স্মৃতিচারণ ফিরে দেখা পর্ব ৩ সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০১৯

ফিরে দেখা   প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব

পুজো কাছাকাছি হতে থাকে। মফস্বল শহরে বড়ো হওয়া আমাদের, কলোনী এলাকার পুজোর কোন অভিজ্ঞতাই নেই। শুনলাম আমাদের কোয়ার্টারের সামনের মাঠেই একটা পুজো হবে, আর একটার হওয়ার কথা ববিদিদের বাড়ির সামনে। এছাড়া স্থানীয় বাঙালীদের, যারা মূলতঃ পূর্ববঙ্গের, একটা পুজো আছে। সেটা কোয়ার্টার এলাকার বাইরে হবে।
পুজোর বেশ আগে থেকেই সামনের মাঠে বাঁশ পড়তে শুরু করে। বাঁশের খাঁচা একটু একটু করে বাড়ে আর আমার ফেলে আসা পাড়ার ঠাকুরদের জন্য মনখারাপ করে। এখানের সঙ্গে ওখানের অনেক তফাৎ। এখানে শুধু ঠাকুরের ঘরবাড়ি তৈরি হয়। ওখানে একটু একটু করে প্রতিমা তার ছেলেপুলে নিয়ে বাড়তে থাকেন। খড়ের কাঠামোর গায়ে মাটির প্রলেপ। নিখুঁত শরীরে পুরনো কাপড়ের আস্তরণ। আস্তে আস্তে রঙ লাগে। ন্যাড়া মাথায় পাটের ফেঁসোর চুল বসে। কাপড়ের ওপর রঙ, নকশা। শেষে জরির ফুলের ফুলকারি। সবশেষে আঁকা হয় চোখ। বড়ো বড়ো টানা চোখের কালো মণিতে দৃষ্টিদানের সময় আমরা থাকি না যদিও, তবু ‘হবে হবে’-র উত্তেজনা পুরোপুরি উপভোগ করি। সমস্তটা না হলেও বেশ অনেকটা রহস্যের শরিক হওয়া যায়।
এছাড়া ওখানে ছিল হরেক মজা। সকালবেলা শিউলি ফুল কুড়োনো, প্রতিদিন একবার করে মণ্ডলবাড়ির ঠাকুরদালানে উঁকি মারা তো আছেই। পাড়ার জমিদারবাড়ির উঠোনের শ্যাওলায় চুন পড়ে। চামচিকে ভরা ঠাকুরদালানের দরজা দু’পাশে হাট করে খুলে যায়। আমরা অবাক হয়ে দেখি, ঝকমকে বারান্দায় এক প্রতিমা তাঁর ছেলেমেয়ে এবং অসুর সমেত দাঁড়িয়ে আছেন। মাথার পেছনে সবটা জুড়ে চিত্রবিচিত্র চালচিত্র। তাতে শিব, নারদ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু সবাই উপস্থিত। রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে মণ্ডলবাড়ি আর জমিদারবাড়ির ঠাকুরে। কোন সিংহের চোখ বেশি জ্বলজ্বলে, কার কেশর কম, কোন অসুরের চেহারা ভালো তা নিয়ে এপাড়া ওপাড়ার ছেলেমেয়েদের মধ্যেও রেষারেষি শুরু হয়।
এখানে সেসব উত্তেজনা নেই। সব ঠাকুরই আসবেন পঞ্চমীর দিন লরি চেপে। গৌহাটি টাউনে তারা বড়ো হচ্ছেন আমাদের একদম চোখের আড়ালে। ঠাকুমার চিঠি আসে। প্রতিবারের নিয়ম মতো এবারেও আমাদের জামা তৈরি করছেন তিনি। পুজোয় কাকা-কাকিমা গৌহাটি বেড়াতে আসবেন, তাদের সঙ্গেই আসবে সেসব। দুঃখ একটাই, জামা বানানো হচ্ছে আমাদের চোখের আড়ালে। সেই মেশিনের পাশে ঘোরাঘুরি, লেস বোতাম লাগানোর উত্তেজনা, নতুন কাপড়ের গন্ধ, কিচ্ছু নেই কোথাও। শরীরে বারবার মাপ নেওয়ার ফিতের ছোঁয়াছুঁয়ি আমাদের শিহরিত হওয়া—নাহ্‌, এবারে কোনওভাবেই ঘটানো যাবে না। এবারে পুজো আছে, কিন্তু পুজো পুজো ভাবটা ভীষণভাবেই কমে গেছে।
খবর পেলাম, পুজোয় বড়োরা দু-দুটো নাটক করবেন। রিহার্স্যাল শুরু হয়েছে ববিদের বাড়িতে। পরে আরেকটা মজার খবরও পাওয়া গেল। সপ্তমীর দিন শুধু মহিলাদের আর অষ্টমীর সন্ধ্যায় কাকুদের আলাদা নাটক মঞ্চস্থ হবে।
ডলি রীতিমতো গুণ্ডা মেয়ে। ওর ভাই কালুও কম যায় না। জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে ওরা ববিদিদের বাড়ির রিহার্স্যাল দেখে। চোখের পলক পড়ে না। কাকুরা ‘শাজাহান’ মঞ্চস্থ করবেন। জাহানারার ভূমিকায় তেমন কাউকে জোগাড় করা যায়নি। তাই ছোটো রায়কাকু হবেন জাহানারা।
ছোটো রায় হলেন শমিত রায়। বড়ো রায় হলেন বিভূতি রায়। বড়োজন পাকা অভিনেতা, চেহারাপত্তরও জমকালো। তাই শাজাহানের ভূমিকায় ওঁকেই মানাবে। শমিতকাকুর বয়স কম। ছোটোখাটো চেহারায় মুখশ্রীটি মন্দ নয়। দাড়িগোঁফ তেমন গজায়নি। তবুও জাহানারার ভূমিকায় শমিতকাকুকে ভেবে নিতে আমাদের বেশ কষ্ট হয়।
কাকিমাদের নাটকের মহড়ায় কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। নাটকের নাম ‘কাঞ্চনরঙ্গ’। হাসির নাটক। নায়কের ভূমিকায় মানে চাকরের ভূমিকায় নামবেন এয়ারপোর্টের বাচ্চাদের স্কুলের হেড দিদিমণি, মিস সেন। বাছাই যে ভালো হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মিস সেনের জোড়া ভ্রূ, চৌকো মুখ, ঘাড় ছাঁটা চুল আর ওপর ঠোঁটের ওপরে ভালোরকম দৃশ্যমান গোঁফরাজির কথা ভেবে চিটুর হাসি আর থামে না। বলে কিনা, “মিস সেনের সবই তো ঠিক আছে। শুধু পোশাক, তা সেটা আর ভাড়া করতে হবে না। বাবারটা দিয়ে আসব। ফিট করে যাবে। কী বলিস?”
আমার মা মাঝেমাঝে মহড়া দেখতে যান। অভিনয়ে যোগ দেননি। তবে উদ্বোধনের সমবেত সঙ্গীতে মা আছেন। বাবার নাটকের অভিজ্ঞতা অনেকদিনের, তাই তিনি পুরোদমে নেমেছেন। তবে তিনি অভিনেতা নন। পরিচালক। নাটকের দিন প্রম্পট করবেন। কাজেই আমাদের বাবা-মাকে নিয়ে অহঙ্কার করার কোনও সুযোগ যে ঘটবে না, বেশ বুঝতে পারছি। দুঃখের কাহিনি আরও আছে। প্রতি সন্ধ্যায় ডলি, কানুদের বাবা-মা দু’জনেই রিহার্স্যালে যান। ওরা বেশ সন্ধেবেলা স্বাধীন। পড়াশুনার নামগন্ধ নেই। কিন্তু আমাদের তা চলে না। মা সন্ধের আগেই ফিরে এসে সন্ধে দেন। তারপর রান্নাঘর থেকেই হাঁক পাড়েন, “পড়তে বসলি?”
পুজোর আগে কারুরই পড়ায় তেমন মন নেই। ঠাকুর না এলেও বাঁশের প্যান্ডেলের জঙ্গলে আমরা ঘুরে বেড়াই। বাঁশে বাঁশে ঠিক টারজানের মতো দোল খাই আর বেয়ে বেয়ে উঠে যাই অনেক ওপরে। মা একদিন দেখতে পেয়ে ভয় দেখান, “বাবাকে বলে দেব।” তারপরও লুকিয়ে চুরিয়ে বাঁশে চাপা চলতেই থাকে।
শুনলাম, পুজোয় ধুনুচি নৃত্যের প্রতিযোগিতা হবে। আমি বাড়ির ধুনো দেওয়ার ধুনুচি নিয়ে হাতে ঘোরাই। বাবাঃ! ধুনো নেবার পর পাত্রটার ওজন তো আরও বেড়ে যাবে। নাচব কী করে?
বাঁশের খাঁচায় সিল্কের কাপড় লাগানো শুরু হতেই আমরা হাতে কর গুনি। আর ঠিক দু’দিন। তারপরেই ষষ্ঠী। পঞ্চমীর দিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে গেট খুলে দৌড়ই। মোড়ের কালভার্টে এয়ারপোর্টের বাস দাঁড়ায়। নেমে আসেন কাকা-কাকিমা, সঙ্গে সুটকেস। ওতে আমাদের পুজোর জামাকাপড় আছে নিশ্চয়ই।
পুজো সময়মত শেষ হয়ে যায়। বাঁশের খাঁচা দাঁড়িয়ে থাকে বেশ কিছুদিন। তারপর সে-ও ভ্যানিশ। দেশগাঁয়ের শহর থেকে আসা কাকা-কাকিমা, সঙ্গে আসা ঠাকুমার গন্ধ, সবই উধাও। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসতে হয়। সামনে পরীক্ষা। পড়ার বইয়ে মুখ ঝুঁকিয়ে পুজোর দিনগুলোতে ফিরে যাই।
গৌহাটিতে প্রথম অবাক হয়েছিলাম প্রসাদ দেখে। হাত পাতলেই নারকেল আর ভেজানো ছোলা। কেন রে বাবা, এখানকার ঠাকুর অন্য ফল-টল কি খান না? আমরা, অন্য জায়গা থেকে আসা ভাইবোনেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি।
ধুনুচি নাচ তার পরের বিস্ময়। হাতে আগুন, মাথায় আগুন নিয়ে ওভাবে যে নাচা যায়, জানতুম না। আমি পারিনি, তবে আমাদের বন্ধুদের অনেকেই বেশ ভালো নাচল।
ঠাকুরের সংখ্যায় মন ভরেনি। গোটা এলাকা জুড়ে চার-পাঁচটা, তাও তেমন সাজগোজের জমজমাটি নেই। আমরা নিজেদের এলাকার প্যান্ডেলেই বসে ছিলাম। তবে নাটকগুলো উপভোগ করেছি।
কাকুদের নাটকের থেকে বেশি জমেছিল কাকিমাদের নাটক।চাকরের ভূমিকায় মিস সেন এত ভালো অভিনয় করলেন,যে পি ডব্লুডির চক্রবর্ত্তী সাহেব ওনাকে রূপোর মেডেল দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। মুনমুনের মায়ের তৈরি আচার অনেক খেয়েছি। উনি যে বাড়ির কর্ত্তার ভূমিকায় এত চমৎকার মানিয়ে যাবেন, সত্যি ভাবা যায়নি। ওঁকে দেখিয়েছিলও একদম ঠিকঠাক। মুখে একটা চুরুট রেখে মাঝেমাঝেই ধোঁয়া ছাড়াটা কে যে ওকে রপ্ত করাল! পরে কলোনিতে এই নিয়ে বেশ আলোচনা চলত যে এটা ওনার পুরোন অভ্যেস।
কাকুদের নাটকে জাহানারার সাজগোজ ভীষণ ভালো হয়েছিল! মনে হচ্ছিল উনি পুরুষ নন সত্যিকারের মহিলা। শাজাহানের সাজগোজ ,মাথার সাদা চুল আর দাড়ি, বড় আলখাল্লা সব এসেছিল গৌহাটি টাউনের দোকান থেকে। চিটু চুপিচুপি আমায় বলেছিল ও দেখেছে নাটক শুরুর আগে, জাহানারাকে, মাঠের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে। শুনে আমারও ভালো লাগেনি। তখনও এক জমাদারনি ছাড়া আর কোন মহিলাকে বিড়ি সিগারেট খেতে দেখিনি। সুন্দরী জাহানারার পক্ষে কাজটা যে আমাদের দৃষ্টিতে গর্হিত হবে তা বলাই বাহুল্য!
সবচেয়ে বেশি ডুবেছিল আমাদের পুজোর পোশাক। ফিটিংসের কোনও বালাই নেই। শুধুমাত্র একটি করে কোট-ফ্রক, ভারি সুন্দর বানানো হয়েছিল। সেটাই আমাদের মানরক্ষা করেছে। গায়ের কোনও মাপ না নিলে এরকমই হয়। তাই ঠাকুমাকে কোনও দোষ দিই না। পুজোর চারদিন শুধু ওই জামাটা পরেই কাটিয়ে দিই।
তবে ঠাকুর বিসর্জনের অভিজ্ঞতাটা একদম নতুন ধরনের হয়। বড়ো নদী একটিই। সেটি ব্রহ্মপুত্র। যার সঙ্গে সকাল বিকেল মোলাকাত হয় স্কুল যাবার পথে। শুনলাম এয়ারপোর্টের ঠাকুর সব বিসর্জন দিতে যাওয়া হবে ব্রহ্মপুত্রের জলে। ঠাকুর যাবে মাথা খোলা ট্রাকে। তাতে ছোটো বড়ো সবাইকে ধরবে না। বাবার কাছে বায়না ধরলাম, তুমি যদি যাও আমিও যাব।
আর কোনও ভাইবোন না, শুধু আমাকে নিয়ে বাবা চললেন। বন্ধুদের মধ্যে চলেছে জুবি। সারা রাস্তা ‘ঠাকুর মাই কি জয়’ করতে করতে গলা ভেঙে গেল। একমাত্র জুবিই আছে আমার সঙ্গে। ব্রহ্মপুত্রের ধারে বিসর্জন হবে। নদীর ধারের রাস্তায় ঠাকুরের গাড়ির লম্বা লাইন। অবশেষে আমাদের ঠাকুরের পালা এলো। চওড়া ধারে অনেকটাই নেমে গেল গাড়ি। বাকিটা কাকুদের কেরামতি। বিসর্জন শেষে অনেক রাতে বাড়ি ফেরা। কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছি। পরদিন সকালে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলাম, অনেক বেলায়।
ঘুম ভেঙে মনে পড়ছিল, আগের রাতে বাড়ি ফেরার পথে মনের আয়নায় হঠাৎ ভেসে ওঠা আমাদের বাড়ির কাছের ফেলে আসা গঙ্গার ঘাটের প্রতিমা বিসর্জনের কথা। নদীর জলে অনেক প্রতিমার একে একে ডুবে যাওয়া, ভেসে যাওয়া। পুজোর প্যান্ডেলের শান্তিজল মাথায় নিয়ে, বাড়ি ফিরে, ঠাকুর ঘরে লাল কালিতে খাতা ভর্ত্তি করে সবাই মিলে লেখা, “শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়।”।তারপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিজয়া সারা। কাচের প্লেটে ঘুগনি, নিমকি, নাড়ুর সমারোহ। বিছানায় শুয়ে সেসব ভাবতে ভাবতে মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। আর উঠতে ইচ্ছে করছিল না।
ওখানে মণ্ডলবাড়ির ঠাকুরের ভাসান হত বিচিত্রভাবে। দুটো নৌকোর মাঝে ঠাকুরকে বসিয়ে, মাঝনদীতে নৌকো ফাঁক করে ধীরে, ধীরে, কৌশলে প্রতিমাকে জলে ফেলা হত। তেমনি যেন আমাকেও কেউ মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে ঝুপুস করেই জলে ফেলে দিয়েছে। আর কোনওভাবেই উঠতে পারছি না।
পরীক্ষা এসে যাচ্ছে। লক্ষ্মীপুজো শেষ হয়ে কালীপুজোর দিকে গড়াচ্ছে দিনগুলো। বাতাসে বেশ শীত শীত ভাব। চিটুর আবার একটু গরম গরম বাই। ও হয়তো জানালা খুলে দিল। মা এসে একটু বাদেই বন্ধ করে দেন। খুব কম স্পিডে ফ্যান চলে। চিটু রাগারাগি করে বাবার কান বাঁচিয়ে। মা জোর ধমক দিয়ে বলেন, “সামনে পরীক্ষা। ঠাণ্ডা লেগে গেলে কী হবে?”
নতুন দেশে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় ভারি মজা হয়েছে। আমাদের মফস্বল শহরে এই পুজোয় তেমন বাড়াবাড়ি ছিল না। সবাই পশ্চিমবঙ্গীয় কিনা। অর্থাৎ সোজা ভাষায় ঘটি। এখানে তো অনেকেই পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছেন। তাই পুজোর আয়োজন প্রায় সব বাড়িরই ঘরে ঘরে। অনেক বাড়িতেই নিমন্ত্রণ আমাদের। তাই রাত ন’টা নাগাদ পেট পুরে লক্ষ্মীর প্রসাদ পেয়ে আমরা বাড়ি ফিরি। মা বেচারি ভাতের হাঁড়ি আগলে অনেকক্ষণ ধরে বসে আছেন। সে রাতে যে সবাকারই ‘মিল অফ’ হয়ে যাবে, তা তিনি জানবেন কী করে? এ ব্যাপারে তাঁর তো কোনও অভিজ্ঞতাই নেই।
সব বাড়ির প্রসাদই একরকম। চিঁড়ে, মুড়কি, নারকেল, ফলের টুকরো, ভোগের খিচুড়ি, পায়েস ইত্যাদি। মার জন্যও কাকিমারা আমাদেরই হাতে প্রাসাদ পাঠিয়েছেন। সেও অনেক। খেয়ে ফুরোয় না। পরেরদিন জনা আর ওর মা পেট পুরে খায়। তবে সেসব শেষ হয়।
পুজোকে তো ধরে রাখা যায় না। একদিন তার শেষ আছে। তখন আসে পরীক্ষা। প্রচুর ফাঁকির পরে সব বাড়ির ছেলেমেয়েরাই বই খুলে রে রে করে পড়তে শুরু করেছে। এহেন বিকট ব্যস্ততার মধ্যে খবর পাওয়া গেল, তাপসীদের বাড়ির সামনে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। না, আমাদের লুচি-মণ্ডা খাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নয়। তাপসীর মায়ের গুরুদেব আসছেন ওদের বাড়িতে। কী যেন স্বামী, বেশ বড়োসড়ো নাম। আমার বাবা আবার এসবে খুব বিশ্বাসী নন। কাজেই আমরা বিশেষ উঁকিঝুঁকি মারতে পারব না। হঠাৎ অসময়টাই সুসময় হয়ে গেল। মা জানলেন, বাবাকে নাকি দুয়েকদিনের জন্য আগরতলায় ট্যুরে যেতে হবে।
মা জামাকাপড় গোছগাছ করছেন আর আমরাও মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছি। বাবা একবার রওনা দিলেই হৈ হৈ করে ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে ওই প্যান্ডেল-বাঁধা বাড়িতে। গুরুদেবের আসাযাওয়া সব দেখতে হবে তো। এর আগে আস্ত একটা গুরুদেব আর কোথায় দেখেছি আমরা?
বাবা সকালের প্লেনে গেলেন আর গুরুদেব এলেন বিকেলের প্লেনে। গেরুয়া রঙের পোশাক প্রায় আলখাল্লার মতো ঝুলছে। মাথার চুল কাঁধ ছাড়িয়ে নেমে এসেছে। খাড়া নাক। টকটকে রঙ। হাতে সোনার বালা। কানে মাকড়ি। গলায় দুয়েক গাছা বেশ মোটা মাপের চেনে গাঁথা রুদ্রাক্ষের মালা। একটা ধবধবে সাদা অ্যাম্বাসাডারে ঠিক বরকনের মতো গুরুদেব ও তাঁর শিষ্যদের আর্বিভাব ঘটল। দর্শনের আশায় ওদের বাড়ির রাস্তার দু’পাশে কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে আছেন। ভক্তরা গোলাপজল, ফুল ছিটোচ্ছে আর গাড়ি থেকে নেমে পা ফেলে ফেলে গুরুদেব হেঁটে আসছেন। পেতে রাখা নতুন কাপড় মাড়িয়ে চলেছেন তিনি। সে এক ভারি জমকালো দৃশ্য! রূপবান মানুষ। চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা, দাড়ি গলায় আলতো ছুঁয়ে উড়ছে, মুখে স্মিত হাসি। চুল, দাড়ি, সবই কালো, মানে তেমন বেশি বয়স নয়।
মহিলাদের ভিড়ই বেশি। আমাদের চেনা পরিচিত মা-কাকিমারা ছাড়াও সে ভিড়ে গুরুদেবের সঙ্গী শিষ্য-শিষ্যারাও আছেন। কেউ তাঁর পা টিপে দিচ্ছেন। কেউ বা চুল আঁচড়ে সিঁথি কাটছেন। গুরুদেব বসেছেন মখমলের গদিতে, লাল তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে। আমরা ভেতরে ঢোকার চান্স পাচ্ছি না। দরজার পাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মেরেই চলছি। তাপসী গুরুদেবের কাছাকাছিই ঘুরঘুর করছে। আমাদের দিক ফিরেও তাকাচ্ছে না। আমরাও তার জন্য কিছুই মনে করছি না। কেন না, এতসব কাণ্ডকারখানা যখন ওর বাড়িতেই ঘটছে, এটুকু উদাসীনতা অস্বাভাবিক নয়।
বলা বাহুল্য, আমাদের আরও একটা উদ্দেশ্য আছে। তা হল প্রসাদপ্রাপ্তি। সে ব্যাপারটা কেমন জমবে তখনও পর্যন্ত আমরা ঠিক আন্দাজ করে উঠতে পারিনি। তবে সব দলেই একজন থাকে তো যার নাক, কান, চোখের শক্তি অন্যদের থেকে মাত্রায় বেশি। ডলি এ-দলের সেই সজাগ কাণ্ডারি। ও খবর আনল, কীর্তনের পর লুচি, আলুর দম, বোঁদের ব্যবস্থা আছে। পেছনের উঠোনে ঠাকুর বড়ো বড়ো কড়াইয়ে সেসব বানাচ্ছে। আমাদের আর পায় কে? গুরুদেবের ভিড়ের মধ্যে বেমালুম মিশে বসে আছি। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। মা এক্ষুনি খোঁজাখুঁজি করতে করতে যে এখানেই এসে পৌঁছবেন, সে ভয় ষোল আনাই আছে তো! তাই যতটা সম্ভব ভিড়ের ভেতরে আরও ভেতরে ঢুকে যাই।
কীর্তন খুবই পানসে লাগছে। কখন শেষ হবে আর ওইসব আলুর দম, লুচির পর্বে ঢোকা যাবে সেই চিন্তায় কচি কচি মাথাগুলো অন্যমনস্ক হয়ে আছে। একটু রাত বাড়তেই কীর্তনের সুরে ঢুলুনিও শুরু হয়। মা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে তিন বোনকে টানতে টানতে বাড়ি নিয়ে চলেন। রাস্তায় যেতে যেতে পেছনের গুরুদেব, লুচি, আলুর দম সব চোখের জলে মিশে গাল বেয়ে নামতে থাকে। কেননা, ডলিরা তখনও বসে আছে। ওদের কেউ হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায়নি। আর ওরাও আমাদের মতো ঘুমে ঢুলে পড়েনি।
পরের দিন ডলিরা যখন বলল ওরা অনেকগুলো করে লুচি, আলুর দম আর বোঁদে খেয়েছে এবং আলুর দম একটুও ঝাল ছিল না, আমরা প্রগাঢ় দুঃখে ভাবতে থাকি সবকিছু দিতে দিতেও ভগবান কেন যে আমাদের বেলাতেই শেষমুহূর্তে হাত তুলে নেন!
গুরুদেবের আসা যাওয়ার বিচিত্র অনুষ্ঠান পর্বের শেষে চিটু আমার কাছে চুপিচুপি এসে জানতে চায়, “হ্যাঁরে দিদি ছেলেরা ছাড়া বুঝি কেউ গুরুদেব হতে পারে না?”
আমি অবাক হয়ে তাকাতেই ও দ্বিতীয় প্রশ্নটি করে ফেলে, “না মানে জানতে চাইছিলাম আমাদের মধ্যে একমাত্র টুকুই ইচ্ছে করলে গুরুদেব হতে পারবে, তাই না?” ঠিক সেইসময়েই মা এসে পড়ায় ও আর নিজের কৌতুহল মিটিয়ে নিতে পারে না।”
বার্ষিক পরীক্ষা এখন একেবারে নাকের ডগায়। রোজ রাতে অনেক দেরি করে ঘুমোতে যাই। সকালে তাই তাড়াতাড়ি উঠতে পারি না। আমাদের ছোটভাইয়ের পরীক্ষা নেই, সে মায়ের কোলের মধ্যে ঢুকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। ছোটোবোন মিঠুও বেশি রাত অবধি জাগে না। ক্লাস থ্রির পড়া আর এমন কী? আমি আর চিটু জেগে থাকি। বাবা-মা মাঝেমাঝে উঠে আমাদের দেখে যান ঘুমিয়ে পড়লাম কি না। তাহলেই মশারির মধ্যে ঢোকাবেন।
নাহ্‌। ঘুমোনোর প্রশ্ন নেই। আমরা ঠিকঠাক জেগে আছি। থাকব না কেন? আমার পড়া খানিক তৈরি থাকলেও নিখুঁত করার ঝোঁক আছে। আর চিটু তো না পড়লে পাশই করবে না। সারাবছর এত ফাঁকি মেরেছে! তার এখন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর পুজোর বহরও বেড়েছে।
বাড়িতে ও মায়ের ঠাকুরকে ঢিপ ঢিপ প্রণাম সারছে। আর স্কুল ছুটির পর, আমরা যখন ট্রাকের অপেক্ষা করি, স্টোর-রুমে রাখা আগের বছরের সরস্বতীকে টিফিনের সন্দেশ খাইয়ে পুজো করছে। সঙ্গী অবশ্য একজন আছে। সে ওরই মতো ফাঁকিবাজ, একই ক্লাসের রূপা। সারাবছর দু’জনে খেলে খেলেই কাটাল। এখন দায়ে পড়ে পুজো আর পড়া দুইই বেড়েছে। মাঝেমাঝে চিটু পড়তে পড়তে ঘুমে ঢুলে পড়ে আর রাত জাগতে জাগতে বিচিত্রসব শব্দ শুনে ভয় পেয়ে ওকে এক ঠেলায় জাগিয়ে দিই আমি। স্কুলে রোজ কোশ্চেন আলোচনা চলছে। বিকেলের ট্রিপে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায়ই সন্ধে ঘনায়।
এরই মধ্যে একদিন আমাদের ট্রাক ব্রহ্মপুত্র নদীর ধার দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ স্পিড বাড়িয়ে দিল। ‘গেল গেল’ রবও উঠল একটা। কী ব্যাপার? ড্রাইভারকাকু নাকি রাস্তা ডিঙোচ্ছিল এমন এক বাচ্চাকে ধাক্কা দিয়েছেন। বাচ্চাটা ছিটকে যাবার পরই বিপদ আন্দাজ করে তিনি জোরে গাড়ি ছোটাচ্ছেন। অত বড়ো ট্রাক, প্রচণ্ড জোরে দৌড়চ্ছে। পেছনে স্কুটার-সাইকেলে অনেক মানুষই তেড়ে আসছে। গাড়ির ভেতরে আমরা এ ওর ঘাড়ে পড়ে যাচ্ছি। শক্ত করে ট্রাকের পাশের লোহার রড ধরে আছি। তবুও টলমল টলমল করছি। ভয়ে, আতঙ্কে চিটুদের সমবয়সীরা কাঁদতে শুরু করেছে। অনেকেরই মুখ আতঙ্কে নীল, কিন্তু গলায় কোনও আওয়াজ নেই। আমাদের মুখগুলো নিশ্চয়ই ফ্যাকাশে। তবে দেখতে পাচ্ছি না। ঝড়ের বেগে চলেছে ট্রাক। এত স্পিডে কোনওদিন এ-গাড়ি চাপিনি আমরা। একেকটা মোড় বেঁকছে সাঁ সাঁ করে। আরেকটা অ্যাক্সিডেন্টও হতেই পারে। আধো সন্ধ্যায় ট্রাকভর্তি আমরা এ ওর হাত চেপে ধরছি। ট্রাকের পেছনে তাড়া করে আসা মানুষের সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। অসমিয়া ভাষায় তাদের ছুড়ে দেওয়া গালাগাল আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।
মানিকরা ওই ভাষা বোঝে। ওদের কাছে পরে শুনেছিলাম ওরা নাকি চিৎকার করে বলছিল, ধরতে পারলে ড্রাইভারকাকুকে মেরে শেষ করে দেবে। ড্রাইভারকাকু তো সোজা থানায় গাড়ি ঢুকিয়ে দিলেন।
কটন কলেজের দাদারা ফোন করতে এয়ারপোর্ট থেকে আরেকটা ট্রাক চলে এল, সঙ্গে কিছু চিন্তিত অভিভাবকও এলেন। অনেকটা রাত করে বাড়ি ফিরলুম আমরা। চাঁদা করে পয়সা তুলে বড়ো দাদাদিদিরা বিস্কুট খাইয়েছিল আমাদের। ফেরার পথে সবাই ঝিমিয়ে বসে আছি। আমার চোখে ভাসছিল একটা সাদা শার্ট আর প্যান্ট পরা ছোটো শরীর। ট্রাকের ধাক্কায় উলটে পড়ছে মাটিতে। ট্রাকের কোণে ড্রাইভারের পেছনের ত্রিপলের ফাঁক দিয়ে ঘটনাটা ঝলসে উঠেছিল আমারই চোখের সামনে। যদিও তক্ষুনি বুঝিনি ব্যাপারটা।
বাড়ি ফিরেও কাঁপুনি তাড়া করে ফিরছিল আমাকে। ভেতর থেকে উঠে আসা ওই আতঙ্ক কতদিন দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছে! চিটুর রাতেই তেড়ে জ্বর এল। পাশের মেসের কাকু হোমিওপ্যাথি গুলি দিলেন খেতে। আমার অবশ্য জ্বর আসেনি। পরে যখন বড়োদের কাছে আমরা ছেলেটার খবর জানতে চাইলাম, তারা এড়িয়ে গেলেন। বারবার প্রশ্ন করে কোনও সদুত্তর না পেয়ে আমরাও যা বোঝার বুঝে চুপচাপ হয়ে গেলাম।
সেসময় গৌহাটির রাস্তাঘাটের শত নিরাপত্তার মধ্যেও একটা হিমশীতল বাঙালি বিদ্বেষের উপস্থিতি টের পেতাম আমরা। আমাদের স্কুলে যেসব মেয়েরা পড়ত তাদের বেশিরভাগই পূর্ববাংলা থেকে এসেছে। চালচলনে কথাবার্তায় আমার সঙ্গে অনেক অমিল। মফস্বল থেকে আসা আমি সেইসব শহুরে বন্ধুদের ভালোই নকল করতাম। সুনন্দা বলে ময়দার মতো সাদা মোটাসোটা একটি বন্ধু ছিল আমার। মাথার পাতলা চুলে দুটি বেণী করত ও। ফাঁকা ফাঁকা চুলের মধ্যিখানে ধবধবে সাদা সিঁথিটা ফ্যাটফ্যাট করত। আমার পাশে বসে সারাক্ষণ কথা বলত, আর সেজন্য মাঝেমাঝেই ক্লাসে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হত আমাদের। তবে তাতে লজ্জা পেতাম না। আর ছিল মৈত্রেয়ী। রোগা ডিগডিগে, চোখে চশমা, মাথায় দুটি মোরগঝুঁটির মতো হর্স-টেল করে চুলবাঁধা। পাতলা চেহারার মেয়েটির চালচলন বেশ ভারিক্কি ধরনের ছিল। এখনও মনে আছে, মৈত্রেয়ীর ছিল পরিষ্কার খাতা, ঝকমকে হাতের লেখা। আর আমার অপরিষ্কার খাতা ও জঘন্য হাতের লেখা। তা সত্ত্বেও আমিই কী করে এই বি সেকশানে সবচেয়ে বেশি নম্বর পাই এ রহস্য নিয়ে মাঝেমাঝেই ও অন্যদের সঙ্গে গুজগুজ করত। সুনন্দা ছিল ওর প্রাক্তন প্রিয় বন্ধু। ভালোমানুষ মেয়েটি হঠাৎ কেন আমাকেই বেশি বেশি ভালোবাসছে তা মৈত্রেয়ীর মাথায় ঢুকত না। কারণে অকারণে আমাকে আর সুনন্দাকে দু’কথা শুনিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল ও। আর ওদের কাছেই অসমীয়াদের বাঙালি অপ্রীতির বিষয়টি প্রথম শুনি আমি।যদিও তখন কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি।
তারপর একদিন চোখের সামনে প্রমাণ পেলাম। সকালে বাবা বাজারে গিয়েছিলেন। বাড়ির সামনে বাজার হওয়ায় ছুটির দিনে দু-তিনবারও বাজার যেতেন তিনি। সেদিনও একবার ব্যাগ রেখে দিয়ে আবার গেছেন। আমরা কোয়ার্টারের বাগানে, বারান্দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রোদ্দুর মাখছি। মা রান্নাঘরে জলখাবার বানাতে ব্যস্ত। ছুটির মনোরম পরিবেশটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল একমুহূর্তে। হঠাৎ দেখলাম বাবা ছুটতে ছুটতে আসছেন। পেছনে অন্তত দশ-বারোজনের একটি মানুষের দল গালাগাল দিতে দিতে ইট ছুঁড়তে ছুঁড়তে আসছে। তারা সবাই ওই অঞ্চলের লোক। কম্পাউন্ডের বেশি ভেতরে ঢুকল না ওরা। বাবা বাড়ি ফিরে হাঁফাতে লাগলেন। বাবাকে ভয় পেতে দেখে আমার ছোটো ভাইবোনেরা পরিত্রাহি কাঁদছে। মা রান্নঘর থেকে ছুটে এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করছেন, “কী, হয়েছে কী?” তাঁর ও মুখে চোখে আতঙ্কের ছাপ।
ঘটনাটা শুনে আমরাও হতবাক। রোজের মতো বাবা বাজার করছেন, এমন সময় নজরে আসে টাউনের খবরের কাগজের গাড়িটা ঘিরে বেশ জটলা হচ্ছে। ওই গাড়িটাতেই এয়ারপোর্ট থেকে টাউনের অফিসে কাগজ যায়। বাবাও প্রতিদিন বাজার থেকে সেই কাগজ সংগ্রহ করেন। বাবা ভিড়ের মধ্যে উঁকি মেরে দেখেন সেই কাগজের অফিসের কর্মচারীকে কিছু লোক মারধোর করছে। চশমা ভেঙে গিয়েছে, জামা ছিঁড়ে ফালা ফালা। বিপন্ন আর্তদৃষ্টিতে তিনি বাবার কাছে সাহায্য চান। বাবা জিজ্ঞেস করেন, “কী হয়েছে? ওঁকে মারছ কেন?”
“ইনি পকেটমার। তাই মারছি। বেশ করছি।”
বাবা তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে ওঁকে ছাড়াতে যান। “আরে করছটা কী! ইনি ভদ্রলোক। তোমাদের ভুল হচ্ছে।”
ওরা তখন বাবাকে তাড়া করে। মানে পকেটমারের সার্পোটার যখন, ইনিও ভালো লোক নন।
আসলে ব্যাপারটা হল দু’জনেই বাঙালি, তাই ওদের বিদ্বেষ আছেই। নাহলে বাবাকে ওই তল্লাটে সবাই চিনত। পেছনে একটি নেপথ্য কাহিনিও ছিল। বাবা যখন ভদ্রলোকের হয়ে কথা বলছেন তখন আমাদের স্কুল যাতায়াতের সঙ্গী মানিক পাশেই ছিল। ওরা কোয়ার্টারে থাকত না। পূর্ববাংলার মানুষদের একটি কলোনি ছিল এয়ারপোর্টের কোয়ার্টার এলাকার বাউন্ডারির বাইরে। সেখানেই ওদের ঘরবাড়ি ছিল।
মানিক বিপদের আঁচ পেয়ে বাবাকে সাবধানও করেছিল। “কাকাবাবু, আপনি চলে যান। কথা বাড়ালেই ওরা আপনাকে মারবে।”
বাবা কথা শোনেননি। শুনবেন কী করে! নিরপরাধ লোকটিকে বাঁচাবার দায় ছিল তো।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার, বাবাদের অফিসের দু-চারজন কর্মচারী যারা বাবাকে ‘সাব সাব’ বলে সম্মান জানাত, হাত মিলিয়েছিল ওদের সঙ্গে। ইট ছোঁড়াতেও পিছিয়ে যায়নি।
ঘটনাটা মিটে যাবার পর বাবা ওদের অফিসে ডেকে কিছুই বলেননি। ‘ক্যাজুয়াল লেবার’ ছিল ওরা। বললে চাকরি নিয়েই টানাটানি হত। ওরাও বাবার কাছে পরে ক্ষমা চেয়ে নেয়।
এখন বুঝতে পারি এসব ঘটনার পেছনে মস্ত কারণ ছিল একটাই। ক্রমাগত বাঙালিদের সংখ্যা বাড়ায় চাকরি, ব্যাবসা সবই অসমীয়াদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। তাই ওরা বাঙালি হঠানোর জন্য এসব করত। সেদিন ওই ঘটনার পরে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় একটা ভয়ের ছায়া পড়ে যা পরেও কাটেনি। যতদিন ওখানে থাকা হয়েছে, আমরা নিজেদের বহিরাগতই মনে করেছি।

***

স্কুলের পথে যারা রোজ যাওয়াআসা করে তারা সবাই তো আর একরকম নয়। একদল একেবারেই সাধাসিধে, পড়াশুনা করে, বইপত্র পড়ে, বাড়ির অবস্থাও নেহাতই মধ্যবিত্ত ধরনের। অন্যদলটি পড়াশুনায় নেহাতই মাঝারি। কিন্তু ফ্যাশনে, চলনে-বলনে একেবারেই অন্যরকম। মানে কোনওভাবেই তাদের নাগাল আমরা পাই না।
শুক্লাদি ছিল ওই দলের মধ্যমণি। বড়ো বড়ো পালক ঘেরা চোখ, টিকালো নাক, চুল কেটে কপালে সাজানো। স্কুল ড্রেসেও চমৎকার ফিটিংস। এখনও চোখ বুজে ওর দাম্ভিক মুখটি স্পষ্ট মনে করতে পারি। ওকে সযত্নে এড়িয়ে চলতাম আমরা আর আমাদের ও একেবারেই বেপাত্তা করত। ওর তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভঙ্গি সহ্য করতে করতে আমরা তিনবন্ধু হঠাৎই মরিয়া হয়ে উঠি। তাছাড়া সেসময় ‘স্বপনকুমারের ডিটেকটিভ সিরিজ’ মগজে ক্রিয়া করে থাকবে। ছুটির পর তিনজনে মিলে ওর নামে একটা চিঠি খাড়া করি আমরা।

মাননীয়া শুক্লাদেবী,
এতদ্বারা আপনাকে জানানো হইতেছে যে ব্রহ্মপুত্র নদীর ধারে বড়ো বটগাছটির তলায় আগামী শুক্রবার দুপুর দু’টা থেকে পাঁচটার মধ্যে দশহাজার টাকা জমা রাখিবেন। টাকাটি একটি বাক্সে ভরে ওখানে রেখে আপনি চলে যাবেন। বিষয়টি পুলিশের গোচরে আনলে আপনার সমূহ বিপদ। টাকা অনাদায়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকিব।
ইতি—
অজ্ঞাত শুভাকাঙ্ক্ষী।
চিঠিটা খুবই কাঁচা হয়ে গিয়েছিল। প্রথমত মোটে দশহাজার টাকা, তা ও জমা রাখতে হবে সেখানেই, যেখানে রোজ আমাদের ট্রাক অপেক্ষা করে। সবাই বুঝেই গেল এটা ট্রাকের কোনও ছেলেপুলেরই কাণ্ড। তখন হাতের লেখা মেলানোর পালা। এই ব্যাপারে আমাদের বুদ্ধিটা ভালোই কাজ করেছিল। আমাদের ক্লাসের একটি মেয়েকে দিয়েই খসড়াটা কপি করিয়েছিলুম আমরা। তাই হাতের লেখা দিয়ে কাউকেই সনাক্ত করা গেল না।
ট্রাকের একটি বেঞ্চির নিচে চিঠিটা পাওয়া যায়। আমাদের মতলবটা যে খুবই আকর্ষণীয় ছিল তখুনি তার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়া গেল। একদিন দু’দিন অন্তর অন্তর কারুর না কারুর নামে ওইধরনের চিঠি আবিষ্কৃত হতে থাকল। কে যে লেখে জানা যায় না, বোঝা যায় না। মোটামুটি ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল, ছুটির পর ট্রাকে উঠে আমরা সবাই চিঠি খুঁজতে থাকি। না পেলে হতাশ হই। যার নামে চিঠি পাওয়া যায় না সে নিজেকে গুরুত্বহীন, অপাংক্তেয় ভাবতে থাকে। খেলাটি বেশ ভালোই জমে উঠেছিল। রোজ এই নিয়ে হুল্লোড় আর নকল রাগারাগি চলত। তার মধ্যে আসল রাগারাগি ছিল একটাই, যেটা প্রথম চিঠি পাবার পরে শুক্লা করেছিল। ওকে জব্দ করে সেদিন সত্যিই আমরা আমোদ পাই। মানে মনোবাসনা পূর্ণ হয়।
তবে কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গেল। আমাদের চিঠির অনুলেখিকার বোন আমাদেরই ট্রাকের জুবির একান্ত বন্ধু ছিল। সম্ভাব্য বিপদটা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। তাই সাবধানতা কিছু কম হওয়ায় জুবি গোটা ঘটনাটা ওই বন্ধুটির মারফত জেনে যায় এবং আমাদের কিছুই না জানিয়ে ট্রাকে সবাইকে বলে দেয়।
তারপর আবার কী? অপমানের একশেষ! চূড়ান্ত গরম হাওয়ায় আমরা ঘেমে নেয়ে একশা! সবার সম্মিলিত ধিক্কারে তিনবন্ধু একেবারে কোণঠাসা।
শুক্লা হাত নেড়ে নেড়ে বলছিল, “দেখে নাও এরা নাকি ভালো মেয়ে! একেকটি মিটমিটে বদমাশ।”
সেদিন আমরা বেশ বুঝেছিলাম ও নিজেই ভারি সঙ্কোচে ভোগে। দু-তিনবছর অন্তর ফেল করে বলেই আমাদের সঙ্গে ডাঁট দেখিয়ে মেশে না। যাই হোক, কিছুদিন সবাই আমাদের তিনজনকে রীতিমতো বয়কট করল। ট্রাকে তিনবন্ধু চুপচাপ যাই আসি, আর মনমরা হয়ে থাকি। বাড়িতেও কিছু বলা যায় না। চিটুকেও কিছু বলতে কড়া নিষেধ করি। তারপর? সেই একই ব্যাপার। সময়! বেশ কিছুদিন কাটতেই ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাই।
স্কুলে বেশ চেনাশোনা হয়ে গিয়েছে। পুজোর ছুটির আগে আমাদের এয়ারপোর্টের এগ্রিকালচারাল ফার্মে একটা পিকনিক করা হয়েছিল কিনা। সেটার সব ব্যবস্থাপনা তো আমিই করেছি। মানে আমার সাধ্যে যতটুকু কুলিয়েছে। বাবাই সবটা সামলে দিয়েছেন।
আমাদের কোয়ার্টার ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা উত্তরে গেলে একটা বড়ো এগ্রিকালচারাল ফার্ম আছে। যেখানে প্রচুর সবজি হয়। ফুলের চাষও করা হয়। ক্লাসে দিদিদের আর মেয়েদের সেখানে পিকনিক করার প্রস্তাব আমিই দিই। সবাই আনন্দের সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। ওই ফার্মের মাঝে একটা ঝিল আছে। তার পাশে লম্বা সারি দেওয়া গাছ। গোলাপ, ডালিয়ার বাগান। পিকনিক স্পট বাছা হল ঝিলের পাশেই। ভারি সুন্দর জায়গা। ফার্মের কাকুদের সঙ্গে বাবার একটু চেনাজানা থাকায় জায়গাটা পেয়ে গেলাম আমরা। বাবার চিরকালই অফুরন্ত এনার্জি। স্কুলের সব বন্ধুরা আসছে আমারই নিমন্ত্রণে, অথচ ব্যবস্থা করছেন তিনি। ঠাকুর ঠিক হয়েছে। খাওয়াদাওয়া খুবই সাধারণ। সকালে লুচি-তরকারি, মিষ্টি। দুপুরবেলা ভাত, কপির তরকারি, মাংস আর চাটনি। ফাউ হিসেবে কমলালেবুরও ব্যবস্থা ছিল। ফার্ম থেকেই কপি দেওয়া হল আমাদের। স্কুলের ছোটো ছোটো মেয়েদের জন্য ওটা ছিল ফার্মের তরফ থেকে উপহার। চাঁদার হার ভীষণ কম। ঝামেলা বাধল অন্য জায়গায়। মিঠু, মানে আমার ছোটোবোন যে এয়ারপোর্টের স্কুলে পড়ে আর একদম ছোটোভাই যে মোটে পড়েই না, বায়না ধরল ওরাও পিকনিকে যাবে। আমি মোটে রাজি নই। স্কুলের ফিস্টে ওরা যাবে কেন? মা বলেছে, “আহা, নিয়ে যা না। ফিস্টের পয়সা আমি দেব।”
রাগ হয়ে যাচ্ছে আমার। মুখে বলছি, “ওরাই যাক বরং, চিটু আর আমি যাব না।”
শেষপর্যন্ত নির্ধারিত দিনে স্কুল ইউনিফর্ম পরা গোটা তিরিশ মেয়ে আর পাঁচ-ছ’জন দিদিমণি নামলেন সিটি বাস থেকে। তখন এত বাস ভাড়া করা যেত না। স্কুলের বাইরে এতদূর আসা আবার ফেরত যাওয়া, তাই মেয়েদের কাউকেই অন্য জামা পরতে দেওয়া হয়নি।

প্রথমে সবাই এল আমাদের কোয়ার্টারে। বড়োদের মা চা-বিস্কুট দিলেন, ছোটোদের শুধু বিস্কুট। পিকনিক স্পট একটু দূরে। চা খেয়ে দিদিমণিরা মিঠু আর ছোটোভাইকে সঙ্গে নিয়ে নিলেন। আমার কোনও আপত্তিই টিকল না।
বাজার করে দিলেন বাবা। উনুন, জ্বালানি, রান্নার লোক, সব ব্যবস্থাই তাঁর। সারাদিন হৈ চৈ করেই কাটল। একটু আধটু দুষ্কর্ম যে হয়নি তা নয়। ফার্মের বাগানের দুয়েকটা গোলাপ, দুটো একটা মুলো-বেগুন কোনও কোনও মেয়ে ব্যাগে ঢুকিয়েছে। বলা বাহুল্য, পারমিশান ছাড়া। ধরতে পারলে কী হত কে জানে। কেউ জানতেই পারেনি। তবে ওরকম বড় সাইজের গোলাপ দেখলে লোভ সামলানো শক্ত!বাবার ভয় না থাকলে ওদের দলে হয়ত আমিও ঢুকে যেতাম।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই ওরা গেল চলে। অতগুলো মেয়েকে অতদূরে ঠিকঠাক ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে তো। বাবার কাজ তখনও ফুরোয়নি। বাড়তি খাবার বিলিয়ে, পিকনিক স্পট, বাগান পরিষ্কার করে তিনি বাড়ি ফিরলেন যখন, তখন বেশ অন্ধকার নামছে।
ওই একদিন খুব গর্ব হয়েছিল আমার। মনে হয়েছিল বাবার মতো কর্মঠ, ভালো লোক পৃথিবীতে কেউ নেই। বিছানায় শুয়ে শুয়ে স্বগতোক্তিতে তাঁকে অজস্র ধন্যবাদও দিয়েছিলাম।

***

আমি গৌহাটি পৌঁছনোর আগেই বেঙ্গলি গার্লস হাইস্কুলের ক্লাস সেভেনে দুটি মেয়ে পড়ত। একজন মালা, অন্যজন বন্দনা। আমি যাবার পরে হল তিনজন। মালার আর আমার সাধ-ইচ্ছের এত মিল ছিল যে, দু’জনের ঘনিষ্ঠতা বাকি আরেকজনের অলক্ষ্যেই বেড়ে যাচ্ছিল। আমরা বই ভালোবাসতাম। এর ওর কাছে থেকে যোগাড় করেও আনতাম। হাতের কাজ ফেলেও গোগ্রাসে পড়ে ফেলতাম। কতদিন হয়তো বাবা একটা বড়োদের উপন্যাস ভাঁজ করে উঠে গেছেন। আমি ঝাঁপিয়ে পড়েছি সেটার ওপর, আর শেষ না হওয়া অবধি থামিনি। না, মালার বা আমার কারও বাড়িতেই বইসংক্রান্ত কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
বন্দনা গল্পের বই অত পড়ত না। সিনেমার গল্প করত খুব। সেসময় বেশিরভাগ সিনেমাই ছিল আমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তাই আকর্ষণীয়ও বটে। কতকগুলো সিনেমা পত্রিকার কল্যাণে আমরা হাঁ করে রুপোলী জগতের খবর গিলতাম। সেই জগতে ঢোকার ছাড়পত্র ছিল না, তাই উঁকিঝুঁকিরও বিরাম থাকত না। সস্তায় সিনেমার নায়ক-নায়িকার নীলচে ছবি দেওয়া সিনেমার বই পাওয়া যেত, তাতে গানগুলো লেখা থাকত। পাতলা খাতার মধ্যে ঢুকিয়ে সেসব বই আনা হত স্কুলে। টিফিনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে নেওয়া হত। উত্তম-সুচিত্রার উদাস দৃষ্টি আমাদেরও আনমনা করে দিত। যারা ধরা পড়ত, ওইসব কুকর্মের জন্য বেশ কিছুদিন তাদের স্কুলে আসা নিষিদ্ধ হত। বইগুলোও বাজেয়াপ্ত হত। তবুও আমরা ফাঁক খুঁজতাম। আসলে নিষিদ্ধ আনন্দে রোমান্স বেশি থাকে তো। মাঝেমাঝে কারোর কম কড়া গার্জেন তাদের সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। সেই মেয়েটির কল্যাণে আমরা গল্পটা শুনে নিতাম। রীতিমতো গল্পের আসর বসত। যারা শুনত তাদের বাহ্যজ্ঞান লোপ পেত। কেন না, মানসচক্ষে সিনেমার নায়ক-নায়িকাকে অভিনয় করতে দেখত তো তারা। সেসব লাগামছাড়া কল্পনার আনন্দের সঙ্গে সত্যি সত্যি সিনেমা দেখার আনন্দের কোনও তুলনাই চলে না।
আমাদের বছরে একটা আধটা ‘কিং কং’, ‘বর্নাফ্রি’, ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ বা ‘বীর হনুমান’ জাতীয় ছোটোদের সিনেমা দেখানো হত বৈকি। এয়ারপোর্টের একটা সিনেমা হল ছিল। আসলে সেটা এয়ারফোর্সের সৈনিক বা অফিসারদের জন্য বানানো হয়েছিল। একটা বিশাল বড়ো হল তার মাথায় কারোগেট না কাঠের ছাউনি আজ আর তেমন করে মনে নেই। চেয়ারগুলো কাঠের, তাতে ছারপোকা ভর্তি। ওখানে একটা হিন্দি বই দেখি। ‘তিসরি মঞ্জিল’ হবে নামটা। ওই প্রথম ওয়াহিদা রহমানকে দেখা। ওঁর সঙ্গে নায়ক ছিলেন রাজকুমার। ওয়াহিদার নাকের নাকছাবিটি আমার মনের আয়নায় গাঁথা হয়ে যায়। এখনও মনে আছে, গরুর গাড়ি করে যেতে যেতে জ্যোৎস্না রাতে গাড়ি থামিয়ে ওয়াহিদা ঘাঘরা দুলিয়ে গেয়ে উঠেছিলেন, ‘পান খায়ে সইয়াঁ হমার।’ ছবিরা কী করে যে এত জীবন্ত হয়ে থাকে কে জানে!
সিনেমার গল্প বলত জুবি। শুধু গল্প নয়, হাত-পা নেড়ে বিভিন্ন ছুটন্ত দৃশ্যকে জীবন্ত করে তুলত। স্কুল ছুটির পর ট্রাকের জন্য অপেক্ষা করতে হত আমাদের। সেই অবসর। সেই অবসরের আসরে জুবি ছিল একাই একশো। সিনেমার গল্প বলতে বলতে হাসত, কাঁদত। তার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও আত্মহারা হতাম। অ্যাকশন দৃশ্যের বর্ণনায় ও ছিল সিদ্ধহস্ত। নায়ক-নায়িকার ছোটার বা দোল খাওয়ার দৃশ্যগুলো ও চমৎকার বর্ণনা করত। একটানা বলে যেত “ছুটছে, ছুটছে, ছুটছে…” আমরাও তখন মনে মনে দৌড়তাম নায়ক-নায়িকার সঙ্গে।
গৌহাটিতে বড়ো হলে সিনেমা দেখার সুযোগ কখনওই হয়নি। অফিসের জিপে এক-আধদিন টাউনে কারও বাড়ি গেলে শিঙাড়া, মিষ্টি খেয়ে ফেরত আসতাম। সিনেমা তো দূরের কথা, বড়োরা বাজারেও নিয়ে যেতেন না আমাদের। কারও বাড়ি জমা রেখে কাজ সারতেন। তাই এয়ারফোর্সের হলে ক্বচিৎ কদাচিৎ সিনেমা শো দেখার সুযোগ আমাদের পরম তৃপ্তি দিত। বাড়ি ফিরেও সে ঘোর কাটত না।
আমরা যে খুব সাধারণ অবস্থার মানে একেবারেই মধ্যবিত্ত ছিলাম, সেটা এখন ভালোভাবেই বুঝতে পারি। মায়ের হাতেগোনা দুয়েকটা ছাড়া ভালো শাড়িই ছিল না। আমাদের ভালো জামাগুলো যদিও খুবই সাধাসিধে মাপের ছিল, তবুও আমাদের কাছে অসাধারণ মনে হত। মা পিকনিকে বা কোথাও বেড়াতে গেলে আমরা সবসময়েই বায়না ধরতাম ওই সিল্কের শাড়িটাই পরতে হবে। বেচারি ভালো মানুষ মা আমাদের বায়না রাখতে একই শাড়ি সব জায়গায় পরে যেতেন।
কলোনির জীবনযাত্রায় উঁচুনীচুর একটা ভেদাভেদ ছিল। যাঁদের কোয়ার্টারগুলো বড়ো এবং অনেকগুলো ঘরের, তাঁরাই যে পদমর্যাদায় উঁচু, সে আমরা ছোটোরাও বুঝতাম। তাছাড়া বড়ো বাংলো প্যার্টানের বাড়িতে ঝুলত বাহারি পর্দা, টবে গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, বাড়ির ভেতর থেকে গ্রামোফোনের গান ভেসে এসে একটা দূরত্ব তৈরি করত।
তবে কিছু থাকুক আর নাই থাকুক আমাদের কোনও গরিবিয়ানা ছিল না। মানে নিজেদের মোটে গরিব ভাবতাম না। শোবার ঘরে সারি সারি তিনটি খাটিয়ায় আমরা, মানে মা আর ভাইবোনেরা শুলেও আমাদের একটি রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। তাতে মাঝে মাঝে বেজে উঠত, ‘একখানা মেঘ ভেসে এল আকাশে।’ বলা বাহুল্য, সেইসব গান শুনে আমাদের খুব আহ্লাদ হত। আর আমরা নাচতে পারতাম, গাইতে পারতাম, ছবি বানাতাম। সেসবের মান যাই হোক, ফুর্তির অভাব ছিল না।
রান্নার গ্যাস ছিল দুয়েকজনের বাড়িতে। ফোনও তাই। টিভি কোথাও আসেনি। রেডিওতে নাটক শোনা হত হইহই করে। সেসময়ের আধুনিক গান ‘যদিও রজনী পোহাল তবুও দিবস কেন যে এল না এল না’ প্রথম শুনি শিপ্রাদির গলায়। শিপ্রাদি ছিল শুক্লাদির দিদি। সাজসজ্জায় অত্যাধুনিক কায়দায় বিশ্বাসী শিপ্রাদির গানের গলাটি ছিল চমৎকার। এয়ারপোর্টের যেকোনও ফাংশনে একক সঙ্গীতের বাঁধা প্রোগ্রাম থাকত তার। বড়ো একটা সিঁদুরের ফোঁটা কপালে দিয়ে, গলায় লম্বা মালা ঝুলিয়ে স্লিভলেস ব্লাউজে শিপ্রাদি ফাংশনে আসত। ঘাড়ের কাছে খোঁপা, কানের পাশে বড়ো এক ফুল। শিপ্রাদিকে দেখতে দেখতে আমরা ভাবতাম কবে আমরা বড়ো হব।

***

বড়ো হওয়ার তখনও অনেক বাকি। ছোটো হওয়ার জন্য মাঝেমাঝেই খুব অপদস্থ হতে হয়। এয়ারপোর্টের সুন্দরী দিদিরা আঁচল উড়িয়ে, সুগন্ধী ছড়িয়ে যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটেন আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। কখনও বা তাদের গায়ে গা ঘষে ঘষে হাঁটার লোভও সামলাতে পারি না। তবে তারা খুব সহজেই আমাদের এড়িয়ে যায়। পাত্তা দিতে চায় না। তাদের গোপন গল্পগুলো খুব শোনার ইচ্ছে হয়। কিন্তু তারাও আমাদের বুঝতে পারে ঠিক। হয় কথা বন্ধ করে দেয়, অথবা এমন নিম্নগ্রামে বলে যেখানে পৌঁছনোর সাধ্য আমাদের নেই।
ছোটো হওয়ার কিছু কিছু সুবিধাও যে আমরা ভোগ করি না তা নয়। যেমন ইন্দিরা গান্ধী যখন মেখলা পরে গৌহাটি টাউনে মিটিং কভার করতে এলেন, এয়ারপোর্টের পথে ছোট্ট মেয়ে বুবুকে তুলে দেওয়া হল তাঁর খোলা ট্রাকে। সে মালা পরিয়ে, চন্দনের ফোঁটা এঁকে দিল প্রধানমন্ত্রীর কপালে।
আমার মনের মধ্যে ওইরকম একটা কাজ করতে চাওয়ার ইচ্ছে উঁকিঝুঁকি দিল অকস্মাৎ। ভারি অদ্ভুতভাবে সে ইচ্ছের পূরণও হল। সেবার সীমান্ত গান্ধী গেলেন প্লেন থেকে নেমে ওই একই রাস্তা ধরে। রাস্তার ধারে কালভার্টের পাশে থামল তাঁর গাড়ি। কপালে চন্দনের টিপ পরানোর সৌভাগ্য হল আমার। সেই গোলাপী বলিরেখাঙ্কিত কপালে আর শান্ত সুন্দর বৃদ্ধ চোখদুটির ছাপ থেকে গেল আমার বুকের মধ্যে। পরে চোখ বুজলেই দেখতে পেতাম।
এরই মধ্যে হাওয়ায় ভেসে এল এক মজার খবর। ঠাকুমা আসছেন গৌহাটি, সঙ্গে ছোটোকাকা। নাতি-নাতনিদের জন্য তাঁর ভারি মনখারাপ হয়েছে। উত্তেজনা বাড়ল আমাদের। বাইরের ঘরে আরেকটা খাটিয়া এনে পাশাপাশি ঠাকুমা আর ছোটোকাকার শোবার ব্যবস্থা হল। ঘরের কোণে টাঙানো দড়ির দোলনাটি আপাতত বাজেয়াপ্ত হয়ে উঠেছে আলমারির মাথায়। “ঠাকুমা আসছেন, ঠাকুমা আসছেন।” খবরটা চিৎকার করে সবাইকে দিতে পারলে হয়ত খুশি হতাম আমরা। কিন্তু সেটা এই কলোনি এলাকায় কোনওভাবেই মানায় না। তবে জানতে কারও বাকি থাকল না। এমনকি, জনা আর তার মা’কেও তাদের অপরিষ্কার জামাকাপড় কাচে ঠাকুমার জন্য পরিষ্কার হতে বলা হল।
যদিও আমাদের ঠাকুমার কোনও ছুঁইছুঁই বাতিক নেই। তবুও তার সম্মানার্থে ঘরের তাকে নতুন কাগজ পাতলুম আমরা। বিছানাপত্তর, এমনকি ঘরের ধার ঘেঁষে রাখা ট্রাঙ্কগুলোর ঢাকনা কেচে পরিষ্কার করা হল। গোল টেবিলের ওপর একটা টেবিল-ক্লথ ঢাকা দিয়ে ফুলদানির খোঁজ করতে জানা গেল, ভাই কবেই সেটিকে ভেঙে ফেলেছে। অগত্যা আগরতলার বাঁশের ফুলদানিতে কিছু মাধবীলতা সাজিয়েই ক্ষান্ত হলুম আমরা।
এক শীতে এখানে আসা। আরেক শীতে ঠাকুমার আবির্ভাব। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। আমাদের অফুরন্ত ছুটি। ধবধবে থান পরা ঠাকুমা সেই ছুটির বাড়িঘরে যেন সদ্য ফোটা গন্ধরাজের মতো শোভা পেতে লাগলেন।
ঠাকুমা আসার দিনটি এখনও ভারি স্পষ্ট হয়ে আছে। উত্তেজনার চোটে আমরা ভাইবোনেরা সকালে দাঁত অবধি মাজিনি। যখন চিটুকে বলছি, ও বলছে, “দিদি আমিও…”
ছোটোকাকার সঙ্গে ঠাকুমা এলেন। বাবা গিয়েছিলেন গৌহাটি স্টেশনে তাঁদের আনতে। আমার দেখেই চোখে জল এল। এই একবছরে তিনি যেন আরও বুড়িয়ে গিয়েছেন। মাথার চুল ধবধবে সাদা। গায়ের চামড়া ঝলমল করছে। ঠাকুমা বাড়ি ঢোকামাত্রই ছুটে কাছে গিয়ে থমকে গেলাম। কী করে নিজেদের সবচেয়ে বেশি আনন্দটা প্রকাশ করব বুঝতে পারছিলাম না।
এয়ারপোর্টের ওই কলোনির সারাবছরের বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘স্পোর্টস’, ‘মেট্‌’, ‘সি.এ.ডি’ আর ‘সি.পি.ডব্লু.ডি’ ওই তিনটি অফিসের তিনটি খেলাধূলার আয়োজন ডিসেম্বরের রবিবার আর ছুটির দিনগুলোকে প্রতিবছরই ভরিয়ে রাখত। খেলাধুলো ছাড়া আমাদের উপরি পাওনা ছিল দিনভর হুড়োহুড়ি আর বোঁদে-লুচি-আলুর দমের বাদামি প্যাকেট। মাথাপিছু একটি করে প্যাকেট বরাদ্দ থাকলেও মানিক-বাপিরা সুনিপুণ কৌশলে একেকজন দু-তিনটে প্যাকেট যোগাড় করে আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে খেত। ওসব আমরা শিখতে চাইনি বললে একদম ঠিক বলা হবে। খুবই অপছন্দের ছিল ব্যাপারটা, তবুও ঝামেলার ভয়ে নালিশ করা যেত না।
খেলায় মালা, আমি একেবারেই লবডঙ্কা। তবে বন্দনা আর একটু ভালো খেলে। চিরকাল সব খেলায় আমি যে লাস্ট হব এই ভবিতব্য আমায় মেনে নিতে হয়েছে। দৌড় দিলে সবার শেষে পৌঁছই। মিউজিকাল চেয়ারে প্রথমেই বাদ। সেবার একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। ছুঁচে সুতো পরানোতে কী করে জানি না একটা জায়গা পেয়ে গেলাম। একবারে সেকেন্ড। লাল টিনের কারুকার্য করা করা টেবিল-ম্যাট ঠাকুমাকে দেখাতেই তিনি বললেন, “বাহ্‌, ভারি সুন্দর প্রাইজ তো! এখানে তাহলে তোমার বেশ উন্নতি হয়েছে। খেলাতেও প্রাইজ পাচ্ছ!”
প্রতিটি স্পোর্টসে ঠাকুমা যেতেন দর্শক হিসেবে। তাঁকে বসার জন্য একটা গদি-আঁটা চেয়ার দেওয়া হত। প্রথম থেকে শেষ অবধি চুপচাপ বসে থাকতেন তিনি। মোটাসোটা বেঁটেখাটো মানুষটির চোখের চশমায়, সাদা কাপড়ে বেশ ওজনদার অস্তিত্ব ছিল। অন্যদের সাদাসিধে কথা বলা, সংস্কারাচ্ছন্ন ঠাকুমাদের সঙ্গে আমার ঠাকুমাটির কোনও তুলনাই চলত না। গৌহাটিতেও আমার বন্ধুরা সবাই ঠাকুমাকে ঘিরে ভিড় করতে শুরু করল। অন্যরকম শুদ্ধ ভাষায়, ‘তুমি তুমি’ করে তিনি যখন ওদের সঙ্গে কথা বলতেন, ওরা সবাই খুবই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত।
আমাকে সবাই জিজ্ঞেস করত, “উনি খুব পড়াশোনা করেছেন, না রে?”
আমি বলতাম, “পড়াশোনা করেছেন কী! অনেককে পড়িয়েছেন। তাছাড়া উনি গল্প, কবিতা এসব লেখেন। পত্রিকায় রীতিমতো ছাপা হয়।”
বলা বাহুল্য, ওদের সামনে এসব কথা উচ্চারণ করতে আমার খুব গর্ব হত। সেই ভাবটা আমি একটুও লুকোতাম না।
ঠাকুমাকে নিয়ে আমরা গেলাম কামাখ্যা মন্দিরে। পুজোর দীর্ঘ লাইন। পুজো দিয়ে ফেরার পথে দোকানে ঢুকে তেলেভাজা খাওয়া। তেলেভাজা ঠাকুমার খুব প্রিয় বস্তু। নিরামিষাশী মানুষটার কীই বা খাওয়া হয়! সারাক্ষণ ঠাকুমার হাত ধরে রইলাম আমি। চিটু মাঝে মাঝে ওঁর হাত ধরে নিয়ে গেলেও ছোটো হওয়ার অপরাধে মিঠু, টুকুকে একটুও সুযোগ দিই না। তারাও আমাদের ডিঙিয়ে ঠাকুমার কাছাকাছি হতে পারে না। মুখে অবশ্যই বলি, “যা, তোরা ছেলেমানুষ! পারিস কখনও? এত সিঁড়ি, এবড়োখেবড়ো রাস্তা, ঠাকুমা পড়ে যান যদি!”
রণকৌশলটি ঠাকুমার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে ঠিকই ধরা পড়ে। অপেক্ষাকৃত সোজা রাস্তায় তিনি মুচকি হেসে মিঠু, টুকুকে কাছে ডেকে নেন। “এবার তোমরা এসো। হাত ধরবে না?”
ওরাও অমনি একছুটে এসে আমাদের সরিয়ে দেয়। চিটু ওর রাগ লুকোতে পারে না। আমি নির্লিপ্ততার ভান করি।
ছোটোকাকা ঠাকুমাকে গৌহাটিতে রেখে কয়েকদিনের জন্য শিলং বেড়াতে যান। ফিরে আসার পরই কষ্টের দিন গোনা শুরু হয়ে যায়। ঠাকুমা ফিরে যাবেন একথাটা বড়ো নিষ্ঠুর লাগে। যদিও স্বাভাবিকভাবে তাই তো হওয়ার কথা।
অবশেষে এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় ঠাকুমা তাঁর পাততাড়ি গোটান। বাবা ট্রেনে তুলে দিতে গেলে আমরা তিনবোন পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসি। ছোটোভাই টুকু বুঝতে পারলেও যোগ দেয় না। আসলে তখনও মা-ই ওর কাছে সব ছিলেন। ও বাইরের ব্যালকনিতে খেলা ভুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
মা বলেন, “পরোটা ভাজব? গুড় দিয়ে পরোটা খাবি?”
পরোটার মতো প্রিয় সুখাদ্যও আমাদের কান্না থামাতে পারে না। রাতে কিছু না খেয়েই শুতে যাই আমরা। পরদিন সকালে চোখ খুলে ঠাকুমার ছেড়ে যাওয়া ফাঁকা কোয়ার্টারটাকে বড়ো বিশ্রী লাগে।

***

ঠাকুমা চলে যাবার পর একটা নতুন খবর শোনা গেল। ঠাকুমা নাকি বাবাকে বারবার বলে গিয়েছেন নাতি-নাতনিদের ছেড়ে একা থাকতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। অন্তত বড়ো দুই নাতনিকে যেন তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাবাও ভেবেচিন্তে ঠিক করেছেন যে আমাকে পাঠিয়ে দেবেন। কেননা, এবার আমার ক্লাস নাইন হবে। ওখানে পড়লেই ভালো, কারণ বাবা যদি হঠাৎ বদলি হয়ে যান আমার কোনও অসুবিধে হবে না। চিটুর ব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ও কখনও আমাকে ছেড়ে থাকেনি। তাই সম্ভবত ও-ও যাবে আমার সঙ্গে।
ঠাকুমা চলে যান। আমাদের সঙ্গে তোলা তাঁর কামাখ্যা আর উমানন্দের মন্দিরের পথের ছবিগুলো জ্বলজ্বল করে অ্যালবামে। কামাখ্যা পাহাড়ের একদম চূড়ায় ভুবনেশ্বরের মন্দির। কামাখ্যা মন্দির পার হয়ে যেতে হয়। কিন্তু উমানন্দ যাওয়ার মজাই আলাদা। ব্রহ্মপুত্র নদীর দ্বীপে উমানন্দ অর্থাৎ শিবের মন্দির। নদীর বুকে নৌকো করে যেতে হয়। সেই নৌকোয় ঠাকুমা বসেছিলেন টুকু আর মিঠুর হাত ধরে। আমরা দু’পাশে। সম্ভবত দে-কাকু তুলেছিলেন ছবিটা। আর দ্বীপে তোলা সব ছবিতেই ঠাকুমার পাশে আমি আর চিটু। ওই ছবিগুলো দেখি ঠাকুমা চলে যাবার পরে, নির্জন দুপুরে, বা একটু বেশি রাতে, যখন বাবা-মা-বোনেরা কেউ জেগে নেই। খাবার টেবিলে পড়তে বসার বাহানায় একা একা ছবিগুলো নাড়ি-চাড়ি। আর বুকের মধ্যে পাক খাওয়া দুঃখটা চোখের জল হয়ে হু হু করে গাল ভাসিয়ে দেয়।
ঠাকুমার কাছে চলে যাবার কথা যখন ভাবি, তখন আবার গৌহাটির জন্য মন হায় হায় করে ওঠে। এখানেও অনেক বন্ধু হয়েছে। বেশ কিছু খেলার বা স্কুলের বন্ধু ছাড়াও পথঘাট, বাড়িঘর, গাছপালার টানই কি কম? চলে গেলে বইয়ের দোকানের সেই হাসিখুশি দাদার সঙ্গে আর দেখা হবে না যিনি স্কুল ছুটির পর আমাদের বই পড়তে দেন। বড়ো রাস্তার ওপারে লজেন্সের দোকান। সেখানে কিছু কিনলেই একটা লজেন্স ফ্রিতে মেলে। সেটা তো আর পাওয়া যাবে না। স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রাকে চাপার মজাও হারিয়ে যাবে। প্রার্থনা সঙ্গীত হিসাবে অসমিয়া ও বাংলায় একই সঙ্গে ‘মানুহে মানুহর কবে’ বা ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গাওয়া যাবে না। কত কথাই ঘুরে ফিরে মাথায় আসতে থাকে।
তার ওপর আমাদের মা। কোনও শাসন করেন না। ঠাকুমার কাছে গেলেই বাড়িশুদ্ধু লোকের মিলিত শাসন শুরু হবে। অসুবিধে অনেক। তবে এগুলো এতদিন মনে পড়েনি।
এইসব গোলমালের মধ্যেই আবার একটা পিকনিকের তোড়জোড় শুরু হয়। ‘অন্তু’তে যে জল প্রকল্প আছে, তারই পাশে বাসে করে গিয়ে পিকনিক করা হবে। সবাই কী পরে যাবে তাই নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। আমাদের তো সাকুল্যে দুয়েকটি বাহারি পোশাক। তাই ওসব নিয়ে ভেবে কোনও লাভ নেই। এবার দলে আছে ইলা। ও বাবা-মার এক মেয়ে। একটু বেশি বয়সের। তাই খুব আদরের। ওর মা আবার এককালে স্কুলে পড়াতেন। নিয়মনীতি শৃঙ্খলায় মেয়েকে সবসময় বেঁধে রাখতে চান। ইলা বেশ ভালোই ডাকাবুকো। স্বাস্থ্য, সাহস, দুইই বেশি। খুবই বুদ্ধিমতী। কলোনিতে ওর মতো সুন্দরীও কেউই নয়। ও আসবার পর বাকিরা ম্লান হয়ে গিয়েছে। ইলা এখন মেয়েদের দলের সর্দার। সারাক্ষণ ঝরঝর করে কথা বলে, শব্দ করে হাসে। আবার পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পায়। একটা ব্যাপারেই মালা আর আমার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না ও। আমাদের মতো গল্পের বইয়ের নেশা নেই ওর। চেষ্টা করেছিল দু-একবার, পেরে ওঠেনি। কিছুদিন বাদেই বলেছে, “ধুস, চুপচাপ বসে তোদের মতো অত বই আমি পড়তে পারব না।”
ইলাকে নিয়ে সবার মধ্যেই একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়, কে ওর বেশি বন্ধু হবে। মালা আর আমার জোট অবশ্য ভাঙার নয়। বন্দনা ওর দিকে ভালোমতো ঝুঁকেছে। ইলার স্কুল আলাদা। আমরা বেঙ্গলি গার্লস-এ পড়ি আর ও পড়ে পাণ্ডুর স্কুলে। গৌহাটি যাবার পথে পাণ্ডু একটা ছোটো শহর, সেখানেও বাংলা মাধ্যমের স্কুল আছে। ওখানে আগে পৌঁছয় ট্রাক। গৌহাটির স্কুল যদিও বেশি ভালো। ইদানিং স্কুল যাবার সময় ইলা না নামা অবধি বন্দনা ওর পাশেই বসে থাকে। যদিও তেমন করে ইলার মনোযোগ আকর্ষণ করা ওর কম্মো নয়। আবার ফেরার পথেও উৎকন্ঠ প্রতীক্ষায় থাকে, কখন ইলা ট্রাকে উঠবে। ব্যাপারটাতে মালা, আমি, মনে মনে একটু বিরক্ত হই। যদিও এ-ব্যাপারে আমাদের নেপথ্য অবদানের কথা মনে রাখি না। প্রধানত আমাদের বাড়তি ঘনিষ্ঠতার জন্যই বন্দনা ওইদিকে ঝুঁকেছে। ইলা আমাদের মতো অত নীতিবাগীশ নয়। ঝালমুড়িওলার ঝুড়ি থেকে চানা তুলে নেয়। ট্রাকের ছেলেদের সঙ্গে ঝগড়া হলে অম্লানবদনে চড় কষায়। কথায় কথায় সবাইকে ‘ইডিয়ট’ বলে। ইচ্ছে হলে যেকোনও বাগানের ফুল না বলে তুলে মাথায় গুঁজতে পারে। আমি আর মালা ওকে এড়িয়ে চলি। কিন্তু বন্দনা মনেপ্রাণে ওর ভক্ত হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই বন্দনা আমাদের নতুন নামকরণ করে। কথায় কথায় বলে, “তোরা দু’জনেই ভিতুর ডিম। ইলাকে দেখে অনেক কিছুই শেখার আছে তোদের।”
স্কুল নেই। পড়া নেই। সামনে পিকনিক। তবুও আমরা বন্দনাকে ছাড়া বিমর্ষ হয়ে থাকি। যতদিন আমাদের সঙ্গে ছিল, বিশেষ পাত্তা দিইনি। না থাকায় অভাবটা বেশি বুঝতে পারা যায়।
পিকনিকের দিন সকাল সাতটায় মোট তিনটে ট্রাকে ইচ্ছুক পরিবারেরা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পাহাড়ি জঙ্গলে ঘেরা রাস্তা, তাই কোম্পানির রাইফেলধারী চারজন গার্ড সঙ্গে চলেন। বনের পথে গাড়ি সেঁধোতে থাকে। পাহাড়ে ওঠা শুরু হয়। রাস্তার পাশেই বেশ গভীর খাদ। আমাদের উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। মোটামুটি ন’টা নাগাদ পাহাড়ের প্রায় চুড়োয় ট্রাক আমাদের নিরাপদে পৌঁছে দেয়। ট্রাক থেকে নেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। ঘন জঙ্গল ভেদ করে এক ঝরনা নেমে আসছে তীব্র গতিতে। চারপাশে আলো হয়ে আছে তার জলকেলির উচ্ছ্বাসে। চোখ ফেরানো যায় না। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি, আর নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে হয়।
জলখাবারের তোড়জোড় শুরু হয়। কলা-পাউরুটি, ডিমসেদ্ধ আর গরম গরম কফি হাতে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আড্ডা জমাই। বন্দনা যথারীতি জুটেছে ইলার সঙ্গে। আমরা দু’জন আর ইদানিং ওকে নিয়ে তেমন মাথা ঘামাচ্ছি না। তবুও নজর ঠিকই চলে যায়, সামান্য কষ্টও হয়।
মাইকে সিনেমার গান বাজে, তার সঙ্গে কমবয়েসী কাকুদের নাচ শুরু হয়। মন দিয়ে সেসবই দেখি আমরা। এমন সময় মুখ কালো করে বন্দনা এসে বসে আমাদের পাশে। টপটপ করে পড়া চোখের জলে ওর দু’গাল ভেসে যাচ্ছে। ব্যাপার কী?
কিছুদিন যাবত হিন্দি স্কুলের একটি কাশ্মীরি ছেলের সঙ্গে ইলার খুব বন্ধুত্ব হয়েছে লক্ষ করেছিলাম। সে নাকি বন্দনাকে খুব বিশ্রীভাবেই অপমান করেছে। সবটা উদ্ধার না করা গেলেও কান্নার মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলা বন্দনার কথা থেকে বোঝা যায়, ও নাকি বন্দনাকে ইলার উপস্থিতিতেই ‘শাট আপ’ বলেছে। ইলা প্রতিবাদ করেনি। সে তখন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁতে ঘাস কাটছিল। অপমানিত মেয়েটির চোখ মুছিয়ে তাকে ভোলাতে, এক কাকুর ক্যামেরায় তিনটে ছবি তুলি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্দনা সব ভুলে আমাদের সঙ্গে জমে যায়। এক ফাঁকে মালা আমার কানে ফিসফিস করে বলে, “শাপমুক্তি।”
মাঝে মাঝে এরকম কোডে কথা বলা অভ্যেস আমাদের ছিল। তবে সেদিন পিকনিকের আনন্দকে ছাপিয়ে ওঠে আমাদের বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আসলে কিছু না হারালে তো তার মূল্য বোঝা যায় না।

***

সবসময়েই দেখি সুখের দিনগুলো হু হু করে কেটে যায়। ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে চলা কষ্ট। দুঃখের দিনগুলো প্রায়শই অসহ্য হয়ে ওঠে। রেজাল্ট ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পনেরো তারিখ। নাগাড়ে গল্পের বই পড়লেও ওই বিষয়টা মাথায় থেকেই যাচ্ছে। দিন এগিয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যায় রোজ। বিছানায় লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে থাকি চুপচাপ। রান্নাঘরে থেকে মায়ের কাজকর্মের টুং টাং আওয়াজ আসে। পরীক্ষা খারাপ হয়নি। তবে ফলাফলটা মনোমত হবে কি না সে-চিন্তা তো একটু আছেই। আমার পরের বোন চিটুর অত দুশ্চিন্তা নেই। দিব্যি হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। যদিও ও-ই বেশিমাত্রায় ফাঁকিবাজ। এয়ারপোর্টের বাচ্চাদের স্কুলের রেজাল্ট আগেই বেরিয়েছে। মিঠি মোটামুটি ভালোই করেছে। তবে অঙ্কের নম্বর পঞ্চাশের ঘরে বলে বাবা ওকে একটু বকাবকিই করেছেন। একমাত্র ভাইয়ের কোনও হেলদোল নেই। ওর পড়াশুনো এখনও শুরুই হয়নি।
এখানে আসার পর পড়ায় আমার বাড়তি উন্নতির মূলে আছে মালা। পাঠ্যের চেয়ে অপাঠ্য বইয়ে যদিও আমরা বেশি উৎসাহী, তবুও মালার রেজাল্ট কখনও খারাপ হয় না। ভালো রেজাল্ট করার জন্য যেটুকু পড়াশুনা দরকার, তা মালা করেই থাকে। ওর দেখাদেখি বারান্দার পাশে রাখা বড়ো খাবার টেবিলটায় খাতাপত্র গুছিয়ে প্রায়ই বসে পড়ি আমি। ভূগোল কোনও কালেই ভালো লাগে না। অঙ্কেও তেমন আগ্রহ নেই। ভালোবাসি ইতিহাস। বাংলায় লিখতে পড়তে খুবই আগ্রহী। ইতিহাসে বাংলায় হায়েস্টও পাই। বিজ্ঞান, ভূগোল, অঙ্কের নম্বর তেমন সুবিধের হয় না। ইংরাজিতে, সংস্কৃতেও তেমন আকর্ষণ নেই। লিখতে লিখতে অনিচ্ছার বিষয়গুলো বেশ ভালোই রপ্ত হয়েছে এবার। ফলস্বরূপ শেষ পরীক্ষাটা আমার খারাপ হয়নি। এমনকি প্রথম তিনজনের মধ্যে নাম থাকলেও অবাক হব না। কী হয়, কী হয়, এরকম একটা চিন্তার মধ্যে দিন কাটছে।
চিটুর ঠাকুর প্রণামের ঘটা বেড়েছে। ইদানিং ক্যালেন্ডারের ঠাকুরের মুখে ও সবকিছু আগে ঠেকিয়ে তারপর খায়। ফলে ক্যালেন্ডারের শিব, দুর্গা, সরস্বতীদের ঠোঁটের জায়গায় ইয়া বড়ো বড়ো গর্ত হয়ে গিয়েছে। রাতে ঘুমোবার আগে, আবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই কপালে হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে। অনেকদিন পেছনে ঘুরঘুর করতে করতে শুনতে পাই, ও বলছে, “এবারের মতো আমাকে পাশ করিয়ে দাও ঠাকুর। আসছে বছর প্রথম থেকেই পড়ব।”
প্রার্থনার সারমর্ম বুঝে আমার দুশ্চিন্তা বাড়ে। নিজের মনে বিড়বিড় করি। আমার ভালো রেজাল্ট দরকার নেই। যেন দু’জনেই ক্লাসে উঠে যাই।
অবশেষে অবধারিত দিনটি গুটিগুটি হাজির হয়। চিটু প্রায় কিছুই না খেয়ে স্কুলের ট্রাকে ওঠে আর আমার হাত আঁকড়ে বসে থাকে। অন্যসময় দু’জনের মোটেই বনে না। তবে এদিন নিজের জন্য কিছুই না বলে প্রাণপণে ওর জন্য ঠাকুর ডাকতে থাকি। মনে আশঙ্কার শেষ নেই। কেন না আমরা তেমন ঈশ্বর বিশ্বাসের জোর নেই। কিছুই না লিখে শুধু ঠাকুরের ভরসায় যে পাশ করা যাবে না, সে আমি ভালোমতোই জানি।
ঠিক বারোটার সময় সব দিদিমণিদের সঙ্গে করে বড়দি আমাদের ক্লাসে আসেন। প্রথামতো ক্লাসের উত্তীর্ণ প্রথম দশজনের নাম উনি ঘোষণা করে তারপর অন্য ক্লাসে যাবেন। দেখি আমাদের ক্লাস-টিচার হাতে রেজাল্টের প্যাকেট নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসেন। নাম ঘোষিত হয়। মালা প্রথম, অরুন্ধতী দ্বিতীয় হবে জানাই ছিল। অরুন্ধতী যতই পড়ুক, মালাকে টপকানো শক্ত। তবে অবাক কাণ্ড এটাই যে আমার নামটা তিন নম্বরে! অর্থাৎ আমি ক্লাসে তৃতীয় এবং সেকশনে প্রথম। আমি কেমন জড়োসড়ো হয়ে হাসার চেষ্টা করি। খুব বেশি বেশি খুশি হতে পারি না। কেননা, সৌভাগ্যটা অভাবিত হলেও সেটা চিটুর জন্য আশঙ্কাকে মুছে দিতে পারেনি।
নিজের রেজাল্ট হাতে নিয়েই দৌড়ই চিটুর ঘরের দিকে। সুনন্দা পেছন থেকে বারবার ডাকে, চিৎকার করে শুভেচ্ছা জানায়, সাড়া দিই না। ও কী করে জানবে আমার মধ্যের দিদিটা বোনের জন্য কেমন তীব্র দুশ্চিন্তায় আছে! আমাকে দেখে ফিক করে হেসে চিটু বলে, “পাস করেছি। তবে অঙ্কে ফেল। হ্যাঁরে দিদি, বাবা খুব বকবে কি?”
আমার খবরে ওর মুখ হাসিহাসি আর চোখ গোলগোল হয়। আমি শুধুমাত্র, “ভয় পাস না, বাবা বকবে না।” বলেই একদৌড়ে মালার কাছে চলে যাই। ওর নম্বর শোনার বা আমারটা বলার সামান্য সৌজন্যটুকুও দেখাই না।
আসলে আমার ভালো রেজাল্টের পেছনে মালার যে অনেকটা অবদান আছে। ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য মনে তখন ছটফটাচ্ছে। দেখি সে নির্বিকার চিত্তে ঘর থেকে হেলেদুলে বার হচ্ছে। ফার্স্ট কি লাস্ট বোঝার উপায় নেই। আমাকে দেখেই একমুখ হাসি নিয়ে বলে, “কনগ্র্যাটস! বলেছিলাম না ঠিকমতো পড়লে তোর ভালো পজিসন হবেই! আচ্ছা, তুই কি বন্দনার খবর নিয়েছিস?”
সত্যিই তো, বন্দনার খবর কী? মালার ‘এ’ সেকশন, আমার ‘বি’, বন্দনার ‘সি’। দৌড়ে গিয়ে দু’জনে দেখি ‘সি’ সেকশনের দরজায় গাল ফুলিয়ে বন্দনা সম্ভবত আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে। ওর রেজাল্ট ভালো হয়নি। অঙ্ক, বিজ্ঞান দুটোতেই ফেল। গার্জেন দেখা করলে তবেই পাশ করবে। আমরা ওকে সান্ত্বনা দিই। ও তবুও গম্ভীর হয়েই থাকে। আমরাও ঠিক খুশি হতে পারি না।

***

গোছগাছের পালা শুরু হয়েছে। গৌহাটি-পর্ব শেষ হতে চলল। বাবা বলেছেন, জানুয়ারি মাসেই আমাদের পাঠিয়ে দেবেন। এয়ারপোর্টে প্লেনে তুলে দিলে কাকারা দমদমে নামিয়ে নেবেন। মা, বাবা আর ছোটো দুই ভাইবোন মিঠু, টুকু থাকবে মায়ের কাছে। আমি আর চিটু চলে যাব। তাই মায়ের খুব মনখারাপ। বারবার আমাদের বলছেন, “তোরা বাবাকে জোর দিয়ে বল না, এখানেই থাকবি। ওখানে ঠাকুমার বয়স হয়েছে তো। তোদের কে দেখবে? আমার খুব চিন্তা হবে।”
বুঝতে পারি মা আমাদের ছাড়তে চাইছেন না।
ওদিকে বাবা সব ঠিকঠাক করে ফেলেছেন। নতুন বাক্সে আমাদের জিনিসপত্র গোছানো হচ্ছে। মিঠু আর টুকু ফ্যালফ্যাল করে দেখছে আর আমাদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।
চিটু বলছে, “বাবাকে বল না, দিদি।”
আমি জানি বলে আর কিছু লাভ নেই। টিকিট কাটা হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া আমার ক্লাস নাইন হল। যেখানেই পড়ি না কেন, তিনবছর টানা পড়তে হবে। বাবা যদি বদলি হয়ে যান তখন কোনও উপায় থাকবে না।
রোজ রোজ নিজেদের বাড়িতেই নেমন্তন্ন খাচ্ছি। পায়েস, মাংস মা রোজ একটা নয় একটা কিছু করছেনই। কড়াইশুঁটির কচুরি, আলুর দম হল যেদিন, সেদিন কাকুকে বলা হয়েছিল। কাকু এসে ইয়াবড়ো একটা পুতুল দিয়ে গেলেন আমাদের। পুতুলটার চোখ নীল। চোখের পাতা শোওয়ালে বন্ধ হয়, বসালে খোলে।
পুতুলটা নিয়ে মিঠু খুব টানাটানি করছিল। বাবা কেড়ে আলমারির মাথায় তুলে রাখলেন। পাশের বাড়ির কাকিমা একদিন আমাদের নেমন্তন্ন করলেন। টুকু-মিঠুও বাদ যায়নি। চারদিকে ফেয়ারওয়েলের সুর। মালার দেওয়া সেন্টটা ফুরিয়ে গিয়েছে। শুধু শিশিটা আছে। ওটা আমি সুটকেসে ঢোকাই। ফাঁকা শিশিতেও গন্ধ থেকে যায় তো।
এর মধ্যেই এক রবিবার খবর পেলাম, আমাদের বাড়ির কাছেই এয়ারপোর্ট ক্লাবে এক ম্যাজিসিয়ান এসেছেন। তিনি নাকি ম্যাজিক দেখাবেন। কথাটা কানে শোনা ইস্তক আমাদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ভাইবোনেরা সবাই যাব। আশেপাশের কোয়ার্টারের বন্ধুরাও বাদ যাবে না। আমাদের যাওয়ার এখনও সপ্তাহ দুয়েক বাকি। ম্যাজিসিয়ানের শো একদিন বাদেই। বিকেলে চারটেয়। ক্লাবের ঘরে। একটাকার টিকিট কেটে আমরা ভেতরে ঢুকি। জমায়েতে কেউ বাদ থাকে না। ম্যাজিক দেখতে বড়োরাও উঁকিঝুঁকি মারছেন। বেশিরভাগ মায়েরাই অনুপস্থিত। কেননা, দশটা পাঁচটা অফিসের পর বাবারা ফিরে এলে চা, খাবার দিতে হবে তো।
ম্যাজিশিয়ানের জামার কটকটে হলুদ রঙ, বিবর্ণ পাগড়ি আমাদের উৎসাহ বিন্দুমাত্র কমায় না। ক্লাবঘরের মেঝেতে তক্তপোশের ওপর সাজসরঞ্জাম গোছানো হয়েছে। একপাশে একটা টেবিল, আর পেছনে কালো পর্দা। শো আরম্ভ হবার একটু আগে হীরাদা হাতছানি দিয়ে বাইরে ডাকে আমাকে। বলে, “ম্যাজিশিয়ানকে একটু সাহায্য করতে হবে।”
দুরুদুরু বুকে হীরাদার সঙ্গে ক্লাবের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকি। ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। হীরাদার সঙ্গে কালো পর্দার আড়ালে হাজির হতেই তিনি বলেন, “তুমি বেশ চালাকচতুর শুনলাম। আমায় যদি একটু সাহায্য করো।”
আমি নার্ভাস। কীভাবে সাহায্য করব?
উনি বললেন, “বসো।”
সামনের টুলে বসে ওঁকে মন দিয়ে লক্ষ করি আমি। ব্রোকেডের জামাটায় মাঝেমাঝে সেলাই করা। নাগরা জুতোয় তাপ্পি পড়েছে। ম্যাজিশিয়ানের চোখের কোলগুলো বসা। সব মিলিয়ে খুব দুঃখী দেখায় ওঁকে। সাহায্যের ব্যাপারে কিছু কথা হয়। সম্মত হয়ে আমি দর্শকদের ভিড়ে মিশে যাই।
ম্যাজিক শুরু হয়। টুপির ভেতর থেকে একের পর এক রঙিন রুমাল, পাখা ইত্যাদি বার হতে থাকে। সবচেয়ে শেষে সম্মোহনের খেলা। সে খেলায় গুটিগুটি আমি স্টেজে উঠি। আমাকে সম্মোহিত করে উনি জল আনান। টেবিল মোছান। গান করান। অথচ পরে আমার সম্মোহন ভাঙলে আমি কিছুই মনে করতে পারি না। সম্মোহিত অবস্থায় আমার সারা শরীরে কাটা আলু রেখে উনি কাপড়ে চোখ বেঁধে ছুরি দিয়ে গেঁথে একটা একটা আলু তুলতে থাকেন। আমি নট নড়নচড়ন। শুধু একবার আমার খুব হাসি পায়। উনি জ্ঞান আনানোর জন্য নাড়ি টিপে বলতে থাকেন, “কাম পালস, কাম পালস।”
আমি অতিকষ্টে হাসি চেপে মড়ার মতো পড়ে থাকি।
বলা বাহুল্য, এই খেলাটায় পর্দার পেছনে আমার সঙ্গে ওঁর গোপন চুক্তিটা ফাঁস হয় না। কিন্তু আমি মনে মনে খুব অখুশি হই। ম্যাজিসিয়ানের ক্ষমতা সম্বন্ধে আমার অবিশ্বাস আসে। এই ফাঁকির ব্যাপারটা মন কিছুতেই মেনে নিতে চায় না।
ম্যাজিক চলাকালীন হীরাদা ওঁকে সবরকম সাহায্য করে। প্রতিবার ম্যাজিক দেখবার আগে উনি উচ্চারণ করেন সেই অমোঘ মন্ত্র—‘হিলি গিলি…’
রাতে আমাদের বাড়িতে ওঁর খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। আসলে বিভিন্ন বাড়িতে ওঁর খাবার ব্যবস্থাও হীরাদাই করে দিয়েছিল। ম্যাজিশিয়ান বলেন, “আমার বাড়ি বাঁকুড়ায়। ম্যাজিকের নেশায় ঘর ছেড়েছি। আমার গুরুর বাড়ি বর্ধমানে। তিনি মারা যেতে আমি স্বাধীনভাবে শো শুরু করছি। এখানে ওখানে খেলা দেখিয়ে ঘুরে বেড়াই। গত দু’বছর বাড়িমুখো হইনি।”
মার হাতের লুচি, পায়েস, আলুর দম খেয়ে ওঁকে খুব খুশি দেখায়। অসাধারণ হয়ে ওঠে হীরাদা। ম্যাজিশিয়ান চলে যাবার পরও হীরাদার গাম্ভীর্য কমে না। রাশভারী ভাব নিয়ে কথাবার্তা বলতে থাকে। ম্যাজিক শেখার উদ্দেশ্যে কিছু কিছু ছোটো ছেলেমেয়ে হীরাদার পিছু ধরে। আমাদের মিঠুও ওই দলে যোগ দিয়েছিল। বাবার ধমকানিতে ওর উৎসাহে ভাটা পড়ে।
ম্যাজিশিয়ানের কতকগুলো ইংরাজি বুলির বাজারে জোর নকল চলতে থাকে। ‘প্লিজ সাইলেন্ট’, ‘ডোন্ট টক’, ‘রেডি’ ইত্যাদি ইত্যাদি। জ্ঞান ফেরানোর সময় মৃদু কন্ঠে বলা ওঁর ‘কাম পালস, কাম পালস’-এর আমি সার্থক নকল করি। মালা হেসে গড়াগড়ি খায়।
একদিন দেখি কোয়ার্টারের সামনের বারান্দায় ছোটো টেবিলটা পেতে, মায়ের কালো শাড়ি টাঙিয়ে মিঠু ম্যাজিক দেখাচ্ছে। টেবিলের ওপর একটা টুপি। তা থেকে অজস্র কাগজ বার করতে করতে মিঠু বলছে, “হিলি গিলি…”
সামনে মাত্র দু’জন দর্শক। একজন আমাদের ছোটোভাই টুকু, অন্যজন জনা। কাজের বউয়ের মেয়ে। যাকে মিঠু মোটে দেখতে পারে না। যেটা দেখে হাসি পায় তা হল ম্যাজিসিয়ানের ড্রেস। বড়ো কিম্ভূত দাঁড়িয়েছে সেটা। পা অবধি ঢাকা হলুদ পাঞ্জাবি আর বাবার বিশাল কোলাপুরি চটি। মাথায় গামছার পাগড়ি বেঁধেছে মিঠু।
মা গেছেন পাশের বাড়ির কাকিমার সঙ্গে পুজো দিতে। সকালে স্নান করার সময় করা তাঁর চিৎকার আমার মনে পড়ে যায়। তিনি বলছিলেন, “আশ্চর্য তো! আমার লাল গামছাটা নিল কে?”

***

চেরাপুঞ্জি জায়গাটা শিলং শহরের ওপরে। পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে হয়। চিরকাল ভূগোল বইয়ে পড়ে এসেছি চেরাপুঞ্জিতে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কেমন একটা ধারণা ছিল চেরাপুঞ্জিতে বুঝি মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে সারাক্ষণ। সেই বৃষ্টিভেজা ঘরদোর, গাছপালা কল্পনায় আঁকা ছিল। ভাবতাম ওখানের ছেলেমেয়েরা কি পড়াশোনা করে না? মানে স্কুলে কি সারাবছর ‘রেনিডে’? লোকে বোকা বলবে বলে এই প্রশ্নটা কাউকে করিনি কখনও।
কল্পনার সেই অদ্ভুত জায়গায় আমাদের যাবার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য্য ঘটনাও কতই ঘটে থাকে। সেরকমই হল। হঠাৎ শুনলাম অফিসের কী একটা ট্যুরে বাবা-কাকু একসঙ্গে শিলং যাবেন। আমরা দুই বোন কলকাতায় ফিরে যাব বলে কাকুর কথামতো বাবা আমাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়েই যাবেন। অফিসের জিপে একটু কষ্টেসৃষ্টেই আমরাও এঁটে গেলাম। উত্তেজনার পারদ আরও চড়ল যখন শোনা গেল কাকু বলছেন, ওখানকার কাজ সেরে চেরাপুঞ্জি ঘুরিয়ে আনবেন।
ঠাণ্ডা খুবই বেশি। হাফ সোয়েটারের ওপর ফুল সোয়েটার, তার ওপর গরম কোট—একেকজন ফুটবলের মতো গোলাকার আকৃতি নিয়েছি। ডিসেম্বরের শেষের দিক। শিলংয়ের গাছে গাছে হলুদ কমলালেবু নজরে এল। গৌহাটি থেকে শিলং যাওয়ার পথে কত চড়াই উতরাই। বুনো ফুলের বাহার। তার সঙ্গে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কামড়। বিপদজনক বাঁকগুলো পার হতে গিয়ে কখনও আমরা চোখ বুজি, আবার কখনও আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি। টুকু নেহাতই বাচ্চা। তাই ওকেই একমাত্র ভয় ছুঁতে পারে না। আসলে ও তো আশঙ্কার দুশ্চিন্তার বয়সে পৌঁছয়নি।
শিলংয়ে খুব সাধারণ মানের একটা হোটেলে বাবা তুললেন আমাদের। নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা। রাতে খেতে বসেই আমরা বুঝে গেলাম, এরা মাছ-মাংস-ডিম কিছুই দেবে না। শুধু কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ যত খুশি নেওয়া যেতে পারে। আরেকটা নতুন জিনিসও ডিশে সাজিয়ে ধরে দিয়েছে। সেঁকা পাঁপড়। যা ইচ্ছে করলে একটার বেশিও খাওয়া যায়। চিটু আবার মাছ, ডিম ছাড়া খেতে পারে না। ও গুম হয়ে যায়। আমি এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে একটুও মাথা ঘামাই না। কেন না, আমার তখন খাওয়ার দিকে মন নেই। কখন চেরাপুঞ্জি যাওয়া হবে সে চিন্তাতেই মশগুল হয়ে আছি। তাছাড়া বুঝতেও পেরেছি আমাদের বাবার সামর্থ্যে এর বেশি আর সম্ভব নয়। সেই প্রথম হোটেলে রাত্রিবাস। কেমন অদ্ভুত একটা শিরশিরে ভয়ের অনুভূতি জড়িয়ে ধরে।
সকালে বাবারা অফিসের কাজ সারতে যান। আমরা হোটেলের লম্বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নতুন শহর দেখি। বাইরে যাবার অনুমতি নেই। রাস্তায় বাজার বসেছে। খাসিয়া মেয়েরা সুন্দর ঝলমলে পোশাক পরে, মাথায় খোঁপা বেঁধে, হাতে উল-কাঁটা নিয়ে সবজি, মাছ, ফল সব বিক্রি করছে। রাস্তায় চলমান মানুষের মধ্যেও মেয়ের সংখ্যা বেশি। তাদের সবার সুন্দর স্বাস্থ্য, টকটকে রঙ, ফর্সা গোলগাল মুখে লালচে আভা। মাথার খোঁপাটিতে বিচিত্র কারুকার্য্য করা চিরুনির শোভা। গায়ের কাপড়টা হাতের তলা দিয়ে তুলে কাঁধে ব্রোচ দিয়ে লাগানো। ওই ঢঙটার মধ্যে জাপানি কিমানো, ব্রিটিশ গাউন আর গ্রিসের আভিজাত্যের নিখুঁত মিশেল। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। স্নান-খাওয়ার সময় গড়িয়ে যায়।
বিকেলে বাবা, কাকু অফিসের কাজ সেরে ফেরেন। আমরা সাজগোজ করে শিলংয়ের বিখ্যাত লেক দেখতে যাই। ভারি সুন্দর একটি সাজানো বাগান সমেত দীর্ঘ লেক। তাতে নীলচে আকাশের ছায়া পড়েছে। সবুজ শ্যাওলা ভরা গভীর জলে বিশাল বিশাল আকৃতির মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে যাদের ধরা নিষেধ। কতরকমের ফার্ন গাছ, রঙবেরঙের ফুল, গাছে গাছে কমলালেবুর হলুদ ঝলকানি। আমার মন ভরে যায়। মিঠু, টুকু কমলালেবু পাড়ার বায়না ধরে। বাবা ধমকে থামান ওদের। জিপে উঠে কাকু পকেট থেকে দুটো তাজা কমলালেবু ওদেরই হাতে তুলে দেন। আমি বুঝতে পারি ওগুলো বাগান থেকেই তোলা হয়েছে। তবে কাকুকে জিজ্ঞেস করতে সাহস হয় না।
পরদিন সকালে বাবা ডাকছিলেন, “ওঠ ওঠ, কত ঘুমোবি! চেরাপুঞ্জি যাবি না?”
খুবই সকাল তখন। ছ’টা বাজে। তবুও ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ি। আর মুখহাত ধুয়ে গরমজলে স্নান সেরে নিই।
আবার সেই পাহাড়ি পথ। চোখ কান সব খুলে রেখেছি। কখন সেই অদ্ভুত জায়গাটা হঠাৎ এসে যাবে তার জন্য রীতিমতো সজাগ হয়ে আছি। মাথায় ভূগোল বইয়ের সেই মনকাড়া লাইন, ‘যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।’ অর্থাৎ সারাক্ষণই আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে। জিপের খোলা পেছনের পথে চোখে পড়ছিল অনেকটা আকাশ। যেন আকাশের খুব কাছে আমাদের নিয়ে চলেছে কেউ। পথের পাশে হঠাৎ নেমে আসা ঝরনা। দেখে দেখে আশ মেটে না এমন সব রঙবেরঙের ফুল। বিশাল বড়ো বড়ো গাছ। লোমে ভরা বেঁটে বেঁটে কুকুর। এমনকি সুন্দরী সুসজ্জিতা অপরূপা খাসিয়া মহিলা। সবাইকে হাঁ করে দেখি। ওই খোলামেলা জিপের প্রবেশদ্বার বেয়ে যেন স্বর্গের সবটুকু আর্শীবাদ আমাদের হালকা নরম হাতে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে। হাওয়া, প্রবল হাওয়ায় উড়ছি আমরা। আর ডানা ছাড়াই পৃথিবীর সীমানা ছাড়াচ্ছি। ঘোর কাটল বাবার কথায়। বাবা বললেন, “অনেক বেলা হয়েছে। চেরাপুঞ্জি পৌঁছতে এখনও অনেক দেরি। তোমরা কিছু খাবে না?”
আমাদের সম্বিৎ ফিরল। সত্যিই তো। সেই কোন সকালে সামান্য কিছু পেটে পড়েছে। না খেলে কোনওমতেই চলবে না আর। পথের পাশে এক ছোটো খাবার দোকান। বয়স্কা এক খাসিয়া মহিলা চালান দোকানটা। সেখানেই আমাদের জিপ থামে আর আমরা একে একে নামি গাড়ি থেকে।
মহিলার বেশ বয়স হয়েছে। হাতের চামড়া ঝুলঝুল করছে। গলায় অনেক পুঁতির মালা। মাথায় হাড়ের চিরুনি লাগিয়ে, ঝলমলে কাপড়ে কাঁধের কাছে ব্রোচ আটকে, সেজেগুজে দোকানে বসে ছিলেন তিনি। আমাদের দেখে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করেন।

আমরাও বসে পড়ি দোকানের খাবার টেবিলের আশেপাশে। কাঠের গুঁড়ির ওপর লাগানো একখণ্ড চ্যাটালো পাথর। সেটাই খাবার টেবিল। চারপাশে খণ্ড খণ্ড পাথর টুলের মতো সাজানো। সেগুলোই চেয়ার। আমরা বসে আছি তারই ওপর। এরকম পাহাড়ি ধাবা এর আগেও কখনও দেখিনি। ধাবার একপাশে খাদ। তার গভীরতায় মাথা ঘুরে যায়।
প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া মাথার ওপর। জোরে ঝড় এলে উড়েই যাবে।
খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। কাঁচা পেঁয়াজ, লঙ্কা সব সাজানো হয়েছে টেবিলে। খিদে বাড়ছে ক্রমশ। খাবার আর আসে না। শেষে পোড়া পোড়া রুটি এল বেতের ঝাঁপিতে। মাংস আসে কাচের বাসনে। কালো কালো রঙের মাংস। কীসের মাংস কে জানে, চিকেন বলে বিশ্বাস হয় না। আমরা হাত বাড়াই। বাবা সরিয়ে দেন পাত্রটা। বুড়ি এসে দাঁড়ায় পাশে। বাবা বলেন, “ইয়ে নেহি চলেগা। সবজি হ্যায়?”
বুড়ির নোংরা দাঁত হাসিতে মুক্ত হয়। তার মধ্যে আবার একটি সোনা বাঁধানো। মিঠু হাঁ করে দেখছে সেটা। আমি চোখ ঘুরিয়ে নিই। সে ব্যস্ত হয়ে বলে, “হ্যায়।”
বেশ বুঝতে পারি, শিলংয়ে আমাদের নিরামিষ খাবারই বরাদ্দ হয়ে আছে। বাঁধাকপির তরকারি আর বেতের ছোটো পাত্রে গরম রুটি আসে এবার। পেটভরে খাই আমরা। কুকুরটা টেবিলের চারপাশে ঘুরঘুর করে আর ল্যাজ নাড়ে। বাচ্চা ছেলেমেয়েদুটো জল এনে দেয়। চা আসে ট্রেতে। ছেলেমেয়েদুটো ভারি মিষ্টি দেখতে। লাল-নীল দুটো বল যেন। ওরা মনে হয় বুড়ির নাতি-নাতনি।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে হঠাৎ। মনে হয় সমস্ত আকাশ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে আমাদের ওপর নেমে আসছে। ভয়ে মিঠু-টুকু কাঁদতে থাকে। বাবা এক ধমক দেন ওদের। ভয় আমি-চিটুও পাই। প্রাণপণে কান্না চেপে রাখি। সম্মানরক্ষার একটা দায় আছে তো! অতখানি ছেলেমানুষি আমাদের আর মানায় কি?
আমার মনে পড়ে আর একদিনের কথা। সেদিনও এমনই ভয় পেয়েছিলাম ।স্কুলের ছুটি হয়ে গিয়েছিল খুবই তাড়াতাড়ি। বিশেষ কেউ মারা গিয়েছিল হয়ত। মানিক ছাড়া আর কোন ছেলে সেদিন স্কুলে আসেনি। ও আমাদের মেয়েদের পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ব্রহ্মপুত্রের ধারে। তারপর হঠাৎই বলেছিল, “নদীর ওপারে যাবি? লঞ্চে চেপে?”
আমাদেরও অনেকদিনের পোষা ইচ্ছে ছিল নদীর ওপারে যাবার। সুযোগ হয়নি। সেদিন হাতে অনেক সময়। সবাই এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। এদিকে লঞ্চঘাটে গিয়ে টিকিট কেটে চাপা তো হল। নদী পার হতে হতে দূর থেকে দ্বীপে উমানন্দের মন্দির দেখে একথাও বলা হল, “একদিন সবাই মিলে উমানন্দের মন্দিরে যাব।”
নদীর ওপারে গ্রাম। সেখানে ঘোরার পর ফেরার পালা। আর ফেরার পথেই এল ঝড়। সব ওলটপালট করে দেবার মত তীব্র বৃষ্টি! আমরা তখন কাঁদতে শুরু করে দিয়েছি। বাকিরা মানিককে দোষ দিচ্ছে। যাই হোক শেষে ডাঙায় ফিরে শান্তি! এখানের বৃষ্টিও সেকথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
পনেরো মিনিটের মধ্যে আবার থেমে যায় সেই আচমকা বর্ষণ। যেমন দুম করে শুরু হয়েছিল তেমনি ঝুপ করেই থামে বৃষ্টির অঝোর জলপড়া আর বাজের বীভৎস শব্দ। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সাদা ছোটো ছোটো বলের মতো শিলগুলো তখনও পর্যন্ত গলে যায়নি। শিলাবৃষ্টির সময় টুকুকে চেপে ধরে রাখা হচ্ছিল। না হলে ও ওই বৃষ্টির মধ্যে শিল কুড়োতে চলে যেত। বৃষ্টি থামতেই ও কখন এক ফাঁকে ছিটকে গেছে আমরা খেয়াল করিনি। শেষে হাতভর্তি শিল নিয়ে এসে হাজির। ঠাণ্ডায় আমরা সবাই কাঁপছি তখন। মা ওর মুখের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে বেশ কিছু শিল টেনে বার করেন। চারপাশে তাকিয়ে ভারি অদ্ভুত লাগে। আকাশের চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। সে তখন সারা শরীরে রঙবেরঙের রামধনুর জামা গলিয়েছে। জলে ধোওয়া আকাশ বৃষ্টির সাবান মেখে ঝকঝকে নীল আর তার বুক জুড়ে প্রকাণ্ড এক সাতরঙের রামধনু। তার বিস্তার চেয়ে দেখবার মতো।
জিপ আবার চলতে থাকে। পথ যেন আর শেষ হবে না। চেরাপুঞ্জি কতদূর?
বড়োরা সবাই ব্যস্ত হচ্ছেন। এই পথে আবার শিলংয়ে ফিরতে হবে তো। আকাশের আলো ক্রমশ কমছে। আমাদের ছোটোদের কোনও দুশ্চিন্তা নেই। চেরাপুঞ্জি না দেখে ফেরার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। হঠাৎ কমে আসা আলোয় দেখি পথ ফুরিয়ে গিয়েছে।
এ তো ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার! চেরাপুঞ্জি এল না, অথচ পথ ফুরিয়ে গেল! জিপ থেকে হুড়মুড়িয়ে সবাই নেমে পড়ি। ড্রাইভারকাকুও নেমে আসেন। মাথা চুলকে বলেন, “স্যার, সব কুছ গোলমাল হো গয়া। চেরাপুঞ্জি যানে কা রোড দুসরি সাইড মে হোগা। ইয়ে নহি হ্যায়।”
আমরা আবার জিপে উঠে বসি। জিপ চলতে শুরু করে। কাকু আর বাবা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। এত বেলায় চেরাপুঞ্জি যাওয়ার কোনও ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। তাই ফিরে যাওয়াই স্থির হয়।

***

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে চিটু আর আমাকে প্লেনে তুলে দেন বাবা। ফিরতে ফিরতে প্লেনের জানালা দিয়ে অনেক মেঘ দেখি আমরা। চোখের জলে তখন গাল ধুয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ফিসফিসিয়ে চিটু খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলে আমায়, “দিদি, ওই দেখ, মেঘের ফাঁকে…”
“কী?”
“সেই চেরাপুঞ্জির রাস্তাটা।”
আকাশে উড়তে উড়তে দেখি অনেক নীচে একটা চিকচিকে পথ উঠেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। একটা অস্পষ্ট লাইনের মতো সেই সরু পথটাকে মন দিয়ে দেখি আর ভাবি, তবে কি ওই পথটাই গেছে চেরাপুঞ্জির দিকে? যেখানে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়?
ওই পথে আমরা বেশ খানিকটা গিয়েছিলাম তো। বাকিটা আজও না যাওয়াই রয়ে গিয়েছে। মানে শেষ অবধি পৌঁছতে পারিনি।

সমাপ্ত

অলঙ্করণঃ মৌসুমী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s