স্মরণীয় যাঁরা

বিস্মৃত বাঙালি নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়->উমা ভট্টাচার্য

ভারতের ভূস্বর্গ কাশ্মীর। সেই কাশ্মীর উনিশ শতকেও এখনকার মত ছিল না। বৌদ্ধধর্ম আর শৈবধর্মের সমন্বয় ক্ষেত্র ছিল কাশ্মীর সেই স্মরণাতীত কাল থেকে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের দিকে কাশ্মীরের কোন নির্ভুল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমানাও ছিল না,ছিল না কোন রাজনৈতিক সমন্বয়। বিশাল কাশ্মীর এলাকায় ছিল কতকগুলি বিচ্ছিন্ন,বিক্ষিপ্ত, উপেক্ষিত অরাজক এলাকা।

কাশ্মীরের প্রভূত উন্নতি  শুরু হয় ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে। মহারাজ গুলাব সিংয়ের smaron02 (Small)মৃত্যুর পর পুত্র রণবীর সিং রাজা হবার পর থেকে। ওই বছরই ব্রিটিশ সরকার কাশ্মীরের উন্নতির জন্য কলকাতার একজন সুশিক্ষিত বিশিষ্ট নাগরিককে কাশ্মীরে পাঠাতে মনস্থ করলেন। কলকাতার একজন সম্ভ্রান্ত,প্রগতিশীল শিক্ষাবিদ ও বিচারক নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়কে কাশ্মীর সরকারে নিয়োগ করার সুপারিশ করলেন।

রণবীর সিং সঙ্গেসঙ্গেই সে প্রস্তাব গ্রহণ করে নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়কে কাশ্মীরের প্রধান বিচারপতি এবং নিজের অন্যতম মন্ত্রণাদাতা ও উপদেষ্টা পদে নিযুক্ত করলেন। তখন থেকেই আধুনিক কাশ্মীরের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি শুরু হল।

কাশ্মীরি শাল, পশমের জিনিস ও কাশ্মীরি রেশমের কথা সবাই জানে। মোগল আমল থেকেই এই শিল্প অবলুপ্ত হতে থাকে। নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় এই সময় বিশেষ করে উন্নতি হয়েছিল কাশ্মীরের রেশম শিল্পের।   

smaron01 (Small)গুলাব সিং

গুলাব সিংয়ের ৪০ বছরের শাসনকালে সুযোগসন্ধানী ব্রিটিশ সরকার সব কাজেই গুলাব সিংকে সমর্থন করে গেছেন। এক রাজার অধীনে আসার পর ব্রিটিশ শাসক উত্তর কাশ্মীরে্র সীমানা রক্ষার জন্য আর বিদেশীদের অনুপ্রবেশ রুখবার জন্য ১৮৮৯ সালে ‘গিলগিট এজেন্সি’ স্থাপন  করেন ও  একটি দুর্গ স্থাপন করেন।কাশ্মীরের ওপর শুরু থেকেই ইংরেজদের বিশেষ দৃষ্টি ছিল। সুন্দর কাশ্মীরের চারদিকেই ছিল নানা দুর্ধর্ষ পার্বত্য উপজাতির বাস। রাশিয়া আর চিনের নজর ছিল কাশ্মীরের ওপর। কাশ্মীরকে নিজেদের দখলে রাখার জন্য তাই ব্রিটিশ সরকার সর্বপ্রথম বহু কষ্ট করে কাশ্মীর উপত্যকার জরিপ করিয়ে একটি কল্পিত সীমারেখা আঁকার চেষ্টা করেছিল। সেই সময়ে কাশ্মীরকে  একতাবদ্ধ করতে প্রথম চেষ্টা করছিলেন কাশ্মীর অঞ্চলের দুর্ধর্ষ রাজা গুলাব সিং। তিনি রাজা ছিলেন না। ‘রাজা’ ছিল তাঁর উপাধি। ২৫ বছর ধরে কাশ্মীরের নানা এলাকা জয় করে নিজের আয়ত্তে আনার পরে তিনি রাজা হলেন। তাঁর দুর্ধর্ষ সেনাপতি জোরাওয়ার সিংয়ের সাহায্যে প্রথম কাশ্মীরের  সুদূর এলাকাগুলিকে জয় করে একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা শুরু করেন। ১৮৩৪ সালে জয় করেন  লাদাখ, ১৮৪০ সালে জয় করলেন বালতিস্তান,১৮৫১ সালে জয় করলেন পার্বত্য চিলাস এলাকা। ঘরোয়া যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘর্ষ, অশান্তি বন্ধ হল তাঁর ছত্রছায়ায়।

ব্রিটিশ সরকারের অন্তরে ছিল ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনকে নিরঙ্কুশ রাখা আর অপরিসীম সম্ভাবনাময় স্বর্গসম সুন্দর কাশ্মীরের ওপর দখল রাখা। সেজন্য দরকার ছিল কাশ্মীরে একটি বলিষ্ঠ শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন। ১৮৭০ সালে রণবীর সিং রাজা হলে কাশ্মীরের  উন্নয়নের ব্যাপারে তৎপর ব্রিটিশ সরকার নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়কে পাঠালেন কাশ্মীরে।

নীলাম্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার হেদুয়া অঞ্চলের এক সম্ভ্রান্ত প্রগতিশীল পরিবারের সন্তান,ও কলকাতায় আদালতের বিচারপতি। তিনি কাশ্মীর সরকারের অধীনে কাজ শুরু করার পর প্রথমেই কাশ্মীরের মধ্যযুগীয় শিক্ষা ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে সচেষ্ট হলেন। আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। স্কুল, কলেজ,বিজ্ঞান শিক্ষাকেন্দ্র, কারিগরি বিদ্যার কলেজ, পূর্তদফতর, কৃষিদপ্তর, উদ্ভিদবিদ্যা পঠনের কলেজ প্রভৃতি স্থাপন করলেন। কাশ্মীরে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা,হাসপাতাল স্থাপন,বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনও হল তাঁর উদ্যোগেই।

শিক্ষার প্রসারের আর উন্নতির জন্য,ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল বিষয়ে ছাত্রদের অবহিত করার জন্য,পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে কাশ্মীরি ছাত্রদের পরিচিত করানোর জন্য তিনি একটি ‘অনুবাদ কেন্দ্র’ স্থাপন করলেন শ্রীনগরে। সেখানে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার,ও ইংরিজি ভাষায় লেখা ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য ভূগোল, অর্থনীতি প্রভৃতি সব প্রয়োজনীয় বইপত্র কাশ্মীরি ভাষাতে অনুবাদ করাতে লাগলেন। এককথায় মধ্যযুগীয় অশিক্ষা ও কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ মলিন অবস্থা থেকে কাশ্মীরকে নিয়ে এলেন শিক্ষার আলোকদীপ্ত, সুস্থ সামাজিক পরিবেশে। ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য স্থাপন করেছিলেন ‘মাহুরা পাওয়ার হাউস’। কাশ্মীরে শিক্ষকের অভাব দূর করতে কলকাতা থেকে বহু বাঙালি পরিবার, শিক্ষক, বিজ্ঞানীদের নিয়ে গেলেন কাশ্মীরে।

এরপর তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল কাশ্মীরে অবলুপ্তপ্রায় রেশম শিল্পের পুনরুজ্জীবন।অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত পশম শিল্পের পাশাপাশি রেশম শিল্পের উন্নতির দিকে নজর দিলেন।

মধ্যযুগের শিল্প-সংস্কৃতির নামকরা কেন্দ্র বুখারা থেকে উপহার পাওয়া গুটিপোকার ডিম থেকে অতীতের কাশ্মীরে রেশম শিল্পের সূত্রপাত হয়েছিল, আর প্রভূত নামডাক হয়েছিল। পরে এই শিল্পের অবলুপ্তিতে অনেক কারিগর পরিবার কর্মহীন হয়েছিলেন। তিনি শিল্পটিকে উজ্জীবিত করতে প্রথমেই ধুঁকতে থাকা শিল্পটিকে ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে কাশ্মীর রাজের একচেটিয়া অধিকারে আনলেন ১৮৭১ সালে। বিচারপতির কাজের সঙ্গে এই দপ্তরটির দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনি। বাঙলার উন্নত তাঁত আর রেশম শিল্পের কথা তাঁর মনে ছিলই। বাঙালি হিসাবে তিনি সেই শিল্পকে কাশ্মীরেও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। বাঙলার তাঁতশিল্পী আর রেশম শিল্পীদের নিয়ে গেলেন কাশ্মীরে। মুর্শিদাবাদ আর নদীয়া থেকে বাইশজন রেশমগুটি বিশেষজ্ঞকে ডেকে নিলেন কাশ্মীরে।

smaron03 (Small)

রণবীর সিং-এর সভায় নীলাম্বর মুখোপাধ্যায় (মাথায় অন্যরকম পাগড়ি)

এই সময়ই বহু বাঙালি পরিবার কাশ্মীরে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। কাশ্মীরে একটি  বিশাল বাঙালি  এলাকা গড়ে উঠেছিল। যাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় কাশ্মীরের জনজীবনে ও অর্থনীতিতে বিপুল উন্নতি সংস্কার  হয়েছিল, তিনি কাশ্মীরকে  শুধু নিজের কর্মস্থল ভাবেন নি, ভেবেছিলেন অখণ্ড বিশাল ভারত ভূখণ্ডেরই দেহাংশ। দেহের একটি দুর্বল অঙ্গ যেমন একটি মানুষকে সম্পূর্ণ হতে দেয়না,তেমনি দেশের একটি অংশ দুর্বল হলেও দেশেরই ক্ষতি। এই মহামূল্য কথাটি তিনি হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। তাইতো নিজের রাজ্য, ঘরবাড়ি, পরিজন ছেড়ে সুদূর কাশ্মীরে গিয়েও সেখানকার এত উন্নতি করেছিলেন! দেশের প্রতি প্রকৃত ভালবাসা ছিল বলেই তিনি বিপ্লবী না হয়েও দেশেরই সেবা করে গেছেন। আজ আমরা বাঙালিরা, এমনকি কলকাতাও কি তাঁকে মনে রেখেছে? জয়ঢাকের পূজা সংখ্যায়, ‘স্মরণীয় যাঁরা’ পর্বে তাঁর কথা লিখে সামান্য শ্রদ্ধা জানালাম।এই বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানেই গুটিপোকার বিজ্ঞান সম্মত চাষ, গুটি প্রতিপালন, গুটি থেকে রেশমসুতো নিষ্কাশন প্রভৃতি কাজগুলি সুষ্ঠুভাবে চলতে লাগলো আর কারিগরদের দ্বারা চলল বস্ত্র বয়নের কাজ। কাশ্মীরে রেশম শিল্পের অভাবনীয় উন্নতি হল তাঁর হাত ধরে। কর্মসংস্থান বাড়ল।

সংযোজন

কাশ্মীরে রেশম শিল্প কী করে এসেছিল সে এক মজার ঘটনা! প্রাচীন ভারতের এলাকার মধ্যে ছিল উত্তরে  বর্তমান কাশ্মীর ছাড়া খোটান, কাশগড়,ব্যাকট্রিয়া, পূর্ব দিকে চিনের কিছু অংশ,তিব্বত পর্যন্ত। ছিল নানা জাতি,নানা উপজাতির বাস। বিশাল সিন্ধুর অববাহিকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল ভারতঃ সিন্ধুস্থান বা হিন্দুস্থান। অবাধ যাতায়াত চলত সবগুলি অঞ্চলের মধ্যে। ব্যবসা-বাণিজ্য, আদান-প্রদান, বিবাহ, আবার যুদ্ধবিগ্রহও চলত এই বিশাল অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে। কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা ছিল না। যেখানে যার অধিকার সেখানেই তিনি সর্বেসর্বা। ছিল শুধু  কারাকোরাম বা কৃষ্ণগিরি, পীরপঞ্জাল, হিন্দুকুশ, সুলেমান পর্বতের দুর্গম বেড়া, আর ছিল অনেক গিরিপথ। সেই পথেই আলেকজাণ্ডারের পর থেকে অনেকেই এসেছেন ভারত অভিযানে। এরই দক্ষিণে, ভারতের মূল ভূখণ্ডের উত্তরে ছিল কাশ্মীর। পাঠানরা যখন প্রবলশক্তি,সেই সময়ে কাশ্মীরে আসে রেশম শিল্প। তার আগে  ভেড়া ইত্যাদি পশুপালন আর এদের গা থেকে পাওয়া পশমই ছিল সাধারণ মানুষের জীবিকা অর্জনের প্রধান উপায়।

সেই সময় প্রতিবেশী অঞ্চল বুখারার শাসক মীর্জা হায়দর, কাশ্মীরের এক শাসককে কোন উৎসব উপলক্ষে নানা উপহারের সঙ্গে এক ছটাক গুটিপোকার ডিম পাঠিয়েছিলেন। কাশ্মীরের শাসক তো উপহার পেয়ে অবাক। অবাক হবারই কথা। কিন্তু মীর্জা হায়দার এই জিনিসটির ব্যবহার কীভাবে করতে হবে, কী কাজ়ে লাগবে সব জানিয়ে একটি চিঠি লিখে একজন কারিগরকেও পাঠিয়েছিলেন। সেই থেকে হয়েছিল কাশ্মীরে রেশম শিল্পের পত্তন ও প্রসার। পরে মোগল আমল থেকে এই শিল্পের অবনতি শুরু হয়,আর দুরানী রাজত্বে একেবারে শেষাবস্থা হয়েছিল। কাশ্মীরে এ শিল্পের আবার পূণর্জন্ম হয়েছিল বাঙালি নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে।  

আয়াগে প্রকাশিত সমস্ত পর্ব এইখানে