স্মরণীয় যাঁরা কান্‌হোজি আংরে উমা ভট্টাচার্য বসন্ত ২০১৭

স্মরণীয় যাঁরা সব পর্ব একত্রে

smaron01-medium

১৯৬৯ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি। বাংলার দুই দুঃসাহসী যুবক একটি সাদামাঠা নৌকায় কোলকাতা জেটি থাকে যাত্রা শুরু করলেন। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গ ভেঙে এই সাধারণ নৌকায় করে ১০০০ মাইল জলপথ পাড়ি দেওয়াই উদ্দেশ্য তাঁদের।এই দুই যুবক হলেন পিনাকীরঞ্জন চ্যাটার্জী আর জর্জ অ্যালবার্ট ডিউক। তাঁদের নৌকাটি কেমন ছিল জান?শুনলেই বোঝা যাবে কতটা দুঃসাহসী আর অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ছিলেন দু’জন।নৌকাটি ছিল কুড়ি ফুট লম্বা, সাড়ে পাঁচ ফুট চওড়া আর উচ্চতায় ছিল মাত্র সাড়ে চার ফুট।উচ্ছল তরঙ্গবহুল সমুদ্রে পালছাড়া নৌকার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য দু’ধারে বেঁধে নিয়েছিলেন দুটি বায়ুপূর্ণ কাঠের বাক্স। ৬ই মার্চ তাঁরা ১০০০মাইল পথে পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষে পৌঁছে সেই ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রা শেষ করে বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন।তাঁদের সম্বল ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাস, আর নীতি ছিল ‘ডু অর ডাই’-তাই তাঁদের নৌকার নাম দিয়েছিলেন তাঁদের মতই  দৃঢ়চেতা, দুঃসাহসী, সফল মারাঠা অ্যাডমিরাল কান্‌হোজি আংরের নামে। তাঁদের অভিযানের বাহনটির নাম ছিল ‘কান্‌হোজি  আংরে’।

কান্‌হোজি আংরে ছিলেন শিবাজির পুত্র শম্ভাজির সময়ের মারাঠা নৌসেনাধ্যক্ষ।আরব সাগরের তীরে শিবাজি স্থাপিত বিখ্যাত সুবর্ণ দুর্গের সামান্য একজন কর্মচারী থেকে নিজের সাহস, দক্ষতা আর কৌশলে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন এক বিখ্যাত সমুদ্রপুরুষ। ভারতের পশ্চিম উপকূলের তটরেখা ধরে ঔপনিবেশিকদের আগ্রাসন প্রতিরোধকারী এক সৈনিক। সপ্তদশ শতকের শেষার্ধ থেকে তাঁর জীবিতকালে তিনিই ছিলেন ভারতের সর্বপ্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী, যিনি একসঙ্গে টক্কর দিয়েছিলেন জলপথে  আসা ইউরোপীয় দুর্ধর্ষ সামুদ্রিক আগ্রাসনকারীদের সঙ্গে,অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে দখলদার ইংরেজ আর মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে। জীবনে তাঁর কোন  অভিযান অসার্থক হয়নি। জলপথে তিনি যুদ্ধ করেছেন পর্তুগিজ,ডাচ,ও বৃটিশের বিরুদ্ধে। জলপথে যারা ছিল অত্যন্ত সফল তাঁদের স্বার্থহানি ঘটাতে তিনি তৈরি করেছিলেন এক সুদক্ষ নৌবহর- মারাঠা নেভি। এর আদর্শেই পরবর্তীকালে ইংরেজ শাসকেরা বোম্বাইতে স্থাপন করেছিলেন ইন্ডিয়ান নেভি-ভারতীয় নৌসেনাবিভাগ।

ঔপনিবেশিক ইংরেজের যে অপূরণীয় ক্ষতি তিনি করেছিলেন তার জন্য ইংরেজ ও অন্যান্য বিদেশী শত্রুরা তাঁকে জলদস্যু আখ্যা দিয়েছিল।তিনিই আধুনিক ভারতের প্রথম সফল নৌব্যক্তিত্ব যিনি আরবসাগরের বুকে বিদেশীদের আধিপত্য,ও দখলদারি ক্ষুণ্ন করেছিলেন।

মহারাষ্ট্রের পুণে থেকে ছ’মাইল দূরে অংগারওয়াদি গ্রামের এক শঙ্কপাল ক্ষত্রিয় পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল ১৬৬৯ সালে।‘বীর রাণা শঙ্ক’ নামে এক ছোট রাজ্যের অধিপতি ছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ। ১৬৭৪ সালে শিবাজির রাজ্যাভিষেকের পর থেকে কান্‌হোজির পিতা তুকোজি ছিলেন সুবর্ণ দুর্গের দুর্গপাল,তাঁর অধীনে ছিল ২০০ সেনা।ছেলেবেলাটা কেটেছিল বাবার সঙ্গে সুবর্ণ দুর্গে, আর জলপথে বাবার  নানা অভিযান দেখে।পরে এখানকারই কর্মী হয়েছিলেন তিনি প্রথমে।

প্রাচীন ভারতের রাজারা ও তাঁদের আনুগত্যপ্রাপ্ত বণিকেরা জলপথকে ব্যবহার করতেন প্রধানত বাণিজ্যবিস্তার ও ধনাগমের জন্য।(যদিও ব্যতিক্রম ছিলেন চোল রাজারা)।জলপথে যুদ্ধের প্রয়োজনের ভাবনা তাঁদের চিন্তাতেই ছিল না। তাই নৌবাহিনীও ছিল না। দাক্ষিণাত্যের মুসলিম শাসকেরা বা মুঘল শাসকেরাও  নৌবাহিনী গঠনের চিন্তা করেননি। মুঘলরা এসেছিলেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে স্থলপথে।

চিত্রটার  বদল হতে শুরু করল পর্তুগিজদের ভারতে আগমনের পর,পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো   জলপথেই প্রথম দক্ষিণ ভারতে এসেছিলেন।পর্তুগিজরা ক্রমে জলপথের উপর আধিপত্য কায়েম করে,ব্যাবসাবাণিজ্য করতে লাগল,ভারতের পশ্চিম সমুদ্রতট ধরে একচেটিয়া অধিকার স্থাপন করল।পরে এল অন্যান্য ইউরোপীয়রা, এল প্রবল ইংরেজ।    

পশ্চিম ভারতের স্বাধীনচেতা শিবাজি মহারাজ প্রথম একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন। ১৬৫৪ সালে মহারাষ্ট্রের কল্যাণ জেলার কাছে সমুদ্রের এক খাড়ির মধ্যে একটি রণতরী রাখার ব্যবস্থা করলেন।তটরেখা ধরে বেশ কিছু নৌকেন্দ্র স্থাপনের চিন্তা করলেন। প্রথমে দুটি নৌবহর স্থাপন করলেন- নৌপ্রধান মৈনাক ভাণ্ডারী,ও দৌলত খান নামে দু’জনের অধীনে।মারাঠা নৌসেনাদের বেশির ভাগই ছিল কোঙ্কনী নাবিক। এছাড়াও ছিল ভাড়াটে সৈন্য। এদের বেশির ভাগই ছিল আবিসিনীয় ক্রীতদাস,যারা ‘সিদ্দি’ বলে পরিচিত ছিল।আর ছিল পর্তুগিজ ভাড়াটে সেনা। সিদ্দিরা একসময় মুঘল সম্রাটদের প্রশ্রয়ে খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।কালে মারাঠদেরও সিদ্দিদের সঙ্গে সংঘর্ষে যেতে হয়েছিল।শিবাজি পর্তুগিজদের যুদ্ধকৌশল রপ্ত করবার জন্য একজন পর্তুগিজ সেনানায়ককে ভাড়া করেছিলেন।পর্তুগিজদের কাছ থেকেই তাঁদের নৌবিদ্যার কারিগরি জ্ঞান ও কৌশল শিখেছিল মারাঠা নৌসেনারা। বিদেশী দক্ষ যোদ্ধাদের মাইনে দিয়ে রাখার রেওয়াজ চালু হওয়াতে মারাঠা সেনাবাহিনী স্থলযুদ্ধ ও জলযুদ্ধের নানা নতুন কৌশল রপ্ত করেছিল।১৬৬৪ সালের সুরাটের যুদ্ধে মারাঠারা স্থলবাহিনীর সঙ্গে এই নৌবাহিনীও ব্যবহার করেছিল। শিবাজি ১৬৭৯ সালে খান্দেরি জয় করেছিলেন।পরিণামে সিদ্দিরা ও ইংরেজরা মারাঠাদের আক্রমণ করেছিল।ব্রিটিশ,সিদ্দি ও মুঘলরা বুঝেছিল শিবাজি শুধু স্থলে নয় জলযুদ্ধেও সমান পারদর্শী।শিবাজির অভিষেকের সময় শিবাজির নৌবহরে ছিল ৮৫টি ‘গ্যালিভ্যাট’ বা রণতরী(নৌকা),আর ৩টি ‘গুরাব’বা পালতোলা যুদ্ধজাহাজ।

শিবাজির মৃত্যু হল ১৬৮০ সালের ৩রা এপ্রিল,রাজা হলেন জ্যেষ্ঠপুত্র শম্ভাজি।শক্তিশালী হলেও রাজ্যের সুশাসন অপেক্ষা বিলাসব্যসন, নৃত্যগীত, আমোদপ্রমোদ আর অত্যধিক পানপ্রিয়তা ছিল তাঁর দুর্বলতা। এছাড়া অত্যন্ত রুক্ষ স্বভাব,আর ক্রূঢ় প্রকৃতির ছিলেন। থাকতেন অধিকাংশ সময়ে রায়গড়ের  দুর্গে আরামে।পারিবারিক দ্বন্দ্ব সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছিল।

তখন মুঘল সম্রাট আওরংজেব।তাঁর সঙ্গে আগে থেকেই শিবাজির বিবাদ ছিল। শিবাজির মৃত্যুতে মুঘল সরকারী নথিদার কাফি খাঁ লিখলেন,‘পার্বত্য ইঁদুরটা নরকে গেল’। শুরু হল মারাঠা সাম্রাজ্যর ওপর নানা আক্রমণ।কান্‌হোজি তখন কোথায়?এগারো বছরের  বালক তখন নিজেদের গ্রামের এক সংস্কৃত অধ্যাপকের গৃহে গুরুগৃহবাসী ছাত্র।সারা সকাল নিরম্বু উপবাস করে চলছে বৈদিক শাস্ত্রশিক্ষা,পুজাপাঠ,নিরর্থক অবোধ্য  মন্ত্রপাঠে দেবার্চনা। নিত্যকার আহার্যে আমিষ বা তেল মশলার বালাই নেই, কৃচ্ছসাধনের চূড়ান্ত। মনে মনে দৃঢ় হয়ে উঠছেন স্বাধীনচেতা বালক,অধীর হয়ে ওঠেন প্রায়ই। মাঝেমাঝে বাবা আসেন দেখে যেতে, বাবার কাছে শোনেন রাজ্যের অবস্থা। চারদিকে দেশী ও বিদেশী শত্রু মারাঠা রাষ্ট্রশক্তিকে শেষ করতে উদ্যত। বাবারও নিরাপত্তা নেই।মারাঠা রাজ্যের যে চরম দুর্দিন সেকথা বোঝেন।মুঘলের আক্রমণ আর সিদ্দিদের আক্রমণে মারাঠাদের দুর্দিনে নিরপেক্ষ থেকে ইংরেজ ও পর্তুগিজরা লাভক্ষতির অঙ্ক কষে চলেছে।দুবছর কেটে গেল, বাবার শরীর ভালো নেই,অবসর নেবেন।মুঘলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মারাঠাশক্তি পর্তুগিজদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছেন।এই সময় একদিন তের বছরের বালক কান্‌হোজি রায়গড় চলে গেলেন,শম্ভাজির কাছে সেনাদলে যোগ দেবার আবেদন করলেন। কিশোর বালকের আর্জি মঞ্জুর হল।তবে সেনাদলে নয়,সুবর্ণ দুর্গের দুর্গরক্ষকের অধীন কর্মচারী হিসাবে কাজে যোগ দিলেন।

smaron02-mediumআওরঙজেব শম্ভাজিকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনলেন না।বিজাপুরের সুলতানকে পরাজিত করে,মুখ ঘোরালেন মারাঠা রাজ্যের দিকে। শিবাজির রাজ্যের অনেকটাই ছিল বিজাপুরের সুলতানের থেকে দখল করে নেয়া।

মারাঠাদের দুর্বল প্রতিরোধ সহজেই দমন করলেন মুঘল সম্রাট।তিনি গুণে গুণে সব মারাঠা দুর্গগুলির দখল নিতে অগ্রসর হলেন।সুবর্ণ দুর্গ দখল করতে মুঘলের সহকারী সিদ্দিরা তিনদিক থেকে দুর্গকে ঘিরে অবরোধ করে রাখল।দুর্গ থেকে জল বা স্থল কোন পথেই বাইরে যাবার বা রসদের যোগান আনবার অবস্থা রইলনা।দুর্গাধ্যক্ষ অচলজি মোহিতে প্রতিরোধে না গিয়ে আপসের বার্তা পাঠালেন,সিদ্দিদের হাতে দুর্গ তুলে দেবার ব্যবস্থা হল।সাহসী, কৌশলী,উচ্চাকাঙ্খী ২০বছরের যুবক কান্‌হোজি সব দেখলেন।  সেই মুহুর্তটা তাঁর কাছে ছিল অত্যন্ত মর্মবিদারক।

বিশ্বস্ত অনুচর, বাল্যবন্ধু বালাজি বিশ্বনাথ আর এক হিতাকাঙ্খী পণ্ডিত ব্রহ্মেন্দ্রস্বামীকে দিয়ে গোপনে সুবর্ণ দুর্গ হাতছাড়া হবার খবর আর অচলজির আসন্ন আত্মসমর্পণের খবর পাঠালেন রাজা শম্ভাজির কাছে,রায়গড় দুর্গে। দুর্গরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার অনুমতি চাইলেন।তিনদিনের মধ্যে অনুমতি এল, রাতারাতি এক সেনাঅভ্যুত্থান ঘটল, অচলজি বন্দি হলেন,দুর্গের ভার চলে এল তাঁর হাতে।তাঁর অনুচর বালাজি ছিলেন চিপলামে সিদ্দিদের নিমক মহলের কেরানি, সেই সুবাদে সিদ্দিদের গতিবিধির সব খবরই পেয়ে যেতেন কান্‌হোজি। এমনই কৌশলী আর গোপন সংগঠক ছিলেন এই যুবক।

১৬৯৮ সালেই অবশ্য সাতারা দুর্গের প্রধান তাঁকে সরখেল বা দরিয়া-সারেঙ অর্থাৎ অ্যাডমিরাল নিযুক্ত করেছিলেন।তখন থেকেই তিনি আরবসাগরের তটরেখা ধরে বোম্বাই থেকে ভেঙ্গুরলা পর্যন্ত জলভাগের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠেছিলেন। শম্ভাজির মৃত্যু হ’ল ১৬৯০ সালে।মারাঠা নৌবহরের দায়িত্ব পুরোপুরি চলে এল কান্‌হোজির হাতে।এরপর থেকে চলল তাঁর নেতৃত্বে জলে স্থলে মারাঠা শক্তির উত্থান।যদিও কেন্দ্রীয় মারাঠা রাজত্ব তখন ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।একা কুম্ভের নকল বুঁদির গড় রক্ষার মত কান্‌হোজি একাই রক্ষা করে চললেন  পশ্চিম সমুদ্রের দখলদারি।

কাজটা খুবই জটিল ছিল। তাঁকে একসঙ্গে সিদ্দি,মুঘল আর ইংরেজ এই ত্রিশক্তির জোটের বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হয়েছে। কখনও হারতে হয়নি তাকে। তিনি প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির  বানিজ্যপোতগুলিকে আক্রমণ করতে শুরু করেন, সেগুলির সামগ্রীর দখল নিতেন, নাহলে বিপুল অর্থ আদায় করে সেগুলি ছাড়তেন।অনেক বিদেশী শত্রুকে দাবিয়ে রাখতেন তিনি।এদের মধ্যে ইংরেজদের ঘাঁটি ছিল বোম্বাইতে,পর্তুগিজদের ঘাঁটি ছিল গোয়াতে,জাঞ্জিরাতে ছিল সিদ্দিদের ঘাঁটি,ডাচদের ঘাঁটি ছিল ভেঙ্গুরলাতে।তিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলেন ইংরেজ বানিয়াদের। ক্রমে সকল বিদেশীরাই তাঁকে মান্য করতে শুরু করেছিল।

একের পর এক জলপথে তাঁর জয়,বিদেশী শক্তিকে পর্যুদস্ত করা,তাঁদের স্বার্থহানি ঘটানো আর মারাঠাদের সম্পত্তি দখলে রাখা,আদিকাল থেকে ভারতের সামুদ্রিক কার্যকলাপের ইতিহাসে এ এক নতুন ঘটনা।গল্প,কাহিনীর মত।

আংরে তাঁর শ্রেষ্ঠ নৌবহরের দায়িত্বে রাখতেন রণকুশল ইউরোপীয়দের-প্রধানত ডাচদের।লোক চিনতে ভুল করতেন না তিনি। একজন সুদক্ষ জামাইকান ও জেমস প্লানটেন নামে এক জলদস্যুকেও নিযুক্ত করেছিলেন নিজের সেনাদলে।তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন-প্রধান গোলাবাজের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। কান্‌হোজির দখলে থাকা কান্ধেরি দ্বীপের দখল নিতে বিফল হয়েছিলেন বলে যে ম্যানুয়েল   দ্য ক্যাস্ত্রোকে ইংরেজরা বিশ্বাসঘাতক বলে বিতাড়িত করেছিল তাঁকেই তিনি নিজের বহরে কাজে লাগিয়েছিলেন।

১৬৯৮ সালে বিজয়গড় তালুকে বিজয়দুর্গে প্রথম সামরিক ঘাঁটিটি  স্থাপন করেন তিনি। কোলাবাতে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন। বন্দরে আসা সমস্ত বিদেশী বাণিজ্যতরী থেকে কর আদায় শুরু করেছিলেন আলিবাগ নৌঘাঁটি থেকে। ১৭২৪ সালে মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি জেলায় পুরন্দরগড় নামে একটি বন্দর স্থাপন  করেছিলেন,যেখান থেকে জলসীমানা পাহারা দেয়া হত।  

১৭০২ সালে প্রথম ছয়জন ইংরেজসহ একটি ছোট জাহাজ আটক করেন কোচিন বন্দরে।এরপর থেকে ১৭২৯ সাল পর্যন্ত ১৪টি সফল অভিযান করেছেন বিদেশীদের বিরুদ্ধে, আগ্রাসনকারী বানিয়াদের জাহাজ আটক করেছেন,আদায় করেছেন বহু অর্থ যা দিয়ে শক্তিশালী করেছেন দেশে জলসীমা সুরক্ষার  ব্যবস্থা।দেশের আয় বৃদ্ধি করেছেন।ঔপনিবেশিক ইংরেজদের জলেস্থলে নাস্তানাবুদ করেছেন আমৃত্যু। তাঁর বিজয়রথ থেমেছে ১৭২৯ সালে পালগড় দুর্গ জয় করে। ১৭২৩ সালে বোম্বাইয়ের ইংরেজ গভর্নর বুন  ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার পর থেকে ইংরেজ ও আংরের মধ্যে সম্পর্ক খানিকটা শান্ত হয়েছিল, যা বজায় ছিল ১৭২৯ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।

আরবসাগর কাঁপানো এই মহানৌবীরের সমস্ত কার্যকলাপের ধারাবিবরণী দিতে গেলে অনেক লিখতে হবে। তবে মারাঠার সেই দুর্দিনে  বিদেশী শক্তির শোষণ থেকে ভারতের পশ্চিমদ্বার রক্ষায় তাঁর যে ভূমিকা ছিল তা একজন দেশপ্রেমিকেরই হতে পারে, একথা বিনা দ্বিধায় বলা চলে। তাঁর একক প্রচেষ্ঠার  কাহিনী পাঠ করলেই এই বীরের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যাবে। পিনাকী চ্যাটার্জীরা তাঁর নামে নিজেদের অভিযানের নৌকার নাম দিয়েছিলেন-সে নাম দেওয়া সার্থক,কান্‌হোজি সারা জীবনে কোন অভিযানে হারেননি।তাঁর পিতৃদত্ত নাম হয়ত কাহ্নাজী (তা থেকেই উচ্চারণ ফারাকে হয়েছে  কান্‌হোজি)-অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু মারাঠীতে আংরে কথার অর্থ নাও বা নৌকা। সত্যি চলন্ত নৌকার মতই তিনিও জলেই চলেছেন আজীবন।         

সমস্ত লেখা একত্রে উমা ভট্টাচার্য   

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s