স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: অনন্ত প্রসারণ থেকে স্টিফেন হকিং-এর স্বচ্ছন্দ প্রস্থান – চিত্তরঞ্জন সাঁতরা- শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডে যত তারা বা নক্ষত্র রয়েছে, তাদের জ্বালানির সবটুকু শেষ হয়ে গেলে, একদিন এই ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু, তার পরও সব শেষ হয়ে যাবে না। কারণ, এই ব্রহ্মাণ্ড শুধুই একটা নয়। এমন ব্রহ্মাণ্ড বা ইউনিভার্স আরও আছে – মাল্টি ইউনিভার্স। এই কনজেকচার বা অনুমান করেছিলেন স্টিফেন হকিং। তাঁর শেষ গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল “A Smooth Exist from Eternal Inflation” – অনন্ত  প্রসারণ  থেকে এক স্বচ্ছন্দ প্রস্থান। এই গবেষণাপত্রে তাঁর সহযোগী ছিলেন টমাস হের্গস। এই গবেষণাপত্র  হকিং সংশোধন করেছেন হুইল চেয়ারটা ছেড়ে অন্য কোন অজানা ব্রহ্মাণ্ডের খোঁজে  চলে যাওয়ার দশ দিন আগে, ৪ মার্চ, ২০১৮। তাঁর ৭৬ বছরের জীবনের যবনিকাপাত ১৪মার্চ, ২০১৮। হকিংএর জীবন শুধু আজীবন বিজ্ঞান সাধনার গল্প নয়, এটা এমন এক মানুষের গল্প, যিনি নিজের জীবনকেই অন্যদের কাছে দৃষ্টান্ত করে তুলতে পেরেছিলেন।

স্টিফেন হকিং মনে করতেন, মহাবিশ্ব একটা বৈজ্ঞানিক নিয়মে চলছে। খুব সহজেই যে এই সমীকরণটি মেলানো যাবে, তাও নয়। তিনি বলেছেন, শূন্য থেকেই অনেক মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যে এখানে আছি, এটা সম্ভাব্যতার হিসেব মাত্র। এই কারণে আমাদের উচিত কাজের সর্বোচ্চ অর্থ তৈরি করা। টোলেমি, কোপারনিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও, নিউটন ও আইনস্টাইনের যোগ্য উত্তরাধিকারী স্টিফেন হকিং।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে জন্ম হকিংয়ের। তাৎপর্যপূর্ণ সমাপতন এই তারিখটারও। কারণ, ১৬৪২ সালের ৮ জানুয়ারি গালিলিওর মৃত্যুদিন। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে হকিং ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা ডাক্তার  চেয়ছিলেন হকিং ডাক্তারি পড়ুক, কিন্তু হকিং চেয়েছিলেন গণিত নিয়ে পড়তে। কিন্তু সেই সময়ে অক্সফোর্ডে গণিত না থাকায় পদার্থবিদ্যা নিয়েই ভর্তি হন। তাকে  পদার্থবিজ্ঞানে তাত্ত্বিক কোনো সমস্যা দিলেই সমাধান হাজির- এটা তার তৎকালীন  প্রফেসর রবার্ট বারম্যানের মন্তব্য। এ-জন্য পড়াশোনার  দিকে তার নজর ছিল খুবই কম। অনার্স জীবনের তৃতীয় বছরে পড়াশোনা বলতে প্রায় বাদ দিয়ে টোটো করে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, বন্ধুবান্ধব বানানোর দিকে মনযোগ দিলেন। চতুর্থ বছরে, ফাইন্যাল  পরীক্ষার ফলাফল এমন হল যে ফার্স্ট ক্লাস নাকি সেকেন্ড  ক্লাস- সেটা নির্ধারণের জন্য ভাইভা প্রয়োজন হল। অমনোযোগী  ছাত্র হিসেবে ততদিনে তিনি বেশ সুনাম (!) কামিয়েছেন।

ভাইভাতে গিয়ে তিনি সেটার সুযোগ নিলেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেছিলেন, “যদি আমাকে ফার্স্ট ক্লাস দেন, তাহলে কেম্ব্রিজে  চলে যাব, ওখানে  গিয়ে মহাবিশ্বতত্ত্ব পড়ব। যদি সেকেন্ড ক্লাস দেন, তাহলে অক্সফোর্ডেই থাকব। মনে হয়, ফার্স্ট ক্লাস দিয়ে  বিদেয় করে দিলেই ভালো হবে।”

তিনি ভাইভা বোর্ডের আস্থা  অর্জন করলেন, ফার্স্ট ক্লাস পেলেন, শুরু করলেন কেম্ব্রিজের পিএইচডি জীবনে ব্রহ্মাণ্ডচর্চার পাঠ ।

১৯৬৩ সালে  স্টিফেন উইলিয়াম হকিং মাত্র ২১ বছর  বয়সে আক্রান্ত  হলেন মোটর নিউরন রোগ বা এমায়োট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস, Amyotrophic lateral sclerosis (ALS). এই  রোগে পেশী নাড়ানো  যায় না, আস্তে আস্তে শরীর দুর্বল হতে  থাকে, শারীরিকভাবে  অথর্ব হয়ে পড়ে রোগী, কথা বলা সম্ভব  হয় না, খাবার গিলে খাওয়ায় অসুবিধা , আস্তে  আস্তে নিঃশ্বাসও আটকে  যেতে থাকে – কারণ এই  রোগে পেশী  নাড়ানোর  জন্য যে নিউরনগুলো দায়ী, সেগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে আস্তে আস্তে। আক্রান্ত রোগী মারা পড়ে কয়েক বছরের মধ্যেই।

ডাক্তাররা বলেছিলেন, হাতে আর দু’বছরের মত সময় আছে। আবার কোনো ডাক্তার বললেন, ২৫ বছর পর্যন্ত বাঁচবেন না হকিং। এটা জানার পর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়লেন হকিং, পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইলেন। ডাক্তাররা বললেন, “ব্যস্ত থাকো, কিছু একটা নিয়ে লেগে থাকো। পড়াশোনাটা ছেড়ো না।” তাঁর রিসার্চ গাইড ডেনিস সিয়ামাও বললেন, “এসো, আমি জানি, তুমি পারবে।” ২৪ বছর বয়সে পি এইচ ডি থিসিস জমা দেওয়ার সময় দেখা গিয়েছিল এ এল এস থাবা বসাতে পারেনি তাঁর মেধায় ।

স্টিফেন হকিং ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মরণব্যাধির মুখে দাঁড়িয়েও তিনি দেখিয়েছেন অমিত সাহস। তবে তিনি নিজেই  প্রথম  স্বীকার করে নেন, অন্য সবার  মতোই  তিনি একজন  সাধারণ মানুষ। তার চোখে-মুখে এক করুণ অভিব্যক্তি। চোখে-মুখে ভালোবাসার এক অন্যরকম জ্যোতি। তাই বুঝি তিনি নিজের বাথরুমের দরজায় সেঁটেছিলেন  মেরিলিন মনরোর একটি বড় পোস্টার।

২০১১ সালে এক সম্মেলনে হকিং বলেন দর্শন মৃত। দার্শনিকগণ বিজ্ঞানের আধুনিক বিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি এবং বিজ্ঞানীরা আমাদের জ্ঞানের ক্ষুধা মেটাতে আবিষ্কারের আলোকবর্তিকা বহনকারী হয়ে ওঠেছেন। দর্শন বিষয়ক সমস্যার সমাধান বিজ্ঞান দিয়ে  করে দেওয়া সম্ভব, বিশেষ করে মহাবিশ্বের নতুন ও খুবই ভিন্ন রকমের চিত্র তুলে ধরতে ও মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান  সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান প্রদান সম্ভব।

হকিং-এর  প্রধান গবেষণার বিষয় ছিল তত্ত্বিক কসমোলজি আর কোয়ান্টাম মধ্যাকর্ষীয় তত্ত্ব। কসমোলজি, পদার্থবিদ্যা ও গণিত –এই সবগুলিরই শিকড়ে হকিং-এর মৌলিক গবেষণা। কৃষ্ণগহ্বরের ব্যাখ্যায়, প্রথমদিকের গবেষণাতেই, তিনি সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন আপেক্ষিকতাবাদ আর কোয়ান্টাম ফিল্ড তত্ত্বের। অনেকের মতে পদার্থবিদ্যায় হকিংএর সবচেয়ে বড় অবদান এটাই।

তাঁর গবেষণার ফলগুলো দ্রুত কাজে লাগিয়ে দেওয়ার মতো নয়। কেন এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হল, মানব জাতির অস্তিত্বই বা কি কারণে, কোথা থেকে আমরা এলাম, আর আমরা কোথায় চলেছি-এই সব মূল প্রশ্নের উপর আলোকপাত করেছেন হকিং। কৃষ্ণগহ্বর, আপেক্ষিকতাবাদ, কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব, অনন্যতা (singularity) এবং উপরের মূল প্রশ্নগুলি সব মানুষের কল্পনাকে উস্কে দেয় বটে কিন্তু আমাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই বিন্দুমাত্র ধারণা নেই বিজ্ঞানের এসব ক্ষেত্রে ঠিক কি ধরনের গবেষণা হয়। বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের অসীম রহস্য জানার নেশাই আমাদের এই লেখা বা পড়ার উদ্দেশ্য।

ষাটের দশকে রজার পেনরোজের  সঙ্গে  মিলে হকিং আইনস্টাইনের  আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে একটি নতুন মডেল তৈরি করেন – যার উপর  ভিত্তি করে সত্তরের দশকে পেনরোজ-হকিং তত্ত্বের  প্রথমটি প্রমাণ করেন। এই তত্ত্বগুলো প্রথমবারের মতো কোয়ান্টাম মহাকর্ষে  অনন্যতার ( singularity) [ স্থান-কালের এমন এক বিন্দু যেখানে স্থান-কালের বক্রতা অসীম হয় ] পর্যাপ্ত শর্তসমূহ পূরণ করে।  আগে যেমনটি ভাবা হতো  অনন্যতা  কেবল একটি গাণিতিক  বিষয়। এই তত্ত্বের  পর প্রথম বোঝা গেল, অনন্যতা বীজ লুকোনো ছিল আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে। এই গবেষনায় হকিং ও পেনরোজ কাজে লাগিয়েছিলেন রায়চৌধুরী সমীকরণ। অধ্যাপক অমল রায়চৌধূরী সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ বিষয়ে এই সমীকরণ আবিষ্কার করেছিলেন ।

১৯৮৩ সালে  হকিং  প্রথম ‘নো বাউন্ডারি’ নামে তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন।

‘মহাবিশ্বে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকার আগে কী ছিল?’এর জবাবে হকিং বলেছিলেন, “এই প্রশ্নের উত্তর একটি তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে। তত্ত্বটি ‘নো বাউন্ডারি প্রস্তাব’ বা ‘সীমানাহীনতা প্রস্তাব’ নামে পরিচিত। মহাবিশ্বের সীমানা পরিস্থিতি হল, এর কোনো সীমানা নেই।”

এতে তাঁর সহযোগী ছিলেন  বিজ্ঞানী জেমস হার্টল। এই তত্ত্বের সাহায্যে তাঁরা মহাবিশ্বের আকার আকৃতি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কার করেন।  সেই গাণিতিক  তত্ত্বে বলা  হয়েছিল, ১৩৮০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের আগে সব কিছু শুনশান  অন্ধকার  হয়েছিল। মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তু এবং শক্তিকে একটি পরমাণুর চেয়ে ক্ষুদ্র ক্ষেত্রের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। ওই মুহূর্তে বস্তু, শক্তি, স্থান এবং সময় বিদ্যমান ছিল না। কিন্তু, তার পরে হঠাৎই একটা বিন্দু  থেকে বেলুনের  মতো হু হু করে ফুলে  ফেঁপে উঠে চার পাশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড। যা এখনও ফুলে ফেঁপে উঠে চার পাশে প্রসারিত হয়ে চলেছে। আর সেই প্রসারিত  হওয়ার  গতি আগের  চেয়ে অনেকটাই বেশি। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটাকে বলা হয় ‘ইনফ্লেশন’। ফুলতে  ফুলতে বেলুন  যখন এক  সময় ফেটে  যায়, এই  ব্রহ্মাণ্ডেরও  দশা এক দিন হবে সে-রকমই।

কিন্তু, সেই তত্ত্ব  নিয়ে খুব সমস্যায় প়ড়েছিলেন হকিং। কারণ ওই  গাণিতিক তত্ত্ব এ কথাও বলে, যে  বিগ ব্যাং-ও শুধু  একটা  হয়নি। অনেকগুলো বিগ ব্যাং হয়েছিল।  সংখ্যায় যা অসীম। একটা বিগ ব্যাং থেকে যেমন আমাদের একটা ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়েছিল, তেমনই সংখ্যায় বিগ ব্যাংও যদিও অসীম হয়ে থাকে, তা হলে আমাদের মতোই অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।  কিন্তু, পরীক্ষা-নিরীক্ষার  মাধ্যমে এই  গাণিতিক তত্ত্বকে  প্রমাণ করে যেতে পারেননি হকিং। বরং তাঁর তত্ত্বের সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, অনেক ব্রহ্মাণ্ডের  যদি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ না  থাকে, তা হলে  আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে বসে  কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আরও বহু ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

হকিংয়ের অন্যতম  কাজ ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে। প্রচলিত  ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্ব  অনুযায়ী, আমাদের এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি  হয়েছে এক মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। বিস্ফারিত বস্তুপিণ্ড মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের  চেনা-জানা পদার্থের  থেকে এই  বস্তু  কিন্তু আলাদা।  বিস্ফোরণের অপরিসীম তাপ ও চাপ এদের  ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র  কণায় ভেঙে  রেখেছে। মহাকর্ষ বল এদের এক জায়গায় টেনে জড়ো করছে। জন্ম নিচ্ছে নতুন  নক্ষত্রমণ্ডলী। সূর্যের মতো নক্ষত্র, সূর্যের চেয়ে আকারে বড় বা ছোট— নক্ষত্রদের এক  দিন মৃত্যু  হবে।  সূর্যের চেয়ে ছোট  নক্ষত্রের মৃত্যুর জবানবন্দি রচনা  করেছেন  সুব্রহ্মণ্যম  চন্দ্রশেখর, যাকে আমরা জানি ‘চন্দ্রশেখর  সীমা’  নামে।

বড়  নক্ষত্রেরা ভেঙে  যায়  হকিং-এর  তত্ত্বের  নিয়মে। সূর্যের চেয়ে অনেক বড় নক্ষত্রেরা (সুপারনোভা) ভয়ঙ্কর  বিস্ফোরণে  শেষ হয় ।  নক্ষত্রের অবশিষ্ট  অংশ  মহাকর্ষের টানে  ছোট  হতে শুরু করে। বহু সূর্যের  ভর  এক সঙ্গে জুড়ে তৈরি হয় এক বস্তু যার ভিতরের   মহাকর্ষের  টান এতখানি যে  সেখান থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। আর যেখান থেকে আলো পর্যন্ত আসতে পারে না, সে  তো  অন্ধকার। একেই  বিজ্ঞানীরা  বলেন  ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর। স্টিফেন  হকিংয়ের  উল্লেখযোগ্য  কাজ  এই  কৃষ্ণগহ্বর  নিয়ে।

পদার্থবিদ্যা  নিয়ম অনুযায়ী, দু’টি কৃষ্ণগহ্বর  যদি  মহাবিশ্বে  কাছাকাছি আসে তবে একটি  অন্যটিকে  গ্রাস  করতে  উদ্যত  হবে। এই  সময়ে  প্রচুর  শক্তি  বিনিময়  ঘটবে। এত  দিন আমরা জানতাম, কৃষ্ণগহ্বর থেকে  কিছু ফেরত  আসে না। কিছু ফিরিয়ে দেওয়া তার ধর্মে নেই। আগেই বলেছি, তার প্রবল  টান  আলোই   উপেক্ষা করতে  পারে  না।  এখানেই  নতুন   কাজ  করলেন  হকিং।  সঙ্গে  ছিলেন  রজার  পেনরোজ। হকিং এবং পেনরোজ জুটি দেখালেন, এই  ফিরিয়ে  না-দেওয়ার  ধারণা  ঠিক  নয়। কৃষ্ণগহ্বর  কিছু  বিকিরণ  ফিরিয়ে দেয়, যা  ঘটে ওই  শক্তি বিনিময়ের সময়ে। এই  কাজ  করতে  গিয়ে  আপেক্ষিকতাবাদ এবং কোয়ান্টাম  মেকানিক্সের মেল বন্ধন ঘটালেন  তাঁরা।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ মহাবিশ্বে  গ্রহ-নক্ষত্রের  চলন-সহ  নানা  বিষয় ব্যাখ্যা করে। আর  কোয়ান্টাম  মেকানিক্স  কণা-পদার্থবিজ্ঞানের  পরমানুর ভেতরকার  কণাদের আচার আচরণ  ব্যাখ্যা  করে । কৃষ্ণগহ্বরের   বিকিরণের  তত্ত্ব  ব্যাখ্যা করতে  গিয়ে এই  দুই  বিদ্যার  মেল  বন্ধন  ঘটিয়ে  নতুন  দিশা  জোগালেন  হকিং। এমনই  মৌলিক  ছিল  এই কাজ  যে  প্রথমে  নিজের  আবিষ্কার  নিজেই  বিশ্বাস  করতে  পারেননি, এমনই  জানিয়েছেন  স্বয়ং হকিং।  সত্তরের দশকের  মাঝামাঝি সময়ে এই কাজ পদার্থবিদ্যার জগতে ঝড় তোলে। শুরু  হয়  নতুন গবেষণা।  হকিংয়ের নামে এই বিকিরণের  নাম  দেওয়া  হয়- ‘হকিং রেডিয়েশন’ । এ কাজের জন্য  তিনি  নানা পুরস্কার পেয়েছেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে কিংবদন্তী  পর্যায়ে  পৌঁছে  যান। কিন্তু  নোবেল  পুরস্কার  তিনি পাননি। কারণ, ‘হকিং রেডিয়েশন’ শনাক্ত  করার  মতো  প্রযুক্তি এখনও তৈরি  হয়নি- কেননা এই বিকিরণ অত্যন্ত ক্ষীন। আর পরীক্ষায় তত্ত্ব  প্রমাণিত না-হলে নোবেল মেলে না। এই  আবিষ্কারের বেশ কয়েক বছর আগেই আইনস্টাইনের  আপেক্ষিকতাবাদের  সমীকরণ সমাধান করে আবিষ্কার হয়েছিল  পেনরোজ-হকিং অনন্যতা (singularity )-যেখানে  না আছে স্থান-না আছে কাল-কেবলমাত্র বিন্দু।

তাঁর নিজের তত্ত্ব ও বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে রচিত বই কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (A Brief History of Time) লিখে তিনি সারা বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন  ও বাণিজ্যিক সফলতা লাভ করেন এবং বইটি রেকর্ড ভঙ্গ করা ২৩৭ সপ্তাহ ব্রিটিশ সানডে টাইমসের সর্বোচ্চ বিক্রিত বইয়ের তালিকায় ছিল। এই বইটি সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাকাশ বিজ্ঞানের অন্যতম একটি বিশাল জ্ঞানের উৎস।  বইটিতে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারনা, স্থান ও কাল, প্রসারমান মহাবিশ্ব, অনিশ্চয়তাবাদ, মৌলকণা ও প্রাকৃতিক বল, কৃষ্ণগহ্বর, মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি, মহান একীভূত তত্ত্ব (Grand Unified Theory বা GUT) সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে।

হকিং শুধু বিজ্ঞানী  ছিলেন না তিনি।  স্টিফেন হকিংয়ের  মধ্যে  লুকিয়ে ছিল কৌতূহলী, শিশুসুলভ একটা মন এবং আদ্যন্ত এক প্রেমিক। কলেজ জীবনেই প্রেম জেন ওয়াইল্ডের  সঙ্গে। ১৯৬৫ সালে বিয়ে। তিন সন্তানের জন্ম এবং ২৬ বছরের দাম্পত্য শেষে ১৯৯১ সালে বিচ্ছেদ। ১৯৯৫ সালে ফের বিয়ে, এলেন মেসন নামে এক নার্সকে। ২০০৬ সালে তাঁর সঙ্গেও বিচ্ছেদ। শেষ জীবনে অবশ্য কাছাকাছি এসেছিলেন  জেন এবং স্টিফেন। ছেলে, মেয়ে, নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘরোয়া জীবনও কাটাচ্ছিলেন। গবেষণার জগৎ নিয়ে বাজি ধরাও ছিল তাঁর নেশা। হিগস বোসন পরীক্ষায় আবিষ্কার হবে না — এর পক্ষে বাজি ধরে ২০১২ সালে ১০০ ডলার হেরেছিলেন হকিং।

হকিং প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, মহাবিশ্বের সর্বত্র প্রাণ থাকা সম্ভব কি না সে নিয়ে প্রশ্ন, বিশ্ব উষ্ণায়নের কুফল নিয়ে প্রশ্ন। বার বার তিনি মানব সভ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন।

২০০৬ সালে হকিং প্রশ্ন করেছিলেন, “রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগতভাবে বিশৃঙ্খল এই পৃথিবীতে, মানবজাতি কীভাবে আরও ১০০ বছর টিকে থাকবে?” পরে তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, “আমি এর উত্তর জানি না। এজন্যই আমি এই প্রশ্নটি করেছি, যাতে মানুষ এই  বিষয়  নিয়ে  ভাবে এবং এখন আমরা যে সমস্যার  সম্মুখীন হচ্ছি তা সম্পর্কে সতর্ক থাকে।”

হকিং উদ্বেগ  প্রকাশ করে  বলেন হঠাৎ পারমাণবিক যুদ্ধ, ভাইরাস, বিশ্ব উষ্ণায়ন, বা মানুষ ভাবেনি  এমন বিপদ থেকে পৃথিবীতে মানুষ ও অন্যান্য প্রজাতির জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে । যদি মানবজাতি  অন্য কোন  গ্রহে উপনিবেশ  স্থাপন করতে পারে, তাহলে  গ্রহ-ব্যাপী দুর্যোগের ফলেও  মানুষ বিলুপ্ত হবে না।  হকিং  বিশ্বাস  করেন মানবজাতির  ভবিষ্যতের  জন্য  মহাশূন্যে ভ্রমণ ও মহাশূন্যে উপনিবেশ  স্থাপন করার  প্রয়োজন ।

হকিং মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করেছেন । বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যন্ত্রাংশ কাজ না করলে কম্পিউটার অকার্যকর হয়ে যাবে। অকেজো কম্পিউটারের জন্য স্বর্গ বা পরবর্তী জীবন বলে কিছু নেই। অন্ধকারকে ভয় পায় এমন মানুষের জন্যই পরকালের গল্প। হকিং মনে করতেন, পরকাল ও স্বর্গের ধারণা ‘রূপকথার গল্প’ মাত্র। মানুষের মৃত্যুভয় থেকেই এসব ধারণার সৃষ্টি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মস্তিষ্কের সবশেষ স্পন্দনের পর আর কোনো বোধ কাজ করে না।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের পর এ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিখ্যাত পদার্থবিদ হলেন স্টিফেন হকিং। এক সাক্ষাৎকারে হকিং বলেছিলেন, বিগত ৪৯ বছর ধরে আমি অকালমৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে আছি। আমি মৃত্যুভয়ে ভীত নই। আবার, মৃত্যুর ব্যাপারে আমার কোনো তাড়াও নেই। আমার আরও অনেক কাজ আছে যেগুলো আমি করতে চাই। হকিং বলেছেন, “ধর্ম আর বিজ্ঞানের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। ধর্মের ভিত্তি কর্তৃত্ব ফলানোতে, আর বিজ্ঞানের ভিত্তি পর্যবেক্ষণ আর যুক্তিতে। জয় হবে বিজ্ঞানেরই, কারণ এটা কার্যকর”। তিনি বলেছেন, “আমাদের জীবন একটাই। এই এক জীবনেই ব্রহ্মাণ্ডের মহান  নকশার কদর  করতে হবে। আর সেই জীবন পেয়েছি বলে আমি কৃতজ্ঞ।”

পদার্থবিদ, মহাবিশ্ববিদ ও বিজ্ঞানের প্রতিনিধি স্টিফেন হকিংকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তার তত্ত্বগুলি  মহাবিশ্বের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আমাদের বিজ্ঞানীরা এখন মহাবিশ্ব সম্পর্কে নতুন অনুসন্ধান করতে পারছেন। কি সমাপতন, পাই দিবসে বিশ্ববাসিকে বাই বাই করে কালের প্রবাহে মিশে গেলেন স্টিফেন উইলিয়াম হকিং।

যতবার আমরা রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, ততবার আমরা  হকিং-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকি, যিনি আমাদের প্রশ্ন করা চালিয়ে যেতে, বৃহত্তর স্কেলে চিন্তা করতে এবং প্রতিদিন আমাদের চারপাশের মহাবিশ্বের সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করতে শিখিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের  মধ্যে আশ্চর্য শিশুসুলভ বিষ্ময় জাগিয়ে তোলার জন্য এবং মানুষের জন্য সক্ষমতা কী, তা দৃষ্টান্ত মূলক করে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য স্টিফেন হকিং হয়ে থাকবেন চির স্মরণীয়।

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s