সেই মেয়েরা লিজে মাইটনার উমা ভট্টাচার্য বসন্ত ২০১৭

সেই মেয়েরা–আগের পর্বগুলো

seimeyeralisemeitner-medium

লিজে মাইটনার ছিলেন একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ,যাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কারের  ফলে আমেরিকার মানহাটান প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা এ্যাটম বোমা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন,আর বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার চিত্রটাই পাল্‌টে  গিয়েছিল।পরমাণু বোমার আঘাতে ছোট্ট দেশ নিপ্পনের গুরুত্বপূর্ণ আর বর্ধিষ্ণু শহর হিরোশিমার মৃত্যু হয়েছিল, আর সেই সঙ্গে শেষ হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নামক প্রলয়কান্ড। যে ব্রহ্মাস্ত্রের বিপুল ধ্বংসাত্মক সাফল্য দেখে নোবেল কমিটি তড়িঘড়ি ১৯৪৪ সালের জন্য নির্দিষ্ট রসায়নবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার ১৯৪৫ সালে তুলে দিয়েছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী অটো হানের হাতে।কিন্তু বাদ পড়েছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহগবেষক,পরামর্শদাত্রী ও পরমাণু বোমা তৈরির ফর্মুলা আবিষ্কারক লিজে মাইটনার।  

হ্যাঁ এমন অবিচারই ঘটেছিল নোবেলের ইতিহাসে। যে আবিষ্কারের জননী ছিলেন  জন্মসূত্রে ইহুদি অস্ট্রিয়ান মহিলা বিজ্ঞানি লিজে মাইটনার, তিনি বঞ্চিত  হয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার থেকে।অবশ্য তাঁর অপরাধ ছিল তিনি ছিলেন জন্মসূত্রে ইহুদি, হিটলারের বর্ণবিদ্বেষী জার্মানিতে তিনি ছিলেন অপাংক্তেয়। তিনি ভিয়েনায় থেকে তাঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে যাবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হওয়ার জন্য ১৯০৮ সালে নিজের ধর্ম ছেড়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।তবুও বাঁচতে পারেননি নাৎসিদের হাত থেকে। ১৯০৫ সালে পি এইড করার পর থেকে ত্রিশ বছর তাঁর কর্মক্ষেত্র  ছিল বার্লিনের  গবেষণাগার যেখানে শেষ চার বছর ধরে অটো হানের সঙ্গে যুগ্মভাবে পরমাণু নিয়ে সফল গবেষণা করেছিলেন। বিংশ শতাব্দির তিনের দশকে জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করে অস্ট্রিয়াকে জার্মান আইনের আওতায় নিয়ে এসেছিল আর সমস্ত বর্ণইহুদিদের জীবনযাত্রা অসহনীয় করে তুলেছিল।এই অবস্থায় অর্ধসমাপ্ত কাজ ফেলে  রেখে বাধ্য হয়েই তিনি চলে গিয়েছিলেন স্টকহোমে্র গবেষণাগারে।এদিকে বার্লিন গবেষণাগারে লিজে মাইটনারের অনুপস্থিতে অটো হান আর তাঁর অধস্তন গবেষক স্ট্রাসম্যান বুঝতেই পারছিলেন না যে তাঁরা কী আবিষ্কার করছেন বারবার। স্টকহোম থেকেই প্রায় প্রত্যহ চিঠি লিখে হান-স্ট্র্যাসমান জুটিকে গবেষণার কাজে  প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন মাইটনার।অবশেষে অটো হান তাঁর সাথে গোপনে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন  সেই পরীক্ষার  বিষয়টি বুঝে নিতে।আর সেই সাক্ষাৎকারে লিজে মাইটনার তাঁকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন গবেষণার প্রক্রিয়াটিকে,যা অটো হান ধরতে পারছিলেন না। সেই পরামর্শের মধ্যেই মিলেছিল অটো হানের সাফল্যের সূত্র, আবিষ্কার হয়েছিল পরমাণু বোমা।কিন্তু তখন তো মাইটনার  আর বার্লিন গবেষণাগারের সদস্য গবেষক  নন।

লিজে মাইটনারের নোবেল না পাওয়ার পিছনে আর একটি বড় কারণ ১৯৩৯ সালে  যখন মানহাটান প্রজেক্ট-পরমাণু বোমার সূতিকাগারে তিনি একজন বিজ্ঞানী হিসাবে যোগ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন বিজ্ঞানের এত বড় একটা আবিষ্কারকে  গণহত্যার অস্ত্র বানানোর কাজে লাগাতে তিনি রাজি নন। জনকল্যানমকামী মাইটনার সেই প্রজেক্টে যোগ দেবার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নোবেল পেয়েছিলেন  বিজ্ঞানী অটো হান। তিনি সগর্বে তা গ্রহণ করেছিলেন ও লিজে মাইটনারের  অবদান বিনা দ্বিধায় অস্বীকার করেছিলেন।বলেছিলেন এই আবিষ্কারের সময় মাইটনার আর বার্লিন গবেষণাগারের সদস্য ছিলেন না। তাছাড়া মাইটনার তো পদার্থবিজ্ঞানী,পরমাণু বোমার  সূত্র আবিষ্কারে পদার্থবিদ্যার অবদান নগণ্য। নোবেল কমিটিও বুঝতে ভুল করেছিলেন যে পরমাণু বোমা আবিষ্কারে পদার্থবিদ্যার অবদান কতখানি গুরুত্বপূর্ণ।সেই সূত্র আবিষ্কার শুধুমাত্র কেমিস্ট্রির বিষয় নয় বরং ব্যাপারটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি-পরস্পরনির্ভর সহযোগী। গবেষণার শুরু কেমিস্ট্রি দিয়ে, পরীক্ষানিরীক্ষায়–এক্সপেরিমেণ্টে কেমিস্ট্রির ভূমিকা মুখ্য হলেও তার চরিত্র বুঝতে দরকার পদার্থবিদ্যার, সে কাজটিই করেছিলেন মাইটনার ও তাঁর বোনপো বিজ্ঞানী অটো রবার্ট ফ্রিৎজ।

নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে কী এমন কাজ করেছিলেন লিজে মাইটনার? তার আগে দেখা যাক আবিষ্কার কাকে বলে? মাইটনারের প্রতি অবিচার হয়েছিল একথা যেমন  বিজ্ঞানীদের জানা তেমনি আবিষ্কার বলতে কী বোঝায় এই প্রশ্নটিও তাঁদের ভাবিয়েছিল।বিজ্ঞান জগতে নতুন কোন জিনিস বা বিষয়ের খোঁজ পাওয়া গেলেই কি  তাকে আবিষ্কার বলা চলে?নাকি সেই জিনিস,বিষয় বা ঘটনা আসলে কী,সেটার ধাপগুলিকে বুঝতে পারাকে আবিষ্কার বলে? আগে বোঝা তারপর সেটিকে কাজে লাগানোর প্রশ্ন।কোন ঘটনা ঘটানো হল, অথচ সেটা কী, কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে পারছেন না গবেষক তখন তাকে আবিষ্কার বলা চলে না। কারণ না বুঝতে পারলে সেই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানোর প্রশ্নই ওঠে না। এমনটিই হয়েছিল অটো হানের গবেষণার ক্ষেত্রে। তিনি দীর্ঘদিনের সহগবেষক লিজে মাইটনারের পরামর্শমত পরীক্ষাগারে গবেষণা  চালিয়ে যা আবিষ্কার করেছিলেন তা কী সেটা অটো হান বা তাঁর সহকারী বুঝতে পারেন নি। সেই প্রশ্নের সমাধান করে দিলেন অসাধারণ মেধার তাত্ত্বিক পদার্থবিদ লিজে মাইটনার।বার্লিনের গবেষণাগারে এক্সপেরিমেন্টের সময় উদ্ভূত নানা জটিল  সমস্যার(পাজ্‌লের)সমাধানও তিনিই করতেন।

মাইটনার, অটো হানদের পরীক্ষালব্ধ বিষয়ের প্রক্রিয়াটির নাম দিলেন ‘ফিশন’। তিন অক্ষরের একটি শব্দ, জীববিদ্যার শব্দকোষ থেকে ধার করে নেওয়া।যার অর্থ   নিউক্লিয়াসের কোষ বিভাজনের প্রক্রিয়া। জীববিদ্যায় সেই প্রক্রিয়ার ফলে প্রাণীকোষ বিভাজিত হতে থাকে এক থেকে দুই,দুই থেকে চার, চার থেকে আট এই নিয়মে আর বস্তুটির প্রসারণ ঘটে। পরমাণু গবেষণার ক্ষেত্রে এই ‘ফিশন’বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে।নিউট্রাল চার্জ বিশিষ্ট নিউট্রন কণা দিয়ে নেগেটিভ চার্জবিশিষ্ট ইউরেনিয়ামকে  আঘাত করলে ইউরেনিয়াম পরমাণুর বিভাজন ঘটে।এই প্রক্রিয়াকে লিজে মাইটনার বললেন  ‘ফিশন’(নামটি অবশ্য সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন লিজের বোনপো বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ’)।মাইটনার বললেন ‘ফিশন’ আঘাতের ধাক্কার সরাসরি ফল নয়, নিউট্রনের ধাক্কায় ইউরেনিয়ামের ভিতরকার পজেটিভ চার্জবিশিষ্ট নিউক্লিয়াসের অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়,এই অস্থিরতা বৃদ্ধির পরিণাম হচ্ছে ‘ফিশন’। এর ফলে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসটি দু’ভাগে ভেঙে  যায়,সে সময় বিপুল পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়,আর সামান্য পরিমাণ পদার্থ বিনষ্ট হয়।পরমাণু থেকে শক্তি মানুষের হাতে তুলে দিল ‘ফিশন’,আবিষ্কৃত হল পরমাণু বোমা যা ধ্বংসের জন্য ব্যবহৃত হল আর আবিষ্কৃত হল পারমাণবিক বিদ্যুৎ যা মানুষের কল্যাণে লাগতে পারে।

বার্লিনের গবেষণাগারে বারবার  এক্সপেরিমেন্ট করে আবিষ্কারটি ঘটালেও কেন এমনটি হচ্ছে  সে বিষয়টি বুঝতেই পারেননি হান।তাঁর কাছে যে বিষয়টি সমস্যাজনক ছিল আগের চিঠিতে তিনি তা লিখেছিলেন লিজে মাইটনারকে। তাঁরা নিউট্রন কণা দিয়ে ইউরেনিয়ামকে আঘাত করে দেখেছিলেন যেখানে ভারী মৌল নির্গত হওয়ার কথা সেখানে নির্গত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত হাল্‌কা বেরিয়াম,যা কেমিস্ট্রির নিয়মে তাঁরা মানতে পারছেন না।চিঠি লিখে এই  সমস্যার যথাযোগ্য সমাধান চেয়েছিলেন মাইটনারের কাছে ।তখন মাইটনার আল্পস পর্বতের এক স্কি-রিসর্টে ছুটি কাটাচ্ছেন,সঙ্গী বিজ্ঞানী বোনপো  অটো রবার্ট ফ্রিৎজ।তাঁকে এ বিষয়ে নিজের ভাবনা জানালেন।নিউট্রনের আঘাতে ইউরেনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে তার কাছাকাছি ওজনের মৌল তৈরি করছে না,বদলে দু’টুকরো হয়ে যাচ্ছে।একটা বেরিয়াম আর একটা ক্রিপ্টন। কীভাবে ইউরেনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস দু’টুকরো হচ্ছে সে ব্যাখ্যাতেও পৌঁছুলেন তিনি।নীল্‌স্‌ বোরের আবিষ্কৃত (পরমাণুর নিউক্লিয়াসের)‘লিকুইড ড্রপ’ নামক গাণিতিক মডেলের সাহায্য নিলেন।চলার পথেই এক টুকরো কাগজ কুড়িয়ে নিলেন রাস্তা থেকে, রাস্তার পাশে এক গাছের তলায় বসেই সমাধান কষলেন সেই সমস্যার।ইউরেনিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে তুলনা করলেন গোলাকার তরল বিন্দুর সঙ্গে।সমাধানে লিখলেন ইউরেনিয়ামের পরমাণু নিউট্রনের আঘাতে সম্প্রসারিত হয় ও ঘটনাক্রমে ইউরেনিয়ামের গোলাকার নিউক্লিয়াসটি দুটি অপেক্ষাকৃত ‘ছোট্ট ফোঁটায়’ ভেঙে যায়।সেটাই হয়েছিল অটো হানের এক্সপেরিমেণ্টে। সেখানেও ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভেঙে যাচ্ছিল অতি হাল্‌কা বেরিয়াম ও ক্রিপটন পরমাণুতে, আর খানিকটা  নিউট্রন ও বিপুল পরিমাণে শক্তি নির্গত হচ্ছিল, পরিবর্তে নগণ্য পরিমাণ পদার্থের ক্ষয় হচ্ছিল। মাইটনার ভাবলেন, কি করে এত অল্প পদার্থের ক্ষয়ে  এত বিপুল শক্তির নির্গমণ ঘটছে?এই বিষয়টাও ধরতে পারেন নি অটো হান ও তাঁর   সহকারী।মাইটনার এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে সাহায্য নিলেন আইনস্টাইনের যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক ফর্মূলা বা সমীকরণের।E=mc2 অর্থাৎ সামান্য পদার্থ=বিপুল শক্তি এই সমীকরণ অনুসারে অতি সামান্য পরিমান পদার্থের ক্ষয়ে উৎপন্ন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ শক্তি বা এনার্জি।মিলে গেল পরমাণু বোমা আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ তৈরির ফর্মূলা।পদার্থের এই শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ার নাম দিলেন ‘ফিশন’।তিনি চিঠিতে অটো হানকে নির্দেশ দিলেন পরীক্ষাগারে পরীক্ষাটি আবার করে দেখতে। এবারেও তাঁদের মিলল বেরিয়াম।চিঠিতে জানালেন মাইটনারকে তাঁদের পরীক্ষায় এক ভয়ঙ্কর ফল মিলেছে,যার ব্যাখ্যা চান। দেখা করতে চাইলেন মাইটনারের সাথে।ততদিনে মাইটনার সমস্যাটির সমাধান করে ফেলেছেন।      

১৯৩৮ সালের মাঝামাঝি সময়। মাইটনার তখন থাকেন নিরপেক্ষ দেশ সুইডেনের  স্টকহোমে। ইহুদি বিজ্ঞানী মাইটনারের সঙ্গে অতি গোপনে দেখা করতে এলেন অটো হান,কারণ জার্মান বিজ্ঞানীর এই সাক্ষাতের বিষয়টি হিটলারের চরেরা জানলে আর রক্ষা থাকবে না। ১৩ই নভেম্বর ১৯৩৮ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে অটো  হান দেখা করতে এলেন। বিজ্ঞানী নীলস্‌ বোরের গবেষণাগারের কনফারেন্স রুমে, অতিশয় গোপনে তাঁদের সাক্ষাৎ হল। অটো হান জানালেন তাঁর গবেষণায় প্রাপ্ত ফলের কথা।মাইটনার বললেন ওঁদের অনুমানে ভুল আছে।তাঁদের বুঝিয়ে দিলেন নিজের ব্যাখ্যা। অটো হান ফিরে  এলেন বার্লিনের গবেষণাগারে। এবারের পরীক্ষায় ইপ্সিত ফল মিলল। ১৯৩৮ সালেই ‘নেচার’ পত্রিকায় লিজে মাইটনার ফিশন নিয়ে তাঁর গবেষণার ব্যাখা বিস্তৃতভাবে লিখেছিলেন।‘ফিশন’ যে বিপুল পরিমাণ শক্তির উৎস তা বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা না করলেও তার আভাস দিয়ে রেখেছিলেন তাঁর লেখা সেই পেপারে।তিনি লিখেছিলেন ১ গ্রাম ইউরেনিয়ামের ফিশন যে পরিমাণ তাপ(শক্তি)নির্গত করবে,তা পেতে ১০,০০০ কিলোগ্রাম কয়লা পোড়াতে হবে।এ সব জানার পরেও নোবেল কমিটি ভুল করেছিল নাকি ইচ্ছে করেই বাদ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে এ প্রশ্ন আজ আর করে লাভ নেই।

আমেরিকায় তখন চলছিল পরমাণু বোমা বানানোর ভাবনা।মানহাটান প্রজেক্টের কর্তৃপক্ষ লুফে নিলেন অটো হানকে।১৯৪৩ সালে ‘ফিশন’ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে আমেরিকা যখন অ্যাটম বোমা বানানোর প্রকল্প তৈরি করেছে তখন সেই  প্রকল্পে যোগ দিতে তাঁরা ডেকেছিলেন লিজে মাইটনারকে, কিন্তু মানুষের অকল্যাণের জন্য আহুত এই যজ্ঞে তিনি যোগ দিলেন না,লিখলেন “বিজ্ঞানের এমন চমৎকার আবিষ্কারকে ঘৃণ্য কাজে ব্যবহারে  আমার সায় নেই।”

ইউরোপ ও আমেরিকার নানা গবেষণাগারে সে সময় পরমাণুর অন্তরস্থিত নিউট্রন, প্রোটন, ইলেক্ট্রন, আর আইসোটোপ-তেজস্ক্রিয় মৌল নিয়ে নানা গবেষণা চলছিল। লিজ্‌ ও হানের কাজও চলছিল পরমাণুর তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে। যে সাফল্য এল লিজে মাইটনারের আবিষ্কারে, যে আবিষ্কারের ফলে পরমাণু রূপান্তরিত হল পরমাণু বোমায়, যার  হাত ধরে ১৯৪৪ সালের জন্য নির্দিষ্ট নোবেল পুরস্কার পেলেন অটো হান, ১৯৪৫ সালে  হিরোশিমা নাগাসাকি ধ্বংসের পর। সেই আবিষ্কারের সম্মান লাভে বঞ্চিত হলেন লিজে মাইটনার। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিদূষী নারী আবার বঞ্চিত হলেন  ন্যায্য পাওনা থেকে।১৯৪৫ সালে নোবেল প্রাপকের তালিকায় যেখানে অটো হান-এর নামের সঙ্গে তাঁর নামও একসঙ্গে উচ্চারিত হতে পারত সেখানে তাঁর নামটি ঠাঁই পেয়েছিল ফুটনোটে।

লিজ মাইটনারের মত বিজ্ঞানী নোবেল পেলেন না সেটা তো একটা অবিচার বটেই,কিন্তু সবচেয়ে অবমাননাকর বিষয় হল,অটো হানের বিবৃতি।তিনি ও স্ট্রাসম্যান নিজেদের এক্সপেরিমেন্ট বর্ণনা করে (১৯৩৯ সালে)একটি পেপার লিখেছিলেন ‘ডাই নাচুরওয়াইজেন স্কাফতেন’ নামক জার্নালে, যেখানে তাঁরা মাইটনারের নাম পর্যন্ত উল্লেখ  করেননি। দূরে স্টকহোমে বসেও মাইটনার যে অটো হান ও স্ট্রাসমানের এক্সপেরিমেণ্টকে লাগাতার নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তাঁদের  এক্সপেরিমেন্টের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁদের সঠিক পথে এগিয়ে দিয়েছেন, সে সব কথাই চেপে গেলেন অটো হান। তিনি  হয়ত নাৎসীদের হাত থেকে বাঁচবার তাগিদে একজন ইহুদি মহিলা বিজ্ঞানীর সহযোগিতার কথা স্বীকার করেননি। কিন্তু হানের সহকারী স্ট্র্যাসমান একথা মানেননি। তিনি স্বীকার করেছিলেন তাঁদের এ কাজের সাফল্যে প্রধান ভূমিকা ছিল লিজে মাইটনারের।

মাইটনার কিন্তু ভেঙে পড়েছিলেন এই ঘটনায়। ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতেই নিজের ভাইকে চিঠিতে লিখেছিলেন,“…আমাদের যৌথ গবেষণাকে ভিত্তি করে অটো হান কিছু ফলাফল প্রকাশ করে সদ্য একটি পেপার লিখেছে…যদিও বিজ্ঞানের বিচারে ও ব্যক্তিগতভাবে অটো হানের সাফল্যে আমি খুশি, তবু  বিজ্ঞানজগতে চারপাশের সবাই ভাববে এই আবিষ্কারে আমার কোনও অবদানই নেই- আমি খুবই হতাশ।”

১৯৪৫ সালে  নোবেল পাওয়ার পর থেকে অটো হান আজীবন বলে গেছেন যে তিনিই ‘ফিশন’ আবিষ্কারের জনক, আবিষ্কারের একমাত্র দাবিদার।মাইটনার একসময়ের সহকর্মী গবেষক বিজ্ঞানীর এই মর্মবিদারক ব্যবহারকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন-“অটো হান ইজ সিম্পলি সাপ্রেসিং দ্য পাস্ট(ইন নাৎসি জার্মানি),আই অ্যাম পার্ট অফ হিজ সাপ্রেস্‌ড পাস্ট”।

১৯৪৫ সালে নোবেল প্রাইজ ঘোষণার পর মহিলা বিজ্ঞানী ব্রিজিট ব্রুম আমিনফকে এক চিঠিতে লিজ যা লিখেছিলেন, তার মর্মার্থ ছিল এই-‘রসায়নে হান নোবেল  পেয়েছেন, সেটা সঠিক, তিনি নোবেলের যোগ্য বিজ্ঞানী। কিন্তু যে কাজের জন্য একমাত্র হান নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তা ভুল। ‘ফিশন’ প্রক্রিয়াটির বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে পরমাণু বোমা বানানো যেত না। ‘ফিশন’ কীভাবে হয় তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতে তিনি ও তাঁর  বোনপো বিজ্ঞানী অটো রবার্ট ফ্রিৎজ যা করেছিলেন তা কোন অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ  নয়। ফিশনের উৎস কী,ফিশন থেকে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়,সেসব অটো হান ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। সেটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর(মাইটনারের) ব্যাখ্যার পর। তাই খবরের কাগজে তাঁকে যে হান-এর অধস্তন সহকারী বলে উল্লেখ করা  হয়েছে, তা তাঁর বেমানান বলে মনে হয়েছে।এটা অন্যায় হয়েছে।

লিজে মাইটনার ছিলেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের এক ইহুদি পরিবারের সন্তান।   ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় লিজের জন্ম ১৮৭৮ সালের ৭ই নভেম্বর। লেখাপড়ারও সেখানেই শুরু হয়েছিল।কিন্তু সে সময়ে অস্ট্রিয়ার সমাজে চৌদ্দ বছরের বেশি বয়সের  মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য স্কুলে পাঠাতে পারতেন না অভিভাবকেরা। সমাজের বারণ  ছিল। ছেলেবেলা থেকেই লিজে গণিত ও বিজ্ঞানে অত্যন্ত ভালো হওয়া সত্বেও তাঁর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাঁর অভিভাবকেরা ছিলেন আধুনিক মনের মানুষ। মেয়েদের লেখাপরা শেখানোর প্রয়োজনীয়তা তাঁরা বুঝতেন। তাই তাঁরা  সমাজের চোখ এড়িয়ে গৃহশিক্ষক রেখে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদেরও বাড়িতেই শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।বাড়িতে পড়াশুনা করেই তিনি এন্ট্রান্স পাশ করেছিলেন আর ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯০৫ সালে পদার্থবিদ্যায় পি এইচ ডি করেছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনিই ছিলেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় পি এইচ ডি প্রাপক মহিলা।

১৯০৭ সালে ২৮বছর বয়সী লিজে মাইটনার গবেষণার জন্য চলে গেলেন বার্লিনে। যোগ দিলেন রসায়নবিদ অটো হান-এর গবেষণাগার ‘কাইজার উইলহেল্‌ম ইনস্টিটিউট ফর কেমিস্ট্রি’তে। দুজনেরই গবেষণার মূল বিষয় ছিল মৌলের তেজস্ক্রিয়তা। এরপর তাঁদের একসাথে দীর্ঘপথ চলা। উভয়ের  কাজ ছিল  পরস্পরের পরিপূরক। লিজে মাইটনার ধীরে  ধীরে হয়ে উঠেছিলেন পরমাণুবিদ্যার একজন পথপ্রদর্শক। তাঁর অনেক আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে পরমাণু মৌলের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার ও বোনপো অটো রবার্ট ফ্রিৎজ-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ আবিষ্কার।অটো হানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সময় তিনি অনেকগুলি আইসোটোপ-তেজস্ক্রিয় পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯২২ সালে  তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ‘অগার এফেক্ট’-তেজস্ক্রিয় বস্তুর পৃষ্ঠতল থেকে ইলেকট্রন বিকিরণের কারণ। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যেই তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে গবেষণা ক্ষেত্রে হান-মাইটনার জুটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম শ্রেণীর দু’জন গবেষক হয়ে উঠেছিলেন। এরপরই শুরু ইতিহাসের প্রহসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি, নাৎসি জার্মানির উত্থান, ইহুদি নির্যাতন, লিজে মাইটনারের বার্লিন ত্যাগ। পরের ঘটনা শুরুতেই লেখা হয়েছে।

নোবেল প্রাইজ থেকে বঞ্চিত হলেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন এক চিরস্থায়ী  বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারের। বিজ্ঞানের খাতায় ১০৯ নম্বর মৌলটিকে তাঁর নামে নামাঙ্কিত করে সেটির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘মাইটনেরিয়াম’-যতদিন বিজ্ঞানের ইতিহাস চলমান থাকবে ততদিন মৌলের তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে উচ্চশক্তিসম্পন্ন পারমাণবিক সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ‘মাইটনেরিয়াম’ মৌলটির নাম উল্লেখ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাইটনারের নামটি মনে করা হবে। যেখানে পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ীদের নাম  স্মরণ করতে জিজ্ঞাসুদের বই খুলে দেখতে হবে।  

সব লেখা একত্রে–উমা ভট্টাচার্য   

Advertisements