স্মরণীয় যাঁরা পাহাড় যখন ডাকে : গার্লিন্দা কালটেনব্রুনার শীত ২০১৯

সুদীপ চ্যাটার্জি

…থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে গার্লিন্দা। চোখ খোলা অবস্থাতেও সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে রীতিমত। এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটে গেছে যে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। স্নায়ুতে অক্সিজেনের অভাব এতক্ষণ বোধ হয়নি, এইবার যেন আচমকা অনুভূতিগুলো ক্ষীণ হয়ে আসছে। যতক্ষণে সে নীচে নামবে, রক্তাক্ত দেহটা হয়ত বরফে ঢেকে যাবে। শীতার্ত হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করল গার্লিন্দা। পায়ের পাতাগুলো যেন বরফের মতই শক্ত হয়ে গেছে। ভয়ে শিথিল হয়ে আছে দেহের প্রতিটা রোমকূপ। প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়ে সে পিছন ফিরে দেখে নিচ্ছে! কোন স্বপ্ন কি মুহূর্তের মধ্যে এমন ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে…

১) ১৯৭৮ সাল। স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে একটা পর্বতারোহণ ক্যাম্প করছিলেন এরিক টেসলার। এমন সময়ে একটা হইচই শুনে সেইদিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।

উত্তর অস্ট্রিয়ার এক ছোট্ট গ্রাম থেকে এসেছে স্কুলের এই ছেলেমেয়েরা। বেশিরভাগের বয়সই বারো বছরের কম। অস্ট্রিয়া দেশটা আল্পসের পাদদেশে, চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। ছোটবেলা থেকেই স্কুলের ছেলেমেয়েরা যাতে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় ভাবে যোগাযোগ অনুভব করে, শিক্ষকেরা সেইজন্যে ছোট ছোট ‘নেচর ক্যাম্প’ আয়োজিত করেন। রক ক্লাইম্বিং-এর পাশাপাশি, সাঁতার, হাইকিং, মাউন্টেন বাইকিং…বনের গাছপালা চেনানোর ব্যবস্থাও করা হয়। সেরকম একটা ক্লাইম্বিং ক্যাম্প চলছিল এখানে। এরিক ফিসারের তত্ত্বাবধানে দড়ি বেঁধে উঁচু একটা পাহাড়ে উঠছিল ছেলেমেয়েদের দল। 

ততক্ষণে গোলমালের কারণটা আবিষ্কার করে ফেলেছেন টেসলার। নেহাৎই পুঁচকে একটা মেয়ে, সাত কি আট বছর বয়স হবে, দড়ি না বেঁধেই খাড়া উঠে গেছে প্রায় একশ ফুট। এখানে পাহাড়ে যদিও বহু ফাঁকফোকর আছে হাতে ‘গ্রিপ’ পাওয়ার জন্যে, কিন্তু তাই বলে ওইটুকু একটা মেয়েকে এরকম দুঃসাহস করতে কোনদিন দেখেননি টেসলার। মেয়েটির অবশ্য হেলদোল নেই। ততক্ষণে পাহাড়ের মাথায় উঠে গিয়ে হেসে হাত নাড়তে শুরু করেছে সে।

অন্য শিক্ষকদের ক্যাম্পের ভার দিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে পড়লেন টেসলার। তাকে ডেকে এনে কড়া স্বরে বললেন, “এই মেয়ে, ওরকম ভাবে পাহাড়ে কেউ ওঠে? পড়ে গেলে হাত পা ভেঙ্গে যেত!”

মেয়েটা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “কি করব? ইচ্ছে হল তো!”

কিছুক্ষণ মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে টেসলার বললেন, “কি নাম তোমার?”

“গার্লিন্দা কালটেনব্রুনার।” উত্তর দিল বছর আটের ছোট্ট মেয়েটি।

সেই শুরু। পাহাড়ের নেশা এর পর থেকেই পেয়ে বসে ছোট্ট গার্লিন্দাকে। এরিক টেসলারের হাত ধরে প্রথমে রক ক্লাইম্বিং, তারপর ক্রমে স্কিয়িং, আইস ক্লাইম্বিং প্রভৃতির সঙ্গে পরিচয় হতে শুরু করে তার। তেরো বছর বয়সে ‘আলপাইন স্টাইল ক্লাইম্বিং’ কথাটার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় কিশোরী গার্লিন্দার। হারমান বুল, কার্ট ডিয়েমবের্গার এবং রেইনহোল্ড মেসনারের মত পর্বতারোহীরা প্রবল ভাবে সমর্থক করেছেন আলপাইন স্টাইলের, একই সঙ্গে এক্সপিডিশন বা সিজ স্টাইলের সমালোচনা করেছেন। অক্সিজেন, নানাধরনের উপকরণ আর পোর্টারদের সাহায্য না নিয়ে, নিজের ক্ষমতায় পাহাড়ে ওঠার মধ্যেই যে সত্যিকারের পর্বতারোহীদের পরিচয়, আলপাইন ক্লাইম্বিং-এর এই দর্শন ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে গার্লিন্দাকে। ১৬ বছর বয়সেই সে ঠিক করে নেয়, একদিন অক্সিজেন ছাড়াই আট হাজার ফুট উঁচু পর্বত শৃঙ্গগুলো জয় করবে সে। সেই কথার খেলাপ করেনি সে, পরবর্তী তিরিশ বছরে একবারের জন্যেও পাহাড়ে চড়তে ‘সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন’ ব্যবহার করেনি গার্লিন্দা কালটেনব্রুনার।

২) ১৯৮৬ সাল। পর্বতারোহীদের কাছে এই সালটি লেখা আছে কালো অক্ষরে। এই বছরেই পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া কে-টু’তে পর পর দুটো দুর্ঘটনায় তেরোজন পর্বতারোহী প্রাণ হারান। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্রিটিশ পর্বতারোহী জুলি টুলিস। বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী কার্ল ডিয়েমবের্গারের সঙ্গে তিনি শিখরে উঠতে পেরেছিলেন, কিন্তু ফিরে আসার পথে একটা দুর্ঘটনায় পড়েন তারা। নিযন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যেতে থাকেন টুলিস, তার সঙ্গে যুক্ত দড়িতে টান পড়তে ডিয়েমবের্গারও পড়তে থাকেন। বহুকষ্টে যখন নিজেদের আটকায় তারা, টুলিস জ্ঞান হারিয়েছেন। আট হাজার মিটারের ওপর রক্ত জমিয়ে দেওয়া ঠান্ডায় রাত কাটাতে হয় তাদের দুজনকে। মরণাসন্ন অবস্থায় অচৈতন্য টুলিসকে বহন করে পরেরদিন ক্যাম্পে পৌঁছোন ডিয়েমবের্গার। টুলিস সেইদিনই মারা যান। অবসন্ন দেহমনে দেশে ফিরে আসেন ডিয়েমবের্গার। এর পর থেকেই পর্বতারোহীদের মধ্যে কে-টু ত্রাসের সঞ্চার করে। ‘শয়তানের পাহাড়’ বলে অনেকেই এড়িয়ে চলতে শুরু করে এই পর্বতশৃঙ্গকে। কিন্তু কিশোরী গার্লিন্দার মনে এক অদ্ভূত আকর্ষণ তৈরী হয় এই পাহাড়ের প্রতি। মনে মনে সে ঠিক করে নেয়, কোন না কোন দিন সে নিশ্চয়ই গিয়ে দাঁড়াবে এই পাহাড়ের চূড়ায়। তখনও সে জানত না, কে-টু তার জীবন বদলে দেবে চিরকালের মত!

পাহাড়ে চড়ার পাশাপাশি তখন গার্লিন্দা নার্সিং-এর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ভিয়েনায়। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে পাহাড়ে। ছুটি পেলেই সে ‘ক্লাইম্বিং গিয়ার’ তুলে আল্পসের অন্তরে গিয়ে হাজির হয়। ছোটখাটো পর্বতারোহণ অভিযানে ভাগ নেয়। এমন করেই দিন কাটছিল।

৩) ১৯৯৪ সাল। কিশোরী গার্লিন্দা তখন যুবতী হয়ে উঠেছে। এই প্রথম কোন পর্বতারোহণ অভিযানের প্রধান সদস্য হিসেবে পাহাড়ে ওঠার সুযোগ পায় সে। পাকিস্তানে অবস্থিত ‘ব্রড পিক’-এর ৮০২৭ মিটার উঁচু পর্বত শিখর জয় করার উদ্দেশ্য নিয়ে অস্ট্রিয়া থেকে উড়ে আসে গার্লিন্দা এবং অন্যান্যরা। এতদিন সে আল্পসের পাহাড়ই দেখেছে প্রধানত, এই প্রথম তার সঙ্গে পরিচয় হয় হিমালয়ের। তেইশ বছরের যুবতী গার্লিন্দা হিমালয়ের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। এই রূপের বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়! হিমালয়ের বিশালতার সামনে অজান্তেই মাথা নুইয়ে আসে প্রত্যেকের। গার্লিন্দার স্বপ্নে দেখা আট হাজার মিটার পর্বতচূড়াগুলো অবস্থিত আছে এই দীর্ঘ হিমালয়ান রেঞ্জেই। আল্পসের চেয়ে এখানের আবহাওয়াও অনেক বেশি অনিশ্চিত, ফলে পাহাড়ে চড়া হয়ে ওঠে আরো অনেক বেশি কঠিন।

ব্রড পিক অভিযান অসফল হয়নি। প্রথম চেষ্টাতেই আট হাজার মিটার উচ্চতার এই পর্বত শৃঙ্গ জয় করেছিল সে। উত্সবের মেজাজে ফিরে আসে তারা। দলের সকলেই খুশি! কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই গার্লিন্দা বুঝতে পারে, হিমালয় তাকে বশ করেছে। কোনভাবেই অন্য কোন কাজে মন দিতে পারছে না সে! স্বপ্নে বারবার পাহাড়ের ছবি ভেসে ওঠে। আবার সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্যে ছটফট করতে শুরু করে গার্লিন্দা।

ততদিনে নার্সিং-এর কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছে সে। হাসপাতালে অসুস্থ লোকেদের সেবা করার ফাঁকে হিমালয়ান জার্নাল খুলে পড়ে বার বার। নার্সিং-এর চাকরির মাধ্যমে উপার্জন করা সমস্ত অর্থ লাগিয়ে আল্পসে একের পর এক পর্বতারোহণ অভিযানের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে শুরু করে গার্লিন্দা। ততদিনে ইউরোপে অনেকেই তাকে চিনে গেছে। ১৯৯৫ সালের মে মাসে চীনের ‘মুজ্তাক আতা’ শৃঙ্গে অভিযানে যায় সে। সেখান থেকে ফিরে এসেই এভারেস্ট অভিযান করার কল্পনা করে গার্লিন্দা। এমন সময়ে ১৯৯৬ সালের একটা ঘটনায় তার সমস্ত পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে যায়।

৪) ১৯৯৬ সালের ১০ মে। মাউন্ট এভারেস্ট-এ শৃঙ্গজয় করতে গিয়ে তুষারঝড়ে হারিয়ে যান বহু অভিযাত্রী। ‘ব্লিজার্ড’ থামলে বহু কষ্টে কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়, কিন্তু ততক্ষণে রব হল, স্কট ফিসার, এন্ড্রু হ্যারিসের মত অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা প্রাণ হারিয়েছেন। এভারেস্টের এই বিভীষিকাময় দূর্ঘটনার পর হইচই পড়ে যায় পর্বতারোহণ জগতে। যথেষ্ট অভিজ্ঞতা না থাকলে যে কোনমতেই হিমালয়ে এবং আট হাজার মিটারের উঁচু পাহাড়ে যাওয়া উচিৎ নয়, সেই নিয়ে তর্ক বিতর্ক শুরু হয়ে যায়।

গার্লিন্দা বোঝে তার সামনে এখনও অনেকটা পথ বাকি। আরো অনেক তৈরী করার আছে নিজেকে, অনেক সাধনা করার আছে, তাড়াহুড়ো করলে চলবে না।  সে একের পর এক ছোট এবং মাঝারি অভিযানের মাধ্যমের পাহাড়ের সঙ্গে পরিচিতি বাড়াতে থাকে।

১৯৯৭ সালে নেপালের ‘আমা দাবলাম’ শৃঙ্গ জয় করে গার্লিন্দা, পরের বছরেই সে তিব্বতে অবস্থিত ৮২০১ মিটার উঁচু ‘চো ইউ’ চূড়ায় পতাকা উত্তোলন করে। এরপর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তী দশ বছরে মাকালু, অন্নপূর্ণা, ধৌলাগিরি, এভারেস্ট সহ একের পর এক শৃঙ্গ জয় করেছে গার্লিন্দা কালটেনব্রুনার। কিন্তু, প্রত্যেক পর্বতারোহীর সঙ্গেই একটা বিশেষ পর্বত শৃঙ্গের যোগাযোগ থাকে। রেইনহোল্ড মেসনার বার বার ফিরে এসেছেন নাঙ্গাপর্বতে, হিলারি ভালোবেসে ফেলেছিলেন নন্দাদেবীকে। গার্লিন্দার অদৃষ্টে সেই যোগাযোগ ছিল কে-টু’র। সেই অপেক্ষা শেষ হল ২০১০ সালে।

৫) জার্মান অভিযাত্রী হারমান বুল একটা কথা বলে গিয়েছিলেন “Mountains have a way of dealing with overconfidence.” প্রতিটা পর্বতারোহী জীবনে কোন না কোন সময়ে এই পরম সত্যিটা উপলব্ধি করেছেন।

২০১০ সাল। গার্লিন্দার নাম তখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এইট থাউজ্যান্ডার্স’ অর্থাৎ বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটারের উঁচু শৃঙ্গ জয় করার উপলব্ধি খুব বেশিজনের নেই। ‘সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন’ ছাড়া আলপাইন ক্লাইম্বিং করে এই তকমা পাওয়া আরো কঠিন। ২০১০ সালে গার্লিন্দা তেরোটি শৃঙ্গ জয় করে ফেলেছে, মাত্র কে-টু বাকি। ২০১০ সালের মে মাসে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ফিরে আসার মাসখানেক পরেই গার্লিন্দা কে-টু অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। আত্মবিশ্বাসের কোন অভাব ছিল না তার, কিন্তু দুটো অভিযানের মাঝে যথেষ্ট বিশ্রাম নেওয়ার একটা অলিখিত নিয়ম আছে, সেটার পরোয়া করেনি সে। তার স্বামী রাল্ফও অভিজ্ঞ পর্বতারোহী, কয়েকবার বারণ করেও যখন গার্লিন্দা কথা শোনেনি, বাধ্য হয়েই হাল ছেড়ে দেয় সে। এর আগে দু বার কে-টু অভিযানে গিয়েও সাফল্য পায়নি সে, এইবার শৃঙ্গজয় করতে বদ্ধপরিকর ছিল গার্লিন্দা।

জুন মাসেই পাকিস্তানে উড়ে এসে পাঁচ হাজার মিটারের উচ্চতায় বেসক্যাম্প করে তারা। সেইখানে তাদের দেখা হয় সুইডিশ পর্বতারোহী ফ্রেডরিক এরিকসন আর ট্রে কুকের সঙ্গে। একসঙ্গে এগোনোর পরিকল্পনা করে তারা। পরের দিন থেকে মোটবহর নিয়ে হাঁটা শুরু হয় দ্বিতীয় ক্যাম্পের দিকে। আবহাওয়া খুব ভালো, কিন্তু সমস্যার মধ্যে মাঝে মাঝেই ধ্বস নামার ফলে আলগা পাথর গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের মাথা থেকে। ৭৬০০ মিটারে এসে পাথর বৃষ্টি এত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যে হেলমেট না পরে তাঁবুতে থাকাও অসম্ভব হয়ে ওঠে। রাল্ফ আগেই কে-টু চূড়ায় উঠেছে একবার, এত ঝুঁকি নিয়ে এগোতে রাজী হয় না সে। গার্লিন্দা অবশ্য ফিরে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক করা হয় রাল্ফ ফিরে গিয়ে বেসক্যাম্পে অপেক্ষা করে থাকবে বাকি তিনজনের জন্যে।

তিন নম্বর ক্যাম্প থেকে বেরোনোর পরেই ট্রের আঙ্গুলে কিছু একটা অসুবিধে শুরু হল। সেখান থেকে শৃঙ্গ প্রায় দশ ঘন্টার পথ, অসাড় আঙ্গুল নিয়ে এগোনো মানে বিপদ ডেকে আনা। ট্রে ফিরে গেল ক্যাম্পে। ফ্রেডরিক আর গার্লিন্দা এগোতে থাকল। তুষারপাত বেশি হওয়ার দরুণ পাথর প্রায় দেখাই যাচ্ছে না, ‘মার্কার ফ্ল্যাগ’ না লাগালে ফিরে আসতে অসুবিধে হবে। মার্কার ফ্ল্যাগ লাগাতে লাগাতে এগিয়ে চলল দুজনে। কয়েক ঘন্টা এগোনোর পর তারা এসে পৌঁছল একটা শৈলখন্ডের কাছে। এই জায়গাটি বিপজ্জনক, ‘বটলনেক’ বলে এই সরু অংশটি পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রীর একটা ঢালু গলিপথ, সেটার পর ফুলকপির আকারের হিমশৈল দেখতে পাওয়া যায়। বেশ কয়েকটা ‘ওভারহ্যাং’ পাথর পেরোতে হয়, তারপর ক্রিভাস বাঁচিয়ে খুব সাবধানে এগোতে হয়। এক পা এদিক ওদিক হলেই অবধারিত মৃত্যু। আগে বহু অভিযাত্রী এই অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু তারা দুজনেই অভিজ্ঞ, দড়ি ছাড়াই সেই অঞ্চলটি সাবধানে পেরিয়ে গেল তারা। আরো খানিকটা এগোতেই তাদের সামনে এসে উপস্থিত হল একটা বরফের দেওয়াল। খাড়া কয়েক হাজার ফুট ওপরে উঠে গেছে সেটা শৃঙ্গের দিকে। কে-টু’র হিমাচ্ছাদিত চূড়া হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাদের।

ক্র্যম্পনের ওপর ভর দিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে থামল গার্লিন্দা। আকাশ পরিষ্কার, খুব বেশি শীতও নেই আজ। তাপমাত্রা মাত্র মাইনাস তেইশ ডিগ্রী সেলসিয়াস। গত চার ঘন্টায় প্রায় হাজার ফুট ওপরে উঠে এসেছে তারা। সঙ্গী ফ্রেডরিক এরিকসনের নিশ্চিন্ত মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিল সে। তার চোখেও ঝলমল করছে আত্মবিশ্বাস। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়ার ওঠবার পথে আবহাওয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু, সেই বাধা যখন নেই, তাদের মত অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের কে-টু পাহাড়ের শিখরে পৌঁছতে খুব একটা সময় লাগবে না।

ফ্রেডরিক গার্লিন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ট্রে যদি মাঝরাস্তা থেকে নেমে না যেত তাহলে আরো তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতে পারতাম আমরা! বরফের ওপর ‘মার্কার ফ্ল্যাগ’ লাগাতেই প্রায় ঘন্টাখানেক দেরী হয়েছে।”

গার্লিন্দা কালো চশমাটা চোখে চেপে নিয়ে বলল, “সামনের খাড়াইটা কঠিন। ‘ফিক্সড রোপ’ ছাড়া এগোনো যাবে না। আমি আগে যাব না তুমি যেতে চাও?”

ফ্রেডরিক মুচকি হেসে বলল, “অবশ্যই আমি যাব। কে-টু’র মাথা থেকে স্কি করে নীচে নামার স্বপ্ন পূর্ণ হতে চলেছে আজ, আমি পিছনে থাকব ভেবেছ? আমি গিয়ে বরফে ‘আইস পিটন’ লাগিয়ে দড়ি ঝোলাচ্ছি, তুমি পিছন পিছন চলে এস।”

গার্লিন্দা আপত্তি করল না। গত কুড়ি বছর ধরে এই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখে চলেছে সে! সেটা অবশেষে সত্যি হবে আজ। মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে চায় সে। চূড়ায় ওঠা নিয়ে ফ্রেডরিকের যত না উত্তেজনা, তার চেয়ে অনেক বেশি সে মুখিয়ে আছে সেখান থেকে স্কিইঙ করে নীচে নামার জন্যে। পর্বতারোহী হওয়ার পাশাপাশি পেশাদারি স্কিয়ার সে, এই নতুন অভিজ্ঞতার জন্যেই সে কে-টু’তে উঠতে চেয়েছিল।

কোমরে লাগানো ‘ক্যারাভিনার’ থেকে দড়ি বের করে ক্র্যাম্পন জুতোর সাহায্যে বরফের পাহাড়ে উঠতে শুরু করেছে ফ্রেডরিক। শক্ত পাথরের মত হয়ে আছে এখানকার বরফ, আইস পিটন পুঁততে বেশ বেগ পেতে হবে তাকে। ক্লাইম্বিং হ্যামারের সাহায্য নিয়ে পিটন ঠুকে তার মধ্যে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিলে উঠতে শুরু করবে গার্লিন্দা। আইস এক্সের ওপর ভর দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল সে।

বরফের ওপর ‘ফ্রি ক্লাইম্ব’ করে অনেকটা ওপরে উঠে গেছে ফ্রেডরিক। প্রথম প্রথম ক্র্যম্পনের জুতোর কাঁটা দিয়ে ঠুকে ঠুকে গ্লেশিয়ারের বরফে উঠতে বেশ অসুবিধেই হয়, কিন্তু অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা কোন অবলম্বন ছাড়াই এভাবে একশো দুশ ফুট উঠে যেতে পারেন। প্রায় দুশ ফুট ওপরে গিয়ে ফ্রেডরিক কোমরের থলে থেকে আইস পিটন বের করে ঠুকতে শুরু করল। সময় লাগবে তার।

অপেক্ষা করতে করতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল গার্লিন্দা। এমন সময় আচমকা একটা আর্ত চিত্কার কানে আসতেই সে চকিতে মুখ তুলে তাকাল। কিছু বোঝার আগেই সে দেখল তার চোখের সামনে দিয়ে ফ্রেডরিকের অবলম্বনহীন দেহটা দ্রুত মাধ্যকর্ষণের টানে নীচের দিকে নেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত মাত্র! প্রায় হাজার ফুট নীচে গিয়ে শক্ত বরফের ওপর ধপ করে পড়ে গেল তার শরীরটা। গার্লিন্দার চোখের সামনে কয়েক মুহুর্তের মধ্যে তার বহুদিনের সঙ্গী, তার বিশ্বস্ত বন্ধু হারিয়ে গেল কে-টু পর্বতের বরফের মধ্যে, চিরতরের জন্যে।

ততক্ষণে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে গার্লিন্দা। চোখ খোলা অবস্থাতেও সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে রীতিমত। এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটে গেছে যে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। স্নায়ুতে অক্সিজেনের অভাব এতক্ষণ বোধ হয়নি, এইবার যেন আচমকা অনুভূতিগুলো ক্ষীণ হয়ে আসছে। যতক্ষণে সে নীচে নামবে, ফ্রেডরিকের রক্তাক্ত দেহটা হয়ত বরফে ঢেকে যাবে। শীতার্ত হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে নীচে নামতে শুরু করল গার্লিন্দা। পায়ের পাতাগুলো যেন বরফের মতই শক্ত হয়ে গেছে। ভয়ে শিথিল হয়ে আছে দেহের প্রতিটা রোমকূপ। প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়ে সে পিছন ফিরে দেখে নিচ্ছে! কোন স্বপ্ন কি মুহুর্তের মধ্যে এমন ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে?

অবসন্ন দেহ আর মন নিয়ে বেসক্যাম্পে ফিরেছিল গার্লিন্দা। পথে অন্য কোন ক্যাম্পেই সে থামেনি, যত তাড়াতাড়ি সে পাহাড় থেকে নেমে আসতে চাইছিল। অভিজ্ঞ রাল্ফ তাকে কোন প্রশ্নই করেনি, ট্রে আর পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কথা বলে ফ্রেডরিকের দেহটা নীচে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছিল সে।

বন্ধুর মৃত্যুর দুর্বিষহ স্মৃতি নিয়ে গার্লিন্দা ফিরে আসে দেশে। মাস তিনেক লেগেছিল তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে। ফ্রেডরিককে সে ভোলেনি। ততদিনে সে মনস্থির করে ফেলেছে। ফিরে সে যাবেই। এত সহজে যে হার মানবে না।

  ৬) ২০১১ সালের অগাস্ট মাস। এক বছর পর গার্লিন্দা আবার ফিরে আসে কে-টু জয় করবার উদ্দেশ্য নিয়ে। অনেকেই বারণ করেছিল, এমনকি রাল্ফও আটকানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কারো কথাকেই পাত্তা দেয়নি সে। সে ঠিক করল, এইবার অভিযান করবে চীনের নর্থ পিলারের রাস্তা দিয়ে, আগেরবারের দক্ষিণ দিকটা এড়িয়ে যাবে। সেই পথে উঠলে হয়ত ফ্রেডরিকের কথা ভেবে সে দুর্বল হয়ে উঠতে পারে! উত্তর দিক দিয়ে শৃঙ্গের পথ আরো অনেক কঠিন, রাল্ফ ছাড়া অন্যান্যরা তাকে পাগলই ঠাউরেছিল। কিন্তু শেষমেস সেই ঠিক হল। বেসক্যাম্পে এসে যোগ দিলেন কাজাভ পর্বতারোহী মাকসুদ জুভায়েভ ও ভ্যাসিলি পিভতসভ। তাছাড়াও দলে আছেন পলিশ অভিযাত্রী টমি ও দারেক জালুস্কি। শত বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের দুঃসাহসিক অভিযান শুরু হয়ে গেল। কিন্তু প্রথম পদেই বিপদের মুখে পড়ল সকলে। বেসক্যাম্প থেকে প্রথম ক্যাম্পে যাওয়ার পথে এমন তুষার পড়ল যে প্রায় কোমর পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় হাঁটা প্রচন্ড বিপজ্জনক, ধ্বস নামলে পরবর্তী একশ বছরেও তাদের দেহ উদ্ধার করা যাবে না।

উত্তরের দিকে তুষারপাত এমনিতেই তুলনায় বেশি হয়, অ্যাভালান্সের ভয়ও আছে। আবহাওয়া বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ‘ব্লিজার্ড’ অর্থাৎ তুষারঝড় আসারও সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আবহাওয়া বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা দরকার বলে রাল্ফ নেমে গেল নীচে, সেখান থেকে রেডিওর মাধ্যমে খবর জানাবে বাকিদের।

বহু কষ্টে এগোতে লাগল বাকিরা। পরবর্তী কয়েকদিনে তুষারঝড় খানিকটা কমল ঠিকই, কিন্তু প্রচন্ড শীত আর বরফের আধিক্যে কচ্ছপের গতিতে এগোতে হল তাদের। চতুর্থ ক্যাম্পে যখন এসে পৌঁছলো তারা, ক্লান্তিতে প্রত্যেকের শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। দুজনের থাকার তাঁবুতে গাদাগাদি করে পাঁচজন থাকা হচ্ছে! হিটার জ্বালিয়ে করা গরম জলে চুমুক দিতে দিতে পরের দিনের পরিকল্পনা করতে লাগল তারা।

চতুর্থ ক্যাম্পের খানিক পরেই একটা দীর্ঘ বরফের খাঁজ অথবা কোলর (couloirs) আছে বলে জানত সকলে। খুবই দুর্গম পথ, তাছাড়া একাধিক ক্রিভাস আছে বরফের ওপর। আলোচনা করে ঠিক করা হল বেসক্যাম্পে রাল্ফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। আকাশ পরিষ্কার থাকার দরুণ নিশ্চয়ই বাইনোকুলার দিয়ে পাহাড়ের খাঁজটা সামনে থেকে দেখতে পাবে সে, তার পরামর্শ মত এগোলে সুবিধেই হবে। তারা সামনে থেকে জায়গাটা না দেখতে পেলেও রেডিওর মাধ্যমে রাল্ফের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে সাবধানে।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পরের দিন এগোতে শুরু করল তারা। রাল্ফের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ করা ছিল, খুব ধীরে ধীরে জায়গাটা পেরিয়ে গেল প্রত্যেকে। কিন্তু এরপর আর এগোনো যাবে না। একে তো প্রচন্ড ক্লান্ত তারা, তারপর আবার তুষারঝড় আরম্ভ হয়ে গেছে। কোন বিকল্প না দেখে ৮৩০০ মিটারের উচ্চতায় বরফের ভিতর পঞ্চাশ ফুট মত গর্ত করে টেন্ট খাটানো হয়। ঠেসাঠেসি করে সেখানে বসে রইল সকলে।

এক একটা মিনিট এক এক ঘন্টার মত মনে হচ্ছে। অক্সিজেনের অভাব, শীত, আর আলপাইন ক্লাইম্বিং-এর প্রচন্ড পরিশ্রম তাদের সকলকেই গ্রাস করেছে। এরকম অবস্থায় পড়লে বাড়ির কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে আত্মীয়স্বজনের কথা। কিন্তু তাও পাহাড়চূড়ায় পৌঁছনোর কল্পদৃশ্যটা এক এক বার ঝলক দিয়ে যায় মানসপটলে। এত বিপদের পরেও কেউ পিছু ফিরতে রাজী নয়। ডাউনস্যুটে জড়সড় হয়ে বসে থাকা পাঁচজন মানুষ একপাত্রে জল গরম করে, কষ্টে সৃষ্টে খানিক স্যুপ করে চুমুক দিচ্ছে। কয়েক ঘন্টার কথা, কিন্তু শীত যেন আরো বেড়ে চলেছে। ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি যাতে হারিয়ে না যায়, সেইজন্যে দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গকে সচল করে রাখতে হয় কয়েক মুহুর্ত পর পর।

রাত দেড়টায় গার্লিন্দা আর দারেক রওনা দিল, কিন্তু শীতের কামড়ে তারা ফিরে আসতে বাধ্য হল। হাত আর পায়ের আঙ্গুলে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, শীত না কমলে কোনক্রমেই বাইরে বেরোনো যাবে না। অবশেষে সকাল সাড়ে সাতটায় আবার শৃঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা দিল তারা। দমভাঙ্গা পরিশ্রমের পর চূড়ার কাছাকাছি এসে পৌঁছল চারজন। দারেক আর মাকসুদরা এগিয়ে গেছে, কিন্তু গার্লিন্দার সমস্ত শক্তি যেন শুষে নিয়েছে কেউ। অবসন্ন দেহে সে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। এক একটা পা ফেলতে গিয়ে মনে হচ্ছে ফুসফুসটা বুকের ভিতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসবে! হয়ত ফ্রেডরিকের মত মৃত্যুই অপেক্ষা করে আছে তার জন্যেও!

এমন সময় আচমকা পথ শেষ হয়ে গেল। সামনে তাকিয়ে দিগন্ত দেখতে পেল গার্লিন্দা। পাহাড়ের শিখরে এসে পৌঁছেছে সে, নীচের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পাচ্ছে বরফের চাদর জড়িয়ে থাকা অসংখ্য পর্বতশৃঙ্গ তাকিয়ে আছে তার দিকে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে পড়তে গার্লিন্দা বলল, “ফ্রেডরিক, আমরা পেরেছি….”

এরপরেও থেমে থাকেননি গার্লিন্দা কারলেটব্রুনার। সারা পৃথিবীর নানান শৃঙ্গে অভিযান করেছেন বার বার। তিনি একমাত্র মহিলা যিনি অতিরিক্ত অক্সিজেন না নিয়েই চোদ্দটি ‘এইট থাউজ্যান্ডার্স’ পর্বতশৃঙ্গ জয় করেছেন। তার আগে কেউই এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেননি। তার লেখা বই ‘মাউন্টেন্স ইন দ্য হার্ট’ অসংখ্য পাঠককে অনুপ্রেরণা দিয়েছে, ভালবাসতে শিখিয়েছে পাহাড়কে। পাহাড়ে ওঠায় থাকা বিপদের আশঙ্কা আর ঝুঁকির কথা জিগ্গেস করলে তিনি হাসেন।

তারই কথায়, “this is our world; it’s the way we want to live. If the mountains are calling me, how can I not go?”

স্মরণীয় যাঁরা সব এপিসোড একত্রে

                            

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s