স্মরণীয় যাঁরা স্ট্যান ‘এক্সেল্সিওর’ লি সুদীপ চ্যাটার্জি বসন্ত ২০১৯

‘আমরা সবাই সুপারহিরো’-স্ট্যান ‘এক্সেল্সিওর’ লি

সুদীপ চ্যাটার্জি

স্কুলের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় অঙ্কে কুড়ি পেয়েছে ভুটু। ইংরেজিতে সাতাশ। ক্লাসে স্যার যাচ্ছেতাই কথা শুনিয়েছেন তাকে। বাড়িতে এসে আরেকপ্রস্থ ধমক ধামক। বাবার হাতে চড় চাপড়ও খেতে হয়েছে। মা তাকে বকতে বকতে নিজেই কেঁদে ফেলেছে। সে যে ড্রয়িং এ একানব্বই পেয়েছে সেটার কথা কেউ বলছেও না। ক্লাসের বন্ধুগুলোও এত বাজে, কথায় কথায় তার মাথায় চাঁটি মারে। ভুটুর ভালো নাম যে অতীশ, সেটা জানলেও সারাক্ষণ ‘ভুটু সর্দার’ বলে তার পিছনে লাগে। কি করে জানি বাড়ির ডাকনামটা জেনে গিয়েছিল তার বন্ধু সন্তু। তখন থেকেই। ভুটুর মন একেবারেই ভালো নেই। মনের দুঃখে ছাদের অন্ধকারে এসে বসে ছিল সে। এই রকম করে বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না। এমন সময় আলোর একটা উজ্জল রেখা এসে ছাদটা আলোকিত করে দিল। ভুটু অবাক হয়ে দেখল আলোর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে খয়েরি কোট আর কালো চশমা পরা একজন মানুষ। তার মুখে চওড়া হাসি। নাকের নীচে মস্ত গোঁফ।  ভুটুর চিবুকে হাত দিয়ে বললেন,  “এই তো।  পেয়ে গেছি। “

ভুটু অবাক হয়ে জিগ্গেস করল, “কী পেয়ে গেছেন?  আপনি কে? “

লোকটা বলল, “আমি স্ট্যান লি।  আরে অন্য গ্রহ থেকে এলিয়েনরা এসে আক্রমণ করেছে।  ওদের মোকাবিলা করতে গেছে আমার সুপারহিরোর দল।  অ্যাভেঞ্জারদের দলে একটা ছেলে কম পড়ছে।  তোমাকে পেয়ে গেছি।  ব্যাস।  আজ থেকে তোমার নাম ভুটুম্যান। “

ভুটু ক্যাবলার মত তাকিয়ে বলল, “আমি সুপারহিরো?  আমার চোখে চশমা।  গায়ে জোরও নেই।  অঙ্কেও খুব খারাপ।  আমার তো কোন সুপারপাওয়ারই নেই। আমি তো সকলের মতন সাধারণ। ” লোকটা মুচকি হেসে বলল,  “তুমি খুব সাধারণ, সেই জন্যেই তো তুমি অসাধারণ। সাধারণ মানুষদের মধ্যেই আসল সুপারহিরোরা লুকিয়ে থাকে। আমার চেয়ে ভালো সেটা কেউ জানে না। চললুম। আজ থেকে তুমি সুপারহিরো। এক্সেলসিওর। “

ওপরের গল্পটা নিছক গল্পই। কিন্তু বাস্তবটা খুব একটা অন্যরকম নয়। ২০১৮ সালে সুপারহিরোদের নিয়ে যে বিশ্বজোড়া উন্মাদনা, তার অনেকটাই স্ট্যান লি তৈরি করেছেন সাধারণ মানুষের গল্প বলে।

১৯২২ সালে জ্যাক আর সেলিয়া লিবারের বাড়িতে জন্ম হয়ে স্ট্যান লির। ভালো নাম স্ট্যানলি মার্টিন লিবার। জ্যাক লিবারের তেমন কোন রোজগার ছিল না, মাঝে মাঝে দর্জির ছোটখাটো কাজ করে দিন চলত। ছেলেবেলা থেকেই অভাবের সংসার, ১৯২৯ সালে মন্দার পর পয়সার অভাবে ব্রঙ্কস অঞ্চলের তিনতলার একটা ছোট্ট ঘরে উঠে যেতে হয় লিবার পরিবারকে।

স্ট্যান আর তার ভাই ল্যারি ভাই তখন স্কুলে যেতে শুরু করেছে। পড়ালেখায় মেধাবী হলেও স্ট্যান প্রচন্ড মুখচোরা। ক্লাসের অন্য ছেলেরা যখন বন্ধুবান্ধব নিয়ে হুল্লোড় করে ছোট্ট স্ট্যান পাল্প ফিকশনের সস্তা ম্যাগাজিনে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকে। সেই সময়ে এরোল ফ্লিন বলে একজন অভিনেতা  পর পর অ্যাডভেঞ্চার সিনেমাতে কাজ করে নাম করেছেন, স্ট্যান তার অন্ধ ভক্ত হয়ে পড়লো। তিনতলার ছোট্ট ঘরের জানলা থেকে বাইরে কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু স্ট্যানের কল্পনার জগৎ তখন বহুদূরে ছড়িয়ে পড়েছে। তাকে বইয়ের নেশা এমন করে পেয়ে বসেছে যে স্কুলের পড়া হুড়মুড় করে শেষ করে সে একটা না একটা বই নিয়ে বসে পড়ে। পড়তে পড়তে নানা বিষয়ে তার জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা দুইই বেড়েছে, মাত্র  দশ বাঁচার বয়সে স্ট্যান কোনান ডয়েল  আর মার্ক টোয়েনের পাশাপাশি শেক্সপিয়ার পড়তে শুরু করে দেয়।    

পনেরো বছর বয়সে নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন সংবাদ পত্রিকা হাই স্কুল ছাত্রদের জন্যে একটা রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সপ্তাহের সবচেয়ে বড় খবর নিয়ে লিখতে হবে ছাত্রদের। আসল উদ্দেশ্য অবশ্য লেখার গুণ পরখ করা। আকর্ষণীয় ভাবে লিখতে পারলে ছোট্ট একটা ঘটনাও সবচেয়ে বড় খবর হয়ে যেতে পারে সংবাদপত্রের দুনিয়ায়। কিশোর স্ট্যানের হালকা লেখালিখির অভ্যেস আগেই ছিল। সে এই প্রতিযোগিতায় লেখা পাঠায় এবং পর পর তিন বার প্রথম পুরস্কার পেয়ে যায়। নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনেইর সম্পাদক স্ট্যানের উচ্ছসিত প্রশংসা করেন এবং তাকে আরো নিয়মিত ভাবে লেখালিখি করতে বলেন।

কিশোর স্ট্যানের মনে সেই সময়ে লেখালিখি নিয়ে যেই আগ্রহ জন্মায়, সেই আগ্রহই তাকে পরবর্তী সত্তর বছর ধরে লিখিয়ে চলেছে। সেই সময়ে স্ট্যানের ইচ্ছে ছিল সে একদিন এক আমেরিকান ক্লাসিক লিখে লোকদের তাকে লাগিয়ে দেবে, কিন্তু নিয়তির বিধানে তাকে নিয়ে অন্য পরিকল্পনা করা ছিল।

সতেরো বছর বয়সে হাইস্কুল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই স্ট্যান খুচরো লেখালিখির কাজে হাত পাকাতে থাকে। কোথাও সমাধিফলক লিখছে, কোথাও বিজ্ঞাপনের খসড়া লিখছে। এরই মাঝে এক পরিচিতের কথায় সে মার্টিন গুডম্যানের টাইমলি পাবলিশিং কোম্পানিতে অফিস ‘গোফার’ হিসেবে যোগ দেয়। গোফারদের আসল কাজ ছিল খুচরো লেখালিখি, পত্রিকার নিয়মিত লেখকেরা ব্যস্ত থাকায় নতুন ছেলেদের টুকিটাকি লিখতে গোফার হিসেবে নেওয়া হত। কাজ না থাকলে তার কালির দোয়াতে কালী ভর্তি করত, লেখক আর সম্পাদকদের কফি দিত, বলা ভালো লেখা ছাড়া আর সব কাজই করত। মার্টিন গুডম্যান তখন কয়েকটি পাল্প ফিকশন পত্রিকা চালিয়ে নাম করেছেন। সস্তা কিন্তু ক্রাইম আর নায়ক-নায়িকা-গুন্ডাদের নিয়ে চালানো এই পত্রিকাগুলো নিউইয়র্কে বহু লোকে পড়ত সে কালে। মার্টিন গুডম্যান তার পাশাপাশি কমিক্সের একটি বিভাগ আরম্ভ করে দিলেন তার টাইমলি পাবলিশিং পত্রিকায়।   

স্ট্যান লির হাতে তেমন কোন কাজ নেই। তার কমিক্সে লেখার তেমন আগ্রহ নেই, খালি সময় বাঁশি বাজায় আর লোকজনদের ব্যবহার দেখে তার ভবিষ্যতের ক্লাসিক উপন্যাসের চরিত্র গঠন করে। লেখক হতে গেলে যে দেখার চোখ চাই, এই মন্ত্র মাথায় রেখে সে শ্যেন দৃষ্টিতে পাবলিশিং এর কাজকর্ম বোঝার চেষ্টা শুরু করে দিল। কি কাজ হচ্ছে, কোন কাজটা পাঠকে পছন্দ করছে, কোনটা সম্পাদক ছাপতে চাইছেন না, সব তার ক্ষুরধার স্মৃতিতে আঁকা হয়ে যেতে লাগল।

এমন সময় কার্টুনিস্ট জো সাইমন আর জ্যাক কিরবি ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’ বলে একটা চরিত্র তৈরি করে ফেললেন কমিক্স বিভাগের জন্যে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপনা করা হলো এই সুপারহিরোর। কিন্তু প্রথম দুটো সংখ্যা লেখার পরেই কিরবি অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কমিক্সের তেমন চাহিদা নেই, নতুন চরিত্র এনে হাজির করতেই অনেক সময় যায়, তারপর তাকে নিয়ে ক্রমাগত একের পর এক গল্প লিখতে গেলে অন্য কাজে মন দেওয়া চলে না। ছবির সঙ্গে আগে থেকে ঠিক করা গল্পের সংলাপ লিখে দিতে ডাক পড়লো স্ট্যান লির। কাজটা সে করলো বটে কিন্তু তাতে তার মন ভরলো না। তাকে লেখক হতে হবে, এইসব ছুটকো কমিক্স লিখলে পরবর্তী কালে সম্পাদকরা তাকে পাত্তা নাও দিতে পারে! তার ওপর গল্পটা তার মনঃপুত হয়নি। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব আছে। কিন্তু তার আর করার কি আছে? সপ্তাহে আট ইউরো করে পাচ্ছে, হুকুম মত কাজ করতে হবে।

ক্যাপ্টেন আমেরিকা অবশ্য স্ট্যান লিকে নিষ্কৃতি দেয়নি। একচল্লিশ সালেই সাইমন আর কিরবি দুজনেই ইস্তফা দিলেন মার্টিন গুডম্যানের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায়। মার্টিন গুডম্যান নতুন লোক না নিয়ে উনিশ বছরের স্ট্যান লিকে সোজা কমিক্স বিভাগের সম্পাদকের পদে আসীন করে দিলেন। কিশোর ছেলেটার গল্প আর চরিত্র নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার ইচ্ছেটা তাকে প্রভাবিত করেছিল।

প্রায় একবছর ধরে স্ট্যান ক্রমাগত ক্যাপ্টেন আমেরিকার গল্প লিখে চলে। সঙ্গে সৃষ্টি হয় ডেস্ট্রয়ারের মত চরিত্র। কিন্তু লেখার চেয়ে ব্যাবসার বাড়ন্তের দিকেই বেশি নজর ছিল স্ট্যানের। মার্টিন সাহেবের সুনজরে পড়ে তার মাইনে বেড়েছে ঠিকই কিন্তু কমিক্স লিখতে সে চায় না। ইতিমধ্যে আসল নাম ব্যবহার না করে সে শুধু ‘স্ট্যান লি’ নামটা ব্যবহার করেছে কমিক্সের লেখক হিসেবে যাতে বই লিখলে কমিক্স লেখকের  সাথে একজন ভবিষ্যতের ক্লাসিক লেখককে পাঠকেরা গুলিয়ে না ফেলে।  

১৯৪২ সালে আমেরিকা পুরোপুরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেমে পড়ে। ইচ্ছে না থাকলেও স্ট্যান লিকে মার্কিন সেনায় যোগ দিতে হয়। প্রথমে সিগন্যাল কর্পসে টেলিগ্রাফ পোল মেরামতির কাজ, তারপর ট্রেনিং ফিল্ম ডিভিশনে গিয়ে ম্যানুয়াল, স্লোগান প্রভৃতি লেখার পাশাপাশি স্ট্যান লি চিঠির মাধ্যমে ক্রমাগত লিখে যেতে থাকে টাইমলি কমিক্সের নানা সিরিজে। যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতার ছায়া এসে পড়ে ক্যাপ্টেন আমেরিকার নানা গল্পের মধ্যে। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হতে স্ট্যান লি ফিরে এসে আবার লেখালিখি শুরু করে। কিন্তু এই কয়েক বছরে কমিক্সের দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে ন্যাশনাল কমিক্স পাবলিকেশন। সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, হকম্যান, ওয়ান্ডারওম্যান একের পর এক সুপারহিরো এসে পাঠকদের প্রিয় হয়ে উঠেছে। হইহই করে কমিক্স বিক্রি হচ্ছে তাদের, তুলনায় টাইমলি কমিক্সে নতুন চরিত্র যোগ হয়নি বললেই চলে। যুদ্ধের বাজারে ব্যাবসা বাঁচাতে বহু টাকা খসাতে হয়েছে ইহুদি মার্টিন কোলম্যানকে।

পঞ্চাশের দশকে কোম্পানির নাম পাল্টে অ্যাটলাস কমিক্স করে দেন গোল্ডম্যান। ততদিনে স্ট্যান বিয়ে করেছেন জোয়ান কোলম্যানকে, এক ছেলে এক মেয়ের বাবা হয়েছেন। পরিবারের দায়িত্ব নির্বাহ করতে স্ট্যান লি মার্টিন সাহেবের কথা মত একের পর এক কমিক স্ট্রিপ লিখছেন, কিন্তু কিছুতেই তার তৃপ্তি হচ্ছে না। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কমিক্স কোড অথোরিটি বসানো হয়েছে, গতানুগতিক ছেলেমানুষি লেখার বাইরে কমিক্সে কিছু বাস্তববাদী কথা বলতে গেলেই সি সি এর তরফ থেকে চিঠি চলে আসে। স্ট্যানের মন খারাপ, কমিক্সের জগৎ ছেড়ে অন্য কাজ করবেন, বই লেখাতে মনোনিবেশ করবেন, এই সব ভাবছেন, ইতিমধ্যে একটা ছোট ঘটনা ঘটে যাওয়াযা তার জীবনের মোড় ঘুরে গেল আবার।

ন্যাশনাল কমিক্স ততদিনে নিজেকে ডিসি কমিক্স বলতে শুরু করেছে। সুপারহিরো ‘ফ্ল্যাশ’ এর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে তারা সব সুপারহিরোদের নিয়ে ‘জাস্টিস লিগ অফ আমেরিকা’ বলে একটা কমিক্স প্রকাশিত করে বসল। আমেরিকার লোক তখন সদ্য টেলিভিশনের স্বাদ পেয়েছে, কমিক্সে তাদের রুচি কমে এসেছিলো কিন্তু জাস্টিস লিগ গরম কচুরির মতন বিক্রি হতে শুরু করলো মার্টিন কোলম্যান স্ট্যান কে ডেকে নির্দেশ দিলেন, ডিসির সমকক্ষ হওয়ার জন্যে নতুন চরিত্র, নতুন লেখার দরকার। স্ট্যানকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে লেখার ব্যাপারে।

স্ট্যান স্ত্রীর পরামর্শে নতুন উৎসাহে কাজ শুরু করলেন। কমিক্স বলেই ফ্যালনা নয়, একটা কমিক্সও ক্লাসিক হয়ে যেতে পারে লেখার গুণে। এই বিশ্বাসে ভর দিয়ে স্ট্যান লির মাথায় নতুন গল্প, নতুন চরিত্ররা ভিড় করতে শুরু করলো।  ততদিনে জ্যাক কিরবি ফিরে এসেছেন পুরোনো কোম্পানিতে। দুজনের একনিষ্ঠ চেষ্টায় তৈরি হলো ফ্যান্টাস্টিক ফোর। বাজারে ছাড়তেই ফ্যান্টাস্টিক ফোর মন জয় করে নিল পাঠকদের। স্ট্যান লি দ্বিগুণ উৎসাহে নতুন চরিত্রদের নিয়ে কাজ শুরু করলেন। ডিসির হিরোদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা তার নায়কেরা, সাধারণ মানুষ যারা বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়ে হিরো হয়ে উঠছেন। হাল্ক, থর, ডেয়ারডেভিল, এক্স মেন, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ একের পর এক নায়ক আসছে স্ট্যান লি আর কিরবির হাত ধরে আর পাঠকের মন জয় করে নিচ্ছেন।

তখন আমেরিকার সঙ্গে শীত যুদ্ধ চলছে সোভিয়েটি ইউনিয়ন। পুঁজিবাদ বনাম সাম্যবাদের আলোচনায় বাজার গরম হয়ে উঠেছে। এমন সময় স্ট্যান লি কলম থেকে উদয় হলো আইরন ম্যান। বিশাল বড়লোক, ব্যাবসাদার, অহঙ্কারী অথচ একটা দুর্ঘটনায় সে হয়ে উঠলো সুপারহিরো। বাস্তবের সঙ্গে কতটা পরিচিতি থাকলে এইরকম একটা চরিত্রের সৃষ্টি আর পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তাকে নিয়ে লেখা সম্ভব হয়ে, যে না পড়েছে তাকে বলে বোঝানো কঠিন। কিন্তু তখনও স্ট্যান লির তুরুপের তাস বাকি।  

একদিন স্ট্যান লি এসে মার্টিন কোলম্যানকে বললেন যে আমেরিকান এক কিশোরকে নিয়ে তিনি নতুন এক সুপারহিরো সিরিজ শুরু করতে চান। স্কুল আর বাড়ি, কিশোর ছেলের বন্ধু বান্ধব, হতাশা, সাফল্য আর নিয়তির সামনে বার বার হেরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। গল্পের প্লট শুনে মার্টিন কোলম্যান সোজা না করে দিলেন। এরকম উদ্ভট সৃষ্টি ভিলেনদের জন্যে, হিরোদের জন্যে না। লোকে পড়বে তো নাই, এতো কষ্টে অন্য চরিত্রগুলো দাঁড় করানো হয়েছে সেগুলোও হোঁচট খেয়ে পড়বে। কিন্তু স্ট্যান নাছোড়বান্দা। বিপক্ষের বহু আলোচনা সত্ত্বেও নিজের দায়িত্বে প্রকাশিত হলো সেই গল্প আর স্ট্যান লি আর মার্ভেলের সঙ্গে কমিক্স দুনিয়ার প্রিয়তম চরিত্র হয়ে উঠল পিটার পার্কার ওরফে স্পাইডারম্যান।

মাকড়শার কামড়ের এমন সাইড ইফেক্ট কোলম্যান স্বপ্নেও ভাবেননি। স্ট্যান্ডে আসার আগেই স্পাইডারম্যানের সব কপি শেষ হয়ে যাচ্ছে। টেলিভিশন থেকে ফোন করছে লোকজন এনিমেশন তৈরি করার জন্যে, স্কুলের ছেলেমেয়েদের ব্যাগে স্পাইডারম্যানের কমিক বুক। মাকড়সা দেখলে লোকে ঘেন্নায় রি রি করে উঠত, এবার দেখা যেতে লাগলো পকেটে করে মাকড়সা নিয়ে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। কী কান্ড! ওইদিকে ডিসি কমিক্সও নড়েচড়ে বসেছে। একটা স্কুলের বেঁটেখাটো চশমা পরা ছেলে কী করে অন্য গ্রহ থেকে আসা দৈবী শক্তিধারী সুপারম্যান আর অন্যান্য নায়ককে টেক্কা দিচ্ছে বিক্রিতে, সেটা তারা অনেক ভেবেও বুঝতে পারল না।  

স্ট্যানকে আর পিছনে ঘুরে তাকাতে হয়নি। বাস্তবকে কলমে তুলে ধরতে কোনদিন ভয় পায়নি সে। অ্যাভেঞ্জার্স সুপারহিরো টিম, ব্ল্যাক ইউডো, ব্ল্যাক প্যান্থার একের পর এক ব্যতিক্রমী চরিত্রে মন জয় করে নিয়েছে তার কলম। নতুন ছেলেমেয়েদের নতুন ভাবনাকে সম্মান দিয়ে চরিত্ররা পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে নিয়েছে কমিকসের জগতে। সত্তরের দশকে বাস্তববাদী লেখাকে সম্মান দিতে কমিক্স কোড অথরিটিকে অনুরোধ করেন স্ট্যান। তার কথা মেনে নিয়ে কমিক্স কোডের পরিবর্তন করা হয় আধুনিক সাহিত্যের প্রেক্ষিতে।

এর পর প্রায় নব্বই সাল অব্দি অনবরত লিখে গেছেন স্ট্যান লি। পঞ্চাশের দশকের অ্যাটলাস কমিক্স তখন মার্ভেল কমিক্স নাম বিখ্যাত। কমিক্স লেখা কবে সে সাহিত্যের মূলধারায় ঢুকে গেছে তার হাত ধরে তার নিজেই জানা নেই।

নব্বই সালের পর থেকে কমিক্সের বিক্রি অনেকটাই কমে আসে। নতুন প্রযুক্তি, টেলিভিশন, ভিডিও গেমের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ধুঁকতে থাকে কমিক্স জগৎ। মুনাফা বাড়াতে টেলিভিশনে মার্ভেলের চরিত্রগুলো নিয়ে কাজ করার চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু ‘হাল্ক’ ছাড়া কোন ধারাবাহিকই জনপ্রিয় হয়নি।  স্ট্যান লি তখন যদিও অবসর নিয়েছেন মার্ভেল থেকে, কিন্তু কোম্পানিতে তার যথেষ্ট প্রভাব আছে। রোনাল্ড পেরালমেন ১৯৯৬ সালে মার্ভেলকে দেউলিয়া প্রচার করে বিক্রি করে দেন টয় বিজ গ্রূপকে। স্ট্যান লিকে ফোন করে রোনাল্ড পেরালমেন আর কোম্পানির নতুন মালিক আভি আরিদ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার মনোভাব জানতে চাইলে স্ট্যান বলেন, “শুধু এইটুকু মনে রেখো যে কোন সময় যে কোন মানুষ সুপারহিরো হয়ে উঠতে পারে। যারা নতুন, যারা এখনো কিছু প্রমাণ করে উঠতে পারেনি, তাদের কথা শুনো। তাদের সুযোগ দিও। নতুন প্রযুক্তি আসছে। সময় ঘুরবে। “

পরবর্তী কুড়ি বছরের মধ্যে যে সময় এতটা ঘুরে যাবে সেটা অবশ্য স্ট্যান নিজেও ভাবেননি। ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন নানা জাজ নিয়ে। শিশুদের নিয়ে সমাজ সংস্কারের নানা দায়িত্ব, নানা জায়গায় লেখালিখি, সারা বিশ্বজুড়ে ‘কমিক কন’ ফেস্টিভ্যালে কমিক্সের শিল্পী ও পাঠকদের মনোযোগী ও উৎসাহী করে তুলতে সময় কেটে যাচ্ছিলো। এই কয়েক বছরে তিনি কমিক্স দুনিয়ার ঈশ্বরের জায়গা নিয়েছেন। তার চিত্তাকর্ষক কথা শুনতে বহু লোকে আগ্রহী, তার অনলস ও সদাহাস্যময় ব্যক্তিত্বের সামনে এলেই সকলের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ‘এক্সেলসিওর’; স্ট্যান লির এই স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সারা দুনিয়ায়।  

ইতিমধ্যে মার্ভেলের ‘স্পাইডারম্যান’ আর ‘ব্লেড’ সাড়া ফেলেছে হলিউডের সিনেমায় , কিন্তু তাতে আর্থিক ভাবে কোম্পানির কোন লাভই হয়নি। স্পাইডারম্যানের দুটো সিনেমা প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, কিন্তু মার্ভেল এন্টারপ্রাইজ মাত্র সাতষট্টি মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। এমন সময় নতুন এক ছেলে এসে আভি আরিদের সঙ্গে দেখা করতে চায়। আভি আরিদ সম্মতি দেয়। মাইসেলের বয়স বেশি নয়, অভিজ্ঞতাও নেই তেমন কিন্তু স্ট্যান লির কথাগুলো আরিদের মাথায় থেকে গেছে। যে কোন সাধারণ মানুষ সুযোগ পেলে সুপারহিরো হয়ে যেতে পারে।

মাইসেলের পরামর্শ ছিল এক লাইনের।

“সিনেমাগুলো নিজেরাই প্রযোজনা করুক মার্ভেল। “

পরামর্শটা স্বীকার করে কাজে লাগিয়ে ছিল আরিদ। প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে মার্ভেল ২০০৮ সালে যখন ‘আইরন ম্যান’ প্রয়োজনা করে, তারা বুঝতে পেরেছিলো এটাই তাদের শেষ সুযোগ। আধুনিকতম প্রযুক্তির ব্যবহার করতে প্রায় সব টাকা ঢেলে দেওয়া হয়েছে যাতে কোন খুঁত না থাকে। রবার্ট ডাউনি জুনিয়ারকে নেওয়ার ঝুঁকি আরও মারাত্মক, ড্রাগ নিয়ে বার ছয়েক জেলে গেছে নব্বইয়ের দশকে। কয়েকটা ছোটমোট চরিত্র ছাড়া কোথাও সুযোগ পায়নি। তাকে সুপারহিরো চরিত্রে নেওয়ার ফল হিতে বিপরীত হতে পারে। কিন্তু স্ট্যান লির কথা মনে গেঁথে ছিল মার্ভেলের সকলের মনে। যারা এখনো কিছু প্রমাণ করে উঠতে পারেনি, তাদের সুযোগ দিও। যে কোন সাধারণ মানুষ সুযোগ পেলে সুপারহিরো হয়ে যেতে পারে।

আয়রন ম্যান মুক্তি পেতেই যাবতীয় রেকর্ড ভেঙে দেয়। রবার্ট ডাউনি জুনিয়ার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যান এক সপ্তাহের মধ্যে। এর পরের ইতিহাস সকলের জানা। একের পর এক সুপারহিরো সিনেমা বানিয়ে মার্ভেল এন্টারটেইনমেন্ট জনপ্রিয়তার শিখরে চলে গেছে। আঠারোটা ছবিতে প্রায় পনেরো বিলিয়ন ডলার আয় করেছে তারা। বিশ জুড়ে তুমুল উন্মাদনা প্রতিটি সিনেমা নিয়ে, পাশাপাশি কমিক্স আর মেমোরিবিলিয়া বিক্রি হচ্ছে হইহই করে। ক্যাপ্টেন আমেরিকা থেকে ব্ল্যাক প্যান্থার, স্পাইডারম্যান থেকে ক্যাপ্টেন মার্ভেল, অ্যান্ট ম্যান থেকে অ্যাভেঞ্জার প্রতিটাই সাধারণ মানুষের অসাধারন হয়ে ওঠার কাহিনী। এর প্রতিটাতেই স্বভাবসুলভ হাস্যময়তা নিয়ে বৃদ্ধ স্ট্যান লি অভিনয় করে গেছেন ক্যামিও রোলে।

স্ট্যান লি গত সত্তর বছরে সাধারণ মানুষকে যেরকম করে সুপারহিরো হতে শিখিয়েছেন, সেটাই আসলে একটা ক্লাসিক উপন্যাসের সামিল। পঁচানব্বই বছর বয়সে মৃত্যুকে সামনে দেখেও এই চিরকিশোর নির্দ্বিধায় বলে উঠতে পারেন, “এক্সেলসিওর। আমরা সবাই সুপারহিরো। ” 

স্মরণীয় যাঁরা সব এপিসোড একত্রে

                            

2 Responses to স্মরণীয় যাঁরা স্ট্যান ‘এক্সেল্সিওর’ লি সুদীপ চ্যাটার্জি বসন্ত ২০১৯

  1. Mousumi Ghosh বলেছেন:

    ভালো লাগলো। অনেক অজানা তথ্য সামনে এলো।

    Like

  2. Shahriar বলেছেন:

    দারুণ

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s