স্মরণীয় যাঁরা – মাসুদুর রহমান বৈদ্য- উমা ভট্টাচার্য

smaron (Small)

মাসুদুর রহমান বৈদ্য ছিলেন বিশ্বের সাঁতারের জগতে বাংলার এক প্রবাদপ্রতিম লড়াকু সেনানী। সদ্য চলে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে। তারিখটা ছিল গত ২৬শে এপ্রিল ২০১৫ । তাঁর কলকাতা তপসিয়ার বাড়ির কাছের এক নার্সিং হোমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। এবারের ‘স্মরণীয় যাঁরা’ পর্বে তাঁর উদ্দেশ্যে সামান্য স্মৃতি অর্ঘ্য দেব, জয়ঢাকের পাতায়।  

প্রথমে বলি কেন তিনি সাঁতারের জগতে এতটা স্মরণীয়। মাসুদুর রহমান ছিলেন “বিশ্বে প্রথম শারীরিক প্রতিবন্ধী এশীয় সাঁতারু”,যাঁর দুটি পা-ই ছিল হাঁটুর ঠিক নীচে থেকে কাটা।উত্তর ২৪ পরগণার বল্লভপুর গ্রামের এক মসজিদের ইমামের ছেলে মাসুদুর ছোট থেকেই ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত,  গ্রামের মাঠেঘাটে খেলাধূলা, আর পুকুরের জলে সারাদিন ঝাঁপানো আর দাপাদাপিতে ছিল তাঁর পরম উৎসাহ। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হলেও কোনও বায়না ছিলনা, একটাই স্বপ্ন, ভাল সাঁতারু হবে সে।

হঠাৎ বিপর্যয় নেমে এল নয় বছরের বালক মাসুদুরের জীবনে। সেটা ১৯৭৮ সাল। একদিন  রেললাইন পারাপারের সময় একটি মালগাড়ির চাকায় তাঁর দুটি পা-ই হারালেন। ভর্তি করা হল হাসপাতালে, সংক্রমণ এড়াতে দুটি পায়ের হাঁটুর একেবারে নীচ থেকেই বাদ দিতে হল। চিকিৎসার জন্য প্রায় দেড়টি বছর তাঁকে কাটাতে হয়েছিল বিভিন্ন হাসপাতালে।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে যে মাসুদুর বাড়িতে ফিরে এলেন তিনি একেবারে আলাদা মানুষ। কোন কান্নাকাটি নেই, ক্ষোভ নেই, পা হারানোর  জন্য দুঃখ নেই। মুখে শুধু এক কথা, তাঁকে ভাল সাঁতারু হতে হবে। মা-বাবা তো বটেই , সারা  বল্লভপুরের প্রতিবেশীরা সহানুভূতি জানাতে এসে ফিরে গেল অবাক হয়ে।

বাবা–মা নীরবে অশ্রু বিসর্জন করেন ছেলের অবস্থা দেখে। সাঁতারের প্রধান দুই অত্যাবশ্যক অঙ্গ হাত আর পা, তার মধ্যে দুটি পা-ই যার নেই সে কী করে স্বপ্নপূরণ করবে?

কিন্তু মাসুদুর নিজের সিদ্ধান্তে অটল। কারো বারণ তাঁকে দমাতে পারেনি। শরীর একটু সুস্থ হলে আর পায়ের ক্ষত একেবারে শুকিয়ে যেতেই, আবার তিনি নামলেন জলে। প্রথম দিকে বাবা নিয়ে যেতেন, পরে নিজেই আয়ত্ত করে নিলেন পুকুরে যাবার উপায়। নাওয়া-খাওয়া আর ঘুমের সময়টুকু বাদে সারাদিনই তিনি পড়ে থাকতেন বাড়ির কাছের পুকুরে, পা ছাড়া সাঁতার কাটা অভ্যাস করতে। 

প্রথম দিকে জলের মধ্যে পা-হীন শরীরটা কোমর থেকে বেঁকে যেত নীচের দিকে, আর শরীরটাকে টানতো নীচের দিকে, শুধু হাত দুটোর সাহায্যে অমানুষিক কসরৎ চলতো জলে ভেসে থাকার। একা, একেবারে একা এক প্রতিবন্ধী লড়াকু ছেলের সাঁতারু হবার প্রয়াস। প্রথমদিকে এইটুকুই ছিল তাঁর চেষ্টা। পা দিয়ে জল কাটার ব্যবস্থাটি কেড়ে নিয়েছিল দুর্ঘটনা, আমরা হ’লে বলতাম ভাগ্য বা নিয়তি। কিন্তু ধার্মিক ইমামের ছেলের কিন্তু আস্থা ছিল মানুষের মনের শক্তির উপরে। ঈশ্বর ,দৈব, আল্লা কাউকেই টেনে আনলেন না নিজের জীবনের ক্ষেত্রে। স্বপ্ন হল তাঁর চালক, ইচ্ছা হল তাঁর বাহন, আর মনের দৃঢ়তা হল তাঁর শক্তি। প্রত্যেক সফল খেলোয়াড়ের মতই, তাঁর জীবনে চারটে ‘ডি’- ড্রিম, ডিটারমিনেশন, ডেডিকেশন, আর ডিসিপ্লিন-ই হল তাঁর সহায়।

একদিন সফল হলেন তিনি। কবির ভাষায় যাকে বলে ‘পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিং’-সেই প্রবাদ বাক্যটি তিনি প্রমাণ করলেন তাঁর জীবনে। প্রবাদানুসারে ঈশ্বরের কৃপাতেই পঙ্গু মানুষও পাহাড় ডিঙোতে পারে, কিন্তু মাসুদুর রহমানের ক্ষেত্রে সেই ঈশ্বর হলেন তাঁর প্রবল মনের জোর, যা কিছুতেই তাঁকে হার মানতে দেয়নি। শুরু হল তাঁর সফল সাঁতারুর জীবন।

পশ্চিমবঙ্গে প্রথম সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন,পানিহাটি থেকে আহিরীটোলা পর্যন্ত গঙ্গাবক্ষে সাঁতারে। কলকাতার মধ্য দিয়ে সাঁতার কেটে গন্তব্যে পৌঁছুলেন পঞ্চম স্থান অধিকার করে।

এরপর অংশ নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা আয়োজিত ভাগীরথীতে ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ সাঁতার প্রতিযোগিতায়, সেখানেও পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন।

১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে অংশ নিয়েছিলেন ‘পুনে আর্টিফিসিয়াল লিম্ব সেন্টার’ আয়োজিত সাঁতার প্রতিযোগিতায়, সেখানে ১৭টি প্রতিযোগিতার মধ্যে ১৬টিতেই তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।

এরপরই তিনি আরও কঠিন প্রতিযোগিতার দিকে এগিয়ে গেলেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে পার হলেন ইংলিশ চ্যানেল। তাঁর এই সাহসিকতা ও সফলতার পুরস্কারের সঙ্গে তিনি  ‘বিশ্বের প্রথম চ্যানেল পার হওয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী সাঁতারু’ বলে ঘোষিত হলেন।

তাঁর পরবর্তী উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগিতা ছিল সঙ্কীর্ণ, তরঙ্গবিক্ষুব্ধ জিব্রাল্টার প্রণালীতে সন্তরণ। ২৫ শে সেপ্টেম্বর ২০০১ খ্রিস্টাব্দে পার হলেন জিব্রালটার। স্পেনের ট্যারিফ দ্বীপ থেকে সাঁতার কেটে মরক্কোর সাগরতীর পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেন মাত্র ৪ ঘণ্টা ২০মিনিটে। সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ট্যারিফ দ্বীপের কাছে একটি নৌকা থেকে জলে ঝাঁপ দিয়ে দুপুর ১২ টা ৪০ মিনিটে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছেছিলেন।

পৃথিবীর সাঁতারের ইতিহাসে এই বিজয় তাঁকেই  প্রথম ঘোষণা করল। কারণ তিনিই প্রথম শারীরিক প্রতিবন্ধী যিনি জিব্রাল্টারের মত কঠিন সমুদ্র পথে ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হলেন। ২০১০ সালে একবার পার হয়েছিলেন পক প্রণালী। প্রতিবন্ধকতার জন্য অলিম্পিক ইভেন্টে যেতে পারবেন না ,জেনেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন লঙ সুইমিং।  আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য যে এইরকম একটি মানুষ গত আট বছর ধরে কোনও বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি স্পনসরের অভাবে।

তাঁর এই অক্ষমতার কথা তিনি নিজ মুখেই বলেছিলেন মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ,২৩শে এপ্রিল ২০১৫, বুধবার কলকাতার ‘বিধান শিশু উদ্যানে’র এক অনুষ্ঠানে  এসে। তাঁর ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্য করে আয়োজিত হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। সেদিন প্রায় ১০০ শিশু এসেছিল সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে, যাদের মধ্যে ১২ জন ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধী। এরা সবাই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মিলনীর সদস্য। তিনি তাদের সঙ্গে নানা গল্প করেছিলেন, ইংলিশ চ্যানেলের ডলফিনদের গল্প, সাগরের ঢেউয়ের ধাক্কার গল্প , আর বলেছিলেন একটি মৎস্যকন্যার কথা, যে নাকি ইংলিশ চ্যনেলে সাঁতার কাটার সময় খানিকটা পথ তাঁর সঙ্গে চলেছিল। তিনি বলতেন, তাঁর সাঁতারু জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তই ছিল মৎস্যকন্যার সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তটি। সেদিনের সভায় বারবার তিনি শিশুদের বলেছেন “নিজেকে কেউ কখনও প্রতিবন্ধী ভাববে না, অক্ষম ভাববে না, আমিও ভাবিনি, ভাবিনা।”

তিনি বলতেন সাঁতার তিনি কোনদিন ছাড়বেন না। সম্প্রতি বাংলা গানের ব্যাণ্ড ‘জোয়ার’,আর সিলিকন গ্রুপ অফ ইণ্ডাস্ট্রিসের সদস্যরা এগিয়ে এসেছিলেন তাঁকে স্পনসর করার জন্য। অর্থসংগ্রহ চলছিল। ভারত ও সিংহলের প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে প্রাথমিক কথা হয়েছিল আগামী জুলাই মাসে তাঁর ‘মিশন পক স্ট্রেট’ অভিযানের জন্য।

আমরা কি আর একটু ভাবতে পারতাম না কেন এই মানুষটি স্পনসর পাচ্ছেন না?  কেন তিনি আর কঠিন কোন প্রতিযোগিতায় যাবার সুযোগ পাচ্ছেন না? কেন তাঁর রক্তাল্পতা, কেন ভালো চিকিৎসা করানো যায়নি তাঁর? এখন কিছুই আর দরকার নেই তাঁর।  পরিবারে মা,স্ত্রী, আর ছোট ছোট দুটি মেয়েকে রেখে, স্পোর্টস কাউন্সিলের কোচের চেয়ারটি খালি করে দিয়ে, সুভাষ সরোবরে অনুশীলনকারী তাঁর ছাত্রছাত্রী-ভাবী সাঁতারুদের শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে, ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমকারী তাঁর শিষ্যা অমৃতা দাস, এছাড়া অগণিত ভক্তদের রেখে তিনি চলে গেছেন অসীমের আর অমৃতের দেশে।

ছোটবেলা থেকে দীর্ঘসময় জলে থাকার জন্য তাঁর পাকতন্ত্রে ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণ ছিল, ফলে রক্তাল্পতা ছিলই , শেষদিকে হয়েছিল ডায়াবেটিস। অবশেষে হৃদরোগের আক্রমনের ধাক্কা তাঁকে কেড়ে নিয়ে গেল পৃথিবী থেকে। আমরা হারালাম এক ক্ষণজন্মা লড়াকু মানুষকে যিনি ছিলেন অনেক প্রতিবন্ধী মানুষের আশার আলোকস্তম্ভ, সারা ক্রীড়াজগতের কাছেই একটা ‘আইকন’। মনে পড়ছে তাঁর সেই কথা যা তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন,-“আমি কোনও প্রতিবন্ধী নই। এবার কি এভারেস্ট জয় করে সেটা প্রমাণ করতে হবে?” 

আজ তাঁর স্মৃতিচারণ করে একটু শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম, তোমরাও এর শরিক হয়ো।

2 Responses to স্মরণীয় যাঁরা – মাসুদুর রহমান বৈদ্য- উমা ভট্টাচার্য

  1. Pingback: জয়ঢাক(নতুন) বর্ষা ২০১৫-সম্পূর্ণ সূচিপত্র | এসো পড়ি। মজা করি

  2. subir045 says:

    অসাধরণ। খুব সুন্দর লেখা। হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গোটা দেশ তাঁকে বঞ্চিত করলেও, তিনি দেশকে অনেক দিয়েছেন। যাঁরা তাঁকে সাহায্য করতে পারলেও সাহায্য না করে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁরা অন্তত একবার তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে নিজেদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুন।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s