স্মরণীয় যাঁরা বাস্তব গোয়েন্দা নীলাদ্রি মুখার্জি শীত ২০১৮

নীলাদ্রি মুখার্জি

আমরা ঘুমাই না

কল্পনার উড়ানে ভর দিয়ে,বইয়ের পাতায়,খবরের কাগজে, রূপালি পর্দায় তাদের অবাধ বিচরণ। সেই ওল্ড টেস্টামেন্টের থেকে তাদের পথ চলার শুরু, এবং তার পর থেকে দেশ-কাল-সীমানার গন্ডি পেরিয়ে বার বার তারা ফিরে আসেন শিহরণ জাগাতে। তাদের আগমনকে প্রায় কোনদিনই বাধা দেয়নি বিশ্বসাহিত্যে র পাঠকমহল,সমালোচনা করেছেন বটে তবে পরম স্নেহে লালনও করেছেন ভাবধারাটিকে‌‌। তাই যুগে যুগে তাদের আবির্ভাব ঘটে প্রায়শই, তা সে কখনও ২২১/বি বেকার স্ট্রিটের দোতলা থেকে কিংবা গড়পাড়ের বাসিন্দার সবুজ অ্যম্বাসাডারের সামনের সিটের জানলা দিয়ে।তাদের আগমনবার্তায় পাঠকের সোল্লাস সাধুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারিদিক,মণিমানিক্যে র ছটা ঝিকমিকিয়ে জন্ম দেয় অপরিসীম মুগ্ধতার। 

কিন্তু পরিস্থিতিটা পাল্টায় যখন পটভূমিকাটা কল্পনার জায়গায় বাস্তবে এসে দাঁড়ায়। রজনী সেন রোড বদলে যখন বেচুবাবু লেন হয়ে যায়,ঠিক তখন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর স্থান পান খবরের কাগজের ম্যােসাজ পার্লারের বিজ্ঞাপনের পাশে। লোলুপ বিবাহবিচ্ছেদ ব্যা বসায়ী আর ঈর্ষায় ভরপুর আঙুলগুলো ঝটপট ডায়াল করে বিজ্ঞাপনের দেওয়া নম্বরে। প্রতিদিন আত্মাহুতি দেয় অ্যলান পিঙ্কারটনের অতৃপ্ত আত্মা। 

অ্যলান জে পিঙ্কারটনের জীবনের শুরুটা অনেকটা সেই বস্তাপচা হিন্দি সিনেমার নায়কের শুরুয়াতি জীবনের মত। ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে আগস্ট গ্লাসগোর এক পুলিশ সার্জেন্ট পিতার ঘরে জন্ম পিঙ্কারটনের। কর্মক্ষেত্রে আঘাত পেয়ে ছেলের জন্মের আগেই অবসর নিতে বাধ্য  হন পিতা। কাজেই শৈশব ও কৈশোর পিঙ্কারটনের যে যথেষ্ট আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে কাটে এ-কথা বলাই বাহুল্যত। 

পিতার অকস্মাৎ  মারা যাওয়ার ফলে, সংসারের চাপে ১০ বছরেই প্রথাগত শিক্ষার ইতি দিতে হয় পিঙ্কারটনকে। তবে থেমে থাকেননি তিনি, বাড়িতে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান পুরোদমে। তবে শুধুমাত্র পড়াশোনা নিয়ে থাকলে যে পেট চলবে না তা বুঝে গেছিলেন পিঙ্কারটন। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি শিখতে শুরু করেন কাঠের পিপে তৈরির কাজ আর তার কিছুদিনের মধ্যে ই বুদ্ধিমত্তা ও হাতযশের দরুণ কাঠের পিপের ব্যুবসা ফেঁদে বসেন। 

তারপর যা হয় আরকি, এক বসন্তে পিঙ্কারটনের জীবনে আসেন ডাডিংস্টোন শহরের গায়িকা জোয়ান কাফ্রে। ১৮৪২ খ্রীষ্টাব্দের ১৩ ই মার্চে চুড়ান্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে বিয়ে হয়ে যায় পিঙ্কারটন ও জোয়ানের। 

পিঙ্কারটন যদি এখানেই থেমে থাকতেন তাহলে বোধহয় ভালোই হত। বেশ সুন্দর বাকি জীবনটা ব্যাবসা, বৌ, বাচ্চা নিয়ে কাটিয়ে দিতেন। তা তো হলই না,উপরন্তু তার মৃত্যুর ১৩৪ বছর পর প্রয়োজন পড়ল  রাত জেগে বিস্মৃতির কবর খোঁড়ার !! বিধাতাপুরুষ বোধহয় সুখ আমার বা পিঙ্কারটন কারোর কপালেই লেখেননি, নইলে পিঙ্কারটনের মতন ব্যরবসায়ী ও পরিবারওয়ালা লোক কখনও জড়িয়ে পড়ে চার্টিস্ট মুভমেন্টে !! অন্য থায় শিকাগোর বেশ কিছু মানুষের ও তো শান্তিতে থাকার কথা আজীবন! কিন্তু হা ঈশ্বর,ভবিতব্যয় কি আর খন্ডানো যায় ! সে যে বড়ই অর্বাচীন,বড়ই নিষ্ঠুর!!

১৮৩৮ খ্রীষ্টাব্দ থেকে সমগ্র ব্রিটেনে আগুনের মতন ছড়িয়ে পড়ে চার্টিস্ট আন্দোলন। মুলতঃ শ্রমজীবীদের উদ্যোোগে ঘটা এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যছ ছিল ব্রিটেনের অভ্যনন্তরীণ রাজনৈতিক গঠনব্য‍বস্থার সংশোধন। ভোটাধিকার, ভোটপদ্ধতির গোপনীয়তা, সংসদীয় বিন্যারসের সমবন্টন ইত্যা দি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠা এই আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন পিঙ্কারটন। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ব্রিটিশ সরকার পিঙ্কারটনকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। মেট্রোপলিটন পোলিস সার্ভিস (অধুনা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড) ওরফে এমপিএস তাদের সমস্ত দুঁদে অফিসার এবং গুপ্তচরদের নিয়োগ করে পিঙ্কারটনকে গ্রেফতার করার জন্যি‌। তবে পিঙ্কারটনকে ধরার সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্য র্থ হয় এবং তিনি এমপিএস এর চোখে ধুলো দিয়ে বিয়ের আসর থেকেই  সস্ত্রীক ব্রিটেন ছাড়েন চিরজীবনের মতন।  

ব্রিটেন থেকে পালিয়ে পিঙ্কারটন আর জোয়ান এসে হাজির হন কানাডার নোভা স্কটিয়া জাহাজঘাটিতে। কানাডায় এসে পৌঁছলেও পিঙ্কারটনদের তখন কপর্দকহীন অবস্থা,কাজেই তাদের এক স্কটিশ বন্ধু যখন পিপে তৈরি করার একটি কাজের সুযোগের কথা তাঁদের বলেন, হাতে স্বর্গ পান যেন পিঙ্কারটন। বিলম্ব না করে নিজের সম্মতি জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান বন্ধুকে। 

আপাতদৃষ্টিতে দেখলে ঘটনাটি খুব সহজ সরল লাগলেও আদপেই কিন্তু তা নয়,কেননা পিঙ্কারটনের বন্ধু তাঁর জন্য যে কাজটির ব্য বস্থা করেছিল তা ছিল শিকাগো শহরে আর কানাডা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য যে বৈধ কাগজপত্র লাগে তা জোগাড় করার মতন আর্থিক অবস্থা পিঙ্কারটনের ছিল না। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না জোয়ানের একবগ্গা স্বামী। এক অন্ধকার রাত্রে বর্ডার পেট্রোলকে ফাঁকি দিয়ে সস্ত্রীক অবৈধভাবে কানাডা থেকে আমেরিকায় ঢুকে পড়েন পিঙ্কারটন আর সেখান থেকে সোজা শিকাগো। 

শিকাগোতে এসে লিল’স ব্রিউয়ারিতে কয়েকবছর কুপার(যে কাঠের পিপে বানায়)  হিসেবে কাজ করার পর পিঙ্কারটন চলে আসেন ফক্স নদী সংলগ্ন শিকাগো থেকে পঞ্চাশ মাইল উত্তর পশ্চিমে ডান্ডি গ্রামে। ডান্ডি গ্রামে চলে আসার জন্য  মূল কারণ ছিল দুটি, এক তৎকালীন ডান্ডি কাউন্টি ছিল অভিবাসী আইরিশ ও স্কটিশ অধ্যুচষিত এলাকা। দুই ডান্ডি সংলগ্ন বনভূমির উন্নত মানের গাছের কাঠ ছিল পিপে তৈরির জন্যশ বেশ উন্নতমানের। 

ডান্ডিতে এসে নিজের একটা কেবিন খুলে কাঠের পিপের ব্যাবসা চালু করেন পিঙ্কারটন এবং অল্পদিনের মধ্যেশই বেশ নামডাক হয় তাঁর। 

তবে যতই পিঙ্কারটন কুপার হিসেবে নিজেকে থিতু করতে চান না কেন,তার নিয়তি তাকে ক্রমশ ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে অন্যর দিকে। গৃহযুদ্ধ পূর্ববর্তী আমেরিকায় আইন ব্য,বস্থা যে কড়া এবং ভয়ানক সক্রিয় ছিল না তা বলাই বাহুল্য্। পুলিশেরা তাদের সাধ্য মত চেষ্টা করলে, সঠিক আইন প্রণয়ন,উপযুক্ত ‌কৌশল এবং লোকবলের অভাবে অনেক জায়গাতেই তাদের ক্ষমতা ছিল নিতান্তই সীমিত। আর এই সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল কাউন্টারফ্রেটার অর্থাৎ মুদ্রাজালকারীদের কার্যকলাপ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আমেরিকান বাজারে উপস্থিত জাল টাকার পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় সত্তর মিলিয়ন ডলারে অর্থাৎ এখনকার ভারতীয় টাকায় প্রায় চারশ কোটি টাকার কাছাকাছি! খুব স্বাভাবিকভাবেই এই জাল মুদ্রা কারবারীদের জন্য প্রায় ভেঙে পড়েছিল আমেরিকার অর্থনৈতিক ব্যখবস্থা। এই কারবারীদের গ্রেফতার করাও খুব সহজ কাজ ছিল না কেন না তারা তাদের গতিবিধির ব্যাঅপারে ছিল মারত্মকরকম সাবধানী আর তাদের ধূর্ততার কথাও ছিল সর্বজনবিদিত।

ডান্ডির জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে হঠাৎই একদিন পিঙ্কারটন মুখোমুখি হন  অপরাধীদল ‘দ্য। ব্যাকন্ডিট অফ প্রায়রির’ কিছু মুদ্রাজালকারীদের সঙ্গে। এক্ষেত্রে  জানিয়ে রাখা ভাল যে এই অপরাধী দলটি ঊনবিংশ শতাব্দীর সবথেকে কুখ্যােত ও নৃশংস দলগুলোর মধ্যে একটি। এদের দলেরই কিছু সদস্য ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দে রক আইল্যা ন্ডে বাড়িতে ঢুকে নৃশংসভাবে হতযা এ করে আমেরিকান সেনাবাহিনীর ক্রেনল ডেভেনপোর্টকে। ডেভেনপোর্ট হত্যা কান্ডের বীভৎসতা জনমানসে এই দলটির ভীতিকে আরো বাড়িয়ে তোলে এবং অপরাধ জগতের এক অন্যযতম নাম হয়ে ওঠে এই দলটি। 

যাই হোক,পিঙ্কারটনের জায়গায় অন্য কোন সাধারণ লোক যদি সেদিন এই দলটির মুখোমুখি হত তাহলে তারও ডেভেনপোর্টের মতোই দশা হত এটা ধরে নেওয়াই যায়। কিন্তু পিঙ্কারটন ছিলেন অন্যো ধাতুতে গড়া। নিজের উপস্থিত বুদ্ধি ও চাতুর্যকে কাজে লাগিয়ে দলটির সঙ্গে সখ্য  জমিয়ে ফেলেন তিনি। বেশ কয়েকদিন তাদের সঙ্গে মেলামেশার পরে দলটিকে তিনি জঙ্গলের এমন একটা জায়গায় নিয়ে এসে ফেলেন, সেখান থেকে দলটির বেরোনো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারপর এক রাত্রির অন্ধকারে চুপিসারে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসেন পিঙ্কারটন।  সটান হাজির হন ডান্ডি কাউন্টির শেরিফের অফিসে আর তার পরই পিঙ্কারটনের খবর অনুযায়ী শেরিফের নেতৃত্বে এক বিশাল পুলিশবাহিনী গিয়ে বামালসমেত গ্রেফতার করে অপরাধীদলটিকে। 

দিকে দিকে পিঙ্কারটনের কীর্তির কথা ছড়িয়ে পড়ে কেননা দ্যগ ব্যাপন্ডিটদের ধরানোর মতন বুকের পাটা আমেরিকার কোন সাধারণ মানুষের ছিল না। পিঙ্কারটনের সাহসিকতায় ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে আমেরিকান সরকার তাকে ১৮৪৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রথমে তাকে কেন কাউন্টির ডেপুটি শেরিফ এবং ক্রমে কুক কাউন্টির ডেপুটি শেরিফ হিসেবে নিয়োগ করে। 

এই ঘটনাসমূহের পর পিঙ্কারটনকে আর কোনদিন তার কুপারের পেশায় ফিরে যেতে হয়নি। ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের থেকে পরবর্তী বছরচারেক-এ তিনি বিপুল খ্যােতি অর্জন করেন, আইনরক্ষক ও একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা হিসেবে। কেন ও কুক কাউন্টির নানা ব্যদবসায়ীদের অনুরোধে তিনি কাউন্টারফ্রেটার এবং ট্রেন ডাকাতদের অনেকগুলি দলকে গ্রেফতার করেন রীতিমত আধুনিক তদন্তসম্মত পদ্ধতিতে। তাঁর তদন্তের গুনাবলি দেখে শিকাগো পুলিশ দফতরের সর্বপ্রথম গোয়েন্দা পুলিশ হিসেবে তাঁকে নিয়োগ করা হয় ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে। 

তবে ডান্ডিতে থাকাকালীন অ্যবলিশন মুভমেন্টে ক্রীতদাসদের সমব্যা থী হওয়ার দরুণ বেশ কিছু প্রভাবশালী মানুষের বিরাগভাজন হন তিনি,কাজেই শিকাগোয় সসম্মানে সরকারি চাকুরি করা প্রায় দুঃসাধ্যর হয়ে ওঠে তাঁর পক্ষে। যে বছর তিনি গোয়েন্দা হিসেবে শিকাগো পুলিশে যোগদান করেন সেইবছরই সেখান থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন তিনি। আর এই ইস্তফাই তাঁর গোয়েন্দা জীবনকে এক অবিস্মরণীয় উচ্চতার পথে নিয়ে যেতে শুরু করে। 

১৮৫০ খ্রীষ্টাব্দে পুলিশি জীবনের ইতি ঘটিয়ে শিকাগো শহরেই তিনি এক নতুন বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার পত্তন করেন। নাম রাখেন পিঙ্কারটন ন্যা শনাল  ডিটেকটিভ এজেন্সি। কোম্পানির ট্যা গলাইন হয় ‘we never sleep’ আর লোগো হয় একটি উন্মুক্ত চক্ষু।এই লোগোটি তৎকালীন সময়ে দারুণ জনপ্রিয় হয় এবং মনে করা হয় যে তদন্তের জগতে ‘private eye’ কথাটির উৎপত্তিস্থল হল পিঙ্কারটনের এই কোম্পানির লোগো। 

কোম্পানির জন্মলগ্নেই পিঙ্কারটন বেশ কিছু ঝানু গোয়েন্দাকে sekhane নিয়োগ করেন যারা প্রত্যে।কেই মানসিক ও শারীরিক গঠনগত দিক থেকে ছিল অনন্য। এইসব গোয়েন্দারা পিঙ্কারটনের সুচারু তদন্ত পদ্ধতিতে ও তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু জটিল রহস্যেনর সমাধান করে সারা আমেরিকায় হইচই ফেলে দেয়। 

এখনকার দেশবিদেশের বাঘা বাঘা সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলি যে পদ্ধতিগুলিতে নির্ভর করে তদন্ত করে সেই পদ্ধতিগুলির অনেকাংশের জনক হচ্ছেন এই পিঙ্কারটন সাহেব ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। ছদ্মবেশ ধরে সন্দেহভাজনের পিছনে ছায়ার মতন লেগে থাকা, সন্দেহভাজন ব্যাগক্তিকে খোঁচরের মাধ্যমে নজরবন্দি করে রাখা, আন্ডারকভার এজেন্ট নিয়োগ করে ক্রিমিনাল গ্যাংদয়ের মধ্যেয সেই এজেন্টের গোপন অনুপ্রবেশ ঘটানো এই সমস্ত পদ্ধতির জনক ছিলেন পিঙ্কারটন।

শিকাগো অঞ্চলে গোয়েন্দা হিসেবে পিঙ্কারটনের সুনাম থাকার সুবাদে বেশ কিছু সরকারি সংস্থা তাঁর কোম্পানিকে সরকারের হয়ে তদন্তভার সমর্পণ করে। আমেরিকান সরকারের থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিখ্যা ত কেসগুলির মধ্যো একটি হল মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের অনুরোধে একটি বড় জালমুদ্রা কারবারি চক্রকে ধরা। এছাড়াও পিঙ্কারটনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছয় যখন ‘মিশিগান ডবল কিডন্যািপিং কেসে’ দুষ্কৃতীদের জাল থেকে দুটি বাচ্চা মেয়েকে উদ্ধার করে আনেন তিনি, আর সেই সঙ্গেসঙ্গেই সমগ্র দুষ্কৃতি দলটিকে গ্রেফতারও করান। এগুলি ছাড়াও আরো অজস্র ট্রেন ডাকাত, কাউন্টারফ্রেটার এবং অপহরণকারী পিঙ্কারটনের এজেন্সির শিকার হয় এবং তাঁর এজেন্সি শিকাগো অঞ্চলের দুষ্কৃতীদের ত্রাস হয়ে ওঠে। 

বর্তমান যুগে যে সমস্ত তদন্তভার আমেরিকান সরকার এফবিআই, সিআইএকে সমর্পণ করে,তখন সে সকল দায়িত্বই বর্তাত পিঙ্কারটনের এজেন্সির ওপর। তবে ১৮৫০ থেকে ১৮৬১ পর্যন্ত পিঙ্কারটনের সুখ্যা তি আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, যতদিন না ১৮৬১ এর এক সন্ধ্যাময় পিঙ্কারটনের ডাক পড়ে বাল্টিমোর রেলপথের প্রেসিডেন্ট স্যা মুয়েল মোর্স ফেলটনের দফতরে। 

সন ১৮৬১,আমেরিকান গণতন্ত্রের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক অত্যডন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর। তখন সবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন প্রবাদপ্রতিম আব্রাহাম লিঙ্কন, গোটা দেশের মুক্তমনারা ভাসছেন আনন্দের জোয়ারে‌। তবে আনন্দের পাশাপাশি লিঙ্কন শুভানুধ্যায়ীদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে লিঙ্কনকে খুন করার অসংখ্য উড়ো হুমকি। লিঙ্কন ব্যাাক্তিগতভাবে এই সমস্ত হুমকিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিলেও তাকে খুন করার কারণও যেমন যথেষ্ট ছিল তেমনই আততায়ীর অভাবও ছিল না। আর এর মধ্যেনই এক ছেলেমানুষী জেদ ধরে বসলেন লিঙ্কন, বললেন প্রেসিডেন্টের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জন্যত তিনি ইলিওনিস থেকে ওয়াশিংটন ডিসি পাড়ি দেবেন সাধারণ জনগনের জন্যি নির্ধারিত রেলের কামরায়, তাও আবার কোন মিলিটারি সুরক্ষা ছাড়া। 

প্রমাদ গুনলেন আধিকারিকরা। গোণবার যথাযথ কারণও ছিল। ইলিওনিস থেকে ডিসি যাওয়ার পথে লিঙ্কনের ট্রেন দাঁড়াবে বাল্টিমোর অঞ্চলের একটি স্টেশনে আর এই বাল্টিমোর সেই জায়গা যেখানে তখনও দাসপ্রথা অবলুপ্ত হয়ে যায়নি। সুতরাং বলাই বাহুল্যক রেলরোডের প্রেসিডেন্ট ফেলটন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন লিঙ্কনের সুরক্ষার ব্যাাপারে। কালবিলম্ব না করে তিনি তলব করেন পিঙ্কারটনকে, এবং অনুরোধ করেন বাল্টিমোরে এসে লিঙ্কনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। 

বাল্টিমোরে পৌঁছে তদন্ত শুরু করার কিছুদিনের মধ্যে ই পিঙ্কারটন বুঝতে পারলেন যে ফেলটনের আশঙ্কা নেহাতই অমূলক না। তাঁর নিয়োজিত খোঁচরদের মাধ্যামে তিনি জানতে পারলেন যে যখন লিঙ্কনের ট্রেন যখন মেরিল্যা ন্ড স্টেশনে দাঁড়াবে তখন বাল্টিমোরের বেশ কিছু ব্যরবসায়ী লিঙ্কনকে হত্যা  করার চক্রান্ত করছে। 

পিঙ্কারটনের হাতে সময় ছিল একেবারেই কম, কেন না ততদিনে ট্রেনে করে যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন লিঙ্কন। কাজেই অপরাধীদের খুঁজে বের করে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টার থেকে লিঙ্কনের প্রাণকে সুরক্ষিত করাকে অগ্রাধিকার দিলেন তিনি। পিঙ্কারটন ঠিক করলেন যে ট্রেন মেরিল্যা ন্ডে পৌঁছনোর আগেই লিঙ্কনকে ছদ্মবেশে ট্রেন থেকে নামিয়ে তিনি নিজেই তাঁকে সঙ্গে করে পৌঁছে দেবেন ডিসিতে। যদিও প্রথমে লিঙ্কন এই প্রস্তাবে রাজি হননি কিন্তু পরে স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে রাজি হয়ে যান। পিঙ্কারটন সস্ত্রীক লিঙ্কনকে নিয়ে ছদ্মবেশে আততায়ীদের চোখে ধুলো দিয়ে নির্দিষ্ট দিনের তিনদিন আগেই পৌঁছে যান ডিসিতে। মেরিল্যা ন্ড স্টেশনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে লিঙ্কনের আততায়ীরা আর নির্ধারিত দিনে নির্বিঘ্নেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন আব্রাহাম লিঙ্কন। 

লিঙ্কনকে হত্যার এই ষড়যন্ত্র ইতিহাসে ‘বাল্টিমোর প্লট’ নামে কুখ্যাত। বাল্টিমোর প্লট ভেস্তে দেওয়ায় বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে পিঙ্কারটনকে নিয়ে হইচই পড়ে যায়। প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন তাঁর কর্মদক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তাঁর দেহরক্ষীদের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেন। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সূচনা হলে, লিঙ্কন পিঙ্কারটনকে ইউ.এস সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। যদিও পিঙ্কারটন লিঙ্কনের দেহরক্ষী প্রধান হিসেবে ইস্তফা দিয়ে এই নতুন পদাধিকার গ্রহণ করতে প্রথমে অস্বীকার করেন কেন না তিনি জানতেন যে পদে পদে লিঙ্কনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু দেশের স্বার্থে ও লিঙ্কনের পীড়াপীড়িতে শেষমেশ তিনি রাজি না হয়ে পারেন না। 

আর ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল লিঙ্কনের আততায়ীরা। ১৮৬৫ সালে ডিসির ফোর্ড থিয়েটারে আততায়ী বুথ গুলি করে হত্যাত করে লিঙ্কনকে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে যদি তখন পিঙ্কারটন লিঙ্কনের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকতেন তাহলে এই ঘটনা কখনই ঘটতে পারত না। পিঙ্কারটন পরবর্তীকালে বিভিন্ন মহলে এই নিয়ে আফশোস করেছেন কিন্তু নিয়তির বিধানকে আটকানোর ক্ষমতা ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দারও ছিল না। 

গৃহযুদ্ধ শেষ হলে পিঙ্কারটন আবার ফিরে আসেন তার এজেন্সির দৈনন্দিন কাজে। সেই সময় স্প্যা নিশ সরকারের অনুরোধে কিউবায় একটি বিদ্রোহ দমনে তাঁর এজেন্সি এক বিশেষ ভূমিকা নেয়। এছাড়াও এই সময় থেকেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যিচর্চা। তাঁর জীবনে ঘটা সমস্ত ঘটনার ওপর অবলম্বন করে একের পর এক ক্রাইম থ্রিলার লিখতে শুরু করেন তিনি। তার লেখা ‘ট্রু ক্রাইম কালেকশন’ ,’দ্য  স্পাই অব দ্যর রেবেলিয়ন’ ,’থার্টি ইয়ারস এ ডিটেকটিভ’ বইগুলি আজও রমরমিয়ে বিক্রি হয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। এছাড়াও তার এজেন্সিতে কাজ করতেন পৃথিবীর প্রথম মহিলা ডিটেকটিভ কেট ওয়ারেন। সুতরাং বলাই যায় যে ঐতিহাসিক দিক থেকে পিঙ্কারটন ও তাঁর এজেন্সির গুরুত্ব অপরিসীম। 

তবে এই পিঙ্কারটনের মতন বর্ণময় চরিত্রের মৃত্যুটা যেমন রহস্যময় তেমনি মর্মান্তিক। সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে গিয়ে নিজের জিভ কামড়ে ফেলেন পিঙ্কারটন, আর সেই থেকে গ্যাং গ্রিন হয়ে যায় তাঁর গোটা জিভে। অদ্ভুতভাবে কোন ধরণের চিকিৎসা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন পিঙ্কারটন এবং প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান। 

তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে দ্বিমত আছে,কেননা তাঁর মৃত্যু কালীন অন্যা একাধিক রিপোর্টে দেখা যায়, মৃত্যুর কারণ দেখানো হয়েছে হৃদরোগ,আবার কোন রিপোর্টে দেখানো হয়েছে ম্যাকলেরিয়া। এবং সবথেকে যেটা আশ্চর্যজনক তা হল এহেন বিভিন্ন ধরণের রিপোর্ট দেখেও আমেরিকান সরকার কোন তদন্তের ব্যযবস্থা করেননি। মৃত্যুর আগের দিন অবধি যে বিষয়টিতে পিঙ্কারটন কাজ করছিলেন সেটি হল আমেরিকার সমস্ত দুষ্কৃতীদের শনাক্তকরণ নথি যা কেন্দ্রীয়ভাবে একজায়গায় রাখা যায়, যে-কাজের ওপর নির্ভর করে আজকের এফবিআই তৈরি করেছে তাদের দেশের অপরাধীদের শনাক্তকরণের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার। বিপ্লবী, গোয়েন্দা, সাহিত্যি ক ,শিল্পী এই মানুষটি এখন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন শিকাগোর গ্রেসল্যােন্ড সিমেট্রিতে। তবে সাবধান, ‘প্রাইভেট আই’ কিন্তু আজো পুরোদমে সক্রিয়, কেননা

‘পিঙ্কারটনরা কখনও ঘুমান না’।

স্মরণীয় যাঁরা সব এপিসোড একত্রে

                            

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s