স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ত্ব , সম্প্রসারণ এবং হকিং – নীলোৎপল ঘোষ- শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

আমরা কীভাবে এসেছি? এই রকম প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনে  এসে থাকতে পারে। আফ্রিকার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের আদিবাসী বোসোঙ্গো (Boshongo) দের বিশ্বাস আমাদের  আগে  ছিল শুধু অন্ধকার , জল এবং  ওদের  ভগবান বুম্বা (Bumba) । একদিন ভগবান বুম্বার পেটে খুব ব্যাথা হয় এবং তিনি বমি করতে শুরু করেন। তখন প্রথমে বেরিয়ে আসে সূর্য । সেই  সূর্যের আলো পড়ে কিছু জল বাষ্পীভূত হয় এবং সেখান থেকে স্থলের সৃষ্টি। তারপর আবার বমি করতে থাকেন। তখন একে একে বেরিয়ে আসে চাঁদ,তারা, চিতাবাঘ, কুমীর,কচ্ছপ এবং অবশেষে মানুষ । আমদের আদি সংস্কৃত সাহিত্য ঋকবেদে নাসাদিয় সুক্তা (Nashadiya Sukta) মন্ত্রে সৃষ্টির সৃষ্টির কথা বলা আছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে সৃষ্টির আগের সময়হীন, বাতাসহীন, স্থলহীন পরিস্থিতির কথা যখন রাত-দিন-এর কোন পাথৱক্য ছিল না। এইরকম অনেক পৌরানিক কাহিনী পৃথিবীর নানা জায়গায় স্মরনাতীত কাল থেকে  চলে আসছে। এসব থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের   অস্তিত্বর প্রশ্নের  সঠিক উত্তর আজও পাওয়া সম্ভব হয় নি। তবে আজকর বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিকদের  আবিষ্কার এই  বিষয়ে অনেক প্রস্নর সঠিক  সমাধান প্রদান  করতে সক্ষম।

এই বিষয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার   করেন এডউইন হাবল্ ১৯২৪ সালে । আমেরিকার  মাউন্ট উইলসন্, লসআঞ্জেলস্  কাউন্টিতে তিনি তার ১০০ ইঞ্চি টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে পান যে মহাবিশ্বে শুধু আমাদের গ্যালাক্সি নয়, আরও অনেক গ্যালাক্সি আছে । তিনি  প্রত্যক্ষ করেন যে সব গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে।

তিনি টেলিস্কোপ দিয়ে দূরের গ্যালাক্সির তারাগুলোর থেকে আসা আলো পরিমাপ করেন এবং তারমধ্যে থাকা বর্ণালীকে বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায় বর্ণালীগুলো লাল রং-এর দিকে সরে গেছে।  আমাদেরর দর্শণ যোগ্য রংগুলির মধ্যে লাল-এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য  সবচেয়ে বেশি। কোন আলো লালএর দিকে সরে যাওয়ার অর্থ হ’ল সেটির তরঙ্গ দৈর্ঘ বেড়েছে। আলো তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ এবং কোন  আলোর উৎস যদি আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে ডপলার এফেক্ট (Doppler efect)  অনুযায়ী সেখান থেকে আসা আলোক তরঙ্গের দৈর্ঘ্য বর্ধিত হয়। এইভাবে  বোঝা যায় বিভিন্ন  গ্যালাক্সিগুলো  ক্রমশ আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একে  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের   সম্প্রসারণ অথবা স্ফীতকরণ বলা হয়। এই প্রসঙ্গে রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক আ্যলেক্সাণ্ডার ফ্রিডম্যান-এর  দু’টি  মৌলিক  ধারণার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯২২ সালে উনি বলেন  যে প্রথমত  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের  মধ্যে যে-কোন দিকে আমরা দেখি, একই  রকম লাগবে। দ্বিতীয়ত  বাইরের  অন্য জায়গা  থেকে  যদি  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে  দেখা যায়, তাহলেও একই রকম লাগবে। এইদুটি  ধারণা থেকে এটা উপলব্ধি করা যায়  বিশ্বব্রহ্মাণ্ড স্থির হলে, এটা কখনও সম্ভব হত না।  কাজেই  ফ্রিডম্যানের অনুমান পরবর্তীকালে হাবল্-এর আবিষ্কার দ্বারা প্রমাণিত হয়।

১৯৬৫ সালে আর্নো পেনজিয়াস আর রবার্ট উইলসন বলে দুইজন আ্যমেরিকান বিজ্ঞানী মাইক্রোওয়েভ ডিটেক্টর নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একরকম নয়েজ (Noise)-এর সন্ধান পান, যেটা ডিটেক্টর অভিমুখ-এর উপর নির্ভর করে না। ডিটেক্টর যে দিকে ঘোরানো হোক না কেন নয়েজ পালটায় না। তারা এই নয়েজকে বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করতে পারেন যে সেটা সৌরজগৎ-এর বাইরে থেকে এসেছে। বহুদূর থেকে আসা আলো লাল রং-এর দিকে সরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার কম্পাঙ্ক মাইক্রোওয়েভ-এর সীমার মধ্যে পড়ে যায়।

এইভাবে নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার-এর মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের  সম্প্রসারণ-এর ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। মনেকরা হয় যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড  সৃষ্টির আদিকালে গ্যালাক্সিগুলো খুব কাছাকাছি ছিল। তারপর একটা বিষ্ফোরণ (বিগ ব্যাং) হয় এবং গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যেতে থাকে।

এইরকম একটা সময়ে স্টিফেন হকিং-এর গবেষণা জীবন শুরু হয়। ১৯৬২ সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর তাঁর ইচ্ছা ছিল তৎকালীন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী প্রফেসর ফ্রেড হয়েল-এর সঙ্গে কাজ করবেন। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হকিং  কাজ করবার সুযোগ পান প্রফেসর ডেনিস সিয়ামার-এর সঙ্গে। এইসময় হকিং-এর মোটর নিউরোন রোগ ধরা পড়ে। হকিং তখন মরিয়া হয়ে গবেষণার জন্য উপযুক্ত বিষয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

১৯৬৫ সালে আর একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ-এর মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে কোন তারা যখন নিজের মাধ্যাকর্ষণ-এর জন্য সঙ্কুচিত হয়, তখন তার ক্ষেত্রফল আর আয়তন হয়ে যায় শূন্য। সেইসময় তারার ঘনত্ব এবং দেশকালের বক্রতা (স্পেস্-টাইম কার্ভেচার) হয়ে ওঠে অসীম। এইভাবে দেশকালের এককবিন্দু বা স্পেস্-টাইম সিংগুলারিটির সৃষ্টি  হয়। সিংগুলারিটি  বলতে  একটি অবস্থান বোঝায় যেখানে  কোন পরিমাপযোগ্য  ধর্ম, (এই ক্ষেত্রে মাধ্যাকর্ষণ) অসীম হয়ে যায়।

স্পেস্-টাইম-এর  সিংগুলারিটি যেখানে তৈরি হয়  সেখানে   ব্ল্যাক হোল  সৃষ্টি হয়ে থাকে। পেনরোজ-এর আবিষ্কার সম্বন্ধে পড়ে হকিং উপলব্ধি করতে পারেন যে যদি সময়ের অভিমুখ উল্টোদিকে করে দেওয়া যায়, তাহলে সঙ্কোচনকে সম্প্রসারন-এ পরিণত করা যেতে পারে।

পরবর্তী কয়েক বছর-এর মধ্যে হকিং সম্প্রসারণের ধারনাকে  প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য প্রয়োজনীয় গানিতিক প্রয়োগ কৌশল তৈরি করেন। ফলস্বরূপ ১৯৭০ সালে পেনরোস-হকিং সিংগুলারিটি  থিওরেম  প্রকাশিত হয়। এই গবেষণা পত্রে প্রমাণিত হয় যে সাধারণ আপেক্ষিতাবাদ অনুসারে    বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির সময়ে বিগ ব্যাং -এর অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। হকিং উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বিগ ব্যাং-এর  সময়  যে সিংগুলারিটির সৃষ্টি হয়েছিল তখন  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আয়তন ছিল ভীষণই ক্ষুদ্র। এই ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে শুধু আপেক্ষিকতাবাদ নয়, কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান-এর প্রভাবও অস্বীকার করা সম্ভব নয়। হকিং-এর গবেষণা পেনরোজ সিংগুলারিটি এবং  বিগ ব্যাং এর   সিংগুলারিটির ভেতরে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করে। আপেক্ষিকতাবাদ  এবং  কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান যুক্ত করার জন্য নতুন তত্ত্ব ( Theory of Everything)-এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। হকিং দেখান যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বোঝবার জন্য ব্ল্যাকহোলের বিষয়ে আরও বেশি জানা প্রয়োজন। পরবর্তীকালে হকিং ব্ল্যাকহোলের উপর অনেক গবেষণা করেন। তারমধ্যে বেকেস্টেইন-হকিং এন্ট্রপি, হকিং বিকীরণ ইত্যাদি  ছিল অন্যতম।

Reference: A Brief History of Time  by Stephen Hawking, Articles in New Scientist Magazine in  the internet

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s