী ধরেছিলেন। ১৯৫৫ সালে তাঁর  জীবনাবসান হয় আর ভারতবর্ষ হারায় এক মহান সাহসী সমাজকর্মী মহিলা চিকিৎসককে।

তাঁর নামে সুরাটের একটি হাসপাতালের নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর জীবনী নিয়ে ছায়াচিত্র নির্মিত  হয়েছে। আদ্যন্ত নারীবাদী এই মানবী জ্ঞান হবার পর থেকে নিজের পিতা, পালকপিতা বা স্বামী কারোরই পদবী  ব্যবহার করেননি। আপন নামটিতেই তিনি সারা জীবন পরিচিত থেকে গেছেন-তিনি ডাক্তার রুক্মাবাই।

শেষে মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে সুবিচার চেয়ে তাঁর লেখা চিঠির ইংরেজি বয়ানের বাংলা অনুবাদ খানিকটা তুলে দিচ্ছি,যা পাঠ করলেই বোঝা যাবে কেমন বুদ্ধিমতী,দৃঢ়চেতা আর সাহসী মহিলা ছিলেন রুক্মাবাই।    

‘কুসংস্কার,সামাজিক অন্যায়  অনুশাসন,বিধিনিষেধের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ভারতের সব মেয়েদের তরফে আমি জানাচ্ছি যে,সকল ভারতবাসীর মত আমিও বিশ্বাস করি যে আমরা ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট এই কারণে যে, আমরা আমাদের পরম আদরের মাননীয়া রানির সুশাসনে, সুরক্ষায় ভারতে বাস করছি। যে সুশাসনের সুখ্যাতি দেশে দেশে প্রচারিত। এমন একজন দক্ষ প্রশাসক যদি বর্তমান ভারতীয় সমাজে অবহেলিত, অত্যাচারিত, সামাজিক নানা শোষণের শিকার, নানা অন্যায় অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ, শিক্ষা অধিকার থেকে বঞ্চিত অগণিত মেয়েদের মুক্তি না দিতে পারেন তাহলে পৃথিবীর কোনও সভ্য সমাজের কোন সরকার ভারতীয় মেয়েদের সুবিচার দিতে পারবে না।

সামনেই আপনার সিংহাসনলাভের পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি উৎসব অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভারতেও আপনার  দীর্ঘজীবন, দীর্ঘ সুশাসন কামনায় মঙ্গল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এইরকম একটি শুভ অনুষ্ঠানের সময় রানিমা কি ভারতের অগণিত অসহায়, দুর্ভাগা মেয়েদের সামান্য আর্তি শুনবেন না? সেইসব মেয়েদের করুণ অবস্থার কথা শুনে ‘হিন্দু অনুশাসন’ বইয়ের দু’একটি শব্দ পরিবর্তন করে মেয়েদের একটু স্বাধীনতার বাতাস উপভোগ করতে দেবেন না? বর্তমান হিন্দু আইনে মেয়েদের বিবাহের ও স্বামীর সঙ্গে থাকবার যে আইন আছে তা পরিবর্তন করে নতুন আইন প্রণয়ন করেন,তবে খুব উপকার হয়। এই পরিবর্তনটুকু করে দিলে, আশা রাখি ভারতের ‘বাল্যবিবাহ’ রোধ করা যাবে, সংসার অনভিজ্ঞ সরল বালিকাদের শ্বশুরগৃহের অত্যাচার সইতে হবে না। আমার একান্ত আবেদন এই জুবিলি অনুষ্ঠান যেন ভারতীয় মেয়েদের জীবনে এমন কিছু অবদান রেখে  যায়, যাতে ভারতীয় মেয়েরা আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। এদেশের মেয়েদের শিক্ষার অধিকার পাওয়াও খুবই জরুরি। আমি নিজেও ডাক্তারি পড়ে চিকিৎসক হয়ে আমার দেশের মেয়েদের সেবা করতে ইচ্ছুক। কিন্তু আমি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। যদি ঈশ্বর ইচ্ছা করেন তবে আপনার হস্তক্ষেপেই এ-সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব।এই পর্যন্ত আমার আবেদন। হে দেবী,আমি আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা প্রার্থী’।

শুভেচ্ছাসহ,
             আপনার অনুগত কৃপাপ্রার্থী
                   রুক্মাবাই।

সেই মেয়েরা–আগের পর্বগুলো

Advertisements

One Response to সেই মেয়েরা রুক্মাবাই উমা ভট্টাচার্য বসন্ত ২০১৮

  1. অরিন্দম says:

    সেলাম।আর কিচ্ছু বলার নেই।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s