স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: স্টিফেন হকিং এর লেখালেখি – অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়- শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

মাত্র একুশ বছর বয়সে শারীরিক পঙ্গুত্বের শিকার মহাকাশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডক্টর স্টিফেন হকিং, হুইলচেয়ারের সাহায্যে জীবন অতিবাহিত করেও তাঁর গবেষণাকে শুধু যে শীর্ষস্থানে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন তাই নয়, ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য সন্ধানে তিনি অনেক বই লিখে গেছেন, যাতে সুস্পষ্ট ভাবে বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বিবৃত। 

জনপ্রিয়তার শিখর ছোঁয়া এই বিজ্ঞানীর লেখা “দ্য ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম” এত বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, যে তাঁর এই বইটি হরির লুটের বাতাসার মতো সারা পৃথিবীতে বিক্রি হয়েছে। ১৯৮৮ সালে এই বইটি ছাপে লন্ডনের ব্যান্টাম পাবলিশিং গ্রুপ। টাইম ম্যাগাজিনের সমীক্ষায় বিশ্বের প্রথম একশটি জনপ্রিয় নন- ফিকশন বইয়ের মধ্যে এটি স্থান পায়। দুই দশকে বইটির এক কোটির বেশি কপি বিক্রি হয়। লন্ডনের সানডে টাইমসে বেস্ট সেলার বই হিসাবে ২৩৭ সপ্তাহ ধরে তালিকায় স্থান দখল করে থাকে।

ব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ সন্ধানী বিজ্ঞানীদের যাবতীয় আবিষ্কার ও ধ্যান ধারনাকে স্থান দিয়েছেন হকিং তাঁর এই বইটিতে। মহাকাশ বিজ্ঞানের অনুসন্ধানের পিছনে লুকিয়ে থাকা জটিলতা ও অঙ্কের কঠিন পথ ছেড়ে, সহজ ভাবে মানুষকে মহাকাশ তত্ত্বে উৎসাহিত করাই ছিল তাঁর উদেশ্য। শুধুমাত্র এই একটি বইই হয়তো তাকে একজন সুলেখক হিসাবে মনে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনীশক্তি তাকে দিয়ে আরও যে কটি বই লিখিয়েছে, বিদেশের বাজারে সেগুলি বিক্রি হলেও আমাদের দেশে কজন কিনেছে, কজনই বা পড়েছে, জানা নেই।

হকিং এর লেখা বইগুলো পড়লে স্বাভাবিক বাকক্ষমতা রহিত মানুষটির মনের গভীরতা, ক্ষুরধার চিন্তন, কৌতুক প্রিয়তা এবং জটিল বিষয় সরল করে উপস্থাপনা করার কৌশল জানতে পেরে বিস্মিত হতে হয়। বইগুলি পড়তে গিয়ে পাঠককে একঘেয়েমির শিকার তো হতে হয়ই না, বরং সহজ সরল ভাষায় লেখা বিজ্ঞান পাঠকের পড়ার উদ্দীপনা সহস্রগুণ বাড়িয়ে তোলে। একটি বই পড়তে শুরু করলে, এক নিঃশ্বাসে শেষ না করে উপায় থাকে না।

হকিং লিখেছেন একগুচ্ছ বই – “আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম”, “আ ব্রিফার হিস্ট্রি অফ টাইম”, “দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল”, “দ্য ব্ল্যাক হোল অ্যান্ড দ্য বেবি ইউনিভার্স”, “মাই ব্রিফ হিস্ট্রি”, “অন দ্য শোল্ডার অফ দ্য জায়েন্টস”, “গড ক্রিয়েটেড দ্য ইন্টেজার্স” “দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন”, “থিওরি অফ এভ্রিথিং”।

এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি গল্পের বই লিখেছেন তাঁর মেয়ে লিজার সঙ্গে যৌথভাবে, যার প্রধান চরিত্র ছিল জর্জ নামের এক কিশোর। শিশু কিশোরদের জন্য এই বইগুলি লেখার উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশ সম্পর্কে স্কুল পড়ুয়াদের কৌতূহলী করে তোলা। বইগুলি হল, “জর্জ এন্ড দ্য ব্লু মুন”, “জর্জ অ্যান্ড দ্য বিগ ব্যাং”, “জর্জ অ্যান্ড দ্য আনব্রেকেব্‌ল কোড”, “জর্জেস কসমিক ট্রেসার হান্ট”, “জর্জেস সিক্রেট কী টু দ্য ইউনিভার্স”।

“জর্জেস সিক্রেট কি টু দ্য ইউনিভার্স” এই সিরিজের প্রথম বই। জর্জের বন্ধু এ্যনি একদিন জানতে পারে, তার বাবা মহাকাশ বিজ্ঞানী এরিক, নিজের গবেষণায় এক মারাত্মক ভুল করে বসেছে। শুক্রগ্রহে তার নামানো রোবটটি ঠিক মতো কাজ করতে পারছে না। জর্জের সাহায্যে এ্যনি তার বাবার ব্যবহৃত সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে, সমস্যার সমাধান করে ফেলে।

“জর্জ এন্ড দ্য ব্লু মুন”এ অসমসাহসী জর্জ ও এ্যনি মহাকাশে বরফের স্তরের নিচে লুকানো জীবনের সন্ধান করতে উদ্যোগী হয়ে পড়ে। হঠাৎ তারা ‘মার্স এক্সপিডিশন’ ক্যাম্পে জায়গা পেয়ে যায়। শুরু হয় শুক্রগ্রহে তাদের জীবন সংগ্রাম।  আগাগোড়া টানটান উত্তেজনায় ভরপুর বইটি খুবই জনপ্রিয় হয়।

“জর্জ অ্যান্ড দ্য আনব্রেকেব্‌ল কোড” এর কাহিনীর শুরুতে দেখা যায় ব্যাঙ্ক নাগরিকদের যথেচ্ছ ডলার বিলচ্ছে, সুপারমার্কেটে বিনামুল্যে  খাবার দাবার বিতরণ হচ্ছে, যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কে বা কারা এই ঘটনার অন্তরালে এই সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটাচ্ছে, সেই রহস্যের সমাধান করতে বহির বিশ্বে পাড়ি জমায় জর্জ আর অ্যানি।

এবার ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে হকিং এর লেখা অন্য বইগুলির সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে তাঁর মূল্যবান কাজের আভাস দেওয়ার চেষ্টা করা যাক।

আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম

অধ্যপক স্টিফেন হকিং এর লেখা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম বহু চর্চিত। এই বইটিতে তিনি ব্রহ্মাণ্ডের স্বরুপ ব্যাখ্যা করেছেন। খালি চোখে ধরা না পড়া সুক্ষ বস্তু (যেমন অনু পরমাণু) থেকে প্রকাণ্ড ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বরের চরিত্র এঁকেছেন পদার্থবিদ্যার এযাবৎ যত আবিষ্কৃত নীতি আছে, তার প্রেক্ষাপটে। শুধুমাত্র আইনস্টাইন প্রণীত, বিখ্যাত শক্তি ও ভরের সামঞ্জস্য সমীকরণ ব্যতিরেকে একটিও সমীকরণের ব্যবহার করেননি, যাতে বিষয়ের জটিলতায় প্রবেশ না করেও, সাধারণ মানুষের কাছেও মহাকাশ বিজ্ঞান জনপ্রিয় ও সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। এরিস্টটলের সময় থেকে বিজ্ঞান ও দর্শন ব্রহ্মাণ্ডের চরিত্র অনুধাবন করে কীভাবে এক এক ধাপ এগিয়ে আধুনিক জ্ঞান লাভ করেছে, তার প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এই বইটিতে। জানালেন, কোয়ান্টাম থিওরির সঙ্গে জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি মিশিয়ে দিয়ে তবেই চেনা যাবে ব্রহ্মাণ্ডের আসল চেহারা। মন্তব্য করলেন, “মানুষের প্রেমে পড়া কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের টানে সম্ভব হয় না”। অর্থাৎ পরিহাসের মধ্যে দিয়ে জানিয়ে দিলেন, মানুষের চেতনার সঙ্গে অসম্পৃক্ত ব্রহ্মাণ্ডের খেলা।   

বইটি পাঠ করা পাঠকের কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠে তাঁর ভাষা শৈলী ও পরিহাসের গুনে। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পিছনে যে ভগবান বলে কারো হাত আছে, এই ধারণা উড়িয়ে দিয়ে হকিং বলেছেন, “ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করার আগে ভগবান কি করতেন, কেউ বলেনা। বরং উল্টে প্রশ্নকর্তাকে ধরে নরকে পাঠাবার চেষ্টা করা হয়।”

১৯৮৮ সালে বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়, যার মুখবন্ধ লেখেন প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী ও লেখক – কার্ল সাগান। প্রকাশিত হয়েছে মোট দশটি সংস্করণ। ২০০৫ সালে এই বইটির আর একটি উত্তরসূরি – ‘আ ব্রিফার হিস্ট্রি অফ টাইম’ প্রকাশিত হয়, যাতে সাইতিরিশটি নতুন ইলাস্ট্রেশন ব্যবহার করে মহাকাশ বিজ্ঞানের অনুসন্ধানের মনোগ্রাহী চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়।

 দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল

বইটির নাম ভূমিকায় হকিং লিখেছেন, ব্রহ্মাণ্ড যেন একটা বাদামের খোলার মতো। ব্রহ্মাণ্ডের আলাদা আলাদা ইতিহাস আছে, যাকে বলা হয় ‘থিওরি অফ মাল্টিপল হিস্ট্রিস’। এক একটা ইতিহাস যেন বাদামের খোলার মধ্যে ধরে রাখা। অনেক বাদামের খোলার সমষ্টি হচ্ছে ব্রহ্মাণ্ডের আসল ইতিহাস। দ্য ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইমের (১৯৯৮) জনপ্রিয়তায় হকিংকে প্রায়ই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হত, পরের বইটি তিনি কবে লিখছেন। তার নিজের ভাষায়, “ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইমের কোনো সিকুয়েল, যেমন ‘সন অফ ব্রিফ হিস্ট্রি’ বা ‘আ স্লাইটলি লঙ্গার হিস্ট্রি অফ টাইম’ জাতীয় বই লেখবার কোনোরকম ইচ্ছেই আমার হয়নি, কারণ আমি আমার গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। ব্রিফ হিস্ট্রি লিখেছিলাম সরলরৈখিক সামঞ্জস্য রেখে, অর্থাৎ আগের চ্যাপ্টারের সঙ্গে পরের চ্যাপ্টারের সংযোগ ছিল। তার ফলে অনেকেই দুএক চ্যাপ্টার পড়ে ফেলার পর আর বেশি দূর এগোতে পারেনি। কিন্তু ‘দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল’ বইটি লেখা হয়েছে এমন ভাবে, যেন এটা একটা গাছ – চ্যাপ্টার ১ আর ২ তার কাণ্ড, আর বাকিগুলো শাখাপ্রশাখা। তাই অন্য চ্যাপ্টারগুলো হয়ে গেছে স্বাধীন। আরও বেশি ইলাস্ট্রেশন ব্যবহার করে বিষয়কে সরল করার চেষ্টা করা হয়েছে।”

এই বইটি ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিল ব্রিফ হিস্ট্রির প্রকাশক ব্যান্টাম প্রেস। প্রথম পরিচ্ছেদ লেখা হয় আইনস্টাইন ও তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে। বর্তমানে ব্রহ্মাণ্ডের যে মডেল বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছেন, তার মূলে আছে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ব্যর্থতা। স্থান কালের বক্রতার কারণে আমরা যে মাধ্যাকর্ষণ উপলব্ধি করতে পারি তার হদিস কিন্তু দেন আইনস্টাইন। বিজ্ঞান সদা পরিবর্তনশীল। এক ব্যর্থতা এনে দেয় আর এক ধাপ সাফল্য। নিউটনের মাথায় আপেল খসে পড়ল, আর তিনি সিদ্ধান্ত করলেন, এই পৃথিবীর সব বস্তু মাধ্যাকর্ষণ বলে একে অপরকে ধরে টান দিচ্ছে। মাথা খাটিয়ে মাধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিষ্কার করলেন। সেখানে অনুপস্থিত সময়ের কেরামতি। সময় যেন বয়ে যাওয়া এক স্রোত, অপরিবর্তনশীল।

আইনস্টাইন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতা সূত্র দিলেন। দেখালেন সময় পরিবর্তনশীল। সময় যে ভিন্ন বেগে ছুটতে থাকা অক্ষে পরিবর্তিত হয়ে যায়, সেটা বুঝতে গেলে আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে চলতে হবে কোন বস্তুকে। আইনস্টাইন গতিশীল বস্তু হিসাবে কল্পিত মানুষকে বসিয়ে দিলেন কল্পিত এক লিফটে, যেটা কেব্‌ল ছিঁড়ে মহাকর্ষের টানে নিচে নেমে যাচ্ছে শুন্যে। লিফটের বেগ বাড়তে বাড়তে আলোর গতিবেগের প্রায় সমান সমান হয়ে যাচ্ছে। লিফটের ভিতরের মানুষটি হাতে ধরে রেখেছে একটা ঘড়ি।

আইনস্টাইন অঙ্ক কষে দেখিয়ে দিলেন, লিফটের মানুষটির দৈর্ঘ কিভাবে কমে যায়, আর সময় কীভাবে ছোট হয়ে যায়। আইনস্টাইনের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হকিং পরিহাস করে বললেন, “ওনার সময়ে “স্টার ট্রেক” নামের ছবিটা তখনো তৈরি হয়নি, স্পেস শিপ নিয়ে ধ্যান ধারনা না থাকায় আইনস্টাইন লিফটের আশ্রয় নিয়েছিলেন তার তত্ত্বের কথা বোঝাতে। আর যে বেচারা লিফটে ঘড়ি হাতে দাঁড়িয়েছিল, সে মহাশুন্যে কেব্‌ল ছেঁড়া লিফটে কী অবস্থায় থাকতে পারে, সেটাও জানিয়ে যাননি।”

কঠিন বিষয়ের মাঝে রসিকতা করে পাঠকের আগ্রহ চাগিয়ে রাখতেই স্টিফেন এমন প্রসঙ্গের অবতারনা করার ক্ষমতা ছিল হকিং এর সহজাত। কিন্তু প্রসঙ্গ থেকে সরে যেতেন না কক্ষনো। তাই তাঁর কাছে আমরা জানতে পারি, আইনস্টাইন প্রসারণশীল ব্রহ্মাণ্ডের কথা জানতেন না, বা জানলেও মানতেন না। তাঁর ধারনায় ব্রহ্মাণ্ড ছিল স্থির। কিন্তু স্থান কালের বক্রতায় শুধু অহর্নিশি ব্রহ্মাণ্ডের বস্তু সমূহ ঘুরে চলেছে। বিগ ব্যাং তাই জায়গা পায়নি আইনস্টাইনের তত্ত্বে। হকিং ব্যখ্যা করলেন, প্রাক আইনস্টাইন সময়ে অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে কীভাবে বিজ্ঞানীরা ধরতে পারলেন ক্রম প্রসারণশীল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী সময় অনন্ত কাল ধরে প্রবাহ মান, তার আদি ও অন্ত নেই। কিন্তু হকিং বিগ ব্যাং তত্ত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, সময়ের শুরু আর অন্তে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব খাটে না।

স্থান কাল কীভাবে বেঁকে যাচ্ছে? ভর ও শক্তির বিন্যাস স্থান কালকে দুমড়ে দিচ্ছে। সময়ও দুমড়ে যাচ্ছে, সরল রৈখিক পথে তার চলা নয়। সময় কোথায় শুরু আর কোথায়ই বা শেষ। হকিং বলছেন, বিগ ব্যাং থেকে সময়ের শুরু আর কৃষ্ণ গহ্বরে গিয়ে তার মৃত্যু। এই বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে সময় নিয়ে কথা প্রসঙ্গে পরিহাস প্রিয় অধ্যাপক সময়ের খেলা বোঝাতে গিয়ে যে মন্তব্য করলেন, তা খুবই উপভোগ্য। তিনি বললেন, “নিউটন এবং আমি দুজনেই কালের বিভিন্ন সময়ে একই অধ্যাপক আসনে বসেছি। কিন্তু নিউটনের চেয়ার বৈদ্যুতিন ছিল না, আমারটা বিদ্যুৎ পরিচালিত।”

সময়ের ভেদে ঘটনা বদলে যাওয়ার উপরোক্ত উদাহরণ খুবই যুক্তি গ্রাহ্য। হকিং এর মতে, বিগ ব্যাং তত্ত্ব ধর্মীয় গুরুদের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সাহায্য করল। যদি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মেনে নিতে হয়, তবে ভগবানের অস্তিত্ব থাকে না। কারণ এই ব্রহ্মাণ্ড যদি চিরকাল একই থেকে যাবে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করল কে? সরাসরি ভগবানের অস্তিত্ত্ব বিপন্ন হয়ে উঠল। অথচ প্রসারণ শীল বিশ্বের তত্ত্ব মেনে নিলে ব্রহ্মাণ্ডের আদি ও অন্তকেও মেনে নিতে হয়। আদি থাকলে তার সৃষ্টিকর্তাও আছে, অতএব ভগবান আছে, একথা মানুষকে বোঝাতে সুবিধা হয়ে গেল আস্তিকদের।

হকিং তাঁর এবং পেনরোজের একটি যৌথ কাজের বর্ণনা দিয়েছেন এই বইটিতে। সেটির গোড়ার কথা হল, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা বিগ ব্যাং এবং কৃষ্ণ গহ্বরে (সিঙ্গুলারিটি) খাটে না – অর্থাৎ এই দুই স্থানে মহাকর্ষের প্রভাব অঙ্ক কষে কেন বোঝানো যায় না, তার মূল কারণ – মাধ্যাকর্ষণ বলের ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কাজে লাগানো হয়নি। এখানেই আইনস্টাইনের তত্ত্বের ব্যর্থতা। অথচ কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কাজে লাগিয়ে অন্য বলগুলি, যেমন, তড়িৎ চুম্বকীয় বল বা আনবিক বলের ধর্ম ব্যখ্যা করা গেছে। অভিকর্ষণে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে যে তত্ত্ব তাকে বলা হয় ‘সুপার গ্র্যাভিটি থিওরি’। এই তত্ত্বের মূলে আছে স্থান কালের দশ বা এগারো মাত্রার ধারনা। আইনস্টাইনের চার মাত্রা সেখানে কার্যকর নয়।

হকিং যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, “সত্যিই কী দশ মাত্রার প্রভাব আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারব?”আবার ওই প্রশ্নের উত্তরও দিলেন তিনি, “আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনা সমূহে এমন কিছু পাইনি, যার ব্যখ্যায় অতিরিক্ত মাত্রার  প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিশেষ ঘটনা, যেমন হাইড্রন কোলাইডারে আলোর প্রায় সমান গতিতে ছুটে যাওয়া মৌল কণা হয়তো এর উত্তর দিতে পারবে।”

ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে হকিং খুলে বলেছেন বইটি লেখার পিছনে তার আসল উদ্দেশ্য। শুরুতেই তিনি সেক্সপিয়ারের হ্যাম্লেট থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন, “হয়তো আমরা বাস করছি একটা ছোট্ট বাদামের খোলার ভিতর। কিন্তু বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে কল্পনার পাখা মেলে মন পাখিকে উড়িয়ে দিতে বাধা কী!” তাই তিনি বাদামের খোলা – এই পৃথিবীতে হুইল চেয়ারে বসে তাঁর বিজ্ঞানী মন উড়িয়ে নিয়ে গেলেন রহস্য সন্ধানে। বললেন, “প্রমিথিউস যেমন জুপিটার থেকে আগুন চুরি করে স্বর্গীয় শাস্তি পেল, পাহাড়ের চুড়োয় তাকে বেঁধে রেখে ঈগলকে ঠুকরে ঠুকরে যকৃত খেতে দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হল, আমরাও কী তেমন দেবতাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেদের সীমাবদ্ধতায় বেঁধে ফেলব, নাকি খুঁজতে যাব স্বর্গীয় রহস্য?”

এই বোধ থেকে হয়তো জন্ম নিল হকিং এর ব্রহ্মাণ্ড অনুসন্ধান স্পৃহা, স্থান কালের মাত্রা ছাড়িয়ে, মহাশূন্যে। হকিং এর মতে, মহাকাশ বিজ্ঞানের জগতে বৌধিক বিপ্লব ঘটে গেল সেদিন, যেদিন বিজ্ঞানী হাব্‌ল টেলিস্কোপ ব্যবহার করে দেখিয়ে দিলেন – ব্রহ্মাণ্ড সম্প্রসারণশীল। হকিং ও পেন্‌রোজ, রিচার্ড ফেইনম্যানের ‘থিওরি অফ মাল্টিপল হিস্ট্রি’ বা বহু ঐতিহাসিক তত্ত্ব এবং আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে মেলানোর চেষ্টা করলেন। ফেইনম্যান বলেছেন, ব্রহ্মাণ্ডের শুরু থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী একটার পর আর একটা যেন একই সুত্রে বাঁধা। সেই ঘটনার শিকল তৈরি করে ইতিহাস। ইতিহাস গড়ে ওঠে সময়ের সাপেক্ষে। আইনস্টাইন বলেছেন সময় আপেক্ষিক – তাহলে ইতিহাসও আপেক্ষিক, বিভিন্ন অক্ষে বিভিন্ন ইতিহাস গড়ে উঠেছে। সব এক সূত্রে গেঁথে দিয়ে পাওয়া যাবে ব্রহ্মাণ্ডের সম্পূর্ণ ইতিহাস।

বিগ ব্যাংএর শুরুতে আমরা কেন তার ইতিহাস জানতে পারব না, তার কারণ ব্যখ্যা করলেন হকিং। কোয়ান্টাম তত্ত্বের গোড়ায় আছে হাইসেনবার্গের আনসার্টেইনিটী বা অনিশ্চয়তার তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনও বস্তুর ভর ও ভরবেগ একই সঙ্গে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। একটিকে নিশ্চিত করে মাপতে গেলে আরেকটি অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। বিগ ব্যাং যেহেতু কোয়ান্টাম তত্ত্ব দিয়েই ব্যখ্যা করা যায়, হাইসেনবার্গের আনসার্টেইনিটী বা অনিশ্চয়তার তত্ত্ব অনুযায়ী, ঘটে যাওয়া ঘটনার সংখ্যা এত কম ছিল, যে তাকে জানার সম্ভাবনা স্বল্প। কিন্তু বিশ্ব যেহেতু বর্তমানে অনেকটাই প্রসারিত হয়ে গেছে, ঘটনার সংখ্যাও বহু, তাই একটি ঘটনাকে সঠিক ভাবে জানবার প্রবাবিলিটী বা সম্ভাবনা অনেক বেশি।

ইতিহাস গড়ে যে সময়, হকিং তাকে দুটি বিভিন্ন অক্ষে রেখেছেন। একটি বাস্তব ও আর একটি কল্পিত। এই দুটি অক্ষ পরস্পর সমকোণে থাকে। বাস্তব অক্ষের ইতিহাস কল্পিত ইতিহাসের অক্ষকে প্রভাবিত করে। ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস এই দুই অক্ষেই পাওয়া যাবে। কল্পিত সময়ের অক্ষের ইতিহাসে, মানুষের চাইতে উন্নত প্রাণী (যেমন আমরা কল্প বিজ্ঞানের ফিল্মে দেখতে পাই) থাকতে পারে বলে মন্তব্য করে স্বাভাবিক কৌতুকে হকিং বললেন, “মানুষের মস্তিষ্ক যে সবচাইতে উত্তম, বিশ্বের ইতিহাস কিন্তু এমন কথা বলেনা।”

চতুর্থ অধ্যায়ে ব্রহ্মাণ্ডের রুপের ভবিষ্যদ্বাণী আলোচনা করতে হকিং পরিহাস করলেন জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎ দর্শন নিয়ে। বললেন, ভবিষ্যতের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাওয়া মানুষের স্বভাবগত, তাই জ্যোতিষীদের বাজার এত রমরমা। গ্রহ নক্ষত্রের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে তারা জীব দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে একেবারে অনবিক সীমায় নেমে গিয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের নক্ষত্রদের কাছে পৃথিবী অতি ক্ষুদ্র একটি বস্তু পিণ্ড ছাড়া কিছুই নয় এবং সেই গ্রহে বসবাস করা মানব জাতি বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যতই গর্ব করে থাকুক না কেন, নক্ষত্রদের তাতে কিছু আসে যায় না। বিজ্ঞানীরা যে জ্যোতিষ শাস্ত্রে বিশ্বাস করেন না তার মূল কারণ, জ্যোতিষ পরীক্ষিত সত্য নয়। কিন্তু বিশ্ব বিষয়ে বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যৎ দর্শন, জ্যোতিষ শাস্ত্র থেকে সম্পূর্ণ পৃথক।

বস্তুর ভর এবং তার গতিবেগ যখন একসঙ্গে সুনির্দিষ্ট ভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়, তখন ওয়েভ ফাংশন দিয়ে হবে জাগতিক ব্যখ্যা। ওয়েভ ফাংশন আসলে একটি গাণিতিক পরিবর্তনশীল মাপক, যা বস্তুর ভর, গতিবেগ ও সময়ের উপর নির্ভরশীল (ওয়েভ ফাংশনকে প্রথম ব্যবহার করেন শ্রডিঙ্গার তার কোয়ান্টাম বলবিদ্যার গাণিতিক সমীকরণে)। হকিং এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করলেন, “ভগবানও অনিশ্চয়তার সূত্র মানতে বাধ্য, তিনিও ওয়েভ ফাংশনকেই জানেন, যেমন জানেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সেই ফাংশন ধোপে টিকবে না কৃষ্ণ গহ্বরের কাছে গেলে।” বুঝিয়ে দিলেন, সময় যেহেতু গ্রাস হয়ে যায় কৃষ্ণ গহ্বরে, তাই ওখানে অঙ্ক কষেও বোঝা যাবে না তার প্রকৃত রূপ। কৃষ্ণ গহ্বরের প্রবল অভিকর্ষজ টানে সময় যাবে থেমে। ওয়েভ ফাংশনই একমাত্র অস্ত্র, যাকে ব্যবহার করে জানা যাবে অতীত ও ভবিষ্যতের ব্রহ্মাণ্ডের সঠিক চেহারা।

কৃষ্ণ গহ্বরের অস্তিত্ব মানতে চাননি অনেক বিজ্ঞানী। স্টিফেন হকিং প্রথম আবিষ্কার করেন কৃষ্ণ গহ্বর সম্পূর্ণ কৃষ্ণ নয়। অর্থাৎ তার থেকেও বিকিরন ঘটে। এই ঘটনাকে বলা হয় – ব্ল্যাক হোল রেডিয়েশন। সমস্যা হল, কেমন করে সেই রেডিয়েশনের সন্ধান পাওয়া যাবে? এই বিষয়ে হকিং প্যারিসে এক সেমিনারে বক্তব্য রাখলেন, তাঁর প্রস্তাব গুরুত্ব পেল না । কিন্তু এর কিছুদিন পরে ১৯৬৩ সালে উচ্চ ক্ষমতার টেলিস্কোপ সন্ধান পেল কোয়েসারের। সূর্য থেকে কোটি কোটি গুন বেশি ভরের কোনও কৃষ্ণ গহ্বরের চারিদিকে রিঙের আকারে অতি উজ্জ্বল কোয়েসারের দেখা পাওয়া গেলে, হকিংএর আবিষ্কারের সত্যতা জানা গেল। কৃষ্ণ গহ্বরের টানে চারিদিকের গ্যাস যখন প্রবল বেগে সেদিকে ধাবিত হয়, তখন তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের নির্গমন হয়, যার ঔজ্জ্বল্য মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির চাইতে হাজার হাজার গুন বেশি।

 গড ক্রিয়েটেড দ্য ইন্টেজার্স

ইন্টেজার্স শব্দের অর্থ পূর্ণ সংখ্যা, যাকে ভগ্নাংশে প্রকাশ করা যায় না। ২০০৭ এ হকিং এই বইটি লিখেছিলেন। শিরোনাম পড়ে মনে হতে পারে, ভগবান এই পূর্ণ সংখ্যার স্রষ্টা কী না, সেই ভাবনায় ভাবিত বইটির লেখা। লেখক ভগবানে বিশ্বাস করতেন এমন প্রমাণ তাঁর কোনও লেখাতেই পাওয়া যায় না। বরং ঈশ্বরের প্রতি কটাক্ষ লক্ষ্য করা যায় তাঁর লেখনীতে। তাহলে তিনি এমন শিরোনাম কেন দিলেন? আসলে তিনি খুঁজতে চেয়েছেন সৃষ্টি তত্ত্বের সন্ধানে বিজ্ঞানীদের গাণিতিক সমাধানের বিবর্তন।

এই বইটি লেখা হয়েছে পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত যেসমস্ত অঙ্কবিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ঘটে গেছে, তাঁদের জীবন ও কাজ নিয়ে। বইটিতে ইউক্লিড, আর্কিমিডিস, ডেকার্টস, ইউলার, লাপ্লাস, ফুরিয়ার, গস, কচি, এলান টিউরিং ছাড়া আরও অনেক গণিতজ্ঞকে স্থান দিয়েছেন হকিং। বইটির প্রথম আলোচ্য ব্যক্তি ইউক্লিড। ৩৫০০ বছর আগে মিশরে পিরামিড বানাতে গিয়ে খুব সম্ভব জ্যামিতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু তারা জ্যামিতিক মাপে কিছু গোলমাল করে ফেলে, কারণ তখনো  (পাই) আবিষ্কার হয়নি। এরপর গ্রীকেরা গণিতে উন্নতি করে এবং গণিত শাস্ত্রের আসল উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।

কিছু বাস্তব ধারণা ও সূত্র মেনে গণিতের শুরু হয় আর প্রয়োগের সফলতাই গণিতের সাফল্য – এই দর্শন সম্বল করে তাদের পথ চলা। গ্রীক গণিতজ্ঞদের কাজকে একত্র করেন ইউক্লিড তার লেখা বই – ‘এলিমেন্টস’ এ। বইটি লেখা হয় খ্রিষ্টপুর্বাব্দ ৩০০ সালে। এখানে বীজগণিত ও জ্যামিতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ও সমাধান লিপিবদ্ধ করা হয়।

হকিং এর লেখা এই বইটি পড়ে আমরা জানতে পারি, ইউক্লিড যেহেতু আলেক্সান্দ্রা শহরে গণিতের শিক্ষক ছিলেন, তিনি তার পূর্ববর্তী সমস্ত গ্রীক গণিতজ্ঞদের কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন আর তাদের কাজ নিয়ে গণিতের সংকলন – ‘এলিমেন্টস’ লিখে, গণিত শাস্ত্রকে সুসমৃদ্ধ করে গিয়েছিলেন। ইর‍্যাশনল নাম্বার বা অযৌক্তিক সংখ্যা নিয়ে গণিতের সংকট জানা যায় ইউক্লিডের বইটিতে। পাইথাগোরাস মনে করতেন সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যখ্যা করা যাবে শুধুমাত্র পূর্ণ সংখ্যা দিয়ে। কিন্তু সমস্যা হল, পাইথাগরাস থিওরেম ব্যবহার করে কিছু সংখ্যা পাওয়া গেল, যাদের পূর্ণ সংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা গেল না, যেমন  বা । কিভাবে পাওয়া গেল সেই সংখ্যা একটু বলে নেওয়া যাক। ধরা যাক, একটি সমকোণী ত্রিভুজের সমকোণ ধারক দুই বাহুর মাপ যথাক্রমে ১মিটার ও ২ মিটার। পাইথাগরাসের সূত্র অনুযায়ী অতিভুজের মাপ হবে  । এই ইর‍্যাশনল সংখ্যাকে কোনও পূর্ণ সংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা যায় না। পাইথাগরাসের শিষ্যেরা ব্যাপারটা ধরতে পেরেও বেমালুম চেপে গেলেন। কারণ মেনে নিলে পাইথাগোরাসের সৃষ্টিতত্ত্ব ধোপে টিকত না, যার মূল ছিল কেবলমাত্র পূর্ণসংখ্যা। সেই তত্ত্বে চার্চও বিশ্বাস করত। শিষ্যদের মধ্যে একজন কথাটা পাঁচকান করাতে, তাকে বাকি শিষ্যেরা সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলে। হকিং এর মতে, পাইথাগোরাসের সেই শিষ্যই হচ্ছে গণিত শাস্ত্রের সর্বপ্রথম শহিদ।

ইউক্লিডের জ্যামিতি দ্বিমাত্রিক। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী স্থান-কালের বক্রতায় ইউক্লিডের জ্যামিতি ব্যর্থ। কিন্তু হকিং বললেন, খুব সম্ভবত ইউক্লিডের জ্যামিতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আইনস্টাইনের আগেও গণিতজ্ঞেরা ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু জ্যামিতির ব্যবহারিক দিকের কথা মাথায় রেখেই তারা সেই জ্যামিতি ব্যবহার করে গিয়েছেন।

ইউক্লিডের পদচিহ্ন অনুসরণ করে অঙ্কের জগতের এক অপূর্ব দলিল নথিবদ্ধ করে গেলেন স্টিফেন হকিং। 

দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন

এই বইটির ভূমিকায় স্টিফেন হকিং মহাকাশ জুড়ে ব্রহ্মাণ্ডের অপার রহস্য দেখে মানুষের সামনের চিরন্তন প্রশ্ন গুলি তুলে ধরেছেন – (১) আমরা যে ব্রহ্মাণ্ডে বাস করছি তাকে জানব কিভাবে? (২) ব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ কী? (৩) সত্যের আসল চেহারা কী? (৪) কোথা থেকে এসব উদয় হল? (৫) ভগবানের কী আদৌ কোনও অস্তিত্ব আছে?

প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন তিনি নিজেই। বললেন, “এই সমস্ত বহু প্রাচীন প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছে দর্শন। কিন্তু দর্শন হার মেনেছে বিজ্ঞানের কাছে, সে পিছিয়ে পড়ছে পদার্থবিদ্যার বিকাশের সঙ্গে।” ২০১০ সালে বইটি লিখতে বসে হকিং বলছেন, “সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার বিকাশ, বিগত দশ বছরে যত ধ্যান ধারণা ছিল তাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।” তাই তিনি লিখতে বসলেন মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আবিষ্কারের দলিল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে সনাতন পদার্থবিদ্যা অনু পরমাণুর জগতকে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়, জন্ম নেয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। ব্যবহারিক জীবনে সনাতন পদার্থবিদ্যা প্রকৃতির নিয়মকে ব্যাখ্যা করতে পারে। মনে হতে পারে মহাজাগতিক বস্তুও একই নিয়মে বাঁধা গণ্ডির মধ্যে চলে, তাদের একটাই ইতিহাস। কিন্তু রিচার্ড ফেইন্ম্যান দেখালেন ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস বিবিধ। থিওরি অফ প্রবাবিলিটির ভিত্তিতে তার প্রস্তাবিত মাল্টিপল হিস্ট্রি অনুযায়ী ব্রহ্মাণ্ডের আছে অনেকগুলি সম্ভাব্য ইতিহাস। আগে ধারণা ছিল মানুষের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই শুধু ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব। আধুনিক পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের বিকাশ দেখিয়ে দিল, খালি চোখে যা দেখা যায়, তা সত্য নয়। আধুনিক টেলিস্কোপ আবিষ্কার মানব ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে গেল। মহাজাগতিক বিস্ময়ের নতুন দ্বার উন্মীলিত হল। প্রস্তাবিত হল ‘এম থিওরি’, হকিং তার নাম দিলেন – থিওরি অফ এভরিথিং।

‘এম থিওরি’ হচ্ছে পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন পৃথক থিওরিকে এক সূত্রে গেথে ফেলা – হকিং এর তুলনা অনুযায়ী, বিশ্বের ভৌগলিক মানচিত্র যেমন দেশ মহাদেশের টুকরো জুড়ে তৈরি হয়, অনেকটা সেইরকম। ‘এম থিওরি’ বলে, মহাশূন্য থেকে সৃষ্টি হয় বহু ব্রহ্মাণ্ড। এক একটি ব্রহ্মাণ্ডের আছে পৃথক পৃথক ইতিহাস। প্রবাবিলিটির সূত্র অনুযায়ী অন্য বিশ্বে পাওয়া যেতে পারে মানুষের মত প্রাণী, যেখানে প্রাণ সঞ্চারের যথেষ্ট উপাদান মজুদ।

আটটি পরিচ্ছেদে লেখা মাত্র ১৮০ পাতার দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইনে হকিং আলোচনাকে ভাগ করে নাম দিয়েছেন ‘মিসট্রি অফ বিং’, ‘দ্য রুল অফ ল’, ‘থিওরি অফ অল্টারনেট হিস্ট্রি’, ‘থিওরি অফ এভরিথিং’, ‘চুজি আওয়ার ইউনিভার্স’, ‘দ্য অ্যাপারেন্ট মিরাক্‌ল’ এবং ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’ নিয়ে।

‘দ্য রুল অফ ল’ লিখতে বসে মহাকাশের বিস্ময় মানুষকে কীভাবে ভাবিয়ে তুলেছে তার ইতিহাস দর্শন করালেন হকিং। ভাইকিং উপকথায় দুই নেকড়ে তেড়ে গেল চাঁদ আর সূর্যের দিকে। তাদের মধ্যে বাধল সাংঘাতিক লড়াই। গ্রহণ লেগে গেল। মানুষ পৃথিবী থেকে চিৎকার করে উঠল তাদের ছাড়ানোর জন্য। গ্রহণ ছেড়ে গেল, দুই নেকড়ের লড়াইও গেল থেমে।

এমন উপকথা পৃথিবীর অন্য দেশেও চালু আছে। কিন্তু একদিন মানুষ আবিষ্কার করল, চন্দ্র সূর্যের গ্রহণ পর্যাবৃত্ত। ব্যাবিলনের কিছু দার্শনিক চন্দ্র গ্রহণের পর্যাবৃত্তের ভবিষ্যতবাণী করতে পেরেছিল প্রায় সঠিক ভাবে। কিন্তু জটিল ছিল সূর্যগ্রহণের ভবিষ্যতবাণী। আর কিছু না হোক, মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল গ্রহণের পিছনে আছে কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম, কোনও আধিদৈবিক শক্তি নয়। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ – যেমন ভূমিকম্প, পাহাড়ের লাভা উদ্গিরন বা বন্যার কারণ সেই সময়ের মানুষ ব্যখ্যা করতে পারেনি। এরিস্টটলের বয়ান অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ শতাব্দীতে থেল্‌স সর্বপ্রথম বলেন যে সাধারণ কিছু বৈজ্ঞানিক নিয়ম দিয়ে জটিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বোঝা সম্ভব এবং তার জন্য আধিদৈবিক শক্তির সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। থেল্‌সের হাত ধরে সূর্যগ্রহণের প্রথম ভবিষ্যতবাণী করা সম্ভব হয়। হকিং এর মতে, প্রাকৃতিক নিয়মের প্রথম গাণিতিক সূত্র দেন পাইথাগোরাস। এর আগে কেবল আর্কিমিডিস প্রথম পদার্থবিদ্যার নিয়মটির সুচনা করেন।

এরিস্টটলের দর্শনকে তীব্র ভাবে আক্রমণ করতে দেখা গেল এই পরিচ্ছেদে। হকিং লিখলেন- “পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এরিস্টটলের প্রস্তাবিত সূত্র না মিললে, তিনি সূত্র না বদলে ঘটনার উপসংহারই বদলে দিতেন। নিজের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খাপ খায় এমন নীতিকেই তিনি পছন্দ করতেন এবং পর্যবেক্ষণে মাপজোকের একেবারে গুরুত্ব ছিল না তার কাছে।”

এরিস্টটলের সুত্রের খুব মজার উদাহরণ দিয়েছেন হকিং। যেমন তার প্রস্তাবিত একটি সূত্র অনুযায়ী, কোনও ভারী বস্তুকে উপর থেকে ফেলে দিলে সেই বস্তু তার ভরের সমানুপাতে সমান গতিতে নিচে পড়তে থাকে। এবার যেই প্রমাণ হল, বস্তুটির গতিবেগ সমান নয়, বরং ক্রমশ বাড়তে থাকে, অমনি এরিস্টটল বললেন, বস্তুটির মাটি ছোঁয়ার ব্যগ্রতাই তার গতি বাড়ার কারণ। অথচ আশ্চর্য জনক ভাবে, এরিস্টটলের এই তত্ত্বই প্রায় দুহাজার বছর ধরে কী করে পশ্চিম দুনিয়ায় কায়েম ছিল, সে নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হকিং। তার মতে প্রাকৃতিক নিয়মের আধুনিক সূত্র প্রবর্তন হয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীতে। ‘সূত্র’ (law) শব্দের ব্যবহার স্বয়ং গ্যালিলিও করেননি। এই শব্দের ব্যবহার করেন জোহান্স কেপলার, যখন তিনি সূর্যের চারপাশে গ্রহের আবর্তনের সূত্র আবিষ্কার করেন। হকিং এর মত অনুযায়ী, আজকের দুনিয়ায় প্রাকৃতিক নিয়মের সূত্র বলতে যা বুঝি, তার সর্বপ্রথম সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন রেনে দেকার্ত। দেকার্তের সূত্রানুযায়ী, সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনাবলী চলনশীল বস্তুর পরস্পর ধাক্কার স্বরূপ দিয়ে বোঝা সম্ভব। প্রতিটি সুত্রে বস্তুর প্রাথমিক অবস্থা (initial condition) জানা গুরুত্বপূর্ণ। তবেই মিলে যাবে পরীক্ষার ফলাফল। দেকার্ত তিনটি প্রাকৃতিক নিয়মের উল্লেখ করেন, পরবর্তীকালে নিউটন প্রস্তাবিত গতি সুত্রের সঙ্গে যার মিল পাওয়া যায়। দেকার্তের দর্শন ছিল, ভগবান এই সূত্রগুলো সাজিয়ে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু একান্তই বাধ্য হয়ে, কারণ আর কোনও বিকল্পই তার কাছে ছিল না। যখন দেকার্ত বুঝলেন, এই দর্শন প্রচার হলে ভগবানকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হবে, তখন তিনি বললেন, ভগবান নিজেই এই প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে, তাই তার কাছে আর কোনও বিকল্প ছিল না। হকিং যুক্তি দিলেন – যদি তাই হবে, তাহলে ভগবানের কাছে বিভিন্ন ব্রহ্মাণ্ড তৈরি করার সুযোগ ছিল, যে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের আলাদা আলাদা প্রাকৃতিক সূত্র এবং প্রাথমিক অবস্থা আছে।

প্রকৃতি যে নিয়মে চলে তাকে জানতে হলে তিনটি প্রশ্নের উত্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন হকিং। যেন নিজের দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। এক, প্রকৃতির নিয়মের আদি কোথায়? দুই, প্রাকৃতিক নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম থাকতে পারে কী? তিন, শুধু একটিমাত্র সম্ভাব্য সূত্রের সেটের অস্তিত্ব আছে, নাকি আরও অনেক সেট থাকতে পারে?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কেপলার, গ্যালিলিও, দেকার্ত বা নিউটন, সবাই ভগবানের হাত আছে বলে নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিলেন। হকিং নিজে কিন্তু ভগবানের অস্তিত্ব মানতে পারেননি, তাই হয়ত মহাকাশের রহস্য সন্ধানে সারা জীবন লাগিয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে হকিং যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন, প্রকৃতির নিয়মের নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। মিরাক্‌ল হতে পারে না। মানুষের মন ও শরীর স্বাধীন ভাবে থাকতে পারে না। শরীর বাদ দিয়ে ফ্রি উইল বা মুক্ত চিন্তার জায়গা নেই। যে নিয়মে গ্রহ নক্ষত্র চলছে, সেই একই নিয়মে প্রাণীদেহের অনু পরমাণু চলছে প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে। তাই ভগবানের অস্তিত্ব যদিও থাকে, প্রাকৃতিক নিয়ম বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তার হাতেও নেই।

সত্যের সন্ধানী বিজ্ঞানীদের যাত্রাপথের ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায় ‘হোয়াট ইস রিয়ালিটি’ অধ্যায়ে। চোখে যা দেখা যাবে সেটিকেই বাস্তব সত্য বলে মেনে নেব, এহেন এরিস্টটলিয় সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন হকিং। আজকের বিজ্ঞান জানে, পদার্থের ক্ষুদ্রতম  কণা কোয়ার্ক। কিন্তু সে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। নিউটন বললেন, আলো সরল রেখায় চলে, কারণ সে কণা ধর্মী। সেই ধর্ম মেনে নিয়ে আলোর প্রতিফলন ব্যাখ্যা করা গেলেও আলোর প্রতিসরণ ব্যখ্যা করতে তার তরঙ্গ ধর্ম মেনে নিতে হল। কিন্তু আলোর বেঁকে যাওয়া বা সরল রৈখিক পথে চলা তো আর খালি চোখে দেখা যাবে না। তাহলে পরীক্ষা করে পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়ে পৌছতে হবে সত্যে। সেই সত্যও সম্পূর্ণ সত্য নয়। হাইন্সেনবারগের আন্সারটেইনিটি তত্ত্ব বলছে, বস্তুর অবস্থান জানতে গেলে তার ভর জানা যাবে না সঠিক ভাবে। তাই সত্যের কাছাকাছি পৌছলেও, আসল সত্য জানা যাবে না। হকিং বললেন, বিজ্ঞানের মডেল তৈরি করে চোখে ধরা না পড়া সত্য বোঝানো হয়ত সম্ভব, কিন্তু মডেলের সত্যতা নিয়েও ভাঙা গড়া চলতে থাকবে যতদিন বিজ্ঞান অনুসন্ধান চলবে।

‘দ্য অল্টারনেট ইউনিভার্স’ অধ্যায়ে নিউটনের ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স, পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করতে কিভাবে ব্যর্থ হল সে বিষয়ে সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন হকিং। উদাহরণ দিয়েছেন আলোর ওয়েভ পারটিক্‌ল ডুয়ালিটির। কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রয়োগ করে আলোর এই ধর্মকে ব্যাখ্যা করা করা গেল। যা খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না, যেমন অনু পরমাণুর গতি এবং আচরণের ব্যাখা একমাত্র কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করেই জানা সম্ভব হল। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার বিকাশের ফলে জানা গেল, প্রাকৃতিক সূত্রাবলী (natural laws) পদার্থের ভবিষ্যৎ ও অতীতের সম্ভাব্য অবস্থা নির্দেশ করে, সুনিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যায় না। হকিং জানালেন, বস্তুর অবস্থার এই অনিশ্চয়তা কিছু বিজ্ঞানীর পক্ষে মেনে নেওয়া একেবারে অসম্ভব হয়ে উঠল। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা যেহেতু ইতিমধ্যেই অনেক ঘটনার ব্যখ্যা দিতে সমর্থ হয়েছে, তার হাত ধরেই চলবে অচেনাকে জানার পথ। অনিশ্চয়তা দূর করবার একমাত্র রাস্তা হল, আরও বেশি করে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে তার গাণিতিক বিশ্লেষণ। রিচার্ড ফেইন্ম্যান মহাকাশ বিদ্যায় কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ব্যবহার করে নতুন দিশা নির্দেশ করলেন তার প্রণীত “অল্টারনেট হিস্ট্রি”তে। জানা গেল, ব্রহ্মাণ্ডের অনেক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করে। 

থিওরি অফ এভ্রিথিং’ অধ্যায়ে আমরা পদার্থবিদ্যার মূল বলগুলি, যথা গ্র্যাভিটেশানল, ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক, উইক নিউক্লিয়ার, স্ট্রং নিউক্লিয়ার বলের সঙ্গে পরিচিত হই, জানতে পারি কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি সম্পর্কে, হকিং যার নাম দিয়েছেন – ‘থিওরি অফ এভ্রিথিং’। ক্লাসিক্যাল পদার্থবিদ্যা অনুযায়ী, বল প্রেরিত হয় বলের ক্ষেত্র বা তার প্রভাবের জন্য। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুযায়ী, দুটি কণার মধ্যে কর্মরত বলের পিছনে আছে বোসন কণার চালাচালি। আলোর কণা ধর্মের পিছনেও আছে সেই একই বোসন কণা।

‘চুসিং আওয়ার ইউনিভার্স’ পরিচ্ছেদ পড়লে জানা যায় ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কর্মকাণ্ড। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হল মহা বিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং দিয়ে। কেমন ছিল সেই বিস্ফোরণ, যার তত্ত্ব স্বয়ং আইনস্টাইনও মেনে নিতে পারেননি? বিস্ফোরণে মহাজাগতিক বস্তু চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। একে বলা হয় ‘কসমিক ইনফ্লেশন’ বা মহাজাগতিক স্ফীতি। হকিং এর তুলনা অনুযায়ী  অনেকটা যেন এক সেন্টিমিটার ব্যাসের একটা ছোট্ট চাকতি ছায়াপথের ব্যাসের এক কোটি গুণ বড় ব্যাসে প্রসারিত পড়ল অতি ক্ষুদ্র সময়ে। ক্ষুদ্র সময় বললেও ধারনায় আসে না, ঠিক কতটা ক্ষুদ্র সময়! একটু খুলে বললে, ব্রহ্মাণ্ড ১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ গুণ প্রসারিত হল মাত্র ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০১ সেকেন্ডে।

এত কম সময়ে ব্রহ্মাণ্ড প্রসারিত হলে নিশ্চয় তা আলোর গতিবেগের অনেক বেশি বেগে ঘটেছিল। যদি এই পরিসংখ্যান সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ব্যর্থ হয়ে যায়। এখানেই হকিং বলছেন, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সমীকরণ ব্যবহার করে ব্রহ্মাণ্ডের বর্তমান অবস্থার অনেক চিত্রই ব্যাখ্যা করা গেলেও ব্রহ্মাণ্ডের আদিতে সেই সূত্র খাটে না। আপেক্ষিকতার সূত্রকে মিলিয়ে দিতে হবে কোয়ান্টাম থিওরির সঙ্গে। তবেই ব্যাখ্যা করা যাবে বিগ ব্যাং তত্ত্বের ও মহাজাগতিক স্ফীতির।

‘দ্য এপারেন্ট মিরাক্‌ল’ অধ্যায়ে হকিং বললেন, “এই যে আমাদের বসবাসের উপযুক্ত গ্রহটি বানাতে কোনও ভগবানের হাত আছে বলে নিউটন মত প্রকাশ করেছিলেন, আধুনিক যুগে এখন আর কেউ সে-কথা বিশ্বাস করে না। কারণ অন্য নক্ষত্রকে ঘিরে পাক খাওয়া গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোটি কোটি সূর্যের মতো নক্ষত্র ঘিরে পাক খাওয়া গ্রহে জীবনের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি মানে এই নয় যে ভবিষ্যতেও তা পাওয়া যাবে না।”

পৃথিবী নামের যে একটি সুন্দর গ্রহে আমরা  বাস করি, সূর্য থেকে সঠিক দুরত্বে থাকার দরুন শুধু এখানেই সৃষ্টি হল প্রাণ, মানব সভ্যতার ইতিহাস গড়ে উঠল। লক্ষ কোটি বছর ধরে সৌরমণ্ডলের গ্রহ উপগ্রহের পাক খাওয়া, পৃথিবীতে চলমান জীবন, আকাশের তারা দেখে মনে হয়, কে যেন আপন খেয়ালে একদিন তৈরি করেছিল এক গ্র্যান্ড ডিজাইন। সে কী দেবতা? হকিং যেন নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন, দেবতা যদি সব গড়েই থাকবে, তাকে থামিয়ে দেওয়া বা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা দেবতা কেন, শয়তানেরও নেই। তাই মিরাক্‌ল হতে পারে না। প্রাকৃতিক নিয়ম একই থাকে, ব্রহ্মাণ্ডের স্থান বিশেষে তা অপরিবর্তনীয়। পরিবর্তন সম্ভব হলে, নিয়ম আর নিয়ম থাকে না। তাহলে কেন বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করে আবার তাকে বদলেও দিচ্ছেন? পর্যবেক্ষণ বদলে দিচ্ছে সিদ্ধান্ত। খালি চোখে যা দেখা যাচ্ছে না, তাই ধরা পড়ছে আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে। বদলাতে হচ্ছে প্রচলিত ধারনা আর পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বলের সমীকরণ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বিজ্ঞানীরা তাই ‘ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি’ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন সব ধরণের বলের নিয়মের সূত্র একীকরণের জন্য। স্ট্রং নিউক্লিয়ার, উইক নিউক্লিয়ার ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বলকে একত্র করা হল। তারপর এল ‘এম থিওরি’, যাতে যুক্ত হল অভিকর্ষজ বল। এম থিওরি এখনো পূর্ণ বিকশিত নয়। হকিং বললেন, যদি এম থিওরি কে এমন ভাবে বিকশিত করা যায়, যার ফলে শুধু এই ব্রহ্মাণ্ড নয়, অন্যান্য ব্রহ্মাণ্ডকেও বলের সমীকরণ গুলো ব্যখ্যা করতে পারে, তবেই বলা যাবে এম থিওরি একটি সফল থিওরি।

দ্য থিওরি অফ এভ্রিথিং – দ্য ওরিজিন এন্ড ফেট অফ দ্য ইউনিভার্স

এই বইটি আসলে স্টিফেন হকিং এর সাতটি প্রসিদ্ধ বক্তৃতা গেঁথে তৈরি। ২০০২ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশক তার ভূমিকায় লেখেন, “এই বইটি পৃথিবীর একজন অন্যতম বুদ্ধিমান বিজ্ঞানীর বিজ্ঞানকে জনমুখী করে তোলার প্রয়াসের প্রতিফলন। তিনি বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান শুধুমাত্র কতিপয় বিজ্ঞানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, সাধারণের কাছে তাত্ত্বিক বিজ্ঞানকে সহজবোদ্ধ করে তোলাও একটি অবশ্য কর্তব্য। এটি এমন বই, যা ঊর্ধ্বাকাশে তাকিয়ে বিস্ময়ে বেবাক হওয়া মানুষকে সত্যের সন্ধান দেবে।”

বিগ ব্যাং থেকে ব্ল্যাক হোল পর্যন্ত ব্রহ্মাণ্ডের বিবর্তনের হদিশ পাওয়া যাবে এই বইটিতে। হকিং এর ভাষায় প্রথম বক্তৃতাটি “ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাসের ইতিহাস।” দ্বিতীয় প্রবন্ধে জানিয়েছেন নিউটন ও আইনস্টাইনের গবেষণা কিভাবে গতিশীল বিশ্বের নতুন দিক উদ্ভাসিত করেছে। তৃতীয় বক্তৃতায় জানা যায় ব্ল্যাক হোলের জন্ম বৃত্তান্ত। চতুর্থ বক্তৃতা হদিশ দেয় ব্ল্যাক হোল থেকে নিষ্ক্রমণের রাস্তা। কোয়ান্টাম থিওরি বলছে, ব্ল্যাক হোল থেকেও রেডিয়েশন সম্ভব। পঞ্চম প্রবন্ধে বিগ ব্যাং তত্ত্বের কোয়ান্টাম মেকানিকাল বিশ্লেষণ। জানা যাবে, কেন স্থান-কাল সীমিত, অথচ তার কোনও কিনারা নেই, যেমন পৃথিবী গোলাকার, তাই তার নেই কোনও ধার  বা কিনারা। ষষ্ঠ বক্তৃতায় হকিং জানিয়েছেন, ব্রহ্মাণ্ডের সীমা নিয়ে নতুন ধারণা কেমন করে বিশ্লেষণ করছে অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের তফাত, যদিও পদার্থবিদ্যার নীতি সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তিত। সপ্তম এবং শেষ বক্তৃতায় তিনি শুনিয়েছেন একীভূত তত্ত্ব বা ‘ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি’র আশার বানী, যা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, মাধ্যাকর্ষণ ও অন্যান্য বলকে একত্রিত করে কেবলমাত্র একটি তত্ত্বের সৃষ্টি করতে পারে।

পৃথিবী যে আসলে একটা গোলাকৃতি বল, যার কোনও ধার বা কিনারা নেই, এরিস্টটলের এই ধারণা থেকে ব্রহ্মাণ্ডের স্বরুপ নিয়ে সত্যানুসন্ধানের সুত্রপাত। তারপর একের পর এক বিজ্ঞানীদের গবেষণা লব্ধ তথ্য প্রাক্তন ধারনাকে নস্যাৎ করে কীভাবে নবীন ধারনার জন্ম নিয়েছে, সে নিয়ে আলোচনা করেছেন হকিং। দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের দ্বন্ধের মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞান সত্যের দিকে কীভাবে এগিয়ে চলেছে, তার মনোজ্ঞ আলোচনা অত্যন্ত উপভোগ্য হয়ে উঠেছে তার বক্তৃতা সমূহে। নক্ষত্রের জন্মের দলিল পেশ করেছেন তিনি। গ্যাস থেকে সৃষ্ট নক্ষত্রের জীবন ও মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। ১৯২৮ সালে ভারতীয় বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমণের যুগান্তকারী আবিষ্কার – ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ উল্লেখিত হয়েছে তাঁর বক্তৃতায়। চন্দ্রশেখরের আবিষ্কার জানায়, সূর্যের চাইতে প্রায় ১.৪ গুন বেশি ভরের নক্ষত্রের অন্তিমকালে ঘটবে সুপারনোভা বিস্ফোরণ, সৃষ্টি হবে ব্ল্যাক হোল। এর চাইতে কম ভরের নক্ষত্র হয়ে যাবে শ্বেত বামন বা ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’।

সত্তরের দশকে হকিং শুধু ব্ল্যাক হোল নিয়েই কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন। ১৯৮১ সালে জেনেভায় মহাকাশ তত্ত্বের উপর একটি অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জেনেভা অধিবেশনের শেষে পোপ স্বয়ং যোগদানকারীদের বক্তব্য শুনতে রাজি হন। কিন্তু তিনি বলেন, বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে তার কোনও সংশয় নেই, তবে বিগ ব্যাং এর পরবর্তী ঘটনা নিয়ে যত খুশি গবেষণা চলুক, বিগ ব্যাং এর ভিতরে পৌঁছতে যাওয়ার চেষ্টা করা একেবারেই অনুচিত, কারণ তাহলে সরাসরি ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ করা হবে, যা বাইবেল অনুযায়ী এক মহাপাপ। পোপের এই বক্তব্য হকিংকে নিরস্ত করতে পারেনি তার বিজ্ঞান অনুসন্ধানে। বরং, অবশিষ্ট জীবন বিগ ব্যাং ও সিঙ্গুলারিটির উপর চমৎকার সব কাজ করে গিয়েছেন তিনি।

পঞ্চম বক্তৃতা – ‘দ্য অরিজিন এন্ড ফেট অফ দ্য ইউনিভার্স’ এ হকিং কতগুলি প্রশ্ন রেখেছেন, যার সঠিক উত্তর এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা দিতে পারেননি। এক, ব্রহ্মাণ্ড আদিতে সূর্যের তাপমাত্রার চাইতে লক্ষ কোটি গুন বেশি তাপমাত্রা ছিল কীভাবে? দুই, ব্রহ্মাণ্ড এত সমতা সম্পন্ন কেন? তিন, ব্রহ্মাণ্ড যে হারে সম্প্রসারিত হয়েছিল (যাকে ক্রিটিকাল রেট বলা হয়ে থাকে), তার চাইতে বেশি বা কম কেন হল না। যদি সম্প্রসারণের হার বেশি হত তাহলে আজ চারিদিকে থাকত মহাশূন্য। আর যদি এর চাইতে কম হারে সম্প্রসারিত হত, তবে আবার সমস্ত গ্যাস থেকে উদ্ভূত পদার্থ আকর্ষণ বলের প্রভাবে ভেঙে পড়ত। মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র তাপমাত্রা সমান। এই সমতা কীভাবে সম্ভব হল। প্রশ্নগুলি নিজেকেই হয়তো করেছেন হকিং, ব্রহ্মাণ্ডের আদি রহস্য অনুসন্ধানে।

ষষ্ঠ বক্তৃতায় আছে- ‘দ্য ডিরেকশন অফ টাইম’, যেখানে হকিং সময়ের তিনটি অক্ষের উল্লেখ করেছেন। প্রথম অক্ষের নাম দিয়েছেন – সময়ের তীর (arrow of time), যেখানে তিনি একটি কাপ ভাঙার ঘটনাকে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করেছেন। ধরা যাক, একটি কাপ টেবিল থেকে ছিটকে পড়ে ভেঙে গেল। ভাঙা কাপকে কোনও প্রযুক্তির সাহায্যেই আর পুরনো অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না, কারণ এনট্রপি যে কোনও কাজেই বেড়ে যায়। অর্থাৎ আমরা অর্ডার থেকে ডিসঅর্ডারে যেতে পারব, কিন্তু উল্টোটা হবার জো নেই। তাপ গতিবিদ্যার সূত্র উল্লঙ্ঘিত হয়ে যাবে। সময়ের সঙ্গে এনট্রপির এই বেড়ে যাওয়াকে হকিং নাম দিলেন সময়ের তীর। দ্বিতীয় অক্ষ হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক তীর  ( physiological arrow) , যেখানে আমরা অতীতের ঘটনা পরম্পরা স্মৃতিতে গেঁথে রাখতে পারি, ভবিষ্যতের নয়। এই দুটি তীরের অভিমুখ এক। তৃতীয় অক্ষ  হল মহাকাশতত্ত্বীয় তীর, তার অভিমুখ যেদিকে ব্রহ্মাণ্ড প্রসারিত হচ্ছে সেদিকে।

ক্লাসিক্যাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী সৃষ্টির আদিতে স্থান-কালের বক্রতা ছিল অসীম। তাই প্রকৃতির কোনও নিয়মই খাটে না তাকে ব্যখ্যা করতে। হকিং বললেন, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়ম মেনে স্থান-কালের অবস্থান সৃষ্টির আদিতে ছিল মসৃণ ও সুসম। পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য ছিল স্থান-কালের। বিগ ব্যাং এর পর থেকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য ভঙ্গ হল, শুরু হল অর্ডার থেকে ডিসঅর্ডারের দিকে যাত্রা। কোথাও কোথাও বস্তু দলা পাকিয়ে তৈরি হল নক্ষত্র ও গ্রহ উপগ্রহ। প্রসারিত হতে থাকল বিশ্ব, সময়ের অভিমুখে। কিন্তু একসময় সম্প্রসারিত হতে হতে, ব্রহ্মাণ্ড সংকুচিত হলে সময়ের অভিমুখ কী বদলে যাবে? ডিসঅর্ডার থেকে যাত্রা শুরু হবে অর্ডারের? সেক্ষেত্রে সময়ের তীর দিক বদল করে উল্টো পথে হাঁটবে।

হকিং ঠিক এমনটাই ভেবে ছিলেন।  তিনি ভেবেছিলেন ব্রহ্মাণ্ডের সংকোচনের সময়, ডিসঅর্ডার থেকে অর্ডারের দিকে যাত্রা শুরু হবে, সময় তার দিক বদল করবে। কিন্তু তিনি নিজেই জানিয়েছেন, তার এক সহকর্মী ডন পেগ ও তাঁর এক ছাত্র রেমণ্ড লাফ্লামের কাজ পরবর্তী সময়ে জানায়, ডিসঅর্ডার বাড়তে থেকবে সংকোচনের সময়। তাই সময়ের অভিমুখও বদলাবে না। পরিহাস প্রিয় হকিং তাঁর নিজের ভুলকে মেনে নিয়ে বলেছেন, অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতো নিজের ভুল চাপা দেওয়ার জন্য তিনি অন্য ব্যাখ্যা দেওয়ার পক্ষপাতী নন, কারণ সেক্ষেত্রে তাঁর জনপ্রিয়তা হারানোর সম্ভাবনা আছে।

সপ্তম ও এই বইয়ের শেষ বক্তৃতায় হকিং ব্রহ্মাণ্ডের রহস্যের ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ব্যবহার করে থিওরি অফ এভ্রিথিং, বা উইনিফায়েড ফিল্ড থিওরির উপযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, “যদিও আইনস্টাইন কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তবুও আন্সার্টেইনিটি প্রিন্সিপ্‌লে অবিশ্বাস করে এক মারাত্মক ভুল করে বসেছেন। হাইসেনবার্গ প্রবর্তিত এই তত্ত্বেই রয়েছে ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চাবিকাঠি।”

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

Advertisements

One Response to স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র: স্টিফেন হকিং এর লেখালেখি – অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়- শরৎ ২০১৮

  1. Rumela Das says:

    সত্যিই খুব ভালো লাগলো পড়তে। অনেক কিছু জানতে পারলাম।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s