স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র – চলে গেলেন স্টিফেন হকিং – কালীপদ চক্রবর্তী- শরৎ ২০১৮

ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

স্টিফেন হকিং ১৪ই মার্চ, ২০১৮ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। সারা বিশ্ব তাঁর এই চলে যাওয়াতে শোকাহত। স্টিফেন হকিং অঙ্ক কষে শিখিয়ে গেলেন কৃষ্ণগহ্বর থেকেও তেজস্ক্রিয় রশ্মির বিকিরণ হয়। আর তার জীবন থেকে আরও শিখলাম জটিল স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরেও মস্তিষ্ক আটকে থাকে না হুইলচেয়ারে। বরং জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া যায় পৃথিবী ছাড়িয়ে ব্রহ্মাণ্ডে।

মার্কিন লেখক জন আপডাইক একবার বলেছিলেন, লেখকের জীবনে একটা কোনও জখম লাগে। রোগ-শোক, বিচ্ছেদ, দুর্ঘটনা, নিদেনপক্ষে একটা কোনও বিরক্তিকর ফোড়া – কিছু একটা। এই আশীর্বাদটা ঈশ্বর স্টিফেন হকিং-কে একটু বেশিই দিয়ে ফেলেছেন। অতি তরুণ বয়সে চিকিৎসকেরা যখন তাঁকে তার রোগের কথা বলেছিলেন, তখন মনে হয়েছিল তাঁর জীবনের সব দরজাগুলো হয়ত বন্ধ হয়ে গেল।

অক্সফোর্ডে পড়ার শেষের দিনগুলোতে নিজের শারীরিক জটিলতার প্রাথমিক আভাস তিনি পেয়েছিলেন। এ-সময় হঠাৎ  একদিন তিনি পড়ে যান এবং কথাবার্তাও জড়িয়ে যেতে থাকে। এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যে বড়দিনের ছুটিতে বাড়ি ফেরেন স্টিফেন। এরপর চিকিৎসকদের থেকে জানা যায় মোটর নিউরন ডিজিজের একটি জটিল ধরন অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস (এ এল এস)- আক্রান্ত হয়েছেন স্টিফেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর। তিনি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন কোনও কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকেই এই অসুখটির নাম শোননি তাই একটু বুঝিয়ে বলতে চাই। এ এল এস হল স্নায়ুর অসুখ। বড় জটিল রোগ। এই রোগে রোগী সম্পূর্ণভাবে চলচ্ছক্তিহীন  হয়ে পড়েন। আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঞ্চালনের জন্য যে স্নায়ুগুলি নির্দেশ দেয়, তাকে মোটর নার্ভ বলে। এই নার্ভগুলোই আমাদের মাথার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। এই স্নায়ুর ক্ষয় হতে থাকলে মস্তিষ্ক থেকে পেশি পর্যন্ত নির্দেশ পৌঁছায় না। তখন হাত, পা সহ অন্যান্য অঙ্গের কাজকর্ম চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। অবশ্য এই অল্প কথায় এই অসুখটিকে ভাল করে বোঝানো সম্ভব নয়। এত কষ্ট এবং অসুবিধে সত্ত্বেও তিনি কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে হাসিল করেছেন প্রায় সবকিছুই। বিকিরণ আপেক্ষিকতার সিঙ্গুলরিটি তত্ত্ব, বিগ ব্যাং তত্ত্বের শেষতম রূপটির আবিষ্কারক তিনি। লিখেছেন বেস্ট সেলিং বই ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ সহ আরও কয়েকটি বই। পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্ত থেকেই পেয়েছেন মান-সম্মান। আর এগুলো করেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে।

স্টিফেনের জীবনে এমন একটা সময় এসেছিল যখন তাঁর কথা পরিবারের লোকজন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ছাড়া কেউই বুঝতে পারতেন না। ১৯৬০ সালের শেষের দিকে প্যারালিসিসের জন্য হুইল চেয়ারের আশ্রয় নিতে হয়।  এরপর জেনেভায় ১৯৮৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। এই জীবন-মরণ যুদ্ধে চিকিৎসকদের তৎপরতায় শেষপর্যন্ত তিনি জীবন ফিরে পান ঠিকই তবে কথা বলার শক্তি একেবারেই হারিয়ে ফেলেন। তখন থেকেই কথা বলার জন্য তাঁকে কম্পিউটারের সাহায্য নিতে হয়েছে।

তত্ত্বীয় কসমোলজি আর কোয়ান্টাম মহাকর্ষ হকিং-এর প্রধান গবেষণা ক্ষেত্র ছিল। ১৯৬০ এর দশকে কেমব্রিজের বন্ধু ও সহকর্মী রজার পেনরোজের সঙ্গে মিলে হকিং আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে একটি নতুন মডেল তৈরি করেন। সেই মডেলের ওপর ভিত্তি করে ১৯৭০ এর দশকে হকিং প্রথম তাদের (পেনরোজ-হকিং তত্ত্ব নামে পরিচিত) তত্ত্বের প্রথমটি প্রমাণ করেন। এই তত্ত্বগুলো প্রথমবারের মত কোয়ান্টাম মহাকর্ষে এককত্বের পর্যাপ্ত শর্তসমূহ পূরণ করে। আগে আমরা ভাবতাম এককত্ব শুধুমাত্র একটা গাণিতিক বিষয়। এই তত্ত্বের পর প্রথম বোঝা যায়, এককত্বের বীজ লুকোনো ছিল আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে। ২০০৭ সালের ১৯শে ডিসেম্বর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বীয় কসমোলজি কেন্দ্রে হকিং-এর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়। প্রয়াত শিল্পী আয়ান ওয়াল্টার এটি তৈরি করেন। আফ্রিকার কেপ টাউনে আফ্রিকান ইন্সটিটিউট অফ ম্যাথম্যাটিক্যাল সায়েন্সের সামনেও হকিং-এর একটি আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করা হয়। তিনি জীবনে বহু পুরষ্কার পেয়েছেন। তার মধ্যে প্রিন্স অব অস্ট্রিয়ান্স পুরস্কার, জুলিয়াস এডগার লিলিয়েনফেল্ড পুরস্কার, উলফ পুরস্কার, কোপলি পদক, এডিংটন পদক, হিউ পদক, আলবার্ট আইনস্টাইন পদকসহ এক ডজনেরও বেশি ডিগ্রি লাভ করেন।

হকিং-এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং বোর-হাইজেনবার্গের কোয়ান্টাম তত্ত্বকে মিলিয়ে দেওয়া। আপেক্ষিকতার তত্ত্ব কাজ করে মহাজগতের  অতিকায়  বস্তু  নিয়ে  আর  কোয়াটাম  তত্ত্বেরবাহাদুরি হল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতে।

হকিং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান অধ্যাপক (স্যার আইজ্যাক নিউটনও একসময় এই পদে ছিলেন) হিসেবে পয়লা অক্টোবর, ২০০৯ তারিখে অবসর নেন। এছাড়াও তিনি কেমব্রিজের গনভিলি এবং কেয়াস কলেজের ফেলো হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। 

অনেকেরই মনে হতে পারে তিনি কী এমন করেছেন যাতে সমগ্র বিশ্ব তাঁকে নিয়ে আলোচনারত। বিষয়টা বোঝানোর জন্য একটু সোজা করে বলার চেষ্টা করছি।

গ্র্যাভিটি মানে হল মহাকর্ষ। যা দিয়ে মহাবিশ্বের সব জিনিস একে অপরকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তোমরা হয়ত বলবে এটা কি চুম্বক যেমন লোহাকে টানে সেরকম কিছু। না, তা নয়। চুম্বক ও লোহার এই টানের মধ্যে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স কাজ করে। আসলে গ্র্যাভিটি হল নিজেই ফোর্স। পৃথিবী আর সূর্য যেমন নেগেটিভ পোল আর পজিটিভ পোল-এর মতন একে অপরকে আকর্ষণ করে সেরকম।

আগে অনেকেই ভাবতেন এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও কণা বা পার্টিকেল আছে যা এই শক্তির জন্ম দেয়। কাল্পনিক এই কণার নাম দেয়া হয়  গ্র্যাভিটন। নিউটন গ্র্যাভিটি আবিষ্কার করলেন, কিন্তু অনেক মাথা খাটিয়েও তিনি বা অন্যকোনও বিজ্ঞানী কোনও পার্টিকেল আবিষ্কার করতে পারলেন না। এর পরেও কিন্তু গ্র্যাভিটন বলে কিছুই খুঁজে পাওয়া গেল না।

তাহলে গ্র্যাভিটি মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে কাজ করে কীভাবে?

আইনস্টাইন আবিষ্কার করলেন কী করে গ্র্যাভিটি কাজ করে। তিনি বললেন, যে কোনও জিনিস তার ভরের জন্য তার চারপাশের জিনিসকে অর্থাৎ স্পেসকে একটু দুমড়ে দেয়। মানে নিজের দিকে টেনে নেয়। সেটাই গ্র্যাভিটি। সোজা একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাচ্ছি। ধরো তোমরা চারবন্ধু একটা চাদরকে চারিদিক থেকে বেশ টেনে ধরে আছ। তাহলে চাদরটা নিশ্চয়ই টান টান বেশ সোঝা হয়ে থাকবে তাই না? এবার যদি ভারি কোনও জিনিস বা এক কিলো ওজনের একটা বাটখারা চাদরটার মাঝখানে রাখা হয় তাহলে চাদরটা একটু নিচে নেমে যাবে তা তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। অর্থাৎ ওটা আর হরাইজেন্টাল থাকবে না। মাঝখানটা নেমে যাবে। এবার যদি একটা কাচের গুলি ওই বাটখারার কাছে ছেড়ে দিলে দেখবে গুলিটা ওই বাটখারার দিকে গড়িয়ে যাবে। কোনও জিনিস তার উপস্থিতির জন্য বা ভরের জন্য তার চারপাশের স্পেসটাকে একটু মচকে দিচ্ছে, এটাই হল গ্র্যাভিটি। চাদরটা হল স্পেস। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ এ তো খুব সহজ ব্যাপার! এতে আবার আবিষ্কার করার কী আছে! আসলে এই সোজা ব্যাপারটাই ওঁর আগে কারও মাথায় আসেনি। উনি আরও বললেন, গ্র্যাভিটি এমনই জিনিস যে সে আলোকেও বেঁকিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ আলো সোজা না গিয়ে হেলে যাবে।

তোমরা তো ফিজিক্সে আলোর প্রতিসরণের কথা পড়েছ। এটা কিন্তু তা নয়। সেটা তো আলো যখন একটা মিডিয়া মনে মাধ্যম থেকে আরেকটা মাধ্যম দিয়ে যায়, তখন প্রতিসরণ হয়। আমরা বলছি মাধ্যমবিহীন ভ্যাকুয়াম দিয়ে যাওয়ার কথা। ধরো একটা বিন্দু থেকে আলো এক লক্ষ কিলোমিটার দূর দিয়ে যাচ্ছে। এবার তুমি বেশ ভারী একটা তারাকে ওই বিন্দুতে বসিয়ে দিলে। তখন লক্ষ করবে আলো তখন আর তার এক লক্ষ কিলোমিটার দূর দিয়ে যাবে না। একটু এগিয়ে আসবে। অর্থাৎ, হয়ত আশি হাজার কিলোমিটার দূর দিয়ে যাবে।

এমনকি গ্র্যাভিটি খুব জোরালো হলে তা আলোকে নিজের দিকে টেনে এনে একেবারে বন্দীও করে রেখে দিতে পারে। তোমরা ভাববে এ-রকম জোরালো গ্র্যাভিটি আবার হয় নাকি! উত্তরে বলব – নিশ্চয়ই হয়। খুব ভারী নক্ষত্র যখন মরে যায় তখন এ-রকম হয়। কারণ মরা তারায় আর কোনও এনার্জি থাকে না। সে কুঁকড়ে ছোট হয়ে যায়। অথচ তার ওজন তো খুব বেশি তাই তখন তাদের গ্র্যাভিটি অকল্পনীয়ভাবে বেশি হয়ে যায়। তখন তার দিকে কোনও আলো গেলে আর বেরোতে পারে না। তাই তাদের নাম দেওয়া হয় কৃষ্ণ গহ্বর বা কৃষ্ণবিবর। ইংরেজিতে তাকেই ব্ল্যাক হোল বলে।

তোমরা নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবে এদের দেখা যায় কি না? কী করে দেখা যাবে? তোমরা যে একে অন্যকে দেখতে পাচ্ছ তার কারণ হল অন্যের গায়ে আলো ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসে তোমার চোখে পড়ছে। কৃষ্ণগহ্বরের গ্র্যাভিটি এতই বেশি যে সেখান থেকে আলো বেরোতেই পারে না। তাই আমরা তাকে দেখতে পাই না। আসলে কৃষ্ণগহ্বর থেকে কিছুই বেরোতে পারে না। বরং তাদের গ্র্যাভিটি এতোই বেশি যে কাছাকাছি সবকিছুকেই তারা গ্রাস করে নেয়। অনেকটা সর্বগ্রাসী দানবের মত। কিন্তু স্টিফেন হকিং প্রমাণ করলেন যে এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। উনি অঙ্ক কষে দেখালেন, কৃষ্ণগহ্বর থেকেও  দুর্বল রেডিয়েশান বা বিকিরণ বেরোয়। তারই নাম হকিং রেডিয়েশন। তবে হকিং–এর এই রেডিয়েশন এতই দুর্বল যে এখনকার কোন যন্ত্রেই তা ধরা যায়নি। আর সে কারণেই হকিং সাহেবকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়নি। হয়ত একদিন এই রেডিয়েশন ধরা পড়বে কিন্তু হকিং-সাহেব আর নোবেল পাবেন না। কারণ নোবেল প্রাইজ মরণোত্তর দেওয়া যায় না।

জীবদ্দশায় তাঁর মত খ্যাতি খুব কম বিজ্ঞানীই পেয়েছেন। তাঁর লেখা বই, ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম হল সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই-এর মধ্যে একটি ।   

বই-এর কথাই যখন উঠল তখন তোমাদের জানিয়ে রাখি হকিং-এর প্রথম লেখক হওয়ার ইচ্ছে হয় ৪০ বছর বয়সে। ১৯৮২ সালে। বিজ্ঞানের ভারী বইপত্রের লেখক নয়, জনপ্রিয় বইয়ের লেখক। এমন বই, যেটা রাস্তাঘাটে লোকেরা পড়বে। যে বই রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরের বইয়ের দোকানে ঝোলানো থাকবে। তোমরা হয়ত ভাবতে পারো ওই সময় তাঁর এরকম অদ্ভুত ইচ্ছে কেন জেগেছিল! ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পরে হকিং বলেছিলেন, মেয়ের স্কুলে পড়ার টিউশন ফি জোগাড়ের তাড়নায়। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ ছিল না। হকিং বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। লেখক সত্তার বীজ লুকিয়ে থাকে যে বাসনার মধ্যে, সেই বাসনা তাঁকে পেয়ে বসেছিল।

স্টিফেন হকিং-এর লেখা ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’ এবং মেয়ে লুসি হকিং-এর সঙ্গে লেখা তাঁর শিশুদের জন্য অ্যাডভেঞ্চার জর্জ’স কসমিক সিরিজের ট্রেজার হান্ট, বা আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম-এর প্রথম অনুচ্ছেদগুলো পড়লেই লেখক হকিং-এর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি যে কত তীব্র রস-বোধসম্পন্ন এক দ্রষ্টা ছিলেন তা ওইটুকু থেকেই বোঝা যায়। আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম বইয়ের জগতে একটা মাইলফলক হয়ে আছে। আড়াই কোটি কপি ইতিমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে বইটি। ৪০টি ভাষায় তার অনুবাদ হয়েছে।

তিনি অতি কষ্টকর প্রক্রিয়ায় লিখতেন। প্রযুক্তিবিদদের বানিয়ে দেওয়া এক বিশেষ ধরনের কম্পিউটার যন্ত্রে সম্ভাব্য শব্দরাজির মধ্যে থেকে ঈপ্সিত শব্দটি বেছে নিয়ে তাঁকে লিখতে হত। এ অতি ঘোরালো ও কঠিন পদ্ধতি। তাঁর লেখায় পাতায়-পাতায় মিশে থাকত হাস্যকৌতুকও। ব্রিফ হিস্ট্রি বইটি লেখার সময় তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে শ্রুতলিখনের আশ্রয় নেওয়া সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। এই সময় থেকেই বিকল্প পদ্ধতিতে লেখার উপায় বেছে নিতে হয়ে তাঁকে। একবার ভেবে দেখ এই কষ্টকর পথ পাড়ি দিতে হলে কতটা জেদি হতে হয়! সিদ্ধান্তে কতটা অটল থাকতে হবে!

তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি জগতকে ব্যাখ্যা করতেন বটে, কিন্তু তাঁর দেখার চোখটা ছিল দার্শনিকের। অবশ্য দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন বইয়ের শুরুতেই তিনি বলে দিয়েছেন, দর্শন একটি মৃত বিষয়। দার্শনিকদের তর্ক জগতকে ব্যাখ্যায় কোনও কাজে লাগে না। অনেকেই তাঁর দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইনকে বিজ্ঞানের দর্শনের বই বলেও অভিহিত করেন।    

হকিং-এর পিতা ফ্র্যাঙ্ক হকিং ছিলেন জীববিজ্ঞানের গবেষক। মা, ইসাবেল হকিং ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী। বাবা চেয়েছিলেন, হকিং বড় চিকিৎসক হোক। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান আর গণিতে।

শেষ করার আগে তোমাদের জানিয়ে রাখি, স্টিফেন হকিং-এর জীবনী নিয়ে দ্য থিওরি অফ এভরিথিং সিনেমা তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালে। শুধু তাই নয় ওই ছবিতে স্টিফেন হকিং চরিত্রে অভিনয় করে ইডি রেডমাইন অস্কারও জিতেছিলেন।  চলচ্চিত্র-বিষয়ক ওয়েবসাইট আই এম ডিবি-র তথ্য মতে, স্টিফেন হকিং অভিনয় করেছেন নয়টি সিনেমা আর ডকুমেন্টারিতে। এছাড়াও সশরীরে এসেছেন কমপক্ষে ৭৪ বার।

 ফিরে যান মূল ক্রোড়পত্রে

Advertisements

2 Responses to স্টিফেন হকিং ক্রোড়পত্র – চলে গেলেন স্টিফেন হকিং – কালীপদ চক্রবর্তী- শরৎ ২০১৮

  1. Priyadarshi Dutt says:

    প্রবন্ধটির মাধ্যমে স্টিফেন হকিংস এর মানবীয় দিকটি জানতে পারলাম| তার সংগ্রাম নিশ্চই পৃথিবীর যে কোনো অন্যান্য বৈজ্ঞানিকের চেয়ে কঠিন, কারণ তিনি এক দুরারোগ্য ব্যাধি তে আক্রান্ত ছিলেন যার জন্য তার একটি সাধারণ জীবন যাত্রা ভয়ংকর ভাবে প্রভাবিত হয়| গুজারিশ সিনেমার একটি দৃশ্য মনে পড়ে গেল, যে খানে কুয়াদ্রিপ্লেজিয়া তে আক্রান্ত জাদুগর (ঋত্ত্বিক রোশন) দয়া-মৃত্যু (ইউথেন্সিয়া)র জন্য আদালতে আবেদন করেছেন এবং তার বিরোধী আইন জীবি চেষ্টা করছেন যে এই আত্মহত্যার দাবি যেন খারিজ হয়| ঋত্ত্বিক রোশন সেই আইন জীবি (রাজিত কাপুর) কে বলে সামনে রাখা একটা কাঠের বাক্সের (তার জাদু প্রদর্শনের দিনের) মধ্যে কয়েক মুহুর্তের জন্য ঢুকতে| যেই তিনি ঢুকেছেন, এমনি জাদুকর সেটা ছিটকিনি আটকে দেন| আইন জীবি ঘাবড়ে যান, এবং বেরুবার জন্য হাকুলি বিকুলি করতে থাকেন| কয়েক মুহূর্ত পড়ে জাদুকর সেটা খুলে দিলেন, এবং বললেন যে তিনি তার জীবনের দম বন্ধ করা পরিস্থিতি কে বোঝাবার জন্য এটা করেছিলেন| যদি কেউ কয়েক সেকেন্ড এই ঘাবড়ে যায়, তা হলে তার অবস্থা কেমন হবে যাকে সারা জীবন কাটাতে হয়| স্টিফেন হকিংস কিন্তু জীবন শেষ করার কথা ভাবেননি, মহাজীবনের, মহাজগতের সন্ধান বিশ্ব বাসী কে জানিয়ে গেছেন|

    Like

  2. অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় says:

    খুব সাবলীলভাবে বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব সহজ করে লেখক বলেছেন। সেই সঙ্গে বিজ্ঞানীর জীবন সংগ্রামের কথা অনেককে উদ্বুদ্ধ করবে।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s