স্মরণীয় যাঁরা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী,অভিযাত্রী ড: ফ্রিজফ নান্সেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় শীত ২০১৭

স্মরণীয় যাঁরা সব এপিসোড একত্রে

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আঠারো বছরের বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটি এক মাইল বরফের মধ্যে স্কি প্রতিযোগিতায় বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিল। সেটা ছিল ১৮৭৯ সাল। স্থান নরওয়ের ফ্রয়েন নামের শহরতলী। এর আগে সে অন্তর্দেশীয় স্কি প্রতিযোগিতাতে প্রথম স্থান পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। আবার সে ছেলে পড়াশুনোতেও সমান চৌখস। পদার্থবিদ্যা আর রসায়নশাস্ত্র তার পছন্দের বিষয়। কিন্তু জীববিদ্যায় অপরিসীম কৌতূহল। এদিকে আবার চোখে স্বপ্ন ভিড় করে আসছে, দুর্গম উত্তরমেরু অভিযানে বেরিয়ে পড়তে হবে। তখনো পর্যন্ত পৃথিবীর কেউ সেই অভিযানে সফল হয়ে উঠতে পারেনি।

দুর্ধর্ষ মেরু অভিযানের পাগলা ঘোড়াটা সারাজীবন ধরে যাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে, তিনি হলেন ডক্টর ফ্রিজফ নান্সেন। মামাবাড়ির দিকে তাঁর আত্মীয় ছিলেন নরওয়ের সামরিক বাহিনীর প্রধান আর বাবার বংশে ছিলেন শ্বেত সমুদ্র পাড়ি দেওয়া দুঃসাহসী শহরের মেয়র। নান্সেনের বাবা ছিলেন পেশায় উকিল। মায়ের ছিল অগাধ পড়াশুনো। এমন পরিবারে বেড়ে ওঠা মৃদুভাষী বালকটির নানা বিষয়ে উৎসাহ আর পারদর্শিতা খুব ছোটবেলা থেকেই দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো শেষ করবার পর তিনি চাকরি পান বারজেন মিউজিয়ামে। তখন তার বয়স মাত্র তেইশ। কাজটা ছিল কিউরেটরের। এখানে তিনি এক অদ্ভুত বিষয়ের উপর গবেষণা লব্ধ পাণ্ডুলিপি জমা করেন, নিম্নবর্গীয় প্রাণীদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক প্রভাব। যারা এই পাণ্ডুলিপির নিরীক্ষক ছিলেন তাঁরা বেজায় আপত্তি তুললেন। উঁহু, এই গবেষণা কোন কাজেরই নয়। আত্মবিশ্বাসী তরুণটি দমে না গিয়ে সেই পাণ্ডুলিপি জমা করে দিলেন। পেয়েও গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বচ্চ ডিগ্রী, ডক্টরেট অফ ফিলজফি। পরবর্তীকালে এই গবেষণার পাণ্ডুলিপি বিজ্ঞানী মহলে সাড়া ফেলে দেয়। অচিরেই জীববিজ্ঞানী মহলে ডক্টর ফ্রিজফ নান্সেন বেশ পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।  

মিউজিয়ামে কাজ করতে করতেই তিনি সমুদ্র বিজ্ঞানে উৎসাহী হয়ে পড়েন। এদিকে মাথায় তখন উত্তরমেরু জয়ের স্বপ্ন তাঁকে রাতে ঘুমোতে দিচ্ছে না। ইতিমধ্যে গ্রীনল্যান্ডের উপর তথ্য সংগ্রহ করবার জন্য এক অভিযাত্রী দল তৈরি করা হয়েছে। সে দলে নাম লিখিয়ে বসলেন নান্সেন। সভ্য পৃথিবী তখনো পর্যন্ত গ্রীনল্যান্ডের এস্কিমোদের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানে না। বিভিন্ন অভিযানে অনেক মানুষ মারা গেছে, যাত্রীবাহী জাহাজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। গ্রীনল্যান্ড অভিযানে গিয়ে প্রচুর অভিজ্ঞতা লাভ করলেন নান্সেন। এস্কিমোদের জীবনযাত্রার উপর তথ্য সংগ্রহ করে লিখে ফেলেন ‘দ্য এস্কিমো লাইফ’। গ্রীনল্যান্ড এলাকার জীবজন্তু ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর লেখা পড়ে বিজ্ঞানী ও মেরু অভিযাত্রীরা প্রবল উৎসাহিত হয়ে পড়েন। নান্সেন ততদিনে নরওয়েতে বেশ পরিচিত একটি নাম।

গ্রীনল্যান্ড অভিযানে গিয়ে তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন। সমুদ্রে নৌবিহার করাকালীন সাইবেরিয়া থেকে ভেসে আসা কাঠের টুকরো দেখতে পেয়ে তিনি অনুমান করেন বরফাবৃত আর্কটিক মহাসমুদ্র প্রকৃতপক্ষে গতিশীল, ভাসমান তুষারস্তূপ স্থিতিশীলতার ভ্রম সৃষ্টি করে মাত্র। তখনো পর্যন্ত ধারনা ছিল উত্তরমেরুর বরফ স্থির, গতিশীল নয়।

নরওয়ে উপকুল থেকে সোজাসুজি উত্তর মেরুতে যাওয়া কোনোরকম ভাবেই সম্ভব ছিল না। ঘনবদ্ধ তুষারস্তর ও হিমবাহ সেই যাত্রার প্রতিবন্ধক। তখনো কিন্তু উড়ো জাহাজ আবিষ্কার হয়নি। কাজেই জলজাহাজ ছিল একমাত্র বাহন।

মনে মনে যখন নান্সেন উত্তরমেরু অভিযানের পরিকল্পনা করছেন ঠিক সেই সময়ে (১৮৮৪ সাল) গ্রীনল্যান্ডে জেনেট জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার হয়। নিউ সাইবেরিয়া থেকে সেই জাহাজ ১৮৮০ সালে উত্তরমেরু অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে আর্কটিক মহাসাগরের জমাট বাধা বরফের চাপে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন সহ অভিযাত্রীদের বেশির ভাগের মৃত্যু হয়।

জেনেট জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার ঘটনা জানতে পেরে নান্সেন তাঁর ভবিষ্যৎ উত্তরমেরু অভিযানে জেনেট জাহাজ যেখানে বরফবন্দী হয়ে ভেঙে যায়, সেখান থেকে যাত্রা শুরু করা স্থির করে ফেললেন। তাঁর হিসেব অনুযায়ী, তুষারবন্দী জাহাজেরও নিউ সাইবেরিয়া থেকে উত্তরমেরু প্রদক্ষিণ করে নরওয়ে ফিরে আসতে আনুমানিক তিন থেকে চার বছর লাগার কথা। আর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে নান্সেনের জুড়ি কেউ ছিল না। তাই আর্কটিক মহাসাগরে ভাসমান তুষার স্তরের গতিকে কাজে লাগিয়ে উত্তরমেরু অভিযানের পুরো ছক কষে ফেললেন তিনি।

কিন্তু বরফে ভাসব দরিয়ায়, বললেই তো হবে না! সেজন্য চাই বরফের চাপে ভেঙে না যাওয়ার মতো উপযুক্ত জাহাজ। জাহাজ গড়ার কারিগর কলিন আর্চারের তখন ইংল্যান্ড আর নরওয়েতে বেশ নামডাক। তাঁকেই নান্সেন নিযুক্ত করলেন জাহাজ বানাতে। নক্সা বানিয়ে ফেলা হল। এবার আসল কাজ, অভিযানের প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ। নরওয়ে সরকারের কাছে আবেদন করতেই নান্সেনের প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়া হল অবাস্তব প্রস্তাব বলে। বিজ্ঞানীরাও সরকারের সাথে গলা মিলিয়ে নান্সেনকে সাবধান করে দিয়ে বলল, “ একি অলুক্ষুনে কথা! মরতে চাও নাকি! আর্কটিক মহাসাগরে জাহাজ নিয়ে পাড়ি দেওয়া আর যমরাজকে নেমন্তন্ন করা, একই ব্যাপার”।

বারণ করলে আর শুনছে কে? নান্সেন পার্লামেন্টে গলা ফাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেই ছাড়লেন। চারটি কাঠের পুরু আস্তরণ দিয়ে তৈরি হল জাহাজ। জাহাজের খোলকে গোলাকার মসৃণ আকার দেওয়া হল, যাতে বরফের চাপে সে জেনেটের মতো ভেঙে না যায়। এদিকে অভিযানের জন্য নরওয়ে সরকারের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে যা অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল, তার সিংহভাগ খরচ হয়ে গেলো জাহাজ বানাতে। তখন তিনি সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন করলেন তার অভিযানের পাথেয় জোগাড় করবার জন্য। সাধারণ মানুষ ততদিনে এই অসম সাহসী, জেদি বিজ্ঞানীটির উপর ভরসা করতে শুরু করেছে। তাই শেষ পর্যন্ত অভিযানের বাকি অর্থ জমা পড়ে গেলো।

উত্তরমেরু অভিযানের তাঁর সঙ্গী হবার জন্য আহ্বান করে কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। সাক্ষাতকার নিয়ে বারো জন বাছা বাছা যুবককে বেছে নেওয়া হল। তাঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন দক্ষ নাবিক, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ বৈজ্ঞানিক। প্রবল ঠাণ্ডায় এই মরণশীল যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ লিস্ট বানিয়ে, সেই সব জিনিষ জাহাজে তোলা হল। বরফের স্তরে চলাফেরা করবার উপযুক্ত স্লেজ ও অন্যান্য সরঞ্জাম তোলা হল। নান্সেন শুধু মাত্র অভিযাত্রী তো আর ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মেধাবি বিজ্ঞানী। তাই পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করবার উপযুক্ত যন্ত্রপাতিও তোলা হল জাহাজে। তিনবছরের জন্য উপযুক্ত খাবার দাবার আর জ্বালানীর জন্য কয়লা নেওয়া হল। পড়াশুনো করে সময় কাটানোর জন্য গোটা একটা লাইব্রেরী তৈরি করা হল। তিনটি কায়াক (লম্বা সরু আকৃতির নৌকা) বানিয়ে জাহাজে তোলা হল। জাহাজের নামকরণ করা হল, ‘ফ্র্যাম’, অর্থাৎ অগ্রগতি।

দিনক্ষণ দেখে, ১৮৯৩ সালের জুন মাসে, স্পিট বারজেন উপকুল ছেড়ে অজানা উত্তরমেরুর সন্ধানে পাড়ি দিল ফ্র্যাম। পথে ভয়ঙ্কর কারা সমুদ্র পার হয়ে নিউ সাইবেরিয়ান দ্বীপে পৌঁছতে লেগে গেলো প্রায় চার মাস। তারপর সত্যি সত্যি তুষার সমুদ্রে বন্দী হল ফ্র্যাম। আর কি আশ্চর্য, সেই জাহাজ না ভেঙে গেলো, না কাত হয়ে গেলো। কম্পাস দেখে অঙ্ক কষে দেখা গেলো, ফ্র্যাম তুষারে বন্দী হয়ে সমুদ্রে ভেসে দিব্যিএগিয়ে চলেছে তার গন্তব্যে।

এই অভিযানে নান্সেন ও তার সঙ্গীরা প্রচুর বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করলেন, তার মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য সমুদ্রের বিভিন্ন স্তরে জলের তাপমাত্রা মাপা। এই কাজে নান্সেন একটি যন্ত্রের উদ্ভাবন করেন, যাকে পরবর্তীকালে নাম দেওয়া হয় ‘নান্সেন বটল’। প্রতি দিন নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করে সমুদ্রবিজ্ঞানে নান্সেনের আগ্রহ আরও বাড়তে থেকে। নিয়মিত গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধির সমীক্ষা চলতে থাকে। উত্তর গোলার্ধে পৃথিবীর পরিবেশ ও চুম্বক শক্তির উপর চালানো হয় পরীক্ষা নিরীক্ষা। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়, বরফের স্তরে ড্রিলিং মেশিন দিয়ে ফুটো করে তুষার স্তরের গভীরতা মাপা। সময় কাটানোর জন্য ফ্র্যামে একটি খবরের কাগজ বার করা হয়। উদ্যোক্তা নান্সেন। আসলে তিনি পড়তে লিখতে নিজে যে ভালবাসতেন শুধু তাই নয়, অন্যদের উৎসাহও দিতেন। অভিযাত্রীরা এই কাগজে তাঁদের কবিতা, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, কার্টুন, অভিজ্ঞতা সব লিখে রাখতেন।

অভিযাত্রীদের আর এক বিনোদন ছিল তুষার ভূমিতে বিচরণকারী শ্বেতভল্লুক, সিল মাছ আর সিন্ধুঘোটক শিকার। সে কাজে ঝুঁকিও কিছু কম ছিল না। অনেকবার এই বন্য প্রাণীদের আক্রমণ থেকে বিস্ময়কর ভাবে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিলেন তাঁরা, শুধু সাহস ও শারীরিক বল সম্বল করে।

এক বছর ঘুরে গেলেও ফ্র্যামের অবস্থান প্রায় ৮০-৮২ ডিগ্রীতে আটকে। কিছুতেই ৯০ ডিগ্রী পোঁছানো যাচ্ছে না। হিসেব কষে নান্সেন দেখলেন, এইভাবে চললে উত্তরমেরু পৌঁছানো অসম্ভব। তাই তিনি জহান্সেনকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লেন স্লেজগাড়ি চেপে। আঠাশটি কুকুর হল সেই স্লেজের চালক। বাকি অভিযাত্রীরা নান্সেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্র্যামেই থেকে গেলেন। যদি নান্সেনের অনুমান সত্যি হয়, তবে ফ্র্যাম একদিন না একদিন নরওয়ে উপকূলে ঠিকই পৌঁছে যাবে এই বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোন উপায় তাঁদের ছিল না। কারণ পিছু ফেরার পথ ছিল না।

ফ্র্যাম জাহাজে অভিযাত্রীদের প্রাতরাশ

মাসছয়েক কেটে যাবার পর বোঝা গেলো সেই ৮৫ ডিগ্রী উত্তর দ্রাঘিমাংশের কাছাকাছি নান্সেন ও জোহান্সেন ঘোরাফেরা করছেন। এদিকে সামনে আসছে উত্তরমেরুর ভয়ঙ্কর শীত। নান্সেন উত্তরমেরু পৌঁছানোর আশা ত্যাগ করলেন। কিন্তু পিছু ফেরার রাস্তা নেই। ফ্র্যাম ততদিনে বরফ সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে কোথায় পৌঁছেছে তাও জানা নেই। ম্যাপ ও কম্পাসের সাহায্যে ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ডে পোঁছানোর উদ্দেশ্যে দুজনে রওনা দিলেন স্লেজ চেপে। এদিকে খাদ্যের ভাঁড়ারে টান পড়েছে। অভিযানের ধকল ও শীতে অনেকগুলো কুকুর মারা গেছে। কুকুরদের খাবার শেষ। তাই উপায়ন্তর না দেখে, এক এক করে কুকুরদের মেরে, সেই মাংসই অন্য কুকুরদের খাইয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হল।

ভাগ্যক্রমে শীত শুরু হবার আগেই ফ্র্যাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ডে পোঁছাতে পারলেন নান্সেন ও জোহান্সেন। শীত শেষ হলে সেখান থেকে জলপথে স্পিট বারজেন রওনা দেবার আশায় উপকূলে ইগলুদের কায়দায় বহুকষ্টে ঘর বানিয়ে ফেলা হল। শ্বেত ভল্লুক আর সিন্ধুঘোটক মেরে তাদের মাংস আর চর্বি জমিয়ে রাখা হল খাবার হিসাবে। গোটা শীতকাল সেই কুঁড়ে ঘরে বন্দী থেকে কাটিয়ে দিতে হল দুজনকে। জামাকাপড়ের দৈন দশা দেখে তাঁবুর কাপড় আর ভল্লুকের চামড়া দিয়ে পোশাক বানানো হল।  

শীতকাল শেষ হতে আবার জলপথে যাত্রা। মধ্যে তুষার ঝড়ে আবার উপকূলে আশ্রয় নিতে হল। এদিকে শ্বেতভল্লুক আর সিন্ধুঘোটকের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। হটাত একদিন হাঁটতে হাঁটতে নান্সেন কুকুরের ডাকের আওয়াজ শুনতে পেয়ে সেই ডাক লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে দেখেন তার পরিচিত এক অভিযাত্রী কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন। প্রায় তিন বছর পর নান্সেন ও জোহান্সেন মানুষের দেখা পেলেন। সেই অভিযাত্রী দলটি ফ্র্যাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ডে ঘাঁটি গেড়েছিলেন বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহে।

নান্সেন উত্তর মহাসমুদ্রের স্রোতের একটি বিশেষত্ব আবিষ্কার করেন। পৃথিবীর নিজের অক্ষে পাক খাবার জন্য মেরু অঞ্চলে কোরিয়োলিস বলের সৃষ্টি হয়। সমুদ্রের জলের পৃষ্ঠভাগে বাতাসের বল এবং কোরিয়োলিস বলের যৌথ প্রভাবে সমুদ্রের জল পেঁচালো পথে ঘুরতে থাকে। সমুদ্রের জলের এই ঘূর্ণ গতি একমাত্র মেরু অঞ্চলেই দেখা সম্ভব।

নিরাপদ শিবিরে ফিরে এসে নান্সেন জানতে পারলেন সারা পৃথিবীতে তার নাম তখন আর অপরিচিত নয়। ছিটগ্রস্ত বৈজ্ঞানিক মেরু অভিযাত্রী হিসাবে বেশ নাম ডাক হয়েছে তার। সবাই ধরে নিয়েছে জেনেট জাহাজের মতোই ফ্র্যাম ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে আর অভিযাত্রীদের হয়েছে সলিল সমাধি। উদ্ধারকারী জাহাজে চড়ে নান্সেন নরওয়ে ফিরে এসে বীরের অভ্যর্থনা পেলেন। পৃথিবীর মানুষের চোখে বিজয়ীর স্বীকৃতি পেলেন নান্সেন ও তার দল। যদিও সঠিক উত্তরমেরুতে না পৌঁছে ৮৬ডিগ্রী ১৪মিনিট উত্তর দ্রাঘিমাংশে পোঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁরা।

উত্তরমেরুতে পা রাখতে না পারলেও নান্সেনের এই অভিযানের মাধ্যমে মানব জাতি সর্বপ্রথম জানতে পারল উত্তরমেরুতে কোনো মানব জীবনের চিহ্ন মাত্র নেই। তদানীন্তন ধারনা অনুযায়ী মনে করা হতো উত্তরমেরুর অগভীর সমুদ্রে আছে অনেক অচেনা অজানা দ্বীপ, অজানা মানুষ ও প্রাণী।

আছে শুধু বরফের স্তরে ঢাকা বহমান গভীর সমুদ্র। উত্তরমেরু অভিযানের অসংখ্য তথ্য নান্সেন ছয় খণ্ডে নথিবদ্ধ করেন, যা পরবর্তীকালে অভিযাত্রী ও বৈজ্ঞানিকদের অনেক কাজে আসে। ফ্র্যাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ড থেকে ঘরে ফেরার পথে নান্সেন তুষার যুগের কিছু জীবাশ্ম খুঁজে পান। সেই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নথিবদ্ধ করেন। 

যেদিন নান্সেন আর জোহান্সেন নরওয়ে পৌঁছান, তার দু একদিনের মধ্যে ফ্র্যাম জাহাজ স্পিট বারজেন পৌছায়। এগারো জন অভিযাত্রী নিরাপদে পৌঁছান। সাইবেরিয়ান উপকুলে বরফে বন্দী জাহাজ, আর্কটিক মহাসমুদ্রের টানে, নরওয়ে ফিরে আসার ব্যাপারে নান্সেনের সিদ্ধান্তের প্রমান পাওয়া গেলে সারা পৃথিবীতে নান্সেন রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।  

১৮৯৭ সালে ক্রিস্টানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় নান্সেনকে জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক নিযুক্ত করে। কিন্তু উত্তরমেরু অভিযানের অভিজ্ঞতা নান্সেনকে সমুদ্র বিজ্ঞানে পারদর্শী এবং উৎসাহিত করে তুলেছিল। জীববিজ্ঞান ছেড়ে তিনি সমুদ্র বিজ্ঞান নিয়ে পড়ানো শুরু করেন এবং প্রচুর খ্যাতি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সমুদ্র বিজ্ঞান পড়াবার জন্য অনুরোধ করে।

১৯০৫ সালে নরওয়েতে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। রাজনৈতিক কারনে সুইডেন ও নরওয়ে দুটি আলাদা দেশ হয়ে যায়। এর আগে পর্যন্ত দুটি দেশ এক ছিল। একই রাজা দুটি দেশের অধিকর্তা থাকলেও নরওয়ে পার্লামেন্টের হাতে ছিল প্রকৃত ক্ষমতা। বিদেশ নীতির পরিপ্রেক্ষিতে মতবিরোধ হলে দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। নান্সেন ছিলেন নরওয়ের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তার কর্মদক্ষতার জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিতির কারণে নরওয়ের পার্লামেন্ট ও রাজা তাকে দুই দেশের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার কাজে নামতে অনুরোধ করে। বিজ্ঞানী নান্সেন তার অধ্যাপনা ও গবেষণা ছেড়ে রাজনীতির পথে পা বাড়াতে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু খুব বেশীদিন তাঁর এই রাজনীতি বিমুখতা কাজে আসে নি। আসলে নান্সেন ছিলেন অত্যন্ত কর্মবীর এবং মানব দরদী। তাই দেশের জনসাধারণের স্বার্থে প্রথম চ্যান্সেলর নিযুক্ত হয়ে লন্ডনে গিয়ে রাজনৈতিক মধ্যস্থতা করেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ক্ষমতাশালী নেতারা নান্সেনকে সমীহ করে তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে সে যাত্রা নরওয়ে ও সুইডেনের যুদ্ধ বিরত থাকে।

মেরু অভিযাত্রী নান্সেন জীবনের কোন অবস্থাতেই হার মানতেন না। তার মধ্যে বাস করত এক যোদ্ধা। এক প্রকৃতি ও মানব প্রেমী সত্ত্বা। শোনা যায়, যেহেতু তিনি জনসাধারণের আস্থাভাজন মানুষ ছিলেন, তাঁকে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসানোর চেষ্টা করা হয়। সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নান্সেন তার বিজ্ঞানের দুনিয়ায় ফিরে যান। এই সময়ে আবার দক্ষিন মেরু অভিযানের পরিকল্পনা করতে থাকেন।

কিন্তু সমাজ হয়ত বিজ্ঞানী-অভিযাত্রী নান্সেনের কাছ থেকে আরও অনেক বেশি প্রত্যাশা করেছিল। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে না হতেই আবার রাজনীতি নান্সেনকে দাবী করে বসল। ১৯১৭ সালে আমেরিকান সরকার নরওয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি বন্ধ করে দিল। মধ্যস্থতা করবার জন্য নান্সেনের ডাক পড়ল। দেশের মানুষকে খাদ্যাভাব থেকে বাঁচানোর তাগিদে নান্সেন ছুটলেন আমেরিকা। তাঁর বাগ্মিতায় বশ করে ফেললেন আমেরিকার ধুরন্ধর রাজনীতিবিদদের।

বিশ্বযুদ্ধের পরিণতিতে পৃথিবী জুড়ে অজস্র মানুষের হত্যা লীলা, খাদ্যাভাব, মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের উল্লাস নান্সেনকে এতটাই ব্যাথিত করে তুলল, তিনি পাকাপাকি ভাবে বিজ্ঞান এবং প্রকৃতির বৈচিত্র অনুসন্ধানের কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে, বৃহত্তর মানবকল্যাণে আত্মোৎসর্গ করলেন। লীগ অফ নেশনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দলে দলে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে যাওয়া শরণার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ালেন পরিত্রাতা হয়ে। সাইবেরিয়াতে লক্ষ লক্ষ যুদ্ধ বন্দী তখন অনাহার আর মহামারীতে মরতে বসেছে। তাদের উদ্ধার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও যানবাহন দিতে সব উন্নত দেশই অস্বীকার করে বসে।  লীগ অফ নেশন নান্সেনের মতো পারদর্শী মানুষ খুঁজছিল, যিনি এই মহাসংকট থেকে পরিত্রাণের রাস্তা খুঁজে দিতে পারবেন। নান্সেন লীগ অফ নেশনের হাই কমিশনার হিসাবে সাইবেরিয়ার যুদ্ধবন্দীদের উদ্ধার কাজে যোগ দিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের কাজে নেমে পড়লেন। বিভিন্ন দেশের কর্তাব্যক্তিদের সাথে কথাবার্তা চালিয়ে, অমানুষিক কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়ে, প্রায় ২৬ টি দেশের ৪,৫০,০০০ যুদ্ধবন্দীকে তাদের স্বদেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন।

যুদ্ধ বিরতির পর আর এক সমস্যা এলো গোটা ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশে। কোটি কোটি শরণার্থী বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তাদের না আছে বাসস্থান, না আছে অন্ন সংস্থানের উপায়। এদিকে স্বদেশে ফিরতে  বদ্ধপরিকর অজস্র নিপীড়িত মানুষ। লীগ অফ নেশনকে আবার নান্সেনের দ্বারস্থ হতে হল। শরণার্থীদের স্বদেশে নিরাপদে ফেরাবার জন্য এক বিশেষ পাসপোর্টের প্রচলন করলেন নান্সেন, যা নান্সেন পাসপোর্ট বলে পরিচিত। নান্সেনের প্রচেষ্টা ও মধ্যস্থতায় পৃথিবীর প্রায় পঞ্চাশটি প্রভাবশালী দেশ এই পাসপোর্ট মেনে নেয়। ১৯২০ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এই পাসপোর্ট যুদ্ধকালীন শরণার্থীদের নিজের নিজের দেশে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপনে সাহায্য করে।

এদিকে রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ সম্পন্ন হবার পর সে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রাশিয়ায় তখন সবেমাত্র কম্যুনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় এসেছে। দেশে উপযুক্ত পরিকাঠামো না থাকায়, দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অন্যান্য ধনী দেশগুলো কম্যুনিস্ট রাশিয়াকে কোনোভাবেই সাহায্য করতে রাজি না হওয়ায়, রেড ক্রস সোসাইটি নান্সেনের কাছে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের ত্রাণের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করে। আরও একবার নান্সেন তার কর্মকূশলীতার পরিচয় দেন। বিভিন্ন দেশের কাছে অর্থ সাহায্যের জন্য হাত পাতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বক্তৃতার মাধ্যমে জনসমর্থন আদায় করে নেন। নান্সেনের চারিত্রিক দৃঢ়তার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় রাজনিতিকেরা। এই কাজে নান্সেন তার জমানো পুঁজি থেকেও অর্থসাহায্য করেন। ১৯২২ সালে জনদরদী নান্সেনকে শরণার্থী সমস্যা সমাধানের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার দান করা হয়। সমস্ত  অর্থই নান্সেন ত্রান তহবিলে দান করে দেন। সেই বছরেই গ্রীস এবং তুর্কির যুদ্ধে আবার শরণার্থী সমস্যা হয়। নান্সেন তখন শরণার্থীত্রাণে সিদ্ধহস্ত পুরুষ হিসাবে জগতজোড়া খ্যাতির অধিকারী। এবারেও তিনি সফল হন।

শরণার্থী সমস্যা মোকাবেলায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়ানোর ধকলে এই মানুষটির শরীর ভেঙে পড়ে। ১৯৩০ সালে তিনি ৬৯ বছর বয়সে মারা যান নান্সেন। মৃদুভাষী, কর্মবীর, বিজ্ঞানী ও অভিযাত্রী নান্সেনের সবচাইতে বড় গুণ ছিল যে কোন কাজের আগে নিখুঁত পরিকল্পনা করবার ক্ষমতা। আর ছিল সিদ্ধান্তে অটল থেকে পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার সংগ্রামী মনোবল। মেরু অভিযানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে শেখার মাধ্যমে গড়ে ওঠা শক্তি ও মনোবল তাঁকে মানুষের কল্যাণসাধনে সক্ষম করে তোলে।

পদে পদে মৃত্যুর অবধারিত ফাঁদ থেকে সুকৌশলে বেরিয়ে এসে সর্বপ্রথম উত্তরমেরুর অজানা তুষার মহাসাগরে অজানা তথ্য আবিষ্কারের জন্য নান্সেনকে ইতিহাস মনে রাখবে। নান্সেনের পরিকল্পিত ফ্র্যাম জাহাজ আরও তিনবার উত্তরমেরু সফর করে। সেই জাহাজকে স্মারক হিসাবে নরওয়ের রাজধানী ওসলোর ফ্র্যাম মিউজিয়ামে সসম্মানে স্থান দেওয়া হয়েছে। উত্তরমেরুর গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং স্মৃতি চিহ্ন সেখানে সংরক্ষিত। বিজ্ঞান সাধক, মানবপ্রেমী অসম সাহসী মনিষী ডক্টর ফ্রিজফ নান্সেন, সভ্য সমাজের কাছে এক জীবন্ত বিস্ময় হয়ে রয়ে গেছেন।

স্মরণীয় যাঁরা সব এপিসোড একত্রে

Advertisements

One Response to স্মরণীয় যাঁরা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী,অভিযাত্রী ড: ফ্রিজফ নান্সেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় শীত ২০১৭

  1. ALAMINKOBI1998@GMAIL.COM. I says:

    Nice

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s