সেই মেয়েরা স্বর্ণকুমারী দেবী উমা ভট্টাচার্য বর্ষা ২০১৬

সেই মেয়েরা- আগের পর্বগুলো

seimeyera01 (Medium)

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীর নাম আমরা সবাই প্রায় জানি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে মাত্র বছর পাঁচেকের বড় ছিলেন কবির এই ন-দিদি। তাঁর অসামান্য প্রতিভা আর নানা বিষয়ে মৌলিক কাজকর্মের কথা মনে হয় সকলেই ততটা জানি না। গত আটই মার্চ আরেকটি ‘আন্তর্জাতিক মহিলা দিবস’ চলে গেল। সেদিন তাঁর কথা খুব মনে পড়ছিল। তাঁর প্রতিভার যোগ্য মর্যাদা আজও তিনি পাননি। নাহলে, অন্যান্য যেসব স্মরণীয়া নারীদের কথা আমাদের স্কুলপাঠ্য বইয়ে থাকে তাঁদের সঙ্গে অন্ততঃ স্বর্ণকুমারী দেবীর জীবনী বিষয়েও কোনো লেখা আমরা পড়তে পেতাম। তাঁকে সম্মান আর শ্রদ্ধা জানাবার জন্য,তাঁর  গল্পের মত জীবনকথা ছোট করে লিখলাম এবারের জয়ঢাকের ‘সেই মেয়েরা’ পর্বে। সামনের তাঁর ১৬০তম  জন্মদিন। তারিখটা ছিল ১৮৫৫ (মতান্তরে ১৮৫৬) খ্রিস্টাব্দের ২৮শে  আগস্ট।

উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণের পুরোধা ছিল কলকাতার ঠাকুর পরিবার। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর উপলব্ধি করেছিলেন নবযুগের চেতনায় আর শিক্ষায় মানুষ করে তুলতে হবে ছেলেমেয়েদের। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় শিক্ষার সমন্বিত রূপটি প্রবেশ করিয়েছিলেন নিজের বৃহৎ পরিবারে। সুস্থ চেতনা গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন তাঁর পরিবারের মহিলাদের মধ্যে।

বাড়ির মেয়েরা অযোধ্যানাথ পাকড়াশীর কাছে বাংলা ও সংস্কৃত শিখতেন আর মেমের কাছে নিতেন ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ। মহর্ষি নিজে অনেকসময় বাড়ির মেয়ে-বউদের জ্যোতির্বিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে পাঠ দিতেন গল্পের মত করে। এর গভীর প্রভাব পড়েছিল কন্যা স্বর্ণকুমারীর মধ্যে যা গড়ে দিয়েছিল তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক রচনার ভিত।

ছোটবেলায় বড় দিদিরা স্কুলে গেলেও  স্বর্ণকুমারীর পড়াশোনা শুরু ও শেষ হয়েছিল বাড়িতেই। স্কুলশিক্ষার সিলেবাসের বোঝা না থাকায় নিজের চেষ্টায় নানা বিষয়ে প্রচুর বইপত্র পড়ে, স্বশিক্ষিত হয়ে  উঠেছিলেন। সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজ,প্রভৃতি সব বিষয়েই তাঁর জ্ঞান ছিল অসামান্য। ঠাকুর পরিবারের অন্তঃপুরে মেয়েদের মধ্যে এক হীরকখণ্ডের মত নিজের প্রতিভার দীপ্তিতে ক্রমশঃ ভাস্বর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কাব্য, সঙ্গীত, নাটক, ছোটগল্প, রম্যরচনা, গীতিনাট্য ও প্রবন্ধ লেখা, সাংবাদিকতা, পত্রিকা সম্পাদনা, সমাজসংস্কারমূলক কাজকর্ম, সমিতি স্থাপন, সর্বোপরি উপন্যাস লেখা- সমস্ত ক্ষেত্রেই নিজের উজ্জ্বল প্রতিভার পরিচয় তিনি রেখে গেছেন। সমকালীন  স্বদেশী ও বিদেশী প্রায় সব বিদ্বান মানুষরাই তাঁকে উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এক বিদূষী মশালবাহক বলে স্বীকার করেছেন।

পরিবারের প্রথা অনুযায়ী মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী ছিলেন  শিক্ষিত,সমাজসচেতন যুবক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট জানকীনাথ ঘোষাল। ঠাকুরবাড়িতে বিয়ের পর মেয়েদের স্বামীসহ বাপের বাড়িতেই থাকবার প্রথা হলেও স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথ তার ব্যতিক্রম ছিলেন।

বিয়ের আগেই তাঁর লেখকজীবন শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর তাতে কোনও ছেদ পড়েনি। বরং তাঁর সাহিত্য প্রতিভার পূর্ণ আলোক বিচ্ছুরণ  শুরু হয় বিয়ের পর। প্রগতিবাদী জানকীনাথের সহযোগিতায় স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি আসতে দেরি হল না।

জানকীনাথ যখন বিলেতে যান তখন অনেকদিন স্বর্ণকুমারী বাপের বাড়িতে রয়ে গিয়েছিলেন। এই সময়েই তাঁর সঙ্গীতচর্চার, ইংরেজী ভাষা শিক্ষার ও ভালোভাবে ইংরেজীসাহিত্য পাঠের সুযোগ হয়েছিল। বাড়ির অন্য মেয়েরা ঘরের কাজে,রান্নাঘরে নতুন নতুন খাবার তৈরিতে, নানারকম হাতের কাজে, রূপচর্চায় আর গল্পগাছায় সময় কাটালেও তিনি নিজেকে  সরিয়ে রাখতেন এইসব থেকে। তাঁর মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরাণীর লেখা থেকেই জানা গেছে যে, সরলা নিজে মাঝেমাঝে অন্দরমহলের মেয়েদের আসরে উপস্থিত থাকলেও তাঁর মাকে কখনও সেখানে দেখেননি। স্বর্ণকুমারী সে সময় নিজের ঘরে,আপন মনে ব্যস্ত থাকতেন নিজের পড়াশোনা,সঙ্গীত রচনা,ও সাহিত্য সাধনায়।  

গল্প ,কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্যের হাতেখড়ি হতে না হতেই করে ফেললেন একটি মস্ত কঠিন কাজ। মাত্র একুশ বছরবয়োসে লেখা হল প্রথম উপন্যাস- ‘দীপনির্বাণ’। ছাপা হল ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে, বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশের এক দশকের মধ্যে। এই ‘দীপনির্বাণ’ই বাংলাভাষাতে কোনও মহিলার লেখা প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসের বিষয়বস্তুও অবাক করার মত। দেশের মানুষের নৈতিক অবনতি আর আত্মকলহের সুযোগে বিদেশী শত্রু বারবার আমাদের দেশকে আক্রমণ করেছে, জয় করেছে,হরণ করেছে আমাদের স্বাধীনতা। সেই গ্লানি আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নিজেদেরই কারণে। এই  বক্তব্যই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর উপন্যাসে।

বক্তব্যের গুরুত্বই যুগের  প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। এই নিয়ে একটা মজাও হয়েছিল অবশ্য। সেইটা বলি। প্রথমে উপন্যাসে লেখকের নামের জায়গায় লেখা  ছিল ‘জনৈক লেখিকা’। বাংলা  দেশে তখনও ভালোভাবে স্ত্রীশিক্ষার প্রসারই হয়নি, অনেক মহিলাই  লেখাপড়ার সু্যোগ থেকে বঞ্চিত। সেই অবস্থায় কোন বাঙালি মহিলার উপন্যাস লিখে ফেলাটা বেশ শক্ত কাজ ছিল। কলকাতার তখনকার বিদ্বান, পণ্ডিত মানুষেরা উপন্যাসের ভাষা আর বিষয়বস্তুর  উৎকর্ষ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।

কলকাতায় হিন্দু পেট্রিয়ট,দি ক্যালকাটা রিভিয়্যু প্রভৃতি নামকরা পত্রিকায় প্রভূত প্রশংসা পেল তাঁর লেখা। দাদা  সত্যেন্দ্রনাথ তখন ইংলন্ডে,সেখানে তাঁর হাতেও  সেই উপন্যাসের  এক কপি পৌঁছুল। তিনি তো প্রথমে বিশ্বাস করতেই পারেন নি যে,একজন মহিলা এই  রকম একটি উপন্যাস রচনা করতে  পারেন। ভাবলেন উপন্যাসটি হয়ত তাঁর ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছেন, ছদ্মনামে। অভিনন্দন জানিয়ে  তাঁকে চিঠি লিখলেন,  “জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে?”

সেই শুরু হল বাংলার সাহিত্যপ্রাঙ্গণে স্বর্ণকুমারীর  অবাধ বিচরণ। একের পর এক অবাক করে দেওয়ার মত লেখা বেরোতে লাগল তাঁর কলম থেকে। এক ধাঁচের নয় সেসব, নানা বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সেসব লেখা। ছোটভাই রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ঠাকুরপরিবারের আর কেউই তাঁর মত এত বেশি লেখেননি।   তেরোটি উপন্যাস, চারটি নাটক,গীতিনাট্য ‘বসন্ত-উৎসব’, প্রকাশিত হল তাঁর  বিজ্ঞানবিষয়ক সাতাশটি প্রবন্ধের সংকলন ‘পৃথিবী’।

শৈশবে বিজ্ঞানের পাঠ শুরু হয়েছিল যাঁর কাছে, সেই মহর্ষি পিতাকেই  শ্রদ্ধা জানালেন নিজের লেখা বিজ্ঞান প্রবন্ধের বইটি তাঁর নামে উৎসর্গ করে। এর থেকে বড়ো পিতৃঋণ শোধ আর কিছু কি হতে পারে?   

লেখক থেকে সম্পাদকে উত্তীর্ণ হতে বেশি সময় লাগেনি তাঁর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বরী দেবীর মানসকন্যা,‘ভারতী’ পত্রিকা (১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বিজেন্দ্রনাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত) সম্পাদনার ভার নিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। সেটা ১৮৮৫ সাল। প্রথমবার এগারো বছর,পরে ১৯০৯ থেকে আরও আট বছর আর শেষে ১৯২৬ থেকে আরও দুবছর, মোট ২১ বছর, তাঁর সম্পাদনায় সমৃদ্ধ হয়েছিল এই পারিবারিক সাহিত্যপত্রিকা।

পত্রিকাটি পারিবারিকভাবে শুরু হলেও এতে লিখতেন অনেক অসামান্য সাহিত্যিক, চিন্তাশীল আর সমাজসংস্কারক মানুষেরা। নামে সাহিত্যপত্রিকা হলেও সাহিত্যের গণ্ডিতে আটকে না থেকে তখনকার  বাঙালি জীবন আর সংস্কৃতির সমস্ত দিক নিয়েই লেখা প্রকাশিত হত এখানে। এই পত্রিকাতেই বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন স্বর্ণকুমারী। পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি ঠিক করেছিলেন যে, তাতে বিজ্ঞান বিষয়ে লেখা প্রাধান্য পাবে। লেখার ভাষা হবে সরল। উদ্দেশ্য ছিল, যেসব মেয়েরা ইংরেজি জানে না,তারাও যেন বিজ্ঞানের খবরাখবর জানতে পারে।

বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ লেখা শুরুর আগে তার জমিটা তিনি গড়েছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিজ্ঞান-রহস্য’, আর সেইসঙ্গে বড়ো বড়ো বিজ্ঞানীদের ইংরেজিতে লেখা বিজ্ঞানের নানা বিষয়ক প্রবন্ধও নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করে। তারপর নিজেই লিখতে শুরু করলেন সে জাতীয় লেখা। প্রথমে সাতটি প্রবন্ধ ভূবিজ্ঞান বিষয়ে। বলা যায়, বাংলার মেয়েদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার  সূচনা ঘটিয়ে দিলেন তিনি এইভাবে।

তাঁর আর এক মৌলিক কাজ হল  বাংলায় বিজ্ঞানের পারিভাষিক শব্দ সৃষ্টি। বিজ্ঞান-প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে দেখলেন বিজ্ঞান বিষয়ের প্রবন্ধ ও আবিষ্কারের বিষয়গুলিতে লিখিত ইংরেজি শব্দগুলি বোঝাবার জন্য সহজবোধ্য বাংলা শব্দের অর্থাৎ পরিভাষার একান্ত অভাব। সুন্দর, শ্রুতিনন্দন, আর যথোপযুক্ত  বাংলা শব্দ চয়ন করে বা সৃষ্টি করে তিনি ‘বিজ্ঞানের পরিভাষা’র এক উল্লেখযোগ্য  ভাণ্ডার সৃষ্টি করলেন।এই পরিভাষার সৃষ্টি হওয়াতে  অনেক  বিজ্ঞানীর লেখা নানা বই বাংলাভাষাতে অনুবাদের  কাজ সহজ ও সহজবোধ্য করা সম্ভব হল।

তাঁর উপন্যাসগুলোর বেশির ভাগই ইতিহাস নির্ভর। ঐতিহাসিক  রমেশচন্দ্রের মতই ইতিহাসের বিষয় নিয়ে লেখবার জন্য ইতিহাসের সঠিক তথ্য পরিবেশনে বিশ্বাসী ছিলেন স্বর্ণকুমারী। টডের লেখা রাজপুতানার ইতিহাস পড়ার পর লিখলেন ‘মিবাররাজ’ (১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ)। উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাজপুতদের বীরত্ব আর জাতির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আত্মত্যাগের কাহিনী। কিন্তু পদানত,অবহেলিত,স্বভূমি থেকে উৎপাটিত আদি জনজাতি, ভূমিপুত্র ভীলদের বেদনা ও বিদ্রোহের কথাও লিখতে ভোলেননি। উচ্চবর্ণের রাজপুত আর আদিবাসী ভীলদের কাহিনী পাশাপাশি চলেছে তাঁর এই উপন্যাসে।  তাঁর শৈশবে ঘটে যাওয়া ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ নিয়ে লিখছেন উপন্যাস ‘বিদ্রোহ’(১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ)। আর হিন্দু রাজা গণেশের উত্থানের কাহিনী নিয়ে লিখেছিলেন ‘ফুলের মালা’ উপন্যাস।

‘হুগলীর ইমামবাড়ি’ও তাঁর লেখা ইতিহাসভিত্তিক  উপন্যাস। সে জায়গার পরিবেশ, ব্যবসাবাণিজ্য, সামাজিক পরিস্থিতি, জনজীবনের সুখদুঃখ, সবকিছুর কথাই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর এই উপন্যাসে। সেই সময়ে হুগলির কঠিন সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের কর্মে উজ্জ্বল দুই ভাই-বোন মহম্মদ মহসীন ও তাঁর বোনের দানশীলতার  কথা লিখতে ভোলেননি। বর্ণনা দিয়েছেন হাজী মহম্মদের প্রতিষ্ঠিত অনন্যপূর্ব স্থাপত্য ‘ইমামবাড়া’র।

ঠাকুর  পরিবারে ছেলেমেয়ে আর বউদের  মধ্যে সব সাংস্কৃতিক ব্যাপারে অংশ  নেওয়ার, বা নতুন কিছু করে দেখাবার একটা হুজুগ সবসময়েই কাজ করত। স্বর্ণকুমারীর লেখা  প্রথম গীতিনাট্য(অপেরা)‘বসন্ত-উৎসব’ (১৮৭৯) সে রকম একটা হুজুগেই লেখা  হয়েছিল। গল্পটা বলি শোন। একবার পারিবারিক আড্ডায় কথা উঠল  ফাগুনের আনন্দ উৎসব ‘দোল’ নিয়ে। সবার জানার আগ্রহ আগেকার  দিনে বসন্তের এই  উৎসব দোল কেমন ভাবে পালিত  হত? নানাজনের দেওয়া নানা তথ্য নিয়ে যখন তর্ক-বিতর্ক জমে উঠেছে বারান্দার আসরে,তখন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বললেন, সেকালের মত করে আবির,কুম্‌কুম,পিচকারি নিয়ে বসন্ত-উৎসব করা হোক।

আবির, পিচকারি ,সাজসরঞ্জাম  এসে গেল। খুব আবির  খেলা হবে রাতের বেলা পূর্ণিমার আলোয় ছাদের বাগানে। ঠিক হল সঙ্গে নাচ-গানও হবে। কদিনের মধ্যেই স্বর্ণকুমারী লিখে হাজির করলেন একটা গীতি-নাটিকা। নাম দিলেন  ‘বসন্ত-উৎসব’। ঠাকুরবাড়িতে সেটির প্রথম অভিনয়ও হয়ে গেল। নাটকে সন্ন্যাসিনী  সাজলেন নিজে।

বড়বাড়ির মেয়ে ও বউ হয়েও সাধারণ মানুষজনের জীবনের ব্যাপারে যথেষ্ট অবহিত ছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় দুই খণ্ডে লেখা ‘স্নেহলতা’ উপন্যাসে।  সমাজসংস্কারকরা বাল্যবিধবাদের ফের বিধবাবিবাহকেই তাদের উদ্ধারের রাস্তা বলে দেখাচ্ছিলেন তখন। স্বর্ণকুমারী এই উপন্যাসে আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বললেন, বিধবাবিবাহেই সমস্যার সমাধান নয়। সমাধান আসবে তাঁদের আর্থিকভাবে স্বয়ম্ভর  করে তোলার মধ্যে দিয়ে।

বাস্তবজীবনেও সমাজের  অবহেলিত বা সম্বলহীন মেয়েদের জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর চিন্তার সার্থক প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। সহায় সম্বলহীন,লেখাপড়া না জানা  কুমারী মেয়েদের আর বিধবা মেয়েদের  সমিতির আবাসনে এনে রেখে লেখাপড়া  শেখাত ১৮৯৬ সালে তাঁর উদ্যোগে আর পরিকল্পনায় প্রতিষ্ঠিত ‘সখি সমিতি’।  তারপর তাঁদের দিয়েই বিভিন্ন বাড়ির অন্তঃপুরের মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর চাকরি দিয়ে স্বনির্ভর করে তোলা হত। এঁদের থাকা খাওয়ার সব দায়িত্ব নিত ‘সখি সমিতি’।

এর পাশাপাশি অনাথ শিশুদেরও আশ্রয় আর  শিক্ষার ব্যবস্থা  করে তাঁদের মানুষ  করে তোলার কাজও চলছিল তাঁর। কিন্তু এইসবই ছিল ব্যয়সাপেক্ষ কাজ। প্রথমদিকে সমতির সদস্যাদের আর্থিক অনুদানে খরচ চলত। চাঁদা ছিল মাসিক এক টাকা। ক্রমে কাজের পরিসর বাড়ল, সমিতিতে থাকতে আসা মেয়েদের সংখ্যা বাড়লে অর্থসংকট দেখা দিল। টাকা জোগাড়ের জন্য স্বর্ণকুমারী তখন এক নতুন পরিকল্পনা করলেন।  একটা হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন তিনি। সমিতির কাজের জন্য অর্থ রোজগার, সেইসঙ্গে মেয়েদের হাতের কাজকে প্রকাশ্যে এনে সে কাজকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেয়া ও তাঁদের পরিশ্রমের অর্থমূল্য দেয়া, সেই ছিল প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য। বলা যায় এই পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই আধুনিক যুগের ‘শিল্পমেলা’র বীজ রোপিত হয়েছিল।

শিল্পপ্রদর্শনীর আয়োজন হল বেথুন কলেজের প্রাঙ্গণে।  মেয়েদের  ভালো রোজগার হয়েছিল জিনিস বিক্রি করে। ঢাকা ,শান্তিপুরের বিখ্যাত শাড়ি, কৃষ্ণনগর,বীরভূমের  হস্তশিল্প, মাটির কাজ নিয়ে শিল্পীরা এসেছিলেন। বাঙলার বাইরে কাশ্মীর, বারাণসী, মোরাদাবাদ, আগ্রা, জয়পুর, বোম্বাই প্রভৃতি নানা জায়গার শিল্পীরা এসেছিলেন তাঁদের শিল্পসম্ভার নিয়ে।

এই প্রদর্শনীর অভাবনীয় সাফল্য এরপর থেকে আর প্রদর্শনী থাকেনি,বাৎসরিক এক শিল্পমেলায়  পরিণত হয়েছিল তা। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারীরা ও ক্রেতারা  সবাই ছিলেন মহিলা। শিল্পকর্মের উৎকর্ষ বিচার করে পুরষ্কারও দেওয়া হয়েছিল। প্রথম পাঁচটি পুরষ্কার জিতে নিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির বাইরের অন্যন্য পরিবারের পাঁচজন মেয়ে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে বাংলার ঘরে ঘরে লুকিয়ে আছে অনেক প্রতিভা, তাঁদের একটু সুযোগ করে দিলে তারা ঠাকুরবাড়িকেও সহজেই ছাপিয়ে যেতে পারে। 

এই প্রদর্শনী উপলক্ষে আর একটি অভিনব ব্যাপার হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাগ্নী সরলা দেবীর(স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা)অনুরোধে, প্রদর্শনী উপলক্ষে ‘মায়ার  খেলা’ নাটকটি লিখে দিয়েছিলেন অভিনয়ের জন্য। নাটকটির প্রথম অভিনয় হয়েছিল সেই প্রদর্শনীর শেষ দিনে। প্রধানত ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাই অভিনয় করেছিলেন, এছাড়া কলকাতার অন্যান্য পরিবারের মেয়েরাও ছিলেন। দর্শকও ছিলেন মহিলারাই।

যে সময়ে তিনি লিখতে শুরু করেছেন তার আগেই বেথুন সাহেবের ‘ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’ স্থাপিত হয়েছিল। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও তাঁর প্রথম কন্যা সৌদামিনীকে সেখানে পড়তে পাঠিয়েছিলেন।গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান মদন মোহন তর্কালঙ্কার তাঁর দুই  কন্যাকে এখানে ভর্তি করার জন্য গ্রামছাড়া হয়েছিলেন বলে শোনা যায়।তাতেও সেই ব্রাহ্মণ দমেন  নি।কিন্তু সে  সময়ের কলকাতার প্রভাবশালী গোঁড়া পুরুষসমাজকে আশ্বস্ত করতে,বেথুন সাহেবকেও স্বীকার করে নিতে হয়েছিল যে, ‘স্কুলে মেয়েদের শুধুমাত্র মেয়েলি হৃদয়বৃত্তি বিকাশের পাঠই দেওয়া হবে’ ।তবেই তিনি স্কুলটি  খুলতে  পেরেছিলেন।আশ্চর্যের বিষয় ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের ডিগ্রী নেবার ঘটনাটি স্বীকৃতি পেলে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়,(১৮৮০খ্রিস্টাব্দে) প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সেই মহর্ষি, যিনি নিজের পরিবারের অন্তঃপুরে জ্ঞানের আলোক প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন।তিনি লিখলেন যে, “বিশ্ববিদ্যালয়ে যেরূপ শিক্ষা প্রদত্ত হয়, তাহা বুদ্ধিপ্রধান শিক্ষা,হৃদয় প্রধান শিক্ষা নহে; অতএব ওই প্রকার শিক্ষা স্ত্রীজাতির পক্ষে উপযুক্ত নহে”।

তাঁর বিভিন্ন লেখা ও কর্মকান্ড থেকে বোঝা যায় যে, নিজের চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি নারী পুরুষকে সমান বলে মনে  করতেন। বাংলা ১২৯২ সালে. ভারতী  পত্রিকায় একটি সংখ্যায় প্রকাশিত “পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব” প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে “নারী পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে বিদ্যাবুদ্ধির চর্চা থেকে বঞ্চিত,সুযোগ পেয়েও যদি সে সদ্বব্যবহার করতে না পারে, তখনই মেনে নেওয়া হবে যে পুরুষ বিদ্যা-বুদ্ধি ও জ্ঞানে স্ত্রীলোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ,উন্নত”। নারীর ব্যক্তিসচেতনতা তাঁকে ঘরে বাইরে পুরুষের  কর্মসঙ্গিনী করে তুলুক এ আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর লেখার মাধ্যমে,ভারতী পত্রিকায়।( বাংলা ১২৯৮ সালের আশ্বিন-কার্তিক সংখ্যায়)। ‘মেয়েদের মস্তিষ্কের ওজন কম বলে তাদের বুদ্ধিও কম’, এই অভিনব পাশ্চাত্য অভিমতের প্রতিবাদ তিনি জানিয়েছিলেন বালক ও ভারতী পত্রিকায়।

শুধু তাই নয়। মতামত জানিয়েছেন স্বদেশী আন্দোলন নিয়েও। স্বদেশী সন্ত্রাস যে সার্বজনীন মঙ্গল আনতে পারে না, এ ভাবনাও তিনি তাঁর ‘রাজনৈতিক প্রসঙ্গ’ নিবন্ধে স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। লিখেছিলেন “সব হত্যাকার্য্যই অমঙ্গলজনক। বোমা নিক্ষেপে হত্যার প্রয়াস ঘোরতর অমঙ্গলের সংঘটয়িতা।………”

মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে অবশ্যই পারে ও সেটা করাও উচিৎ একথা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। নিজের জীবনেও তিনি সেটা করে দেখিয়েছেন। লেখার পাশাপাশি ১৮৮৯ থেকে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে কাজ করেছেন। স্বামী জানকীনাথ ঘোষাল যখন জাতীয় কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন, সে সময়ের কথা। তিনিই প্রথম বাঙালি মহিলা যিনি কংগ্রেসের জাতীয় অধিবেশনে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলা থেকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য যে দুজন মহিলা সদস্যা নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই শহরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে ও ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি ছিলেন অন্যতম বাঙালি মহিলা প্রতিনিধি।   

৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত লিখে গেছেন তিনি।  চেতনা ও দৃষ্টির সর্বত্রগামিতা, নতুন যেকোন ভালো পরামর্শ গ্রহণ করার মত উদার মানসিকতা, নারীকল্যাণমূলক নানা অভিনব কাজকর্ম  থেকে অনায়াসেই তাঁকে উনবিংশ শতাব্দীর সমাজসচেতনতার  ক্ষেত্রে প্রথম নারীর স্থান দেওয়া যায়।  আজীবনের মিতভাষী,এই মানুষটির দেহান্ত হয়েছিল ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৩রা জুলাই। তাঁর  প্রতিভা ও কর্মের যোগ্য মূল্যায়ন হয়নি। তবে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ দিয়ে সম্মানিত করেছিল। তাঁর যোগ্য মূল্যায়ন হলে আজকের মানুষ, বিশেষত মেয়েরা উপকৃত হবে। নতুন পথের দিশা পাবে।