স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: কৃষ্ণগহ্বর বিকিরণ -তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়- শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

“অসুখ তোমাকে ধন্যবাদ, তুমি আমার জেদ সীমাহীন করেছ”- লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘স্টিফেন হকিং-এর প্রতি’ কবিতায় । স্টিফেন হকিংকে  বোঝবার, শ্রদ্ধা জানাবার এর চেয়ে উপযুক্ত ভাষা আর হয় না। একুশ বছর বয়েস থেকে সারা জীবন একটা ক্রমশ ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে; শুধু বুদ্ধি আর মেধার জোরে বিজ্ঞানের  সাধনা করে গেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তার  মূল কারণ এই বিস্ময়, আরো একটা কারণ বোধহয় লুকিয়ে আছে আইনস্টাইনকে বলা চার্লি  চ্যাপলিনের সেই ঐতিহাসিক মন্তব্যের ভেতর, ”ওরা আমার সবটাই বোঝে, তাই আমি জনপ্রিয়; তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারে না, তাই তুমি জনপ্রিয়!”

স্টিফেন হকিং-এর গবেষণার বিষয় কৃষ্ণগহ্বর (black hole)। তিনি ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ বইতে লিখেছেন যে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘মহা বিষ্ফোরণের একক’ (Big bang singularity); ১৯৭০ সালে তিনি চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন ‘কৃষ্ণগহ্বর’ নিয়ে । তাঁর কাজ বুঝতে চেয়ে বরং আমরা বুঝতে চেষ্টা করি‘কৃষ্ণগহ্বর’ ব্যাপারটা কি?

‘কৃষ্ণগহ্বর’ নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভাবনা-চিন্তা কিন্তু বেশ পুরোনো । ১৭৮৩ সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন মাইকেল প্রথম আলোচনা করেন এক ধরণের নক্ষত্র বিষয়ে, যার ভর এতটাই বেশি যে তার নিজের অভিকর্ষের টানে কোন আলো সেই  নক্ষত্রের আবহমণ্ডল ছেড়ে বেরোতে পারবে না। সেই নক্ষত্ররা হবে ‘অদৃশ্য নক্ষত্র’;  আজ আমরা এদের কৃষ্ণগহ্বর বলে জানি। তিনি আরো বলেছিলেন যে এরকম বেশ কিছু নক্ষত্র হয়ত আছে; আমরা তাদের দেখতে পাবো না, কিন্তু তাদের অভিকর্ষের বল অনুভব করতে পারব। মজার কথা, মার্কুইস ডি লাপ্লাস তাঁর ‘দ্য সিস্টেম অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ (বাংলায় বইটার নাম ‘বিশ্বজগৎ’ বলা যেতে পারে) বইয়ের প্রথম আর দ্বিতীয় সংস্করণে এক বিশেষ ধরণের নক্ষত্র সম্বন্ধে আলোচনায় প্রায় একই কথা বলেন, কিন্তু পরের সংস্করণ থেকে বাদ দিয়ে দেন (হয়ত তাঁর মনে হয়েছিল ব্যাপারটা খুব গোলমেলে!)।

‘কৃষ্ণগহ্বর’ বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে নক্ষত্রদের  জীবনচরিত। নক্ষত্রদের বুকের ভেতর সব সময় ফেটে চলেছে হাইড্রোজেন বোমা (যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফিউশন’ বিক্রিয়া বলে); তার ফলে তৈরি হচ্ছে তাপ আর আলো । বিস্ফোরণের এই শক্তি তাদের বাঁচিয়ে রাখে নিজেদের প্রবল অভিকর্ষের টান থেকে। এই প্রক্রিয়ায় একদিন ফুরিয়ে আসে তাদের ইন্ধন, হাইড্রোজেন। যে নক্ষত্র যত উজ্জ্বল, যত তপ্ত; সে শেষ করে ফেলবে তার ইন্ধন ততো তাড়াতাড়ি। ঠাণ্ডা হতে থাকবে, কুঁকড়ে যেতে থাকবে নিজের অভিকর্ষের টানে। ১৯২৮ সালে ব্রিটেনে গবেষণা করতে যাবার সময় এক ভারতীয় বিজ্ঞানী, সুব্রহ্মনিয়ম চন্দ্রশেখর ভাবতে শুরু করেন, কী হবে যখন  নক্ষত্রদের  ইন্ধন শেষ হয়ে যাবে ? তিনি অঙ্ক করে দেখালেন যে যদি  নক্ষত্রের ভর সূর্যের  দেড়গুণের ওপর( ১.৪ গুণ ) হয় তবে জ্বালানী ফুরিয়ে গেলে সে তার নিজের অভিকর্ষের টানে  কুঁকড়ে যাবে ।  সূর্যের  দেড় গুণের কম ভরের নক্ষত্র হয়ে থাকবে ‘সাদা বামন’ (white dwarf); তার চেয়ে অল্প বেশি ভরের নক্ষত্র হবে ‘নিউট্রন নক্ষত্র’। কিন্তু ‘চন্দ্রশেখর সীমার’ ওপর যে নক্ষত্র আছে, তাদের সমস্যা খুব বেশি; হয় তারা বিষ্ফোরণ করে নিজেদের ওজন ঝরিয়ে ফেলবে, নয়তো গুটিয়ে যাবে কৃষ্ণগহ্বরের ‘এককে’  (singularity)।

কেমন হবে সেই গুটিয়ে যাওয়া? আমরা হকিংএর ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি  অফ  টাইম’ বই  থেকে ছোট করে বলছি : ধরা যাক কোন মহাকাশচারি একটা গুটোতে থাকা নক্ষত্র থেকে প্রতি সেকেন্ডে খবর পাঠাচ্ছে তার মহাকাশযানে [যেটা ঐ নক্ষত্রের অভিকর্ষের ‘সঙ্কট ব্যাসর্ধে’র (critical radius, যেখানে কৃষ্ণগহ্বরের অভিকর্ষবল ততোটা জোরালো নয়) বাইরে আছে]। যদি ধরা হয় ১১:০০টার সময় নক্ষত্রটি গুটিয়ে গিয়েছিল; তবে সময় যত ১১:০০টার কাছে আসবে, মহাকাশযানে পেতে থাকা খবর পাওয়ার সময়ের দূরত্ব ততো বাড়তে থাকবে (নক্ষত্রটি তখন তরিৎ-চুম্বকিয় তরঙ্গের ওপরও তার অভিকর্ষের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে)। ১০টা ৫৯ মিনিট ৫৯ সেকেণ্ডের পর মহাকাশযান আর কোন খবর পাবে না । ওই  নক্ষত্র তখন কৃষ্ণগহ্বর হয়ে গেছে ।

কৃষ্ণগহ্বরের কথা প্রথম কিন্তু চন্দ্রশেখর বলেননি; বলেছিলেন মার্কিন পদার্থবিদ জন হুইলার, ১৯৬৯ সালে। বিনষ্ট হয়ে যাওয়া নক্ষত্রদের তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘কৃষ্ণগহ্বর।’ প্রথমে তো কেউ মানতেই চায়নি; তাঁকে বিকৃত মস্তিষ্ক বলে ভাবা হয়েছিল । পরেN-87 ছায়ামণ্ডল বা সিগনাস X-1 (যে নক্ষত্র কোন অদৃশ্য ভরের সঙ্গে জোড় বেঁধে, জোড়া নক্ষত্রের মতো ঘুরছে ) নক্ষত্রের খবর পাওয়া গেল, সবাই মানল কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব । এখন অবশ্য ‘স্পেস টেলিস্কোপ ইমেজিং স্পেক্টোগ্রাফ’ নামের খুব উন্নত ক্যামেরা তৈরি হয়েছে। এর সাহায্যে প্রচুর  কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব ধরা পড়ছে ।

কিন্ত  কৃষ্ণগহ্বরের থেকে কোন আলো বের হয় না। তবে একে বোঝার উপায় কি? কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব বোঝা যায় তার আশেপাশের অন্য নক্ষত্রদের চলন দেখে। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের রাজা । তিনি আছেন আড়ালে; যক্ষপুরী চলছে তাঁরই টানে। আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রেও আছে এমনি একটি ‘অতিভর  কৃষ্ণগহ্বর’, নাম ‘স্যগাটোরিয়স-এ’; তার টানেই চলছে এই ছায়াপথের সব নক্ষত্র, আমাদের সূর্যও। একটা তথ্য জানলে অবাক হতে হয়, একটা ‘অতিভর  কৃষ্ণগহ্বরের’ ভর কয়েক কোটি সূর্যের ভরের সমান। কৃষ্ণগহ্বরের কোন ব্যাস নেই; এটি একটি অনন্ত  ঘণত্ব আর দেশ-কালের (space-time) বক্রতার একক। এর উষ্ণতা চরম শূণ্যের ( absolute zero বা -273°C ) খুব কাছাকাছি । এখানে আমাদের জানা পদার্থবিদ্যার কোন নিয়ম খাটে না, কারণ ওই একক থেকে কোন আলো বা কোন তথ্য বাইরে আসে না। কৃষ্ণগহ্বর সম্বন্দে আমরা যেটুকু জানি সেটা কিছু গণিতের সমীকরণ, যা দিয়ে বিজ্ঞানীরা বুঝতে চেষ্টা করছেন এর প্রকৃতি ।

কৃষ্ণগহ্বরের অভিকর্ষের ( যার ভেতর থেকে কিছুই বাইরে আসে না ) একটা  সীমা আছে, তাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘ঘটনার দিগন্ত’ ( event horizone ) । এখানে আলো বা অন্য বস্তুর নড়াচড়া হয়; অর্থাৎ এই  দিগন্তে  কিছু ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়।  কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরের উষ্ণতার ওপর এই  ‘ঘটনার দিগন্তের’ আয়তন বাড়ে কমে; এই  দিগন্তের ওপর চোখ রেখেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে চেষ্টা করেন কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর কি হচ্ছে ।

কৃষ্ণগহ্বরকে বিজ্ঞানীরা তিনরকম বলে চিহ্নিত করেছেন : ১) নক্ষত্র  কৃষ্ণগহ্বর ( Steller Black Hole), ২) অতিভর  কৃষ্ণগহ্বর ( Super Massive Black Hole), আর ৩) ক্ষুদ্র কৃষ্ণগহ্বর (Miniature Black Hole) । আকারের ওপর নির্ভর করেই এই  নামগুলো রাখা হয়েছে ।

সব ধরণের কৃষ্ণগহ্বর কিন্তু একইভাবে তৈরি হয় না। নক্ষত্র কৃষ্ণগহ্বর কিভাবে তৈরি হয় সেটা আমরা আলোচনা করেছি ।

অতিভর কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয় ছায়াপথের ভেতর। ছায়াপথের বড় বড় নক্ষত্রের পারস্পরিক দূরত্ব আর অভিকর্ষের চাপে তৈরি হয় এই ধরণের কৃষ্ণগহ্বর। এদের ভর কোটি সূর্যের সমান বা তার থেকে বেশি ।

কিন্তু ক্ষুদ্র  কৃষ্ণগহ্বর কিভাবে তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে। এ প্রসঙ্গে জয়ন্তবিষ্ণু নরলিকর আর ফ্রেড হোয়েলের ‘হোয়েল-নরলিকর’ তত্ত্বের কথা বলতে হবে। তাঁরা ক্ষুদ্র কৃষ্ণগহ্বর তৈরির কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন যে  ১৫০০০ কোটি বছর আগে মহাবিস্ফোরণের( Big Bang ) সময় মহাবিশ্বের যে অস্থির অবস্থা ছিল তার ফলেই তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্র কৃষ্ণগহ্বর ।

১৯৭৩ সালে হকিং এলেন মস্কোতে। সেখানে আলোচনায় দুই রুশ বিজ্ঞানী ইয়াকোভ জেলদোভিচ আর আলেক্সান্দার স্টারোবিনস্কির সঙ্গে আলোচনায় একমত হলেন যে  কৃষ্ণগহ্বরের থেকেও রশ্মির বিকিরণ হতে পারে। সেখানেই তিনি ঘোষণা করলেন যে  কৃষ্ণগহ্বর থেকেও বিকিরণ হয়। এই আলোচনাটা খুব জটিল; এতে ‘কোয়ান্টাম বলবিদ্যা’ (quantum mechnics), তাপগতিবিদ্যা (thermodynamics) এবং ‘সাধারণ আপেক্ষিকতার’ ( general theory of relativity ) সুত্র ব্যবহার করা হয়েছে । সেজন্য অনেকে এই        তত্ত্বকে ‘সার্বজনীন তত্ত্ব’ বা Theory of Everything বলেন ।

এবার আমরা বুঝতে চেষ্টা করি  কীভাবে হয় এই বিকিরণ । তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে কোন আধারে (system) যদি বস্তু বা শক্তির ঢোকে  তবে সেই আধারের ভেতর বস্তুর বিশৃঙ্খলা (entropy ) বেড়ে যায় । দু’টো আধারের বস্তুকে যখন এক আধারে মিলিয়ে দেওয়া হয়; নতুন আধারের বিশৃঙ্খলা আগের দু’টো আধারের বিশৃঙ্খলার যোগফলের চেয়ে বেশি হয় । ‘ঘটনার দিগন্তে’ যে মহাকাশ তা ফাঁকা নয় । সেখানে আছে বস্তু, শক্তি বিভিন্ন রূপে । কৃষ্ণগহ্বরের টানে কিছু বস্তু বা শক্তি ঢুকে যায় কৃষ্ণগহ্বরের অংশে, সেখানে বিশৃঙ্খলা বাড়ে; বেড়ে যায় ‘ঘটনার দিগন্তের’ পরিসীমা । কোয়ান্টাম বলবিদ্যার তত্ত্বে সেই বস্তুর মধ্যে থাকে প্রতিবস্তুও (ঋণাত্মক বস্তু)। বস্তু এবং প্রতিবস্তু স্বাভাবিক ধর্ম একে অন্যকে ধ্বংস করে দেওয়া। যাই হোক, কৃষ্ণগহ্বরের প্রবল অভিকর্ষের টানে সাধারণ বস্তুর শক্তি থাকে অনেক কম; তাকে শক্তি খরচ করতে হয় ওই প্রবল অভিকর্ষ থেকে নিজেকে বার করে আনতে। সাধারণত বস্তুকণার শক্তি ধনাত্মক, কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরের প্রবল অভিকর্ষের চাপে ‘ঘটনার দিগন্তে’ তার শক্তিও ঋণাত্মক (প্রতিবস্তু) হয়ে যেতে পারে। যে ঋণাত্মক শক্তিকণা বাঁধা পড়ে কৃষ্ণগহ্বরে; সে আর ধ্বংস করতে পারে না ধণাত্মক শক্তির বস্তুকে;  কিছু বেরিয়ে আসে মুক্ত মহাকাশে । দূরের কোন পর্যবেক্ষকের কাছে সেই কণাই মনে হবে বেরিয়ে এসেছে কৃষ্ণগহ্বর থেকে। কৃষ্ণগহ্বরের ওজন যত কম হবে বস্তুকণাকে ততটা কম দূরত্ব যেতে হবে ধণাত্মক বস্তু হতে, ততো বেশি হবে সেই কৃষ্ণগহ্বরের বিকিরণ।

 কিন্তু আজও  কৃষ্ণগহ্বরের বিকিরণের কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় নি। হকিং নিজেই স্বীকার করেছেন, যদি কোন  কৃষ্ণগহ্বর আমাদের সূর্যমণ্ডলেরই দূরতম অংশেও থাকে; তবু তার বিকিরণ এত কম যে আমাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল যন্ত্রও তার নাগাল পাবে না। CERN যন্ত্রে অতিক্ষুদ্র কৃষ্ণগহ্বর সৃষ্টি করেও এরকম কোন বিকিরণের সন্ধান পাওয়া যায়নি । তবে তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, এ ধরণের বিকিরণ আছে যার ফলে কৃষ্ণগহ্বরেরও মৃত্যু হবে একদিন ( ১৫০০ কোটি বছর লাগবে একটা ১০১৫ গ্রামের  কৃষ্ণগহ্বরের মৃত্যু হতে )।

হকিং-এর ইচ্ছা অনুসারে তাঁর সমাধির ওপর উৎকীর্ণ থাকবে এই বিকিরণের সমীকরণ:

জীবনের পর তাঁর ‘এপিটাফ’ ( সমাধিস্তম্ভ-লিপি ) মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে বলবে, “অবশেষে তুমি আমাকে অধিকার করেছ, হারাতে পারনি !”

 

তথ্যসূত্র  :-  ১) A Breief History of Time : Stephen Hawking , ২) স্টিফেন হকিং ও মহাবিশ্বের রহস্য : পৃথ্বীরাজ সেন

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s