সেই মেয়েরা-উষা মেহতা উমা ভট্টাচার্য

seimeyera (Small)

১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দ। কুখ্যাত সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন চলছে। নেতারা বক্তৃতা দিচ্ছেন, গান্ধীজির ডাকে দলে দলে সাধারণ মানুষ পথে নামছেন মিছিল করে। সবারই মুখে এক স্লোগান- ‘সাইমন গো ব্যাক’।

গুজরাটে তখন প্রতিবাদীর সংখ্যা অগুনতি। সেখানকার সুরাট শহরে একদিন সকালে দেখা গেল বড়োদের একটি প্রতিবাদ মিছিল চলেছে। সেই মিছিলের শেষে,একটু তফাতে আর  একটি ক্ষুদে মিছিল আসছে, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের একটি দল, হাতে তেরঙ্গা পতাকা, মুখে  কচি গলায় স্লোগান ‘সাইমন গো ব্যাক’। তাদের নেতা একটি আট কি নয় বছর বয়সী ছোট মেয়ে, চলেছে মিছিলে সবার আগে।

হঠাৎ গোরা পল্টন তেড়ে এল, পতাকা হাতে একটি মেয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। পুলিশ তাদের মিছিল ভেঙে বাড়ি পাঠিয়ে দিল।

সুরাতের খেরার একটি প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রী, এই ক্ষুদে দলের নেতা মেয়েটি কিন্তু দমবার পাত্রী নয়। তার নেতৃত্বে শিশুরা অভিভাবকদের কাছে এই ঘটনা জানাল। শিশুদের অভিভাবকেরা অনেকেই গান্ধীবাদী ছিলেন, ছোটদের মুখে পুলিশের তাড়া দিয়ে পতাকা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার কথা শুনে রেগে  গিয়ে তাঁরা আবার শিশুদের মিছিলে পাঠাবেন ঠিক করলেন। তবে এবার তাদের হাতে আর পতাকা দিলেন না। এবার তেরঙ্গা কাপড় দিয়ে জামা তৈরি করে, তাই পরিয়ে তাদের মিছিলে পাঠালেন। এক একটি পতাকাই যেন হাঁটছিল মিছিলে। তেরঙ্গা মিছিলের শিশুরা  দৃপ্তকণ্ঠে বলতে বলতে চলল, “পুলিশ  তুমি যতই করো, উঁচাও লাঠি, ব্যাটন ধরো, পারবে নাকো পতাকা মোদের কাড়তে”।(Policemen, you can Weild your sticks & your batons, but you cannot bring down our flags”.) এই অভিনব মিছিল দেখে পুলিশও বোধ হয় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।

এখানেই থেমে ছিলনা মেয়েটি আর তার দল। তারা বড়োদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মদের দোকানে পিকেটিং করতেও যেত পড়াশোনার পরে।

কিছুদিনের মধ্যেই বাবার কানে এল মেয়ের কীর্তিকলাপের কথা। বাবাও হয়ত আর সব শহরবাসীর মতই দেশভক্ত ছিলেন, কিন্তু তাঁর বাধা ছিল, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রাজের অধীনে কর্মরত একজন বিচারক। মেয়ের আচরণে বিপদগ্রস্ত হতে পারেন জেনে বাবা বাধ্য হয়েই তাঁকে বারণ করলেন।  বাবার বিপদ হতে পারে জেনে মেয়ে কিছুদিন প্রকাশ্যে কাজ বন্ধ রাখল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সে বাধাও দূর হল। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বাবা অবসর নিলেন। তখন মেয়েটির বয়স দশ বছর মাত্র। তখনই তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতেও উৎসুক।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁদের পরিবার চলে গেলেন বোম্বাই। বোম্বাই তখনো মুম্বাই হয়নি। এবার তাঁর পক্ষে দেশের কাজ করা অনেক সহজ হয়ে গেল। পড়াশোনার সাথে সাথেই দেশের কাজে পুরোপুরি অংশ নেবার উপযুক্ত হয়ে উঠতে লাগলেন। তিনি আর অন্য কিছু ছেলেমেয়ে মিলে নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া নির্দেশনামা ও বিভিন্ন বিষয়ে নানা ছাপা  কাগজ, লিফলেট ইত্যাদি গোপনে জনগণের মধ্যে  বিলি করতেন। যাঁরা জেলে ছিলেন তাঁদের পরিবারের লোকজনদের সাথে দেখা করতেন,তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া দরকারি খবর বা নেতাদের কাছ  থেকে পাওয়া নির্দেশমূলক চিঠিপত্র সংগ্রহ করতেন। লোক মারফৎ সেগুলি যে কোন উপায়ে বন্দী বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে দিতেন।  ছোট বলে তাঁদের কেউ বিশেষ সন্দেহও করত না। সেই সুযোগে তিনি পুরোমাত্রায় কংগ্রেসের খবরাখবর রাখতে শুরু করলেন ও নেতাদের কাছে নির্ভরযোগ্য কর্মী হয়ে উঠলেন।

ছাত্রাবস্থাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আজীবন কংগ্রেসের কর্মী থাকবেন, সংসার করবেন না। খুব কম বয়স থেকেই তিনি সম্পূর্ণভাবে গান্ধীজির জীবনধারাকে গ্রহণ করেন। ১২/১৩ বছরের মেয়েটি খাদির পোশাক পরতে শুরু করলেন, বিলাসিতাকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করলেন জীবন থেকে। গান্ধীজির জীবনদর্শনই হল তাঁর জীবনদর্শন,যা তিনি সারা জীবন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন।

পড়াশোনা কিন্তু ছেড়ে দেননি। মধ্যমানের ছাত্রী হলেও ভারুচের চন্দরামজি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকে ভালো ফল করলেন। ক্লাসের প্রথম পঁচিশজন ছাত্রীর মধ্যে তাঁর নামটি স্থান পেল। দেশের কাজের পাশাপাশি কলেজের পড়া চলল। ১৯৩৯ সালে বম্বের উইলসন কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক হলেন।

২২ বছর বয়স থেকে কংগ্রেসের সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিলেন। তখন ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল। কংগ্রেস ও গান্ধীজির ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৪২ সালের ৯ই আগস্ট শুরু হবে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’। ওইদিন বোম্বাই শহরের ‘গোয়ালিয়র ট্যাঙ্ক ময়দান’-পরবর্তীকালের  মুম্বাই ‘আগস্ট ক্রান্তি ময়দান’ থেকে মিছিল শুরু হবে।

ভারত ছাড়ো  আন্দোলনের ঘোষণার পরেই তৎপর ব্রিটিশ পুলিশ ধরপাকড় শুরু করল। আট আগস্ট গান্ধীজি প্রমুখ অন্যান্য বড়ো নেতারা গ্রেপ্তার হলেন। নেতাদের গোপন নির্দেশানুসারে নির্দিষ্ট দিনে জমায়েত পরিচালনার ভার পড়ল জুনিয়ার গ্রুপের কংগ্রেস কর্মীদের ওপর। সেদিনই নেতৃপদে অলিখিত অভিষেক হয়ে গেল তাঁর। সমবেত জনতার সামনে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি জানিয়ে বক্তৃতা দিলেন তিনি, ও তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে বম্বেতে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সূচনা  করলেন। এবার থেকে তিনি হয়ে উঠলেন কংগ্রেসের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা- ঊষা মেহেতা ।  

এই সময়েই তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছিলেন। তা হল কংগ্রেসের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও গোপন একটা বেতারকেন্দ্র স্থাপন। ঊষা মেহেতা- ১৯২৮ সালের সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে মিছিলকারিণী সেই ছোট্ট প্রতিবাদী মেয়েটি, স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই অভাবনীয় কাজটি করলেন। ১৪ই আগস্ট থেকে চালু করলেন, ‘সিক্রেট কংগ্রেস রেডিও’র কাজকর্ম। এই অসামরিক গোপন রেডিওর সাহায্যে গোপনে ইংরেজবিরোধী প্রচার চালানো, নেতা, সাধারণ কর্মী ও দেশের অন্যান্য প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ও নানা সিদ্ধান্ত বিষয়ে  অবহিত থাকার কাজ চলল অতি সন্তর্পণে।

১৪ই আগস্ট সেই বেতারে ভেসে এল তাঁর কন্ঠস্বর, “আমি ভারতের কোনও এক জায়গার কোনও এক অবস্থান থেকে ৪২.৩৪ মিটার বেতার তরঙ্গে চালিত ‘কংগ্রেস রেডিও’ থেকে বলছি……”

এই রেডিওর মাধ্যমে গান্ধীজির নির্দেশ গ্রহণ ও রেকর্ড করা হত প্রচারের জন্য। সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হত, তাঁদের নির্দেশ, উপদেশ রেকর্ড করা হত ও পরিকল্পনার বিষয়ে জানা যেত। পুলিশের চোখে ধুলো দেবার জন্য প্রায় রোজই প্রচারকেন্দ্রের জায়গা  বদল করা হত।

এর ফলে বিপ্লবী আন্দোলনের কাজ চালানো অনেকটা সহজ হয়ে গেল। ইংরেজ পুলিশের মতে যেগুলি ছিল নিষিদ্ধ খবর সেগুলিই বিনা বাধায় জনতার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার  করা সহজ হয়েছিল, সারা দেশে আন্দোলনের আঁচ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল অতি সহজেই।    

অনেক অনুসন্ধানের পর পুলিশ বেতার কেন্দ্রের সন্ধান পেল তিন মাস পর-১২ই নভেম্বর। বেতারকেন্দ্রের উদ্যোক্তাসহ সকল সদস্যই গ্রেপ্তার হলেন। ঊষা মেহেতাও গ্রেপ্তার হলেন।

ভারতীয় পুলিশের গোয়েন্দা শাখা সি আই ডি তাঁকে ছ’মাস ধরে জেরা করে। কিন্তু পুরো জিজ্ঞাসা পর্বে তিনি জেরার উত্তরে একটিও কথা বলেননি। ছ’মাস জেলের একটি সেলে একাকী আটক থেকেও তাঁর মনোবল ছিল অটুট। কংগ্রেসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তাঁকে বিদেশে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেওয়া হবে এইরকম নানা প্রলোভন দেখানো হয়েছে, কিন্তু তিনি ছিলেন নির্বাক। এমনকি বিচারের দিনগুলিতেও তিনি প্রশ্নের উত্তরে নির্বাক থেকেছেন। নিজেকে বাঁচাবার জন্যও তিনি কোন উত্তর  দেবার চেষ্টা করেননি । ফল হল চার বছরের জেল।পুণের ইয়ারাভেদা জেলে তাঁকে রাখা হয়েছিল।

জেলে থাকাকালীন তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য বম্বের জে জে হসপিটালে আনা হয়েছিল, তাও  ২৪ ঘণ্টা চারজন সশস্ত্র পুলিশের পাহারায়।একটু সুস্থ হলে আবার তাঁকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোরারজী দেশাইয়ের নির্দেশক্রমে তাঁকে মুক্তি  দেওয়া হয়েছিল ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে । পরবর্তীকালে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি ছিল সিক্রেট  কংগ্রেস রেডিওর কাজ শুরু করা আর সবচেয়ে তিক্ত আর দুঃখের মুহূর্তটি ছিল যখন জানলাম যে,একজন ভারতীয় টেকনিশিয়ানের বিশ্বাসঘাতকতায় এত গুরুত্বপূর্ণ কাজের জায়গাটি্র  সন্ধান  পেয়ে গেল ইংরেজ পুলিশ। আমরা সবাই ধরা পড়লাম। দেশের অনেক ক্ষতি হল।”  

তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে যাওয়াতে এর পরে ইচ্ছে থাকলেও তিনি সামাজিক বা রাজনৈতিক সমস্ত কাজ থেকে দূরে থেকেছেন।  আমৃত্যু লেখালেখির মাধ্যমে সামাজিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। পরে আরও পড়াশোনা করেছেন, গান্ধীজির রাজনৈতিক ও দার্শনিক মতাদর্শ নিয়ে গবেষণা করে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রি পেয়েছেন। ইংরিজি ও গুজরাটি ভাষায় অনেক প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও বই লিখেছেন। ছাত্রী হিসাবে, লেকচারার হিসাবে,প্রফেসর হিসাবে, গবেষণা সহায়ক হিসাবে,সর্বোপরি বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিভিকস্‌ ও পলিটিক্স’ বিভাগের প্রধান হিসাবে ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে অবসর নেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল। ভারতীয়  বিদ্যাভবন, গান্ধী শান্তিসংস্থা যোজনা, গান্ধী স্মারক নিধি ট্রাস্ট প্রভৃতি সংস্থার সঙ্গে তাঁর আজীবন যোগ ছিল।

১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত করেন ভারত সরকার। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ৮০ বছর বয়সে তাঁর দেহান্ত হয়। 

 স্মরণীয় সহযোগীরা

ভারতবর্ষের মত পরাধীন দেশে ঊষা মেহতাই প্রথম নাগরিক যিনি কংগ্রেসের বিপ্লবী  কাজকর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য একটি সফল অসামরিক ‘গোপন বেতারকেন্দ্র’ স্থাপনের মত দুঃসাহসী কাজটি করেছিলেন। এ কাজে তিনি যাঁদের সহকারী নির্বাচন করেছিলেন ও যাঁদের অকৃপণ সহযোগিতায় এই কাজটি করতে পেরেছিলেন তাঁদের নাম না করলে অন্যায় হবে। এই বেতারকেন্দ্রের বাস্তবায়নে যাঁর প্রত্যক্ষ সহযোগ ছিল তিনি ছিলেন শিকাগো রেডিওর মালিক নানকা মোতওয়ানি- যিনি সমস্ত যন্ত্রপাতি আর টেকনিশিয়ান যুগিয়েছিলেন। সহযোগী ছিলেন বিঠ্‌ঠলভাই জাভেরি,চন্দ্রকান্ত জাভেরি,বাবুভাই ঠক্কর ।যাঁরা মানসিক সমর্থন যুগিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডাঃ রামমনোহর লোহিয়া,অচ্যুৎ রাও পট্টবর্ধন,পুরুষোত্তম টিকমদাস।

শেষে একটি কথা জানাই যে দিল্লীর এসকর্ট হাসপাতালের ডিরেক্টর ও  নামকরা অ্যানাস্থেটিস্ট ডাঃ যতীন মেহেতা, আর বিখ্যাত চিত্রপরিচালক কেতন মেহেতার পিসিমা ছিলেন ঊষা মেহেতা।                                         

সেই মেয়েরা- র সমস্ত এপিসোড একত্রে এইখানে

Advertisements

One Response to সেই মেয়েরা-উষা মেহতা উমা ভট্টাচার্য

  1. কৃষ্ণেন্দু ব্যানার্জ্জী । says:

    ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নতুন দিক সম্পর্কে জানলাম । লেখিকাকে ধন্যবাদ আর এই কর্মকাণ্ডের হোতাদের আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s