স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র – সম্পাদকের ডেস্ক থেকে- শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

সম্পাদকের কথা 

মহাকাশ বিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অধ্যাপক স্টিফেন হকিং এই শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তি। একজন বিজ্ঞানী হিসেবেই শুধু নয়, ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে উৎসাহী এক সুলেখক হিসাবেও তিনি বিশ্বের সর্বত্র অতি পরিচিত একজন মানুষ। শারীরিক অসমর্থতায় হুইল চেয়ার আসীন হয়েও কখনো তিনি স্বয়ং উপস্থিত জনপ্রিয় টিভি শো তে; আবার কখনো বা কার্টুন চরিত্র হয়ে উঠেছেন। ‘রক স্টার’ তুলনীয় খ্যাতি পেয়ে, জনপ্রিয় থেকে জনপ্রিয়তর হয়ে উঠেছেন বিশ্বের প্রতিটি কোণায়।

কলেজ জীবনের হকিংএর সহপাঠীরা তাঁকে ‘দ্বিতীয় আইনস্টাইন’ উপাধি দিয়েছিল। কিন্তু স্টিফেন হকিংকে শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিদীপ্ত বিজ্ঞানী বলা যতটা যুক্তিপূর্ণ, ‘দ্বিতীয় আইনস্টাইন’ বলে তাঁকে অভিহিত করা ঠিক ততটাই অযৌক্তিক। বিজ্ঞানের দুনিয়ায় প্রবাদপ্রতিম দুই মানুষ- আইনস্টাইন ও হকিং, প্রকৃতপক্ষে অতুলনীয়। হকিং-এর জীবনীকারেরা তাঁকে একজন ‘সুপার স্টার’ বিজ্ঞানী বলে ব্যখ্যা করেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান প্রফেসরের চেয়ার অলংকৃত করেন হকিং, যে চেয়ারে একদা আসীন ছিলেন নিউটন এবং পল ডিরাক। দুবার তাঁকে নাইট উপাধি দেওয়া হয়। জনপ্রিয়তা তাঁকে টেলিভিশনের পর্দা পর্যন্ত টেনে এনেছে। তাঁর বক্তৃতা শুনতে মানুষের ঢল নেমেছে প্রেক্ষাগৃহে।

গবেষণার কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নেওয়া, বক্তৃতা দেওয়া, বই লেখা এবং একজায়গা থেকে আর এক জায়গায় ভ্রমণ একজন সুস্থ শরীরের মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক হলেও, শারীরিক দিক থেকে প্রতিবন্ধক একজন মানুষের পক্ষে কী করে সম্ভব হয়েছিল, সে কথার জবাব দিয়েছেন তাঁর মেয়ে লিসা হকিং। লিসার কথা অনুযায়ী, হকিং বলতেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও একজন মানুষের মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার কখনোই হওয়া উচিত নয়।” মানসিক শক্তিই স্টিফেন হকিংকে করে তুলেছিল এক কর্মযোগী বিজ্ঞানী, সুরসিক ও সুন্দর মনের মানুষ।   

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হকিং অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। প্রথমত তাঁর চিকিৎসার টাকার অঙ্ক আকাশ ছোঁয়, দ্বিতীয়ত তাঁর সন্তানদের পড়াশুনোর খরচ মেটানোর দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মাথায়। স্থির করেন, বই লিখে টাকা রোজগার করতে হবে। বইটাকে হতে হবে জনপ্রিয়, যা বিজ্ঞান বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে কাজে লাগবে। লেখা শুরু হল –‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’। বইটি কেমব্রিজ উইনিভার্সিটি প্রেস থেকে ছাপা হবে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে হকিং জবাব দেন, তিনি বইটি বিক্রি করে কিছু টাকা রোজগার করতে চান, তাই এর বাজার বুঝে ছাপতে হবে। তাঁর মত অনুযায়ী বইটি ছাপার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। লন্ডনের ব্যান্টাম প্রেস সর্বোচ্চ প্রস্তাব দিয়ে বইটি ছাপানোর টেন্ডার পেয়ে যায়। মহাকাশ তত্ত্ব নিয়ে লেখা বইটির বাজার দর বুঝে হকিংকে ব্যান্টাম প্রেস আড়াই লক্ষ ডলার অগ্রিম ও সঙ্গে রয়্যালটির আকর্ষণীয় প্রস্তাব দেয়। বইটি প্রকাশিত হলে হকিংএর জনপ্রিয়তাও আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। বিজ্ঞান বিষয়ে এর চাইতে বেশি বিক্রি আর কোনও বইয়ের হয়নি।

হকিং এর নিকটতম ছিল তাঁর হুইল চেয়ার। এই চেয়ারটি সাধারণ চেয়ারের থেকে আলাদা ছিল। মাত্র একুশ বছর বয়সে হকিং এর শরীর পঙ্গুদশা প্রাপ্ত হলেও তাঁর আঙুলের পেশী কম্পিউটার মাউসের বোতাম টিপতে সক্ষম –এইটুকু জানতে পেরে ডাক্তার ও কলাকুশলীরা তাঁর জন্য বিশেষ হুইলচেয়ার বানানোর কাজে হাত দেন। কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে শব্দ চয়ন করে স্ক্রিনে বাক্য রচনা করবার জন্য যে সফটওয়ার ব্যবাহার করা হয়, তার নাম ছিল – ইকুয়ালাইজার। হুইলচেয়ারের হাতলের সঙ্গে ট্যাবলেট কম্পিউটার লাগিয়ে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে তাঁর হাত অসাড় হয়ে পড়ায় তাঁর চশমার ফ্রেমে একটি সুইচ বসিয়ে দেওয়া হয়, যার কাজ ছিল হকিং এর মুখের পেশীর কুঞ্চন-প্রসারণ অনুযায়ী শব্দ চয়ন করা। শব্দ থেকে বাক্য তৈরি করার পর স্পিচ সিন্থেসাইজার (স্পিচ+) ব্যবহার করে স্পিকারের মাধ্যমে তিনি কথা বলতেন। মেইল করা, লেকচার নোট্‌স বানানো এবং বক্তৃতা দেওয়া, সবই তিনি করতেন হুইলচেয়ারে বসে কম্পিউটারের সাহায্যে। স্বাভাবিক বাকশক্তিরহিত একজন মানুষ কতখানি মনোবলের অধিকারী হলে এমন কৃত্রিম উপায়ে বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ রেখে চলতেন, ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। এমত অবস্থাতেও তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে পরিহাস করার ক্ষমতাও রাখতেন। নিজের উপর রসিকতা করে বলতেন, লুকাসিয়ান চেয়ারে যেসব বিজ্ঞানী তাঁর আগে বসেছেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য হচ্ছে, তাঁর চেয়ারটিই কেবলমাত্র বিদ্যুৎ চালিত।

ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে অধ্যাপক স্টিফেন হকিং এর মূল্যবান কাজ এবং তাঁর বহুমুখী প্রতিভাকে তুলে ধরাই এই ক্রোড়পত্রের উদ্দেশ্য। অধ্যাপক স্টিফেন হকিং শুধু একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না – তিনি ছিলেন এক দার্শনিক, লেখক এবং অভিনেতা – এক সম্পূর্ণ মানুষ।

জয়ঢাকের সম্পাদক, শ্রী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের উদ্যোগে এই অসাধারণ মানুষটির কর্ম চিত্রায়নের দায়িত্ব লাভ করে, স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্রের সম্পাদক হিসাবে, আমি জয়ঢাকের কাছে ঋণী ও ব্যক্তিগতভাবে গর্বিত। ব্যক্তি জীবনের অন্দরমহলে উঁকি দেওয়া বর্জন করে, যথাসম্ভব তাঁর কর্মজীবনের দিকটি উদ্ভাসিত করে তোলার প্রচেষ্টা করাই এই ক্রোড়পত্রের উদ্দেশ্য। তথ্যের সমস্তরকম ত্রুটির দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে এই ক্রোড়পত্রের সম্পাদকের, জয়ঢাকের নয়।

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s