স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: টাইম মেশিন প্রসঙ্গে স্টিফেন হকিং – অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়- শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

সময় একটা বহতা নদীর মতো – এমনই মন্তব্য করেছিলেন স্টিফেন হকিং। সময়ের ঢেউতে গা ভাসিয়ে চলেছে পৃথিবীর মানবসভ্যতা। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কল্পনা করতে শুরু করে এমন এক টাইম মেশিনের, যাতে চড়ে দিব্যি ঘুরে আসা যাবে আমাদের অতীতে বা ভবিষ্যতে। এমন যন্ত্রযান, যাতে অতীত বা ভবিষ্যৎ ভ্রমণ করা যায়, সেটা মানুষের মাথায় কি করে এলো, তা জানতে হলে আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্ত্ব একটু বুঝে নেওয়া দরকার। তাঁর সেই অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে সময়কে হারিয়ে দিয়ে আগু পিছু চলে যাবার কল্পনা।

যে কোনও বস্তুর অবস্থান জানতে হলে সাধারণত তিনটি দিশার প্রয়োজন হয়, ইংরাজিতে যাকে বলা হয় কোঅরডিনেট। তিনটি অক্ষকে চিহ্নিত করা হয় এক্স, ওয়াই এবং জেড নাম করণ করে। আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্বে সময় বা টাইমকে চতুর্থ কোঅরডিনেট হিসাবে জুড়ে দিলেন। ধরা যাক দুটি যন্ত্রযান আলাদা গতিবেগে ছুটে চলেছে। কোনও এক সময়ে তারা কাছাকাছি চলে এলে তিনটি কোঅরডিনেট এক হয়ে যেতে পারে, কিন্তু চতুর্থ কোঅরডিনেট কখনোই এক হতে পারে না। কারণ সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, যে যানটিতে গতিবেগ বেশি, তার ঘড়ি ধীরে চলবে। একে বলা হয় টাইম ডাইলেশন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা সূত্র অনুযায়ী, কোনও বস্তুই আলোর চাইতে বেশি বেগে ছুটতে পারে না। আলোর বেগ প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ডে। সাধারণত আমরা এই প্রচণ্ড গতিবেগ ধারনাতেই আনতে পারি না। বর্তমানে সবচাইতে বেশি গতিবেগে চলে যে ট্রেন তার গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৪৩০ কিমি। সম্প্রতি যে রকেট মহাকাশে পাঠানো হয়েছে, তার গতিবেগ সেকেন্ডে ৮ কিমি এর কাছাকাছি। কাজেই আলোর গতিবেগে চলতে পারা যন্ত্রযান সম্বন্ধে কল্পনা করাও যথেষ্ট কষ্টকর। আইনস্টাইন বললেন, যদি কোনোভাবে যন্ত্রযানকে আলোর গতিবেগ দেওয়া যায়, তাহলে তার ভর হবে অসীম, দৈর্ঘ্য হয়ে যাবে শূন্য। মানুষের স্বল্প আয়ুর জীবনে তাহলে কি কোনোদিন যাওয়া যাবে না এই সৌরমণ্ডল ছাড়িয়ে আর এক সৌরমণ্ডলে, বা নীহারিকার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে? দেখা যাক আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, কেন যাওয়া যাবে না দূর থেকে দূরান্তরে, ব্রহ্মাণ্ডে।

আমাদের সব চাইতে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টাউরি আছে ৪.২ আলোক বর্ষ দূরে। মানে আলোর বেগে ছুটতে সক্ষম এমন যানে চড়ে পারি দিলেও পৃথিবীতে ফিরে আসতে আট বছর লেগে যাবে। আর যদি অত্যাধুনিক রকেটে চেপে সেখানে পাড়ি দেওয়া যায়, তবে লক্ষাধিক বছর লেগে যাবে। আইনস্টাইন বলছেন আলোর গতিবেগে ছোটা অসম্ভব আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এক মনুষ্য জীবনে সম্ভব নয়। তাহলে টাইম ট্র্যাভেল কি অধরাই রয়ে যাবে?

হকিং তার লেখা বিখ্যাত বই – এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইমে মন্তব্য করেছেন, আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী কোনও বিশেষ যন্ত্রযানে চেপে যদি আলোর অর্ধেক বেগেও পাড়ি দেওয়া যায়, তবে টাইম ডাইলেশনের জন্য ঘড়ি ঢিমে চলবে, নভোচরের বয়স পৃথিবীর মানুষের তুলনায় আস্তে বাড়বে। তাই যদি সে পৃথিবীতে মহাকাশ যাত্রার পর ফিরেও আসে, ততদিনে পৃথিবীর মাটিতে হাজার হাজার বছর কেটে যাবে। তাহলে সে মহাকাশ যাত্রার অভিজ্ঞতা শোনানোর জন্য কাউকে পৃথিবীতে খুজেই পাবে না। কারণ তাকে কেউ চিনতেই পারবে না। তাহলে কি মানব সভ্যতা কোনোদিন ব্রহ্মাণ্ডের অন্য নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো গ্রহের মাটি স্পর্শ করতে পারবে না? এই প্রশ্নটা স্টিফেন হকিংকেও তাড়া করে বেড়াত তার ছাত্র বয়স থেকে। তাই তিনি সত্যানুসন্ধানে মহাকাশ তত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনো করলেন।

মহাকর্ষজ টান যে স্থান-কাল বা স্পেস টাইম দুমড়ে যাওয়ার কারণে, সেকথা আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে আগেই জানিয়ে গেছেন। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে স্থান ও কাল দুয়ের মধ্যে যোগসূত্র আছে। ভারী নক্ষত্র বা ব্ল্যাক হোলের ভর ও শক্তি, তার চারপাশের স্থানকালকে মুচড়ে দেয়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাতে সেটা দেখাও গেছে। হকিং বললেন চার মাত্রা নয়, যে কোনও স্থানের দশ মাত্রা আছে। ছয়টি মাত্রা বেঁকে গিয়ে স্থান একটি সিলিন্ডারের মতো আকার নেয়। সময় সহ চারটি মাত্রা মানুষের জানা বোঝার মধ্যে, কিন্তু বাকি ছয় মাত্রা বোঝা যাবে না।

স্থান কতখানি মুচড়ে যেতে পারে, সেটা নির্ভর করে উপস্থিত বস্তুর ভরের উপর। যত ভর বেশি, তত স্থান-কালের মুচড়ে যাওয়া। অভিকর্ষজ বল অত্যন্ত দুর্বল। পৃথিবীপৃষ্ঠে আমরা যে সমস্ত বস্তু দেখতে পাই, তার ভর নক্ষত্রলোকের অন্যান্য বস্তুর অপেক্ষায় অনেক কম, তাই তাদের ক্ষেত্রে এই বল টের পাওয়ার উপায় নেই। নক্ষত্রের কাছেও অভিকর্ষজ বল এত নয়, যে স্থান-কালের দোমড়ানো মোচড়ানো বোঝা যাবে। তাই ব্ল্যাক হোলের কাছে গেলেই স্থান কালের দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার বাস্তবিক প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। হকিং বললেন, ব্ল্যাক হোলের কাছে যাওয়া নভোচরদের কলজের জোর চাই। কারণ ব্ল্যাক হোলের আগ্রাসী টানে আকাশ যান বা নভোচরের কী হবে, কেউ জানে না।

আইনস্টাইনের তত্ত্ব টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে যাওয়ার কোনও পথ বাতলায়নি দেখে বিজ্ঞানীরা নতুন ভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করলেন টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে। কেউ কেউ বললেন, স্থান কাল দুমড়ে গিয়ে কসমিক স্ট্রিং তৈরি হলে অতীতে বা ভবিষ্যতে চলাফেরা করা সম্ভব। কসমিক স্ট্রিং হল স্থান-কালের পেঁচানো জটিল লম্বা সুতো। আর একটু ভালোভাবে বললে বলা যায়, স্থান-কালের দশমাত্রিক দশা যেহেতু সিলিন্ডারের আকার ধারণ করে, কসমিক স্ট্রিং দুমড়ে যাওয়া অনেক কম ব্যাসের সিলিন্ডার, যা আকারে সুতোর মত সুক্ষ হয়ে যায়। কসমিক স্ট্রিং এর  ভরের টান কোটি কোটি টনের সমান। এই প্রবল টানে যে কোনও বস্তু আলোর বেগে পৌছতে পারে।

হকিং বললেন, কসমিক স্ট্রিং ছাড়া আর একটা উপায়ে, আপেক্ষিকতার সূত্র মেনে টাইম ট্র্যাভেল সম্ভব। কীভাবে? ধরা যাক আমরা স্থান-কাল দুমড়ে দিয়ে খুব সুক্ষ টিউবের মতো সুড়ঙ্গ তৈরি করলাম, একে বলা হবে ওয়ার্ম হোল বা কেঁচোর গর্ত। ওয়ার্ম হোল একস্থান থেকে আর এক স্থানের মধ্যে দুরত্ব কমিয়ে দেবে। তাই এই গর্তের এক দিক থেকে আর একদিকে দ্রুত চলাফেরা করা যাবে খুব কম সময়ে। উদাহরণ দিলেন হকিং –যদি প্রক্সিমা সেন্টাউরি পৃথিবী পর্যন্ত ওয়ার্ম হোল তৈরি করা যায়, তবে আসল দুরত্বের দশ লক্ষের এক ভাগ দুরত্ব অতিক্রম করে প্রক্সিমা সেন্টাউরিতে পৌঁছান যাবে।

কিন্তু ওয়ার্ম হোল তৈরি হবে কী করে? স্থান-কাল যেভাবে দুমড়ে গিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের গোলাকার পৃষ্ঠ তৈরি করে সেভাবে নয় – বরং উল্টো দিকে দুমড়ে গিয়ে তৈরি হবে তার চেহারাটা। হকিংএর মতে, অনেকটা বাইসাইকেলের সিটের মতো দেখতে হবে।

অতীত ভ্রমণ করতে এমন সুড়ঙ্গ বানাতে লাগবে নেগেটিভ ভর এবং শক্তি ঘনত্ব। কিভাবে পাওয়া যাবে সেই ভর ও শক্তি? নিউটনের বলবিজ্ঞান হোক বা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা, কোনটাতেই নেগেটিভ ভর ও শক্তি ঘনত্ব পাওয়া যাবে না। তার জন্য চাই কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সাহায্য। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে হাইসেনবার্গের বিখ্যাত আনসারটেইনিটি বা অনিশ্চয়তার সুত্রের উপর। এই তত্ত্বের প্রয়োগ যদি আপেক্ষিকতার উপর করা যায়, তাহলে নেগেটিভ ভর ও শক্তি ঘনত্ব পেতে কোনও অসুবিধা নেই। তাহলে অনায়াসে টাইম মেশিনে চড়ে ওয়ার্ম হোল বেয়ে অতীতে ফিরে যাওয়া যাবে। কিন্তু অতীতে ফিরে যেতে, আপেক্ষিকতার নিয়ম মেনে চলতে হবে আলোর চাইতে বেশি গতিবেগে, যা আবার আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা সূত্র অনুযায়ী সম্ভবপর নয়।

এখানেই হকিং সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আইনস্টাইনের আলোর গতিবেগের তত্ত্ব নিয়ে। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা পরীক্ষিত প্রমাণের অপেক্ষায় থাকে। এখনো পর্যন্ত সি ই আর এন ল্যাবরেটরিতে প্রাথমিক কণা বা এলিমেন্টারি পার্টিক্‌লকে আলোর গতিবেগের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও, তাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি।

স্টিফেন হকিং আরও প্রশ্ন তুললেন, যদি টাইম ট্র্যাভেল করে অতীতে ফিরে যাওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতের উন্নত বিজ্ঞান শিক্ষিত মানুষ বর্তমান জগতে এসে আমাদের টাইম মেশিন বা ওয়ার্ম হোল বানানোর কায়দা কানুন শিখিয়ে যাচ্ছে না কেন? তার মতে, উড়ন্ত চাকতি চড়ে ভবিষ্যতের মানুষ আমাদের মাঝে মধ্যে দর্শন দিয়ে যায় – একথা একেবারে ভুয়ো, অযৌক্তিক। ভবিষ্যতের মানুষ অতীতে ফিরে যেতে পারছে না তার কারণ, আমাদের পৃথিবীতে স্থান-কাল এখনো অতটা দুমড়ে উঠতে পারেনি যে তারা টাইম ট্র্যাভেল করে আমাদের দেখা দিয়ে যাবে। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে একদিন টাইম মেশিনে চড়ে ভবিষ্যতে যে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতে পারে, তাঁর এই বিশ্বাসের কথা হকিং অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলে গেছেন।

অতীত কালে পাড়ি দেওয়া নিয়ে হকিং একটা গল্প ফেঁদে বসতেন বক্তৃতা দেওয়ার সময়। ধরা যাক আজ রকেটে চড়ে কেউ পাড়ি দিল মহাকাশে। তারপর তার ইচ্ছে হল রকেট ছেড়ে টাইম মেশিনে চড়ে সেই সময়ে পৌঁছে যেতে, যখন সে আদৌ রকেটে চড়েইনি মহাকাশের উদ্দেশ্যে। রকেটে চড়ার আগে যদি সে পৌঁছতে পারে, তাহলে সেই রকেট সে বোমা মেরে উড়িয়েও দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তার রকেটে চড়ে মহাকাশ যাত্রাই সম্ভব হবে না। হকিং এর মতে এই প্যারাডক্স বা কূটতর্কের মীমাংসা নেই, কারণ টাইম ট্র্যাভেল করে অতীতে যাওয়াই সম্ভব নয়। তাঁর মতে, অতীতকে আমরা পরখ করেছি – স্থান-কালের বক্রতা দেখতে পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভবিষ্যত অজানা ও উন্মুক্ত। তাই একমাত্র টাইম মেশিনে চড়ে ভবিষ্যতে যাওয়া যেতে পারে, অতীতে নয়।

সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে হলিউডে অনেক সিনেমা বানানো হয়েছে, যা স্টিফেন হকিং-এর মতে একেবারে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন, যদিও সেসব সিনেমা খুবই চমকপ্রদ ও চোখ ধাঁধানো। অতীত ভ্রমণ এসব সিনেমার আসল উপাদান হলেও হকিং যুক্তি দিয়ে নস্যাৎ করে দিয়েছেন সিনেমায় দেখানো ঘটনাবলী। এ’রকম এক চলচ্চিত্র ‘স্টার ট্রেক’ টিভি সিরিজের একটি এপিসোড। সেখানে দেখানো হয়েছিল, নিউটন আইনস্টাইন এবং স্টিফেন হকিং-এর সঙ্গে একই বৈঠকে বসেছে সিনেমার চরিত্র ডেটা। ইতিহাসের পাতা থেকে অতীতের বিভিন্ন সময়ের দুই বিজ্ঞানী, বর্তমানের বিজ্ঞানী ও ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীদের এই চমৎকার বৈঠক নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েননি হকিং। তিনি যুক্তি দিলেন, অতীতে ফিরে যাওয়া যদি সম্ভবই হয়, তবে চরিত্রটি অতীতে ফিরে গিয়ে নিজেকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তার অস্তিত্ব হয়ে উঠবে বিপন্ন। এরকম ঘটার সম্ভাবনা এই জন্য নেই যে, ঘটনার কার্যকারণ ঘটে ফলাফলের আগে। উল্টোটা ঘটতে পারলে প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম ব্যর্থ হয়ে যাবে।

পদার্থবিদ রিচার্ড ফেইনম্যান স্থান- কালের উপর তাঁর গবেষণা পত্রে প্রস্তাব করেছিলেন থিওরি অফ সাম অভার হিস্ট্রিস। সেটা বুঝতে গেলে আগে একটু আলোচনা করতে হবে, হিস্ট্রি বা ইতিহাস বলতে আমরা কী বুঝি। এই মুহূর্তে  যে ঘটনা ঘটছে, আগামীকাল তাই হয়ে যাবে ইতিহাস। অর্থাৎ অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনা পরম্পরার বিবরণ একত্র করে ইতিহাস গড়ে ওঠে। তাহলে ইতিহাস কাল নির্ভর এক বৈজ্ঞানিক তথ্য, যাতে ভেজাল মেশানোর কোনও জায়গাই নেই। ফেইনম্যান বললেন, এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে একটা নয়, অনেক ঘটনা বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা ভাবে ঘটে চলেছে। ইতিহাস স্থান-কাল নির্ভরশীল বলে একটা ইতিহাস নয়, আসলে ইতিহাস গড়ে উঠেছে অনেক ইতিহাসের যৌথ সমষ্টি নিয়ে। এই তথ্যের প্রমাণ হিসাবে তিনি কোয়ান্টাম থিয়োরিকে হাতিয়ার করেছিলেন। ফেইনম্যানের তত্ত্বকে সমর্থন করে অনেক বিজ্ঞানীরাই একমত হলেন যে ব্রহ্মাণ্ডের একটিমাত্র অনন্য ইতিহাস থাকতে পারে না, আছে অনেক পৃথক পৃথক বিকল্প ইতিহাস, যার নাম দেওয়া হল, ‘অল্টারনেট হিস্ট্রি’।

হকিং এই বিকল্প ইতিহাসকে সমর্থন করেননি। তিনি ফেইনম্যানকে সমর্থন করে যুক্তি দিলেন যে, এক ইতিহাস অন্য ইতিহাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ পৃথক। একটি বিশেষ ইতিহাস গড়ে ওঠে উপস্থিত বস্তুকে নির্ভর করে। আর একটু সহজ করে বলা যায়, কোনও গ্রহে যদি কোনো এক সময়ে সভ্যতা গড়ে ওঠে, তার ইতিহাস সমস্ত বস্তুকে স্থান-কাল দিয়ে এমন ভাবে মুড়ে রাখবে, আর এক ভিন্ন সভ্যতায় বা ইতিহাসে বাস করা মানুষ সেই ইতিহাসে প্রবেশ করতে পারবে না। পদার্থবিদ্যার জটিল তত্ত্ব বোঝানোর জন্য হকিং উপমা ব্যবহার করতেন। তিনি বললেন, ধরা যাক মহাকাশ যানে চড়ে একদল মানুষ যাত্রা শুরু করতে চলেছে। ঠিক তখনি অন্য নক্ষত্র পুঞ্জ থেকে আর এক মহাকাশ যান তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে যাত্রা পণ্ড করে দেবে, এমনটা ঘটার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও যুক্তি দিয়ে বোঝালেন, দ্বিতীয় মহাকাশ যানটি যেহেতু অন্য আর এক বিকল্প ইতিহাসে বাস করে, সে কখনই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রবেশ করতে পারবে না। অর্থাৎ মহাকাশ যান পৃথিবী থেকে পাড়ি দেওয়ার আগে ধ্বংস হয়ে যাবে, এমন কথার ভিত্তি নেই। যেহেতু বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এক ইতিহাস থেকে আর এক ইতিহাসে ঢুকে পড়ার, তাই কল্পবিজ্ঞানের নামে সিনেমাতে যা দেখানো হয়, তা রূপকথা হতে পারে, কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন কোনোমতেই নয়। 

স্টিফেন হকিং টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে যা বলে গেছেন, তার সার হল, বর্তমানে বিজ্ঞানের উন্নতি হলে এমন মেশিন বানিয়ে ফেলা যাবে, যাতে চেপে ভবিষ্যতের সময়ে পৌঁছান যেতে পারে। বর্তমানের সাপেক্ষে আমাদের ফেলে আসা অতীতে যাওয়া সম্ভব না হলেও, ভবিষ্যতে টাইম মেশিনে চড়ে আলোর গতিবেগের বেশি দ্রুততায় অতীত ভ্রমণ সম্ভবপর হতে পারে। স্থান-কাল দুমড়ে দিয়ে ওয়ার্ম হোল তৈরি করে এক নক্ষত্রমণ্ডলী থেকে লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরে আর এক নক্ষত্রমণ্ডলীতেও পাড়ি জমাতে বাধা নেই। হকিং এর মতে সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম থিওরি মিশিয়ে স্ট্রিং থিওরি বাস্তবায়িত হলে আমরা হাতে পাব এমন এক থিওরি, যার নাম তিনি দিয়েছেন – “থিওরি অফ এভ্রিথিং”, তার সাহায্যে স্থান-কাল বেঁকিয়ে দিতে মানুষ সক্ষম হবে। দশ মাত্রার সেই গলি দিয়ে সহজেই চলে যাওয়া যাবে অতীত ও ভবিষ্যতে।

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

Advertisements

One Response to স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: টাইম মেশিন প্রসঙ্গে স্টিফেন হকিং – অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়- শরৎ ২০১৮

  1. Puspen Mondal says:

    অসাধারণ! কঠিন কথা সহজে খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছেন।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s