স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: টেলিভিশন ও সিনেমার পর্দায় স্টিফেন হকিং – অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

ব্রহ্মাণ্ডের আদি ও অন্ত নিয়ে মানুষের চিন্তার অন্ত নেই। কোথা থেকে যে সে উদয় হল, আর কোথায়ই বা তার শেষ, সেই নিয়ে অন্তহীন বিস্ময় তাকে টেনে নিয়ে গেছে বিজ্ঞানের রহস্য উন্মোচনে। এই শতাব্দীর অন্যতম প্রবাদ পুরুষ, কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির প্রবর্তক, বিশ্বসংসারকে নতুন করে চিনিয়ে দেবার পথপ্রদর্শক, প্রফেসর স্টিফেন হকিংকে ঘিরে জমে উঠেছে অপরিসীম কৌতূহল। তাই তিনি খ্যাতির চরম সীমায় আরোহিত হয়েছেন। তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা, টেলিভিশন সিরিজ। কখনো টেলিভিশন কার্টুন সিরিজে ভয়েস এক্টর হয়েছেন, কখনো বা তাঁকে দেখা গেছে সশরীরে, হুইল চেয়ার আসীন। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটির বিচ্ছুরণে, সরস কথকতায়, হয়ে উঠেছেন পৃথিবীর সবচাইতে সপ্রতিভ ব্যক্তি, উল্লিখিত হয়েছেন ‘রকস্টার’ বলে।

আমেরিকান টিভি সিটকম (situation comedy র সংক্ষেপ) – ‘দ্য বিগ ব্যাং থিওরি’, খুবই জনপ্রিয় হয়। এর সিজন ৫ এর ২১ নম্বর এপিসোডের শিরোনাম ছিল – ‘দ্য হকিং এক্সাইটেশন’। এই এপিসোডে হকিংকে ক্যামিও (স্বল্প সময়ের জন্য অতিথি শিল্পী হিসাবে যখন কোনও বিখ্যাত ব্যক্তি অভিনয় করেন, তখন তাকে ক্যামিও বলা হয়) বা অতিথি শিল্পী হিসাবে অভিনয় করতে দেখা যায়।

এই এপিসোডের চরিত্র হাভার্ডকে দেখানো হয়েছিল স্টিফেন হকিংএর সহকারী হিসাবে। একদিন সে হকিং এর কাছ থেকে আসা এক ই-মেইলে জানতে পারে, হকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করতে আসছেন এবং হাভার্ডকে হকিং এর কম্পিউটার চালিত হুইলচেয়ারের তদারকির দায়িত্ব নিতে হবে। হাভার্ডের খুশির সীমা নেই। এদিকে তার এক বন্ধু, পদার্থবিদ শেল্ডন ছিল হকিং এর একজন গুণমুগ্ধ ভাবশিষ্য। সে চেপে ধরল বন্ধু হাভার্ডকে – আলাপ করিয়ে দিতে হবে হকিং এর সঙ্গে। শেল্ডন তখন বোসন কণা নিয়ে গবেষণা করছিল। হকিং এলেন, শেল্ডন তার গবেষণার বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আলাপচারিতায় হকিংকে জানাল – হিগস বোসন কণা কৃষ্ণ গহ্বরের কেন্দ্র থেকে সময়ের সঙ্গে পিছিয়ে যায়। হকিং বললেন, “তুমি যা বলছ তা খুব রোমাঞ্চকর, কিন্তু সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, কারণ গবেষণাপত্রের দু’নম্বর পাতায় একটা গাণিতিক ত্রুটি দেখতে পাচ্ছি।” এরপর দেখা যায় শেল্ডন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, আর হকিং বলছেন, “দারুণ, আর একজন অজ্ঞান ব্যক্তির সঙ্গে আজ দেখা হল।”

ক্যামিওতে হকিংএর এই সশরীরে উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক ভাবেই শুধু আমেরিকা বা কানাডায় নয়, অন্যান্য দেশেও ‘দ্য বিগ ব্যাং থিওরি’কে জনপ্রিয় করে তোলে। এর আগেও হকিং অন্যান্য টিভি সিরিয়ালে চরিত্র হিসাবে নিজেই অভিনয় করেছেন। কোথাও আবার তার আইকনিক ভয়েসকে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘দ্য সিম্পসন’, ‘ফিউচারামা’, ‘এক্স-মেন কমিক্স’, ‘স্টার ট্রেক’, ‘দ্য নেক্সট জেনারেশন’, ‘ডক্টর হু’ ইত্যাদি ক্যামিওতে তাকে সশরীরে বা এ্যানিমেশন চরিত্র হিসাবে দেখা গেছে। এর মধ্যে ‘স্টার ট্রেক’ সবচাইতে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

‘স্টার ট্রেক’ আমেরিকার টেলিভিশন চ্যানেলের এক অন্যতম জনপ্রিয় সিরিজ। মহাকাশ অভিযান নিয়ে এই ডকুমেন্টারি হকিংএর লেখা – ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’এর উপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়। অভিনেতা লিওনার্ড নিময় জানতে পারেন হকিং স্টার ট্রেকের একজন নিয়মিত দর্শক। স্টার ট্রেকের নির্দেশক রিক বারম্যান হকিংকে স্টার ট্রেকের একটি এপিসোডে অভিনয় করার প্রস্তাব দিলে, হকিং সানন্দে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এই এপিসোডে হকিং স্বয়ং তার নিজের চরিত্রে অভিনয় করেন।

স্টার ট্রেকের এই দৃশ্যে নিউটন, আইনস্টাইন, হকিং এবং ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী ডেটাকে দেখা যায় পোকার খেলতে। হকিং তার স্বীয় জীবনের মতোই এখানে মাধ্যাকর্ষণ ও বিজ্ঞান নিয়ে বাজি ধরেন। দৃশ্যের শুরুতে হকিং  রসিকতা করে বলছেন, “সেই ফ্রেম অফ রেফারেন্সে মার্কারি গ্রহকে উল্টো দিকে ঘুরতে দেখা যাবে…”

হকিং এর রসিকতায় হাসিতে ফেটে পড়েন আইনস্টাইন। নিউটন বিমুঢ়, হকিং এর হাসিতে দুষ্টুমি। ডেটা নিউটনকে বলেন, “রসিকতাটা যাই হোক না কেন, সেটা বুঝতে গেলে আপেক্ষিকতার নীতি অনুযায়ী স্থান-কালের বক্রতাকে বুঝতে হবে।”

ডেটার কথা শুনে নিউটন ভীষণ রেগে গিয়ে বলেন, “আমার পিঠ চাপড়ানোর চেষ্টা করো না। আমিই পদার্থবিদ্যার জনক। সেই যেদিন আমার মাথায় আপেল ভেঙে পড়ল, সেদিন বিজ্ঞানের জগতের এক যুগান্তকারী ঘটনার সৃষ্টি হল…”

হকিং নিউটনের কথার মাঝে বলে উঠলেন, “আবার সেই আপেলের কাহিনী শুনতে চাই না।”

ডেটা মন্তব্য করে, “শোনা যায় আপেলের এই গল্পটা নাকি মনগড়া?”

নিউটন বেজায় রেগে গিয়ে ডেটাকে ধমকান, “তোমার এত সাহস হয় কী করে?”

আইনস্টাইন বিষয় ঘুরিয়ে দেবার জন্য বলেন, “এসো আমরা খেলাটা শেষ করি।”

আইনস্টাইন হকিংকে বলেন, “তুমি নির্ঘাত বাজি হারবে। তোমার আনসারটেইনিটি আর কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন তোমাকে বাঁচাতে আসবে না।”

হকিং বলেন, “আবার তুমি ভুল প্রমাণিত হলে আলবার্ট! বাজি আমিই জিতলাম।”

দেখা যায় হকিং এর সহকারী যন্ত্র হাতলে ফেলে দেওয়া তাস দেখাচ্ছে – হকিং বাজি জিতে গেছেন, অর্থাৎ তার তত্ত্ব সঠিক।

হকিং এর সঙ্গে স্টার ট্রেকের শুটিঙের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন সিরিজের নির্মাতা নির্দেশক ও কলা কুশলীরা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে সেটে সবার সঙ্গে রসিকতা করেছেন হকিং। অভিনেতা ব্রেন্ট স্পিনার যখন তাকে জানান, হকিং এর চরিত্রে আসলে তারই অভিনয় করবার কথা ছিল, তখন হকিং বলেন, “আমাকে পোকারের বাজি জেতা টাকাটা ডেটা কখন দেবে বলছে জিজ্ঞেস করে এসো দেখি।”

স্পিনারও কম যান না, বলেন, “আপনাকে চেকটা ই-মেইল করে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”

শুটিঙের সেটের সমস্ত খুঁটিনাটি দেখে স্টিফেন খুব খুশি হন। স্থান কাল বেঁকে যাওয়া নিয়ে সেট-এ তৈরি ‘ওয়ার্প কোর’ এর মডেল দেখে ছেলেমানুষি বিস্ময়ে মন্তব্য করেন, আরে কী আশ্চর্য! আমি তো এই নিয়েই এখন কাজ করছি। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ সেটের সমস্ত শিল্পী এবং কলাকুশলীরা কেমন ভাবে উপভোগ করেছিলেন, সেই নিয়ে অনেকেই অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন।

হলিউডের বিখ্যাত ফক্স প্রোডাকশন নির্মিত টিভি এ্যানিমেশন সিরিস – ‘দ্য সিম্পসন’এ হকিং এর রেকর্ডেড ভয়েস ব্যবহার করা হয়। দ্য সিম্পসনে তার অভিনয় সম্পর্কে সাক্ষাতকারে তিনি মন্তব্য করেন, “যতজন মানুষ আমার বিজ্ঞানের জন্য আমায় চেনে, ঠিক ততজন মানুষ আমাকে ‘দ্য সিম্পসন’এ অভিনয় করার জন্য চেনে।”

‘দ্য সিম্পসন’ কার্টুন সিরিজের বেশ কয়েকটি এপিসোডে নেপথ্যে অভিনয় করেন হকিং, যার মধ্যে ‘দে সেভড্‌ লিসাস ব্রেন’, ‘ডোন্ট ফিয়ার দ্য রুফার’, ‘স্টপ, অর মাই ডগ উইল শুট’, বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। ‘দে সেভড্‌ লিসাস ব্রেন’ কাহিনীর শুরুতে দেখা যায়, শহরের মেয়র পালিয়ে গেছেন, আর নাগরিকেরা সবচাইতে বুদ্ধিমান ব্যক্তি দিয়ে শহরকে শাসন করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে। লিসা সিম্পসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শহরের শাসনকর্তা মেয়রের পদ। লিসা সিম্পসন, মার্গে ও হোমার, সবাই যখন সবাই নিজের নিজের আইকিউ নিয়ে গর্ব করছে, তখন হুইল চেয়ারে ঢুকছেন কার্টুন চরিত্রে হকিং। সদর্পে তাঁকে ঘোষণা করতে শোনা যাচ্ছে, তাঁর আই কিউ লেভেল – ২৮০। সেই শুনে সবাই স্তব্ধ। প্রিন্সিপাল স্কিনার হকিংকে স্বাগত জানিয়ে সম্বোধন করছেন, “ডক্টর হকিং! দ্য স্মার্টটেস্ট ম্যান অফ দ্য ওয়ার্ল্ড”। এই দৃশ্যের দর্শকও যেন গর্বিত বোধ করে পৃথিবীর সবচাইতে সপ্রতিভ মানুষটির জন্য। লিসাকে হকিং বলছেন, “ক্ষমতা তোমাকে নষ্ট করছে”, সবাই হৈ হৈ করে ওঠে। স্টিফেন জনতার উদ্দেশ্যে ধমক দিয়ে বলে ওঠেন, “এবার সবাই চুপ! আমার সম্বন্ধে বলতে পারে একমাত্র আমার এই কথা বলা যন্ত্র, আর কেউ নয়।” প্রিন্সিপালকে যখন হকিং বলছেন, “আমার হতাশার কারণ বুঝতে পারছি না – সে কী আমার ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি সূত্রবদ্ধ করার ব্যর্থতা, নাকি তুমি নিজেই!”, তখন আমরা পরিহাসপ্রিয় হকিংকে দেখতে পাই।

সিম্পসন সিরিসের প্রযোজক অল জিন জানিয়েছিলেন, “যাদের বিজ্ঞান নিয়ে কোনোরকম কৌতূহল ছিল না, সেই সমস্ত সাধারণ মানুষের কাছেও মহাকাশবিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন হকিং। ‘দ্য সিম্পসন’ এর এই এপিসোডে সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অঙ্ক ও বিজ্ঞানও কায়দা করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

“দ্য ফেয়ারলি অড পেরেন্টস” এ্যনিমেটেড টেলিভিশন সিরিজের “রেমি রাইড্‌স এগেইন” এ হকিং এর কার্টুন চরিত্রে তার হুইলচেয়ারের পিছনে রকেট লাগানো অবস্থায় দেখা যায়। রকেট লাগানো হুইলচেয়ারে হকিং এর প্রস্থানের দৃশ্যটি খুবই উপভোগ্য।

নিজের উপর রসিকতা করবার জন্য হকিং বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার চরিত্রের এই দিকটি বিভিন্ন সিরিজে ঠিক সেই ভাবেই ব্যক্ত করবার চেষ্টা করে গেছেন তার গুণগ্রাহীরা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি তাদের চাহিদার মুল্য দিয়েছেন যথাযথ ভাবে। তাই হকিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তরুণ প্রজন্মের কাছেও।

শর্ট ফিল্ম – ‘এনি ওয়ান ক্যান কোয়ান্টাম’এ অভিনেতা পল রুডের সঙ্গে অভিনয় করেন হকিং। তবে তাঁকে ভয়েস এক্টর হিসাবে রাখা হয়। রুডিকে ৭০০ বছর পরের পৃথিবী থেকে মেইলের মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে বাঁচাবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাজ দেওয়া হয়, কোয়ান্টাম দাবা খেলায় ডক্টর হকিংকে হারাতে হবে, তবেই বাঁচানো যাবে মানবজীবন। সাধারণ দাবা খেলার সঙ্গে কোয়ান্টাম দাবার তফাত এই যে এখানে রানি একাধিক জায়গায় বা একই জায়গায় দ্বৈতস্বত্বায় থাকতে পারে।

এদিকে রুডি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক’ও জানত না। তার চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করে হকিং জানান, রুডিকে গো-হারান হারাতে কোনও অসুবিধাই তার নেই, কারণ রুডি হকিং এর মতো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিশেষজ্ঞ নয়। রুডি পড়াশুনো করতে শুরু করে। এমনকি হকিং এর লেখা ‘থিওরি অফ এভরিথিং’ পড়েও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিল বিষয় তার মাথায় ঢোকে না। শেষে হ্যারি পটার পড়তে পড়তে কোয়ান্টাম দাবা খেলার সূত্র সে হাতে পেয়ে যায়। হকিং এর সঙ্গে দাবা খেলার শুরুতে বেজায় অসুবিধায় পড়লেও কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেল্মেন্টের জটিল চালে রুডি হকিংকে হারিয়ে জয়ী হয়। বেঁচে যায় মানবসভ্যতা।

ক্যামিও শো – ‘কোয়ান্টাম ইজ কলিং’ এ হকিংকে ভয়েস এক্টর হিসাবে দেখা যায় অভিনেত্রী জো সালদানার সঙ্গে। কাহিনীর এক চরিত্র স্যামসন পেগের বিড়াল হারিয়ে যাওয়ায়, সাল্ডানা পৃথিবীর সবচাইতে বুদ্ধিমান ব্যক্তি প্রফেসর হকিং এর সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে, তার বিড়াল খুঁজে দিতে অনুরোধ করে। হকিং এর দেওয়া সূত্র ধরে জানা যায় বিড়ালটি বাক্সের ভিতর থেকে ওয়ার্মহোল বেয়ে অন্য ব্রহ্মাণ্ডে চলে গেছে। ভিডিওতে দেখানো কৌতুকের মধ্যে নিহিত ছিল পদার্থবিদ্যার কোয়ান্টাম তত্ত্বের ব্যবহারিক উপযোগিতা। ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির পদার্থবিদেরা এই ভিডিও তৈরি করতে সাহায্য করেন। উদ্দেশ্য ছিল কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও তার কার্যকারিতা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। পদার্থবিদ শ্রডিংগার কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বোঝানোর জন্য বিখ্যাত ক্যাট এক্সপেরিমেন্ট ব্যবহার করেন। একটি বাক্সে একটি বিড়ালকে যদি এক বোতল বিষের সঙ্গে রেখে দিয়ে বাক্স বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বোতল উল্টে গিয়ে বিষক্রিয়ায় বিড়ালের মৃত্যু হয়, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অনুযায়ী বন্ধ বাক্সের বাইরে থেকে মনে হবে বিড়ালটি অর্ধেক মৃত ও অর্ধেক জীবিত। পদার্থবিদ্যার জটিল এই বিষয়টিকে জনসমক্ষে অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরা হয়।

ডিসকভারি চ্যানেলের উদ্যোগে একটি ডকুফিকশন – ‘দ্য এলিয়েন প্ল্যানেট’ তৈরি হয়। এই ডকুমেন্টারিতে দেখানো হয় নাসার উদ্যোগে অন্য সৌর মণ্ডলের গ্রহ ডারউইন-৪ এ রোবটিক অভিযান চালিয়ে প্রাণের সন্ধান করা হচ্ছে। নাসার রকেট আলোর ২০ শতাংশ বেগে ছুটে যায় চার আলোকবর্ষ দূরের এই গ্রহটিতে। এই গতিতে চলে, বিয়াল্লিশ বছর লাগে গ্রহটিতে পৌঁছতে। ডকুমেন্টারিতে বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের ভিন্ন গ্রহের প্রাণী সম্বন্ধে তাদের ধারণা নিয়ে সাক্ষাতকার নেওয়া হয়। প্রফেসর স্টিফেন হকিংও এলিয়েন বা ভিন্ন গ্রহের প্রাণী সম্পর্কে তার অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, কোটি কোটি তারা মণ্ডলীতে কোন না কোনও গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সেখানে রোবট দিয়েই অভিযান করতে হবে কিন্তু যেহেতু সেই সব গ্রহের দুরত্ব অনেক বেশি, রোবটেরা ফিরে এলে তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবার জন্য হয়ত রোবট প্রেরকেরাই বেঁচে থাকবে না।

আমেরিকান লেট নাইট টেলিভিশন শো – ‘লেট নাইট উইথ কোনান ও ব্রায়েন’ এর ১৭৫২ এপিসোডে অভিনেতা জিম কেরিকে দেখা যায় মহাকাশ তত্ত্ব ও মাধ্যাকর্ষণের আধুনিক আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করতে। দেখানো হয়, স্টিফেন হকিং স্বয়ং ফোন করে জিম কেরিকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, কসমিক ইনফ্লেশন নিয়ে স্টিফেনের কাজকে জনসমক্ষে তুলে ধরবার জন্য। কিন্তু আবার পরিহাস প্রিয় অধ্যাপক সন্দেহ প্রকাশ করছেন দর্শকদের নিরেট মাথায় সেই তত্ত্ব কতখানি ঢুকবে, সে নিয়ে।

এইচ বি ও টিভি চ্যানেল বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের উপর ‘গ্রেট মাইন্ড সিরিজ’ তৈরি করে, যার প্রথম এপিসোডে প্রফেসর হকিং এর সাক্ষাতকার নেওয়া হয় কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে তাঁর অফিসে। সাক্ষাতকার নেন সিরিজ হোস্ট, জন অলিভার। হকিংকে প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ তাঁর কাজ বুঝতে পারে না কেন?

প্রশ্নের উত্তরে হকিং বলেন, কাল্পনিক সময় সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতাই এর একমাত্র কারণ। কাল্পনিক সময় মহাবিশ্বে আর একটি ডাইমেনশন মাত্র। এমনকি কল্পবিজ্ঞান নিয়ে যারা সিনেমা তৈরি করে, তারাও বেশির ভাগ এই অজ্ঞানতার শিকার। আর একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন অদূর ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (artificial intelligence) এত বেশি উন্নতি লাভ করবে, যে সে নিজেই মানবসভ্যতা ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠবে। রোবটের সঙ্গে লড়াইয়ে মানুষ হারবে। অলিভার তাঁকে প্রশ্ন করেন, অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোথাও কী হকিং এর চাইতে বেশি বুদ্ধিমান ব্যক্তি থাকা সম্ভব? প্রশ্নের উত্তরে হকিং বলেন, অবশ্যই তা সম্ভব। আগামী একশো বছরের মধ্যে যে মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, তার এই ধারনা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে এই সাক্ষাতকারে জানান হকিং। অধ্যাপক হকিংএর সহজাত প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, এপিসোডটিকে অন্য মাত্রা দিয়ে, প্রবল জনপ্রিয় করে তোলে।

ক্যালিফর্নিয়াতে ২০১৪ সালে একটি সায়েন্স ফিকশন ফিল্ম তৈরি হয় যার নাম ছিল – “ইন্টারস্টেলার”। এই সিনেমাটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। মূল বিষয়বস্তু ছিল, পৃথিবী মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠায় অয়ার্ম হোলের মধ্যে দিয়ে মহাকাশচারীরা অন্য নক্ষত্র লোকে পাড়ি জমিয়েছে বাসযোগ্য গ্রহের খোঁজে। ফিল্মটির সহ প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার জোনাথন নোলান এই কাজটির জন্য চার বছর ধরে নিরলস গবেষণা করেন। মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কে জানবার জন্য তিনি ক্যালিফর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভর্তি হয়ে পড়াশুনো করেন। বিজ্ঞানী মহল সিনেমাটিতে দেখানো ব্ল্যাক হোল এবং ওয়ার্ম হোলের উপস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করে।

ইন্টারস্টেলারে দেখানো কল্পবিজ্ঞান স্টিফেন হকিং এর ব্ল্যাক হোলের কাজের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছিল। কাহিনীতে দেখা যায় কুপার আমেরিকান স্পেস সংস্থা নাসার একজন প্রাক্তন মহাকাশচারী, যার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে তার দুই সন্তান মেয়ে মার্ফি ও ছেলে টমকে নিয়ে বাস করে। মার্ফি এক মেধাবী ছাত্রী, যে গ্রাভিটি নিয়ে বাবার মতোই উৎসাহী। একদিন হটাত রহস্যময় এক ধুলোর ঝড়ে শহর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে সেই ধূলিঝড়কে মার্ফি ভূত ভেবে বসে। কুপার অঙ্ক কষে মার্ফিকে জানায়, ধূলিঝড় মাধ্যাকর্ষণের পরিবর্তনে সৃষ্ট। তারা দুজন গ্র্যাভিটেশন এনমালির কোঅরডিনেট খুঁজে বার করতে বেরিয়ে পড়ে আবিষ্কার করে এক রকেট লঞ্চিং স্টেশন, যার অধিকর্তা প্রফেসর জন ব্র্যান্ড। সেখানে তোড়জোড় চলছে মহাকাশ যাত্রার। আটচল্লিশ বছর আগে শনি গ্রহের কাছে এক ওয়ার্ম হোল দেখা যায়। সেটি দূরের নক্ষত্র মণ্ডলীর বারোটা বসবাস যোগ্য গ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিছু সেচ্ছাসেবী ওয়ার্ম হোলের পথ বেয়ে সেই গ্রহ গুলিতে বাসের উপযুক্ত জমির খোঁজে পাড়িও দিয়েছিল। ব্র্যান্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী কুপারকে দায়িত্ব দেওয়া হয় মহাকাশ যান এন্ডিওরেন্স চালিয়ে নতুন গ্রহের সন্ধানে। দুজন রোবট ও তিনজন সহকারী সহ শুরু হল কুপারের অভিযান। শনির বলয়ের কাছে অভিযাত্রীরা ওয়ার্ম হোলে ঢুকে পড়ে খুঁজে পেলেন পূর্ব অভিযানের নেতা মিলারের আবিষ্কার করা গ্রহ। সেখানে মানুষের বাসযোগ্য হাওয়া ও জল পাওয়া গেল, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবী থেকেও বেশি। গ্রহে নেমে হাঁটুজলে পাওয়া গেলো মিলারের মহাকাশযানের ভগ্নাবশেষ। হটাত প্রবল অভিকর্ষজ টানে গ্রহের সমুদ্রে সৃষ্টি হল ভয়ঙ্কর জোয়ার। ফলে একজন যন্ত্র মানব ও একজন মানব অভিযাত্রী মারা গেল। ইঞ্জিন আবার চালু করার পর জানা যায়, গ্রাফিটি এফেক্টে টাইম ডাইলেশনের জন্য তারা পৃথিবীর সময় থেকে ২৩ বছর পিছিয়ে পড়েছে।  

এবার আর একটি গ্রহ থেকে আগের অভিযানের সদস্য মানের কাছ থেকে বার্তা পেয়ে তারা পাড়ি দেয় সেই গ্রহের দিকে। সেই সময়ে পৃথিবী থেকে আসা বার্তায় জানা যায় কুপারের মেয়ে মার্ফি বড় হয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানী হয়ে গেছে আর সে প্রস্তুতি নিচ্ছে নতুন গ্রহের অভিযানের। প্রফেসর ব্রান্ড মৃত্যুসজ্জা থেকে জানান, কুপারের অভিযান সফল হতে বাধ্য। ব্ল্যাক হোল থেকে নিষ্কৃতি পাবে এন্ডিওরেন্স। এর ভিতরেই পাওয়া যাবে গ্রাভিটেশনাল সিঙ্গুলারিটির হদিস। গারগান্তুয়ার টানে তার চারিদিকে পাক খেয়ে ৫১ বছর পৃথিবীর সময় থেকে পিছিয়ে যায় কুপার। এরপর সে গারগান্তুয়ার গহ্বরে পড়ে যেতে যেতে সে নিজেকে আবিষ্কার করে টেসারেক্টের ভিতর – ভবিষ্যতের পৃথিবী থেকে আসা কোনও মানুষের বানানো চারমাত্রিক কিউবয়েডে। হটাত আপনা থেকেই টেসারেক্ট ভেঙে যায়, কুপার ছিটকে পড়ে মহাশূন্যে। জ্ঞান ফিরে কুপার দেখে তার মেয়ে মার্ফি শনি গ্রহের কাছের স্পেস স্টেশনে তার পাশে বসে। মার্ফি ততদিনে বয়সের ভারে কুব্জ। বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে প্রফেসর ব্রান্ড ও মৃত মহাকাশ অভিযানের সাথীর জীবন সঞ্চার করে কুপার ও তাঁর মেয়ে। সবার মিলিত প্রচেষ্টায় নতুন গ্রহে মানুষের বাসযোগ্য কলোনি বানাবার কাজ শুরু হয়। 

ইন্টারস্টেলার প্রসঙ্গে হকিং সুইডেনে তার এক সাক্ষাতকারে বিবৃতি দেন, সিনেমাটিতে ব্ল্যাক হোলের যা চরিত্র দেখান হয়েছে, তা তাঁর মতে সঠিক। ব্ল্যাক হোল কখনোই শেষ কথা হতে পারে না। যদি ব্ল্যাক হোলে কেউ পড়েও যায়, সে ব্ল্যাক হোল থেকে বেরিয়ে অন্য ব্রহ্মাণ্ডে যাওয়ার পথ পেয়েও যেতে পারে। রসিকতা করে হকিং বলেন, “যদি বোঝ তুমি ব্ল্যাক হোলে আছ, চিন্তার কিছু নেই, বেরনোর রাস্তা আছে।”

যে মানুষটি তাঁর কাজের মাধ্যমে খ্যাতির উর্দ্ধাসনে বসেন, তার ব্যক্তিগত জীবন মানুষকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করে। জানতে ইচ্ছে করে, কাজের পরিসীমার বাইরে আটপৌরে জীবনে তিনি কেমন ছিলেন। তাই হকিং এর উপর বায়োপিক বানানো হয়, যার নাম দেওয়া হয় – ‘থিওরি অফ এভ্রিথিং’। এই সিনেমাটির নির্দেশক ছিলেন জেমস মার্স। বইটির চিত্রনাট্য তৈরি করা হয় ডক্টর হকিং এর প্রথম স্ত্রী জেন হকিং এর লেখা – ‘ট্র্যাভেলিং টু ইনফিনিটিঃ মাই লাইফ উইথ হকিং’ এর উপর ভিত্তি করে। ২০১৪ সালে সিনেমাটি রিলিজ হয় এবং প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানত সিনেমাটির শুটিং হয়, যেখানে জীবনের সবচাইতে বেশি সময় অতিবাহিত করেছিলেন স্টিফেন হকিং। হকিংএর চরিত্রে অভিনয় করে অভিনেতা এডি রেডমাইনে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান। হকিং এর গলার আওয়াজ ব্যবহার করার প্রস্তাবে সানন্দে রাজী হয়ে যান হকিং। সিনেমাটি সম্পর্কে হকিংকে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করেন, “এই সিনেমায় দেখানো ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনের অনেকক্ষেত্রেই মিল আছে”।.

টেলিভিশন ও সিনেমার পর্দায় হকিং এর উপস্থিতি ও সক্রিয় যোগদান, শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর ও অন্যান্য মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কাজগুলিকেও জনপ্রিয় করে তোলে। সাধারণ মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে মহাকাশ বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলি সম্বন্ধে।

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s