স্মরণীয় যাঁরা

ঈশা খাঁ  (১৫৩৩-১৫৯৯)

উমা ভট্টাচার্য

smaronisakhan (Medium)

এবারের পর্বে থাকছে বাংলার স্বাধীনচেতা বিখ্যাত বারো ভুঁইয়ার একজন, ঈশা খাঁ মসনদ আলির কাহিনি। বাংলার বারোজন ভূঁইয়া স্ব স্ব এলাকায় স্বাধীন ছিলেন,অধিকৃত এলাকা বাড়াতে এঁরা নিজেদের মধ্যেও যুদ্ধ করতেন। কিন্তু এঁদের মধ্যে একটা মিল ছিল,মোগল ছিল এঁদের সকলেরই শত্রু। এঁরা তুর্কি,হাবশি, পাঠান,মোগল এমনকি ইংরেজ কারও অধীনতা মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। প্রবল  বিরোধিতা করে অনেক সময় মৃত্যুবরণ করেছেন,কিন্তু আক্রমণকারী বিদেশী সুলতান, সম্রাট কারোর কাছেই মাথা নত করেননি।

এঁদের অধিকৃত বিশাল এলাকা,এঁদের প্রতিপত্তি,সেনাবল,শক্তিশালী নৌবাহিনীর বিবরণ থেকে মনে হয় এঁরা ছিলেন সামন্তরাজা বা বড়োমাপের জমিদার। এঁদের কেউ বা পাঠান আমলে জায়গির পেয়েছিলেন,পরে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন। আবার কেউ বা অন্য জায়গা থেকে বাংলায় এসে বসতি করেন ও নিজ প্রতিপত্তি বাড়িয়ে বড়ো জমিদার হয়ে উঠেছিলেন।

এঁদের প্রতিরোধের জন্যই মুঘল সম্রাট আকবর বারবার বাংলার সুবেদার বদল করেও নিজের জীবিতকালে সুবা বাংলার পুরোটা করায়ত্ব করতে পারেননি। এই ভূঁইয়াদের মধ্যে বিখ্যাত ঈশা খাঁ ছিলেন ভাঁটির দেশের অধীশ্বর। ঈশা খাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন অযোধ্যাবাসী ক্ষত্রিয় রাজপুত। তাঁর ঠাকুর্দা ভগীরথ ভাগ্যান্বেষণে চলে আসেন বাংলাদেশে। তখন বাংলায় রাজত্ব করছেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন মহম্মদ শাহ। ১৫৩৩ সাল থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত তাঁর রাজত্বকাল। ভগীরথ নিজ দক্ষতায় সুলতানের অধীনে দেওয়ানের পদ লাভ করেন। তাঁর দুই পুত্রের একজন, কালিদাস, ছিলেন ঈশা খাঁর পিতা। তিনি যজ্ঞে হাতি দান করতেন বলে পরিচিত ছিলেন কালিদাস গজদানী নামে। পিতার মৃত্যুর পর কালিদাস গজদানী উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার দেওয়ানীটি লাভ করেন। তিনি ভাঁটি অঞ্চলে বাস করতেন। দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ,বঙ্গের পুর্ব অঞ্চল,বর্তমান ঢাকা,কুমিল্লা,ময়মনসিংহের কিছু অঞ্চল,আর এর দক্ষিণে সুন্দরবনের কিছু অংশ জুড়ে ছিল তাঁর এলাকা। শোনা যায় তিনি এক মুসলমান ধর্মপ্রচারকের সঙ্গে ধর্মবিষয়ে বিতর্কে পরাজিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হন। নাম নেন সলিমান খাঁ। সুলতানের  কন্যা সইদা খাতুনকে বিয়ে করে সরাইলের জমিদারী লাভ করেন।

গিয়াসুদ্দিন মামুদ শাহের রাজত্বের শেষভাগে,১৫৩৬ সালের কাছাকাছি সময়ে ঈশা খাঁর জন্ম হয়। গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর সলিমান খাঁ নিজেকে সুলতানের বৈধ উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেন। সেই সময় দিল্লিতে পাঠান শের শা শূরী তখ্‌ত্‌ দখল  করেছেন। সলিমান খাঁ পাঠানদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়লেন। বাংলার পাঠান শাসক ইসলাম শাহ শূরীর সঙ্গে যুদ্ধে তিনি নিহত হলেন। তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈশা খাঁ আর ইসমাইল খাঁকে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করে তুরানে পাঠিয়ে দেওয়া হল।

ইসলাম শাহর মৃত্যুর পর বাংলায় কারনানী বংশের শাসন শুরু হয়। তাজ খাঁ কারনানী বাংলার শাসক হলে ঈশা খাঁর মামা (অনেকের মতে তাঁর কাকা)তাঁর অধীনে চাকরি নেন। সুলতানের রাজদপ্তরে থাকার সুবাদে সুযোগ বুঝে খোঁজখবর করে দুই ভাগ্নে-ঈশা খাঁ আর ইসমাইল খাঁকে তুরান থেকে বাংলায় ফিরিয়ে আনেন।

এরপর যুবক ঈশা খাঁ নিজের দক্ষতায় সুলতানের নেকনজরে পড়েন। এই সময়ই তিনি প্রথমে খিজিরপুরের শাসনভার পান,পরে ১৫৬৪ সালে সোনারগাঁ ও মহেশ্বরদী  পরগনার অধিকার লাভ করেন। ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতা বাড়াতে শুরু করেন, জঙ্গলবাড়ি,একডালা প্রভৃতি পুরানো দুর্গগুলির সংস্কার করেন। ১৫৭৫ সালে সোনারগাঁয়ে মোগলবাহিনীর অভিযান ব্যর্থ করতে তাঁর শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে দাউদ খাঁকে অভূতপুর্ব সাহায্য করেন।তাঁর কৃতিত্বে খুশি হয়ে দাউদ খাঁ তাঁকে খিজিরপুরের মসনদ-ই-আলা উপাধি দেন।

মোগল-পাঠানের দ্বন্দ্বের সুযোগে নিজের এলাকা আর ক্ষমতা দুইই বিস্তার করতে থাকেন সুচতুর ঈশা খাঁ। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খাঁয়ের পরাজয় হয়। তিনি পালিয়ে যান। এরপর ঈশা খাঁর জীবনের বাকি সময়ের অনেকটাই ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়েই কেটেছে।

সুযোগ বুঝে তিনি ঢাকা,রংপুর,ত্রিপুরা,ময়মনসিংহের অনেকাংশ দখল করে নেন। নিজের সুরক্ষার জন্য এগারোটি নদীর মিলনস্থল ‘এগারোসিন্ধু’তে দুর্গ নির্মাণ করেন,এগারোসিন্ধুকে রাজনীতি ও ব্যাবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলেন। ১৫৮১-৮২ সালের মঝামাঝি সময়ে নিজেকে সমগ্র ভাঁটির অধীশ্বর ঘোষণা করেন। ছোটখাটো একটা রাজ্য গড়ে তুলে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

এইবার দিল্লির মোগল সম্রাটের টনক নড়ল। বাংলার সুবাদার করে খান জাহান আলিকে পাঠালেন ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে। ঈর্ষাণ্বিত কিছু বাংলার পাঠান জমিদার মোগলের সঙ্গে যোগ দিল। এই যুদ্ধে সরাইলের কাছে খান জাহানের নৌবাহিনীর পরাজয় ঘটে ঈশা খাঁর পক্ষের দুই জমিদার মজলিস প্রদীপ আর মজলিস দিলওয়ারের বাহিনীর হাতে। খান জাহান তাণ্ডায় পালিয়ে যান প্রাণ বাচাঁতে। এই সময় ঈশা খাঁ রাজ্যে ছিলেন না,তিনি ত্রিপুরার রাজা অমরমাণিক্যের কাছে গিয়েছিলেন সৈন্যসংগ্রহ করতে। ৫২,০০০ সৈন্য সাহায্য পেলেন ত্রিপুরারাজের কাছ থেকে। ফলে মোগল সৈন্যের মোকাবিলা করার মত যথেষ্ঠ শিক্ষিত সৈন্যবল হলো তাঁর।

এরপর ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এলেন শাহাবাজ খান,তিনি ঈশা খাঁর একটি প্রাসাদ ধ্বংস করে দেন। পরে সোনারগাঁ,এগারোসিন্ধুর দিকে অভিযান করেন।  চতুর ঈশা খাঁ এই সময় সন্ধি করার ভান করে কিছুদিনের জন্য মোগলদের নিরস্ত রাখলেন। আর পাঠান সর্দার মাসুম খাঁ কাবুলির সহায়তায় মাস্কেট আর বারুদ ও গুলি সংগ্রহ করে, হঠাৎ করে একযোগে জলে-স্থলে আক্রমণ করলেন মোগল সেনাকে। এগারোসিন্ধু ও ভাওয়ালের যুদ্ধে শাহবাজ খানের সেনাবাহিনীকে বিধ্বস্ত করলেন ১৫৮৪ সালে। এক মোগল সেনাপতির মৃত্যু হল,শাহাবাজ খানও পালিয়ে গেলেন তাণ্ডায়।

আবার ১৫৮৬ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য শাহাবাজ খাঁ এলেন ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এইবারও ঈশা খাঁ ভান করলেন যেন আকবরের সঙ্গে সন্ধি করে তাঁর বাঙলা জয়ে সাহায্য করবেন।

তিনি পাশের কোন রাজশক্তিকে শক্তি বাড়াতে দিতেন না। এই কারণে পূর্বতন আক্রমণকারী কোচ রাজা রঘুদেবের রাজ্য আক্রমণ করে তাঁকে পরাজিত করে কোচ-হাজো শক্তিকে স্বপক্ষে আনলেন মোগলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তিশালী করতে। এবার তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান করতে এলেন মোগল সুবাদার রাজপুত রাজা মানসিংহ। ১৫৯৪ সালে বাংলার সুবাদার হয়ে এসে রাজমহলে রাজধানী স্থাপন করে পুত্র দুর্জন সিংহকে ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠালেন ১৫৯৫ সালে। ভাঁটি অঞ্চলের দিকে এগোতে এগোতে অনেক বিক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর দুই প্রতিপক্ষ মুখোমুখি হল ১৫৯৭ সালে। যুদ্ধের প্রথম দিকে ঈশা খাঁর অবস্থান সুবিধাজনক ছিল না। প্রথমে তিনি পিছু হঠার নীতি নিলেন। শেষে একমাসের মাথায় যুদ্ধে দুর্জন সিং নিহত হলেন। মোগল বাহিনী পরাজিত হল।  

আবুল ফজল ও অন্যান্য ঐতিহাসিকদের নানা লেখা থেকে জানা যায় এরপর তাঁকে রাজা মানসিংহের সঙ্গে দ্বৈরথে অংশ নিতে হয়েছিল। বাংলার সুবাদার মহাযোদ্ধা মানসিংহের সঙ্গে ডুয়েল লড়বেন বাংলার এক সামন্ত রাজা। ভাবা যায়না। শুরু হল তলোয়ারের লড়াই। দুজনেই সমানে সমানে লড়ছেন। আসলে ঈশা খাঁ-ও তো রাজপুত ক্ষত্রিয় বংশেরই সন্তান,রক্তে তাঁর ক্ষাত্রতেজের উপস্থিতি। হঠাৎ ঈশা খাঁর তরোয়ালের আঘাতে মানসিংহের হাতের তলোয়ারটি ভেঙে টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ে যায়। তৎক্ষণাৎ ঈশা খাঁ থেমে গেলেন,কারণ প্রতিপক্ষ নিরস্ত্র। শত্রুপক্ষ হলেও নিরস্ত্রকে আঘাত করা যুদ্ধের নীতিবিরুদ্ধ। যেমন মহারাজ পুরুকে সম্মান দিয়েছিলেন বিজয়ী বীর আলেকজাণ্ডার, তেমনি বীর বীরের  সম্মান রাখলেন। একজন উচ্চাকাঙ্খী সামন্ত রাজার এমন মহৎ আচরণ স্পর্শ করলো মানসিংহের হৃদয়। দুজনেই দুজনকে সম্মান জানিয়ে করমর্দন করলেন,বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন দুজনে।

সুচতুর ঈশা খাঁও দেখলেন সেনাপতি মানসিংহই যেখানে একক লড়াইয়ে হেরে গেছেন তাঁর কাছে, তখন তো সম্রাটের পরাজয়ই হয়েছে। তাই ঠিক করলেন অযথা  যুদ্ধ করে নিজের সেনাবল ধংস না করে,রাজ্যের মানুষের জীবনকে অশান্তিময় না করে তুলে দিল্লীর সম্রাটকে সম্মান জানিয়ে দেখাই যাক না। তিনি তো আর যুদ্ধে হেরে বশ্যতা স্বীকার করছেন না!

smaronisakhan02 (Medium)তাঁর ব্যবহারে আপ্লুত মানসিংহ তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লী গেলেন,সম্রাটের সঙ্গে পরিচয় করালেন,তাঁর মহৎ আচরণের কথা জানালেন। ছিলেন ভাঁটির অধীশ্বর,হয়ে গেলেন বিস্তীর্ণ বঙ্গের ২২টি পরগণার পূর্ণ অধীশ্বর। সম্রাট তাঁকে ২২টি পরগনার পূর্ণ শাসনভার দিলেন বিনা শর্তে। এরপর যতদিন বেঁচে ছিলেন তাঁর রাজ্য তাঁরই ছিল। শান্তিতে দিন কাটিয়ে এই অফুরান প্রাণশক্তির অধিকারী এই বিচক্ষণ সামন্তরাজার স্বভাবিক মৃত্যু হয় ১৫৯৯ সালে।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁর নামে ডাকটিকিট বার করেছেন।