স্মৃতিচারণ ফিরে দেখা পর্ব ২ সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষা ২০১৯

ফিরে দেখা   প্রথম পর্ব

আবার এক নতুন তরঙ্গ ওঠে আমার সাধারণতম জীবনে। ইন্টারস্কুল ডিবেট কম্পিটিশনে যাবার জন্য স্কুলের মহড়াটিতে আমার ভাগ্যেই শিকে ছেঁড়ে। ছোটখাটো যুদ্ধটি সহজেই জয় হয়েছিল। কেন না আগের স্কুলেও ডিবেট করেছি এবং প্রথমও হয়েছি। বলাবাহুল্য সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লেগেছিল। স্কুলের প্রতিযোগিতা হয় দোতলার লম্বা বারান্দায় নীচু তক্তপোশের (যাকে আমরা ডায়াস বলতাম) ওপর টেবিল সাজিয়ে। দাঁড়িয়ে বলতে হয়েছিল। বিচারক হিসেবে বড়দিমনির পাশে আরও জনাদুয়েক দিদিমনি বসে ছিলেন। পেছনে নাইন, টেন, ইলেভেনের বড় দিদিরা। বিষয়টা যতদূর মনে পড়ছে ছিল, ‘বিজ্ঞান অভিশাপ না আর্শীবাদ’ এরকম কিছু। সব উঁচু ক্লাসের মেয়েদের হারিয়ে ক্লাস এইটের ছোটখাটো আমার প্রথম হওয়াটা বলাবাহুল্য বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এক ঝটকায় আমি বিখ্যাত হয়ে যাই।
পরের পর্বটাই ঝামেলার। স্কুল থেকে নির্বাচিত প্রতিযোগীকে যেতে হবে আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায়। দু একদিন পরেই সেই অনুষ্ঠান শহরের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরীতে। শুরু বিকেল চারটেয়। শেষ হতে সন্ধে ঘনাবে। এয়ারপোর্টে ফিরে যাবার শেষ বাস খুব বেশি দেরি করলেও পাঁচটায় ছাড়ে। কাজেই স্কুলে ফার্স্ট হলেও, বুঝে যাই ওই প্রতিযোগিতায় আমি যোগ দিতে পারব না। নিশ্চয়ই দ্বিতীয় হওয়া মেয়েটিই যাবে, সে গৌহাটি টাউনেই থাকে। কিন্তু ঘটনা তা ঘটে না। বড়দির খাস চেম্বারে ডাক পড়ে আমার। সাদা ধবধবে খোলের শৌখিন শাড়ি পরা, মাথায় বলখোঁপা বাঁধা মহিলাটিকে ভারি সম্ভ্রমের চোখে দেখতাম। তিনি যখন একগাল হেসে আমায় “এসো মিতশ্রী” বলে ডাক দেন, আমি প্রথম হবার সময়ের চেয়েও বেশি অবাক হই। উনি আমার নাম ধরে ডাকছেন, কি সৌভাগ্য! বুকের মধ্যে তোলপাড় হতে থাকে।
বড়দিমনি শান্ত গলায় হেসে হেসে বলেন, “প্রতিযোগিতায় তোমাকেই যেতে হবে তো। অসুবিধের কিছু নেই, তোমার বাবাকে আজই চিঠি লিখে দেব। ওই রাতটা আমার বাড়িতে থাকবে। আমিই তোমায় ওখানে নিয়ে যাব।”
বাবা সহজেই রাজি হন। আমি অবশেষে স্কুল ফেরৎ বড়দির সঙ্গে ওই আসরে যোগ দিতে যাই। এখন আর সেই প্রতিযোগিতার আসরটির কথা স্পষ্ট মনে নেই। তবু আবছা আবছা দেখতে পাই, একটা বড় হল, ডায়াসে একের পর এক উঠছে, বক্তব্য রাখছে। অসমিয়া, হিন্দি, ইংরাজি, বিভিন্ন ভাষায় নিক্ষিপ্ত শব্দ বা বাক্যগুলো আমাকে বেশ ঘাবড়ে দেয়। চারপাশে সব স্কুলেরই কিছু কিছু ছেলেমেয়ে ইউনিফর্ম পরে বসে আছে। ওই পরিবেশের গাম্ভীর্য আর বক্তব্যের অস্পষ্টতা আমার নিজস্ব সাবলীলতা প্রায় নষ্ট করে দেয়। বলতে হয় তাই বলি। তবে সে বলাটায় আমার বিশেষত্বের কোন ছাপ পড়েনা। কেননা একটা ঘোরের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে । অবশেষে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় কিছুই না হতে পেরে, লজ্জা লজ্জা মুখে বড়দির বাড়ি রাত্রিবাস করতে যাই। বুঝতে পারি আমার জন্য তাঁরও আশাভঙ্গ হয়েছে।
ওখানে গিয়েই অবশ্য সব লাজলজ্জা ভ্যানিশ। বড়দির দুই মেয়ে। একজন আমার থেকে বড়, ক্লাস নাইনে পড়ে। আর একজন ছোট, ফাইভের ছাত্রী। তারা তাদের চিত্রবিচিত্র খেলনা, আর গল্পের বইএর সম্ভার সমেত আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। আমাদের খেলা জমে ওঠে। পুরস্কার না পাওয়ার কষ্ট, বেমালুম ভুলে যাই। মেয়েদুটি খুব সপ্রতিভ আর আমি একটু বেশিই মিশুকে। কাজেই মেলামেশা সহজেই ঘটে।
তবে এর পেছনে একটা কারণ ছিল। রিকশায় সারা রাস্তা মুখ বুজে এলেও বাড়ির চৌকাঠে পা দিয়ে আমার বড়দিমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন।
“মিতশ্রী, সবকিছুতেই হার জিত আছে। না হারলে মানুষ জিততে শেখে না। ওসব কথা ভুলে যাও। আমার বাড়ি এসেছ। তোমার মতই দুটি মেয়ে আছে এ-বাড়িতে। ওদের সঙ্গে চুটিয়ে আনন্দ করে নাও।”
সেদিন রাতে ঠাকুরের রান্না করা টিপিকাল পূর্ববাংলার জিরেবাটার মাছের ঝোল আমার অপূর্ব লাগে। আরও আবিষ্কার করি স্কুলের সেই দূর থেকে দেখা বড়দিমনিটি কখন একদম ঘরোয়া মাসিমনি হয়ে গিয়েছেন।
পরেও আমার জীবনে এ ঘটনা বারবার ঘটেছে। বহুবার দেখেছি যে মানুষটাকে অসম্ভব ভয় পেয়েছি, দূর থেকে লক্ষ্য করেছি, চুম্বকের আকর্ষনে যিনি আমাকে কাছে টেনেছেন, অথচ যাঁর কাছাকাছি হবার কোন সম্ভাবনা নেই, তিনি হঠাৎ একদিন আমার একদম কাছের মানুষ হয়ে পড়েছেন। তাই এই ম্যাজিকটা আমাকে আর আশ্চর্য করে না।
***

বাবাদের অফিসের বন্দ্যোপাধ্যায় সাহেব ছিলেন এমনই একজন মানুষ। আমাদের স্কুলছুটির দিনগুলোয় কোয়ার্টারের বারান্দা থেকে তাকে লক্ষ করি। চওড়া কাঁধ মানুষটি শীতের সকালে, একদম ঠিক সময়ে, স্যুটবুট পরে নিজের বাংলোর গেট খুলে, অফিসের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেন। সেই প্রথম একজন ইঞ্জিনিয়ার চাক্ষুষ করা। সে-সময় ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, শব্দগুলোর বেশ ওজন ছিল। খুব ভালো ছাত্র ছাড়া ওইসব হয়ে ওঠা সহজ ছিল না তো! ওইসব পেশার মানুষদের আমরা বিশেষ সমীহ করতাম। উনিও ছিলেন সেইরকম একজন।
পদবীতে আমরাও চট্টোপাধ্যায়। ওইসব লতায় পাতায় আত্মীয়তার একটা যোগসূত্র “পাধ্যায়দের” মধ্যে সবসময়ই খুঁজে পাওয়া যেত। এক্ষেত্রে দেখা গেল উনি আমার বাবার নিজের পিসতুতো ভাইয়ের শালা মানে ওঁর এক মামাতো বোনের সঙ্গে বাবার একজন পিসতুতো ভাইয়ের ইত্যাদি, ইত্যাদি। যাক্‌ সেসব কথা। একদিন সন্ধ্যাবেলায় উনি আমাদের বাড়িতে নিজে থেকেই এলেন। আমরা পড়ছিলাম। শুনতে পেলাম দরজার বাইরে বেশ মিহি কন্ঠে, সুভদ্র উচ্চারণে কেউ জিজ্ঞেস করছেন, “চ্যাটার্জীদা, আছেন নাকি?”
বোধয় সেইদিনই অসম বন্ধুত্বের প্রথম সূত্রপাত। মুখে ‘কাকু’ বলে ডাকলেও আসলে উনি ছিলেন আমাদের বন্ধু। বাবা নেহাতই কেজো মানুষ। পেশায় এ্যাকাউন্ট্যান্ট। বয়সেও ওঁর থেকে বছর বারো তেরোর বড়। অফিসের বস। তাই বেশি কাছাকাছিও হওয়া যায় না। ওঁর গল্প, আড্ডা সব হত আমাদের সঙ্গে। কাকুর বিশাল বাংলোয় বাড়ির লোকজন কেউই আসেননি। কাজেই আমাদের বাড়ি এলে মা ওনাকে খাইয়েই বাড়ি পাঠান।
দূর থেকে হাতছানি দেওয়া বড়োসড়ো বাংলোটায় আমাদের অবাধ প্রবেশাধিকার জন্মাল। ওঁর কাছে দেশবিদেশের গল্প শুনতাম আমরা। সেই সময় একদম অবাস্তব, অসাধারণ স্বপ্ন দেখতে শুরু করি আমি। যেমন খুব ভালো রেজাল্ট করে বিদেশে পড়তে গেছি। ইংরাজি তেমন জানি না। কথা বলতে পারছি না। সে কী ভয়ানক, অসহায় অবস্থা!
ওই বাংলোর মাঝের ঘরে, একটি তাকে রাখা থাকত কুচকুচে কালো এক টেলিফোন। অনুমতি পেয়ে প্রথম দিনই আমরা ফোন করলাম অচেনা এক নম্বরে। দু-একটা কথা বলেই কেটে দেওয়া হল ফোনটা। আবার আমরা থাকাকালীন কোন ফোন এলে ছুটে গিয়ে ধরতাম আমরা। গলা যতদূর সম্ভব নরম করে বলতাম “হ্যালো।” সে রোমাঞ্চের স্বাদই আলাদা। সারাক্ষণ চলত এসব ছোটখাটো দুষ্টুমি। যদিও সবকিছুর শেষে উত্তেজনা দমন করে, নিরীহের মতো বাড়ি ফিরতাম দুজনে। যেন ভালোমন্দ খেয়ে মুখ মুছে নিয়েছি।
প্রতিবারই ছোটবোন চিটু আমার সঙ্গে যায়। অপর্যাপ্ত স্বাধীনতার যথাসাধ্য সদ্‌ব্যবহারে সেও কমতি যায় না। মাকে কিন্তু কোন রিপোর্টই দেয় না সে। বুঝে গিয়েছে, এইসব হ্যাংলামী, অসভ্যতা, বাবা, মা, কেউই পছন্দ করবেন না।
মা, বারবার জানতে চান, ওঁর কোয়ার্টারে এতক্ষণ কী করছিলিস? কোন জিনিসে হাত দিসনি তো?
আমরা সাজানো গোছানো খবর দিয়ে মার মন ভোলাই। বলা হয় না চাঁদের আলোয় লনে টেবিল পেতে অপূর্ব পিকনিকের কথা। যার মেনু শুধু আলুকাবলি। বলি না ডিমসেদ্ধ, আলুসেদ্ধের টুকরো প্লেট ভর্তি করে নিয়ে কে আগে ক’টা মুখে পুরতে পারে, সেই অভাবনীয় প্রতিযোগিতার কথা। ঘর অন্ধকার করে ভূত, ভূত খেলার কথা, সমবেত কন্ঠে গাওয়া ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’, আর জনগণ মন’ সংক্রান্ত ফাংশানের কথা।
প্রতিদিন যাওয়া হয় না, তবে যেদিন যেদিন আমরা যাই, সারা সন্ধে যা ইচ্ছে করে ভেজা বেড়ালের মত বাড়ি ফিরি। মা ভাবতেও পারেন না যে ওখানে আমরা কাপভর্তি চা, কফি পান করি। মুঠোমুঠো কাজুবাদাম, কিশমিশ খাই। গাছের ফুলপাতা তুলে ঘর সাজাই। রান্নাঘরের লোকটিকে যা খুশি বানিয়ে দেবার ফরমাস করি। চাটুতে আটা ভেজে চিনি দিয়ে পরিবেশন করার সময় সে নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়। কেন না সেক্ষেত্রে প্লেটের বদলে খাবার জন্য কাগজ পাতা হয়। ছোট দুই ভাইবোনকে কখনো নিয়ে যাই না আমরা। কেননা ওরা নির্ঘাৎ মা’কে সব বলে দেবে।
প্রথম আলাপের পর উনি আমাদের বলেছিলেন, “আমাকে তোরা ‘কাকু’ বলে ডাকিস।” আজ পর্যন্ত ওই ডাকটা কাউকে দিইনি আমরা। এখন বুঝতে পারি ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার পক্ষে অন্তত খুব উপকারী হয়েছিল। বাড়ি আর স্কুলের বাইরে, গল্পের বইয়ের একটা বানানো জগৎ ছিল আমার। তার সীমানা সেই বয়সেই, ওই মেলামেশায়, অনেক হাত বাড়িয়ে নিতে পেরেছিলাম।
ওঁর সম্বন্ধে একটা কথাই উল্লেখ করত সবাই। যদিও তখন তার গুরুত্ব বুঝিনি। মুখে মুখে ঘুরত কথাটা। এই সাহেব ভীষণ সৎ, একেবারে একশোভাগ। অফিসের জিপও ব্যাক্তিগত কাজে শুধুশুধু ব্যবহার করেন না, রীতিমতো ভাড়া দেন।
মাঝে মাঝে বনভ্রমণ হত। যে কোন ছুটির দিনে টিফিন কেরিয়ারে খাবার আর বোতলে জল নিয়ে বনের পথে নিরুদ্দেশ যাত্রা, সঙ্গে আমরা দুই মূর্তিমান। কুমারী মিতু আর কুমারী চিটু। গাড়ি চালাতেন অফিসের ড্রাইভার, তবে সমতল পেরিয়ে যখন ঘন বনের রাস্তা শুরু হত, সেই এবড়োখেবড়ো পথে ড্রাইভারকে সরিয়ে কাকু বসতেন ওই সিটে, ধরতেন স্টিয়ারিং, রোমাঞ্চকর সেই অভিযানের স্বাদ আজও আমার স্মৃতিতে একইরকম উজ্জ্বল।
আমরা খুবই ছোট ছিলাম। নাহলে কাকুর ড্রাইভিং-এ নিশ্চিন্ত হবার কথা নয়। মা বাবা জানতে পারলে, ব্যাপারটার ভয়াবহতা আন্দাজ করে আমাদের নিশ্চয়ই যেতে দিতেন না। তবে তাতে যে বিশাল ক্ষতি হয়ে যেত, সেই অসীম প্রকৃতির সান্নিধ্যলাভের সৌভাগ্য থেকে আমরা একেবারে বঞ্চিত হতাম, তা এখন অনুভব করতে পারি।
আসামের বনেজঙ্গলে ঘোরার অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, সেই বন্য ভয়ালতার আন্দাজ একমাত্র তাদেরই আছে। বনের ভেতরটা একেবারে জমাট। আলো আসে না। যদিও আলোর মাসতুতো বোন রশ্মির দেখা এক আধবার পাওয়া যায়। বনের একদম গভীর অন্দরমহলে, আচমকা জিপ থামিয়ে, কাকু বলতেন, নাম। আমরাও ঝুপঝাপ নেমে কাকুর গা ঘেঁসে ঘেঁসে বনের অন্দরে ঢুকতাম। ড্রাইভার একা গাড়ি আগলাত।
যত এগোতাম ততই বিস্মিত হতাম। কোথাও বিশাল বিশাল গাছের ঝুড়ি নেমে মাটি ছুঁয়েছে। তাতে অনায়াসে দোল খাওয়া যায়। আমরাও সুযোগের সদ্‌ব্যবহার করি। দড়ি ধরে ঝুলতে ঝুলতে বইয়ে পড়া ‘টারজান’ হবার শখ মেটাই। কাকু বলতেন, “মনে কর এই সেই আফ্রিকার অরণ্য, আর আমি, বীর টারজান।”
আমরা নাকিসুরে চেঁচাই, “মোটেই না। গাছের ঝুড়ি ধরে ঝুললে তবেই টারজান হওয়া যাবে।”
কাকু হাসেন, “ঠিক আছে। এবারটা তবে তোরাই টারজান হ। আমার যা ওয়েট, আসছে জন্মের আগে আর টারজান হওয়া হল না।”
বনের অন্ধকার ভেদ করে, শুঁড়িপথ বেয়ে, এগিয়ে চলি আমরা। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠি আবার নামি। হাত পা, হাঁটু, গাছের গা ঘষা খেয়ে, কখনও বা হড়কে নেমে যাওয়ার ফলে ছড়ে কেটে চিত্রবিচিত্র হয়ে যায়। পথে চলতে চলতে হঠাৎ থমকে, আকাশের দিকে মুখ করে গন্ধ শোঁকেন তিনি। বলেন, “কী বোট্‌কা গন্ধ রে বাবা! বাঘ আসছে নাকি?”
চিটু কেঁদে ফেলে ভ্যাঁ করে। আমারও সেই একই অবস্থা। তবু সম্মান রক্ষার দায় আছে একটা। চিটুর থেকে আমি দু’বছরের বড়। সেই কথাটা ভোলা যায় কি? গলা শুকিয়ে কাঠ। মুখে বলি, “ধ্যাৎ শুধু শুধু ভয় পাস না তো! এই বনে বাঘ-ফাগ নেই।”
কাকু তবু ফিসফিসিয়ে বলেন, “কে জানে থাকতেও পারে। ঠিক যেন চিড়িয়াখানার বাঘের খাঁচার সামনের গন্ধটা পাচ্ছি। তোরা পাচ্ছিস না?”
এবার সত্যিসত্যি ভয় পেয়ে ওনাকে জাপটে ধরি দুজনেই। উনি গা ঝাড়া দিতে দিতে হা হা করে হাসেন। সেই হাসি, বনের অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে, ঘুরতে ঘুরতে ফিরে আসে আবার আমাদেরই কাছে। পরে, অনেক পরে, শুনেছিলাম, বাঘ না থাকলেও ওই বনে হিংস্র বনবেড়াল বা চিতা থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যেত না। আমাদের সৌভাগ্য যে একেবারে খালি হাতে ঢুকলেও, তাদের কারো সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি।
বনের আর এক ভয়ানক বিপদ হল দাবানল। আমরা কখনো তার মধ্যে পড়িনি। তবে গল্প শুনেছি। ভারালি কাকু জুবির বাবা। তিনি অসমেরই স্থানীয় বাসিন্দা, অসমিয়া। বাঙালি বিয়ে করায় জুবিরা মামারবাড়ির সূত্রে বাঙালি হয়েছে। ভারালি কাকু কমবয়সে বন্ধুদের সঙ্গে আসামের জঙ্গলে পিকনিক করতে গিয়ে দাবানলের কবলে পড়েন। বিকেলের আলো তখন কমে আসছে,তারা বন্ধুরা মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছেন। এমন সময় দাউদাউ আগুন তাদের প্রায় ঘিরে ধরে। কোনরকমে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন তারা। সেই ভয়াবহ গল্প শুনতে শুনতে ভয়ে আমাদের গা শিউরে উঠেছিল।
কোয়ার্টারের বারান্দা থেকে রাতের বেলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দূর থেকে ভেসে আসা রামলীলার গান শুনতাম আমরা। তখন কখনো কখনো নজরে এসেছে দূরের পাহাড়ে আগুন জ্বলছে। চিটু বলত, “দিদি ওই দ্যাখ দাবানল!” পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা আবার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম ওইসব অচেনা পাহাড়দের। আর হাঁ হয়ে যেতাম দেখে যে গাছপালারা সব যেমন কে তেমন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। রাতের ধ্বংসলীলার কোন প্রমাণ তারা রাখেনি। আজ বুঝি সে-সবই দূরত্বের কারণে। কাছে গেলে হয়ত কিছু নজরে আসত।
কবে দেখেছি। তবুও সেই সব বনদের আর অচেনা গাছেদের এখনো একইভাবে মনে আছে আমার। বিশাল বড় বড় সবুজ পাতা। বিরাট উচ্চতা, আর ঝকঝকে সবুজ রঙ নিয়ে এখনও হয়ত তারা সেখানেই দাঁড়িয়ে। আমার আর তাদের কাছে যাওয়া হল না। সেইসব অন্ধকারে ভরা গা ছমছমে শুঁড়িপথ, আচমকা হড়কে নেমে যাওয়ার মতো ঢালু পাহাড়ি রাস্তা আরও কোথাও কোথাও দেখেছি। তবে মিল থাকলেও একরকম মনে হয়নি কখনই। তার কারণ বোধহয় বয়স। ছোটবেলায় যে রেলিংটা মাথা ছড়িয়ে যায়, বড়বেলায় সেটাই হাঁটুর সমান। বিস্ময়ের ধরণও তাই। তখন যা দেখেছি তাতেই হাঁ হয়ে গেছি। পরে আন্দামানের গভীর বনে ঢুকে মনে হয়েছে এটা ঠিক সেরকমটা নয়। সেই পাহাড়ের বাঁক ঘুরতেই নেমে আসা হঠাৎ জলধারা, জলের ধারা ছুঁয়ে ফেনায় শ্যাওলা ধরিয়ে ফেলা বড় বড় পাথরের চাঙর, এখন ও আমার সম্পূর্ণ ফ্রেম ঢেকে রেখেছে।
এক পাথর থেকে আর এক পাথরে লাফ দিয়ে, টপকে টপকে কি অনায়াসেই না এগোতাম আমরা। কাকু বলতেন, “মনে কর, এখানে আর কেউ আসেনি। আমরাই প্রথম পা ফেলছি।” আমরাও তাই মনে করে ঝর্নার জলে হাসিহাসি মুখের ছবি দেখতাম। তিনটে বাজতে না বাজতেই বন থেকে বেরোনর তাড়াহুড়ো শুরু হত। সন্ধ্যের পর বনে নাকি বাঘ, ভাল্লুক আর তেনাদের রাজত্ব চলে। সেখানে আমাদের মত গৃহস্থ মানুষের প্রবেশাধীকার নেই।
বনে সত্যিসত্যি বাঘ সিংহের সঙ্গে দেখা হয়নি। খানিকটা ইচ্ছে করেই ভয় পেয়েছিলাম। তবু গা ছম্‌ছম্‌ করেছিল। আসলে সেটাই ছিল বনের খেলা।
এখনকার দিনের সঙ্গে সেসব দিনের কত তফাৎ। তখন কত তুচ্ছ কারণে সারাদিন মন ভারি করে বসে থাকা। কত সামান্য পাওয়ায় হৃদয় উপচে নদী হয়ে যাওয়া।

***

মালা কে জানে কেন আমাদের এই কাকু প্রাপ্তিতে খুব একটা খুশি হতে পারল না। কাকুর বাড়িতে ওকেও নিয়ে গেলাম একদিন। যথাযোগ্য আপ্যায়নেও ওর মন ভরল না। ফেরার পথে বলল, “নাঃ! তুই যতই বল, কাকুকে আমার এমন কিছু আহামরি লাগেনি।” কথাটা শুনে বলাবাহুল্য খুবই মনখারাপ হল। যদিও আর একটা মন তখনও বলছে, মালার ভাল লাগা মন্দ লাগাই কি সব? তোমার কেমন লাগছে সেটা কি কিছুই না।
আসলে তখন মালাকে পায়ে পায়ে অনুসরণ করি। গল্পের বই-এর নেশা তো ছিলই। পড়াশুনোর ঝোঁক, ভালো ফলাফলের ইচ্ছেও কম ছিল না। মালার কাছাকাছি হয়ে দেখতাম পাঠ্যবিষয় ও পড়ার থেকেও লেখে বেশি। সমস্ত চ্যাপ্টার দু’তিনবার করে লিখে ফেলে। আমিও তখন সেটা শুরু করেছি। খাবার টেবিলের এককোণ ঘেঁসে বসি আর যা পড়ি তার সবটাই লিখি। বাবা বড় বড় খাতার যোগান দেন। একটার পর একটা ভর্তি হয়ে যায়। চিটুও আমার দেখাদেখি খাতায় লেখালেখি শুরু করেছে। তবে ও তো সত্যিই ফাঁকিবাজ! তাই কোন খাতাই ভর্তি হয় না। আমার সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাছে ও যখন খাতা চায়, বাবা ওকে জোর ধমক লাগান।
সেই সময়টা ভারি অদ্ভুত ছিল! যে যা করত, সেটাই করার ইচ্ছে হত। সার্কাস দেখে এসে ট্রাপিজের খেলার ব্যর্থ অনুকরণ চলত। দোকান দোকান খেলা বা ডাক্তার ডাক্তার খেলা তো ছিলই। এছাড়া কে কেমন কায়দায় কথা বলছে, কি ধরনের পোশাক পড়ছে, কিভাবে চুল বাঁধছে, সবটাই মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে নকল করার একটা প্রবণতা গজাত। আমার বাড়িতে চিটু ঠিক সেটাই করতে চাইত, যেটা আমি করেছি। ব্যাপারটা মাঝেমাঝে বোকামোর পর্যায়ে চলে যেত। আমি কবিতা লিখতাম ছোট থেকেই। একদিন তোশকের নীচ থেকে ওর একটা ডায়েরি বেরোল। তাতে ও যেসব কবিতা লিখেছিল, সেগুলোর কোনটাই শেষ অবধি কবিতা হয়ে উঠতে পারেনি। তবু ওর করুণ চাহনি দেখে বলেছিলাম বেশ হয়েছে।
আমারও অনেক কিছু করার ইচ্ছে ওভাবেই আসত। জুবিদের বাড়িতে চোখে পড়েছিল ওর দিদি ববিদির আঁকা বেশ কিছু ছবি। দেওয়ালে বাঁধানো ছবিগুলো দেখে বাবার কাছে রঙ, কাগজ কিনে দেবার বায়না করলাম। গৌহাটির টাউনের বড় বাজার থেকে বাবা এনে দিলেন এক প্যাকেট রঙ, কয়েকটা তুলি, আর কিছু বড় বড় ড্রয়িং পেপার। ববিদির মতো করেই আমিও আঁকলাম কারখানা, অবশ্যই নদীর ধারে। সেগুলোর চিমনি থেকে ধোঁয়া উড়ছিল আকাশে। উড়ে যাওয়া পাখি আর ধোঁয়া সমেত নীল আকাশ তেমন খারাপ হল না। কিন্তু নদীর রঙ আর আকাশের রঙে ফারাক আনাই হল মুশকিল। পেনসিল স্কেচ আগেও করেছি তবে কখনোই তা রঙ দিয়ে ভরাট করা হয়নি। শেষ করার পর প্রথম দর্শক হলেন মা। বললেন, “খাসা হয়েছে। বাবাকে দেখাস।”
মুশকিল হল অন্য জায়গায়। আমার দেখাদেখি ছোট ভাইবোনেরাও সবাই আঁকতে শুরু করল। আর বারোটা বাজল আমার সাধের রঙের। ওরা যথেচ্ছাচার করে। একরঙ থেকে তুলে তুলিটা অন্য রঙে ডোবায়। জল ধুয়ে নেওয়ার পাট রাখেনা। ফলে সব রঙই বেজায় খারাপ হতে থাকে। আমি চেঁচাই। তেড়ে যাই। ওরা আমার অনুপস্থিতির সুযোগ নেয়। তাই কোন কাজ হয়না। মাঝখান থেকে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া আর চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। বাবা মা অতিষ্ট হয়ে ঘোষণা করেন, “মিতু ছাড়া আর কেউ যদি রঙে হাত দাও তো…………।”
আমার আবার এতটা সহ্য হয়না। ছবি আঁকতে বসলেই ওরা চারপাশে ঘুরঘুর করে। কখনো বা খাতার সাদা পাতা ছিঁড়ে আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আঁচড় কাটে! আস্তে আস্তে সব কিছু আবার “যথা পূর্বং তথা পরং।” এবার চেঁচালে বাবা মা আর কান দেননা। আমারই দোষ, খাল কেটে কুমির আনতে কে বলেছে আমায়?

ববিদির মতো নিখুঁত ছবি আর আঁকা হয়না আমার। হবে কী করে? গাছের রঙ যে হলুদ সবুজ। বাড়ির রঙ লালচে নীল। সাদা রঙটা তো কালো ভূত হয়ে বসে আছে। কি আর করি? রোজরোজ রঙ কিনে দেবার বায়না তো করা যায়না।
এর বেশ কিছু পরে ক্লাস টেনে পড়াকালীন যখন আঁকার ক্লাসে ভর্তি হই, গৌহাটির ছবি আঁকার দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠত। তুলি কিভাবে ধরতে হয়, ঘোরাতে হয়, শিখতে শিখতে, বারবার সেই পুরনো কিম্ভূত কিমাকার রঙের বাক্সটা আমার চোখের সামনে নাচতে শুরু করত। তার সেই তিড়িং বিড়িং নাচের ফাঁকে দেখতাম কোন রঙেরই বিশেষ কোন জাত গোত্র নেই। শ্রেনীহীন সেই লাল নীল, হলুদ, সবুজদের সারাজীবনে কোথাও খুঁজে পাইনি। তার সঙ্গে সঙ্গে হুটোপাটি করে, ভাইবোনেদের ঝগড়া সমেত ছবি আঁকার দৃশ্যটাও, বেমালুম গায়েব হয়েছিল।

***

গৌহাটি টাউনে যাবার বাস দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের কোয়ার্টার থেকে একটু দূরে, বাজারে যাবার মোড়টায়। বাসের নাম “চিটি বাস”। আমরা মাঝেমাঝে ফাঁকা বাসে উঠে বসি। কচিৎ কখনো চাপাও হয়। সিটের ওপরের দেওয়ালে বড় বড় করে লেখা থাকে, “বাসের ভিতরত থুতু ফেলিবেক না।”
প্রথম দিন লেখাটা পড়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ওটা লিখেছে কেন? বাসের ভেতরে কেউ থুতু ফেলে নাকি?”
বাবা বলেছিলেন, “না ফেললে লিখবে কেন? নিশ্চয়ই এরকম ঘটে। তাছাড়া হাটে কত লোক আসে না! তারা পান খেয়ে পিক ফেলে হয়ত।”
ওই ছোট বাজারটায় হাট বসে রবিবারে। কত রকমের দোকান যে আসে! আর কত লোক হাটে কেনাকাটি করার জন্য জড়ো হয়। অনেক কিছুর সঙ্গে সেখানে ‘তাম্বুলের’ও কেনাবেচা চলে। তাম্বুল মানে কাঁচা সুপুরি। এরা পানে দিয়ে খায়, অতিথিদের ও তাম্বুল দেওয়া পান দেবার রেওয়াজ আছে। তবে অভ্যেস না থাকলে কেউ সহ্য করতে পারেনা, মাথা ঘোরে।
রপ্ত না হওয়া অসমিয়া ভাষাটা বড় মিষ্টি। কানে শুনতে বেশ লাগে। এরা বোনকে বলে ‘ভন্টি’ মানে বোনটি। রাস্তাঘাটে সাইকেলে যেতে যেতে ছেলেরা আমাদের বলে “ভন্টি তফাৎ যাও” সে ভারি মধুর লাগে শুনতে, এমনকি বাসের কন্টাকটারও ঝনাৎ করে পয়সার ব্যাগ বাজিয়ে বলে ওঠে ‘ভন্টি’। আমরা চমকে যাই। অসমিয়া ভাষায় লেখা বইও পড়ে নিতে পারি। অক্ষর আমাদের বাংলাভাষার মতো। তবে প্রয়োগে অনেক পার্থক্য আছে।
অসমিয়া ছেলে বা মেয়েদের চোখ, শরীরের গড়ন, উচ্চতা, গায়ের রঙ, অনেকটা গড়পড়তা বাঙালিদের মতো। কোথায় যেন ছাপ ফেলেছে আসাম, বাংলাদেশের সবুজ লাবণ্য। আমাদের শাড়িকে দুটুকরো করলেই ওদের পোশাক ‘মেখলা’ হয়ে যায়। কোমরের কুঁচি পর্যন্ত একটুকরো আর বাকি টুকরোটা গায়ের ওপরে চাদরের মতো চাপানো। তাতেই আঁচল তাতেই ঘোমটা। ঘরে ঘরে বউ, ঝি, ছেলেপুলেরা তাঁতে ‘মেখলা’ বোনে। সেগুলো রোজকার ব্যবহারের, সুতির কাপড়ে ফুলকারি নকশা তোলা। মুগার ‘মেখলা’ হল সিল্ক সুতোয় বোনা। সেসব অনেকটা তসরের মতো, তবে আর ও ঝক্‌ঝকে। রোজ রোজ কাচাপরা করে মেয়েরা। একটুও টসকায় না। বরং নিত্যদিনের ধোওয়া পরায় রঙের ঝিকঝিকানি আরও বাড়ে। বেশি বেশি বাহারি আর জেল্লাদার হয়ে ওঠে।
এই সময়ে একজন মানুষের সঙ্গে আলাপ হয় আমাদের। দক্ষিণ ভারতের মানুষ। এয়ারফোর্সে কাজ করলেও মনেপ্রাণে একজন নৃত্যশিল্পী। ভদ্রলোককে অনেকটা সুঠাম, সুন্দর, মহিষাসুরের নিখুঁত মূর্তির মত দেখতে। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। মাথার কোঁকড়ানো চুল মাথার মাঝের দিকে উঁচু করে আঁচড়ানো। চোখদুটি ভাসাভাসা, হাসিটি ভারি সরল। আমার ছোটবেলা থেকেই নাচের ঝোঁক। এখানে আসার কিছুদিন আগেও নিয়ম করে শিখেছি স্কুলে, মাস্টারমশাই এর কাছে। উনি বাবাকে বললেন, আমাকে দু’একখানা নাচ শিখিয়ে ওঁর নাচের পার্টনার করবেন।
বাবা আপত্তি করলেন না, স্কুলের দিনে তো বিকেলে থাকার প্রশ্ন নেই। তাই ছুটির দিনের বিকেলেই নিয়ম করে আসতে লাগলেন উনি।
নাচ যদিও খুবই ভালোবাসি, তবু একটা মাত্র ছুটির দিনে বিকেলের খেলা বন্ধ করে, কে আর নাচতে চায়? উনি আসার আগেই টুক্‌ করে খেলতে চলে যাই। চুপচাপ বাইরের ঘরে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করেন, আর মার করে দেওয়া চা খান। একটুও রাগেন না। এতই নাচপাগল!
আমি ফিরে এসে বলি, “ওমা, বসে আছেন? আমি না আপনার আসার কথা একদম ভুলে গিয়েছিলাম।” চিটু পাশে দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখে আমাকে আর নিশ্চয়ই ভাবে, দিদিটা ডাহা মিথ্যেবাদী!
উনি লাজুক হাসেন, “ঠিক আছে। তৈরি হয়ে এসো।”
নাচে ফাঁকি দেওয়া যায় না। সবকটা ছুটির দিনেই উনি যে আসবেন তা কি আমি জানি না। এতো ইচ্ছাকৃত ফাঁকির বাহানা। তবু মাপ করে দেন। আমার তখন মনে হয় বললেই হত, “সন্ধেবেলা আসুন। বিকেলে খেলতে যাব।” না অতটা সাহস তখন ছিল না যে মনের কথা প্রকাশ করি।
মাষ্টারমশাই-এর অনুষ্ঠানে আরও একটি মেয়ে নাচবে। তার নাম মামনি কলিতা। ওঁদের বাড়িতে একটা রির্হাস্যাল হল। ওঁর সঙ্গে মামনির বাড়ি গেলাম। দরজা খুলল মামনির দিদি, ধরিত্রী কলিতা। যেমন সুন্দর নাম তার তেমনি চেহারা। অবাক হয়ে দেখলাম আর ভাবলাম মানুষের মুখ তাহলে সত্যিসত্যিই পদ্মফুলের মতো হয়। এখনও মনে আছে পদ্মফুলে যেমন জলের বিন্দু থাকে, তেমনি গোলাপী মুখটির এখানে ওখানে দু’একটি জলের ফোঁটা ফুটেছিল। মুখের চারপাশ ঘিরে ছিল কালোচুলের থোকা-থোকা, আঙুরলতা। মামনির দাদার নাম তুমুন। সে আমাদের নাচের সঙ্গে তবলা বাজাবে। ওদের ভালো নাম আমার জানা হয়নি। তবে খুব পছন্দ হয়েছিল, দুই ভাইবোনকে। তবু তেমন করে আলাপ করতে পারিনি। ওদের সৌন্দর্য দেখে কেমন ঘাবড়ে গেছিলাম। তখন অকারণ লজ্জার সঙ্গে ইচ্ছের লড়াই হত। আর বলাবাহুল্য লজ্জাই জয়ী হত। কাজেই মুচকি হাসির বেশি, ওদের সঙ্গে একটুও এগোয়নি আমার সম্পর্ক।
এয়ারফোর্সের অফিসারদের জন্য যে আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থা সেখানেই আমাদের নাচের অনুষ্ঠান হবে। বিকেল বিকেল তৈরি হয়ে বাবার সঙ্গে গেলাম। এয়ারফোর্সের গাড়ি নিয়ে গেল আমাদের। বেশ মনে আছে সেই এক বুক দুরদুরু ভয়ের অনুভূতি ! মিলিটারি ব্যারাকে গাড়ি ঢুকছে। আবছা অন্ধকারে একটার পর একটা গেটে দাঁড়াচ্ছে। চেকিং হচ্ছে। আবার এগিয়ে যাচ্ছি।
ততদিনে আমি ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ সিনেমাটা দেখে ফেলেছি। শেষদৃশ্যে গেটের পর গেট পেরিয়ে পুরো মিলিটারি পরিবারটির পালানোর দৃশ্যের সঙ্গে, সবটা মিলে যাচ্ছে। নিজের জীবনেই ঢুকে পড়ছে বিদেশী সিনেমা। বুকের মধ্যে ধুক্‌ধুক্‌ করে ভয়, আর অদ্ভুত রোমাঞ্চে গায়ে কাঁটা দেয়।
সেদিনের নৃত্যনাট্যের বিষয় ছিল ‘ বিশ্বামিত্রের ধ্যানভঙ্গ’। মাষ্টারমশাই বিশ্বামিত্র, আমি মেনকা। নিজেকে আজ মনে পড়েনা। তবে চোখ বুজলেই জটাজুটধারী বিশ্বামিত্রের চেহারাটা চোখে ভাসে। ওই অদ্ভুত সাজগোজ দেখে সেদিনও হেসেছিলাম। আজও মনে পড়ে বেজায় হাসি পায়।
তার পরের ঘটনাটা যদিও খুব একটা হাসির হল না। কাকু খুব রাগ করলেন। বাবাকে সরাসরি বললেন, “ওখানে মিতুকে অনুষ্ঠান করতে দেওয়া একদম ঠিক হয়নি। ওসব পরিবেশ ভালো নয়।” আমাদের রাশভারি বাবাও বেমালুম মেনে নিলেন কথাটা। মাস্টারমশাইকে কী বলা হয়েছিল জানি না। তবে আমাকে আর কোন ছুটির দিনে খেলা বাদ দিয়ে নাচ শিখতে হয়নি। কী এক অজ্ঞাত কারণে উনি আর আসেননি।

***

স্কুলে গরমের ছুটি পড়ল। এমনিতে গৌহাটি ঠান্ডা ঠান্ডা শহর। তবে গরমও নেহাত মন্দ পড়ত না। ছুটির দিনের বিকেলগুলো লম্বা। ভাবি অনেক খেলব। বন্ধুরা কেউ আসে না। তারা নাকি কোন সেনগুপ্ত কাকুর বাড়িতে রোজ জড়ো হচ্ছে। মনিমালার আসর বসছে সেখানে। নাচ, গান, খেলা, হরেক মজা চলছে সন্ধে অবধি। মাঠে তারা আসবে কেন?
একপা দুপা করে আমাদের কোয়ার্টারের এলাকা পেরিয়ে আমরা তিনবোন সেনগুপ্ত কাকুর বাড়ি হাজির হই। বাবা জানতে পারলে বকবেন। কেন না দূরত্ব কম না। ওই রাস্তা ধরে একা একা যেতে আমরা সত্যিই ভয় পাই। তবু যাই।
ওখানে কোয়ার্টারগুলো থাকত পরপর সাজানো। সামনে দিয়ে একটা বাঁধানো রাস্তা। রাস্তাটা কোয়ার্টারগুলোর সামনে দিয়ে এগিয়ে, দুপাশেই গিয়ে বড় রাস্তায় মিশেছে। আর সেখানেই দু -মোড়ে সিমেন্টের বাঁধানো কালভার্ট। বেশ বসে গল্প করা যায়। কোয়ার্টারগুলো এত একরকমের দেখতে যে নতুন লোককে ছেড়ে দিলে কেবলই ঘুরপাক খাবে।
সেনগুপ্ত কাকুর বাড়ি যেতে গেলে ওইরকম চারসারি কোয়ার্টার এরিয়া ডিঙোতে হয়। আমরা কালভার্টের সংখ্যা গুনে গুনে এগোই যাতে গুলিয়ে না ফেলি। ছোট দুইবোনের পা ব্যথা করে। তবু ওরা যাবেই।
প্রথমদিন তাঁর দরজার মুখে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়াই আমরা। অনাহুত তিন বোন। ভেতরে তখন চাঁদের হাট বসেছে। নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, সবকিছুরই মহড়া চলছে।
কাকু ডাকেন, “আরে এসো, এসো। তোমরা পিডব্লুডির চ্যাটার্জীদার মেয়ে না?”
আমরা দুরু দুরু বুকে ভেতরে ঢুকি। না বলে আসা। চ্যাটার্জীদা টের পেলে আমাদের আর আস্ত রাখবেন না। তবু মরিয়া হয়েই এসেছি। নাহলে তো কৌতুহলেই মৃত্যু হত।
‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’ নাটকের রিহার্স্যাল চলছিল সেদিন। মিঠুদি লক্ষ্মী হয়েছে। দেখতে সুন্দর। ভালোই মানাবে। ওদের বাড়িতে আমরা মাঝেমাঝেই উঁকিঝুঁকি মারি। ওরা চাটগাঁর লোক, ধর্মে বৌদ্ধ। মোমবাতি জ্বালিয়ে “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি/ ধর্মং শরণং গচ্ছামি” আবৃত্তি করে ওদের বাড়ির সবাই। বৌদ্ধ পরিবার আগে কখনও দেখিনি। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা মানুষ যেন। আমরা তাই মিঠুদিদের খুব সমীহ করে চলি।
সেনগুপ্ত কাকুর চেহারাটি লম্বা ছিপছিপে, মুখে ঝলমলে হাসি। একগাল হেসে আমাদেরও বলেন বাড়িতে জিজ্ঞেস করে এসো। পার্টের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
রাতে ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে তুলি কথাটা। বাবা কাগজ পড়ছিলেন। গম্ভীর গলায় বলেন, “না। অতদূরে রিহার্স্যাল দিতে যাবে না তোমরা।”
তা বললে হয়? বন্ধুরা যে সবাই ওখানে। বাবাকে কী করে বোঝাই? চোখ দিয়ে টপ্‌টপ্‌ জল পড়ছে। আর নিজেদের অত্যাচারিত, নিপীড়িত ভাবছি।
মা ম্যানেজ করলেন। রান্নাঘরে গিয়েই আমরা কাঁদছিলুম কিনা। বাবাকে বললেন, “ওরা যাবে।”
“তার মানে?” মায়ের এ হেন দুঃসাহসে বাবা অবাক!
“তোমার তো একা যাওয়া নিয়েই আপত্তি। এ-পাড়ার সব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যাবে আবার ওদের সঙ্গেই ফিরবে। তাহলে হবে তো?”
“বিপদ আপদ কিছু হলে কে দেখবে? আমি তো তখন অফিস থেকেই ফিরি না।”
“কিছুই বিপদ হবে না। ওরা মাঠ দিয়ে দিয়ে যাবে।” বলে মা খুন্তি নিয়ে সোজা রান্নঘরের দিকে রওয়ানা দেন।
আমরাও আর দাঁড়াই না। পাশের ঘরে গিয়ে জোরে জোরে পড়া শুরু হয়। এরপরেও যদি বাবা না করে দেন, তাই সে তল্লাটেই আর থাকি না। পড়া দেখাই শুধু। আসলে তখন তো পড়ায় মনই নেই।
সেদিন মাকে আস্ত একজন দেবী মনে হয়।
অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসে। হীরাদা, রতনদা, বাপি, মানিক, আরো অনেকে মিলে স্টেজ সাজায়। মাঠের ওপর স্টেজের মাচা বাধা শুরু হতেই আমরা শিহরিত হই। স্টেজের চর্তুদিক চট দিয়ে ঢাকা। মাথার কাছে নীল কাপড়ে বড়ো বড়ো হরফে লেখা আছে, “মনিমালার আসর, গৌহাটি এয়ারপোর্ট।”
উপস্থিত হতে দেরি হয়ে যাওয়ায় তেমন বড়ো পার্ট জোটেনি আমাদের। তবে সেজন্য কোন দুঃখ হয়নি। গলায় সাদা ফুলের মালা। তিনবোনেরই গায়ে সেলাই করে ছোট করা মায়ের ব্লাউজ। ঝক্‌ঝকে শাড়ি, চক্‌মকে ওড়না! সবই অঙ্গে উঠেছে তো। আর কী চাই? সঙ্গে উপরি পাওনা যথেচ্ছ লাল লিপস্টিক মাখার সুযোগ। সমবেত নৃত্যে চিটু, আমি দুজনেই আছি। উত্তেজনা, আবেগে ভরপুর তিনজনে, মাকে বারবার মনেমনে কৃতজ্ঞতা জানাই। এমন অনুমতি, মা ছাড়া বাবার কাছ থেকে আদায় করার সাহস কারোর যে হত না, সেকথা আমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানে।
প্রথমেই আমাদের নাচ, তারপরে নাটক। স্টেজের দু’পাশে লাগানো আলোর পাশে লাল, নীল কাগজ নিয়ে হীরাদারাও রেডি। নাচের বা নাটকের দৃশ্যে আলোর ফোকাশ দিতে হবে তো। বীনাদি উদ্বোধনী সঙ্গীত “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” গেয়ে পর্দার পাশে ফিরে গিয়েছে। গানের দল প্রস্তুত। হারমোনিয়াম তবলা নিয়ে তারা পর্দার আড়ালে গুছিয়ে বসেছে। এমন সময় নজরে আসে নাচের দলে দু’পাশ থেকে যেখানে তিনজন করে ছ’জন ঢোকার কথা সেখানে একজন কম। সেনগুপ্ত কাকু বলেন, “ববি দেখ ত, কে নেই? দেখে আমায় এক্ষুনি জানাও।” ব্যস্ত হয়ে তিনি চলে যেতেই ববিদি আমার কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়। শাড়ি আর ওড়নায় সবাইকে একইরকম দেখাচ্ছে। ববিদি আমায় ঠেলা দিয়ে বলে, “এই মিতু, চিটু কই?”
চিটু নেই? আমি বেশ ভয় পেয়ে যাই, তবে কি বাবার কথাই সত্যি হল! চিটু হারিয়ে গেল। কিন্তু একটু আগেও তো ছিল। এত ভিড়ের মাঝখান থেকে ছেলেধরারা ঠিক ওকেই বেছেবুছে নিয়ে যাবে কী করে?
আমার মাথায় এসব যুক্তি ঢোকে না তখন। হঠাৎ খুব কান্না পায়। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। শুধু গাল দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে নামতে থাকে। বেশ বুঝতে পারি মুখের মেকআপ ধুয়ে যাচ্ছে। তবু নিজেকে সামলাতে পারি না। ওইসব জবরজং শাড়ি, ওড়না নিয়ে, খুঁজতে যাবারও ক্ষমতা নেই। ওরই মধ্যে চিটুর আর্বিভাব। ওর নাকি খুব জোর ছোট বাইরে পেয়েছিল। সবাই ব্যস্ত, কাকে বলবে? সারা মাঠ লোকে লোকারণ্য। সবাই বাড়িতে তালা লাগিয়ে ফাংশান দেখতে এসেছে। তাই নির্জন জায়গা খুঁজে প্রাকৃতিক কর্ম সারতে ও সামান্য দেরি করে ফেলেছে। বকুনি শুনতে শুনতে বেচারির মুখ শুকিয়ে আমসি! তবু আমি দিদিগিরি ফলাই। রেগেমেগে বলি, “আমাকে বললি না কেন?”
“তুই যদি আমাকে যেতে না দিস? যা অবস্থা, বলতে গেলেও দেরি হত।”
দেখি কাপড় প্রায় খুলেই ফেলেছে। ববিদি ওকে তাড়াতাড়ি কাপড় পরিয়ে দেয়। আমাদের নাচ শুরু হয়। “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।” নাচতে নাচতেই লক্ষ্য করি একেবারে সামনের সারিতে, বাবা চশমা পরে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। ঘটনাটা জানতে পারেননি তো? আমি আর তাকাই না। নাচ শেষ হবার পরে জোর হাততালি। নাটকেও পার্ট আছে আমাদের। তাড়াতাড়ি পোশাক বদলাতে যাই।

***

গরমের দীর্ঘ ছুটিটা কোথা দিয়ে যেন হুশ্‌ করে কেটে যায়। গৌহাটিতে জীবনযাপনের অন্য স্টাইলটায় আমরা বেশ রপ্ত হয়ে গেছি। মাসে মাসে একটা ইনল্যান্ডে ঠাকুমার কাছে একখানা চিঠি যায়। তাতে যদিও বারবার লিখি, “তোমার জন্য খুব মন কেমন করছে। তুমি কবে আসবে?” বেশ বুঝতে পারি এসব ডাহা মিথ্যে কথা! বাবার কাছে বকুনি না খেলে কখনোই ঠাকুমার মুখ মনে পড়ে না। প্রতিদিনের ব্যস্ত রুটিনের আনাচ-কানাচে এমন একটা ফাঁক নেই যে ঠাকুমার মুখ ভেসে উঠবে। শুধু পোস্ট কার্ডে, সাজানো হস্তাক্ষরে ঠাকুমা যখন লেখেন, “ মিতু, চিটু, মিঠু তোমরা কেমন আছ? তোমাদের জন্য বড় মনখারাপ হয়।” তখন আমাদের সেই খাড়া দাঁড়ানো গম্ভীর স্বভাবের ঠাকুমার কথা মনে পড়ে যায়। আর ভেসে ওঠে, কাকা, কাকিমা খুড়তুতো ভাইবোন সমেত ঝলমলে তিনতলা বাড়িটা। চল্লিশ পাওয়ারের বাল্‌ব্‌ জ্বলা ঘরে, তক্তপোশে পেটে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বই পড়তে ব্যস্ত, বেঁটে গোলগাল এক মহিলাকে দেখতে পাই। যাঁর চশমার ম্যাজিকটা ভারি অদ্ভুত! খুললেই ভাসা ভাসা বড় চোখদুটো একদম ছোট হয়ে যায়।
ঠাকুমা পরেন সাদামাটা সাদা থান। যার কোন পাড় নেই। মুখে শূন্য প্রসাধনের সহজ লাবণ্য। সবকিছুই সাধারণ, শুধু তিনিই নন। তখনই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখেন। একটা প্রাইমারি স্কুল নিজেই গড়ে তুলেছেন। লেডি ব্রেবোর্নের সেলাই-এর ডিপ্লোমা ছিল তাঁর। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি কত মহিলা তাঁর কাছে সেলাই শিখতে আসেন। তাঁদের মাথায় ঘোমটা হাতের ব্যাগে উলকাঁটা আরও কত কী। আমরা সুযোগ পেলেই ওঁদের রহস্যময় ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে দিই। আবার কখনো ঝাঁটার কাঠি আর উলের ছোট ছোট গোলা নিয়ে ‘উল গোনা’ শিখতে চাই। ওরা হেসে আমাদের শুধরে দেন “উল গোনা” নয় “উল বোনা”।
ঠাকুমা সারাদিনই ব্যস্ত। কখনও ঘর সংসারের কাজ করেন, কখনো বা বই পড়েন, অথবা লেখালেখি করেন। তারই ফাঁকে ফাঁকে পাড়ার মানুষেরা আসেন। কেউ বা জ্বর, সর্দি কাশি পেটব্যথার হোমিওপ্যাথি ওষুধ চান। কেউ কেউ আবার নানা রকম দরকারি পরামর্শ নেন। সে-সব সময় ঘরের দরজা বন্ধ হয়। আমরাও ঢুকতে পাই না।
বাবা বলেন, “তোমাদের ঠাকুমা নিজের চেষ্টায় আদ্য-মধ্য পাশ করেছেন। ব্রাহ্ম গার্লসে ক্লাস ফোরে পড়াকালীন বিয়ে হয়েছিল তো। তখন মাত্র এগারো বছর বয়স। তারপরেও নিজে নিজে পড়ে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার হয়েছেন।” আমরা শুনি, তবে সবটা বুঝি না। দুপুরবেলা যে ঠাকুমা তেঁতুলে গুড় লঙ্কা চট্‌কে দুধভাত খান, আমাকে আর চিটুকে একগাল একগাল মুখে তুলে দেন, অথবা থালাভর্তি লঙ্কা, আম, ডাঁটার আচার করে রোদ্দুরে শুকোতে দেন, কিংবা হারমোনিয়াম পেতে গান শেখান, সেই ঠাকুমাটা আমাদের চেনা! অনেক পাশ করা ঠাকুমাটা নেহাতই অচেনা।
কখনো সখনো পাড়ার অন্য বাড়িতে ঠাকুমার সঙ্গে আমি যাই। তারা শশব্যস্ত হয়ে মাদুর বা আসন পেতে দেন। “বসুন দিদি বসুন।” ঠাকুমা গম্ভীর মুখে পাতা আসনে বসেন।
দূরে থাকাকালীন এইসব কথা মনের মধ্যে ভাসে। আর দেখি নীচের একতলার বারান্দায় একটা বড়ো বেতের চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসে আছেন একজন মানুষ। চশমাপরা দুটি চোখ বাড়ির প্রবেশ পথে স্থির। কিন্তু কেউ সেই পথে আসেনা ঢোকে না। ছবিটা চোখে ভাসলেই তীব্র মনখারাপ হয়। আমি অদৃশ্য হাত নেড়ে তাড়াই ভাবনাটাকে।

***

ঝমঝমিয়ে বর্ষা আসে। অনেকদিনই স্কুল যাওয়া হয় না। ত্রিপল ঢাকা ট্রাক এসে দাঁড়ায় আমাদের কালভার্টে। তারপর কাউকে না নিয়েই চলে যায়। জানলা দিয়ে দেখি আমরা, দু’একজন কলেজে পড়া দাদা দিদি ছাতা নিয়ে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। তবে ছোটরা কেউই যাচ্ছে না। নির্ঘাৎ বাবা মা-ই তাদের বাড়িতে আটক করেছেন। চোদ্দ কিমি রাস্তা পেরিয়ে স্কুল। পৌঁছলেই হাজার মজা! তাছাড়া এমন দিনে রেনিডে মানে ছুটির ঘোষণা তো হবেই হবে। আমরা বাড়িতে ছট্‌ফট্‌ করি।
আমাদের বড় রাস্তার কালভার্টের উল্টোদিকেই একটা বাজার বসে। বৃষ্টির দাপটে সেটাও উধাও হয়েছে। এমনকি হাটের দিনেও সেখানে জমা জলে পুরনো তরকারির খোসা ভাসে। বৃষ্টি হয়েই চলেছে। থামে আর না। জল থামতে না থামতেই গ্রামের বুড়িরা ডিম সবজি নিয়ে জানলার কাছে এসে হাঁক পাড়ে। ছোটছোট ছেলেরা জলে ছপছপে রাস্তায় ধরা মাছ নিয়ে বিক্রি করতে আসে। মা ডাকেন তাদের। কোয়ার্টারের বারান্দা পায়ের জলছাপে মাখামাখি হয়। মায়ের কেনা বেচায় আমরাও সামিল হই। বেশ মেজাজ নিয়ে মতামত দিতে থাকি।
বাবা অফিস থেকে ফিরে রাগ করেন। “তোমায় এসব কে কিনতে বলল? বোকা পেয়ে ঠকিয়ে দিল তো?”
মা হাসেন। নিরুপায়ের হাসি। মুখে বলেন, “সব কিছু ফুরিয়ে গিয়েছে। তুমি কখন আনবে, তাই একটু আধটু কিনেই ফেললাম।”
আড়ালে আমাদের কাছে ফিস্‌ফিস্‌ করেন, “না কিনলে ওরা খাবে কী? সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছে। বেচারারা বাজারে বসতেই পারছে না।”
মায়ের এই নেপথ্য ভাষণের অভ্যেস আমাদের মাঝেমাঝেই ক্ষুব্ধ করে। আমি মাকে বলি, “তুমি সোজা বাবাকে বললেই পার।”
মা হাসেন, “জানিস তো রাগী লোক। কী হবে রাগিয়ে?”
আমরা তবু খুশি হই না। বাবার মতো মা-ও তো একজন বড় মানুষ। আমাদের মতো ছোটো নয় যে গুরুজনদের মুখের ওপর উচিত কথা বলতে পারবেন না। তবু যে মা কেন এত লুকোচুরি করেন বুঝি না। স্পষ্ট কথা সোজাসুজি বললেই হয়। কিন্তু হয় না। আমাদের সেনগুপ্ত কাকুর বাড়ি যাবার পারমিশান করে দেবার মতো লড়াই তাই এক আধবারই মা সাহস করে করেন। বাকিটা চলে পর্দার আড়ালে। আমাদের মতো কচিকাঁচা দর্শকদের কাছে।
সকালে আমরা স্কুলে যাওয়ার আগেই কাজে আসে জনার মা। পরনে চিরকুট ময়লা কালো ঝুল একটা মেখলা। সঙ্গে ওর মেয়ে, বছর আষ্টেকের জনা। ওরও মাথার চুল এলোমেলো। মিঠুর সমবয়সী, মাথায়ও সমান। মা ওকে মিঠুর বাতিল ফ্রক, আমাদের ছোট হওয়া পাজামা, সোয়েটার পরতে দেন।
মিঠু রাগ করে, “তুমি আমার সব জামা ওকে দিয়ে দিচ্ছ কেন?” যদিও অহেতুক রাগ, তবু মা নরম গলায় বলেন, “ছিঃ মিঠু, ওটা তো তুই পরিস না। তোর তো অনেক আছে। ওর যে একদম নেই।”
জনার মাথা ভর্তি উকুন, সাড়া গায়ে খড়ি ওঠা। অথচ কালো মুখখানিতে সবসময় ভারি মিষ্টি একটা হাসি ঝুলছে। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার কষ্ট দুঃখ যেন ওকে ছোঁয়নি। জনার চোখ সবসময় ঘোরে। একটা সূঁচ পড়ে থাকলেও কুড়িয়ে এনে দেয় ও। যতক্ষণ আমাদের কোয়ার্টারে থাকে, মিঠুর পায়ে পায়ে ফেরে। মিঠু ইচ্ছে মতন ওকে খেলায় নেয়, আবার কখনো বাদ দিয়ে দেয়। রান্নাঘরে মায়ের কাছে নাকি গলায় নালিশও করে। “ও মা, দেখোনা, জনা আমার পাশে চলে আসছে। মাথায় উকুন হয়ে যাবে তো। তুমি বারণ করো না। ওমা…,” ওর ঘ্যানঘ্যানানি চলতেই থাকে। তবে এসব কথা মা কখনোই শুনতে পান না। জনাও সেকথা খুব ভালো করেই জানে। তবুও অসহায়ের দৃষ্টি নিয়ে বাইরের সিঁড়িতে চুপ করে বসে থাকে। দৃশ্যটা আমার একদম পছন্দ হয় না।
জনার মা কয়লা ভাঙে, ঘর ঝাঁট দেয়, বাসন মাজে, আমাদের সব কাপড়-চোপড় কাচে। বাংলা কিছুই বোঝে না, মা ইশারা ইঙ্গিতে সবই বোঝান ওকে। জনা পড়ে না, শোনে না, শুধুই খেলা করে। আর এইজন্যেই জনাকে মিঠু হিংসে করে।
বর্ষা বা যেকোন হঠাৎ ছুটির দিনে স্কুল না গেলে টের পাই জনা আর জনার মা দুপুরে বাড়ি যায় না। সারা সকাল কাজ করে, পেছনের উঠোনের কলে বালতি পেতে স্নান সারে ওরা। মা ওদের মাথার তেল, গায়ে মাখার সাবান যোগান দেন। স্নান সেরে মাটিতে উবু হয়ে ভাত খেতে বসে। একটা কলাইয়ের সানকিতে দুজনকে একসঙ্গে ভাত দেন মা। ওর মা একগাল একগাল নিজে খায় আবার ওকেও খাওয়ায়। খেয়েদেয়ে ডাইনিং টেবিলের পাশের মেঝেতে আঁচল পেতে মেয়েকে নিয়ে গড়িয়ে নেয় খানিক। বিকেলের রোদ নামলে কাজ সেরে দুজনে গুটিগুটি বাড়ি ফেরে। অনেকটা পথ পেরোলে ওদের গ্রাম। অনেকখানি হাঁটতে হবে।
মিঠু চলনসই খানিকটা অসমিয়া শিখেছে। জনার সঙ্গে কথা বলতে ওর কোন অসুবিধেই হয় না। মাঝেমাঝে জনাকে কোলের কাছে নিয়ে, পেছনের উঠোনে উকুন বাছে ওর মা। বাবা সেইসময় অফিস থেকে কোন কারণে বাড়িতে এলে, খুব বিরক্ত হন।
“ওরা উকুন বাছছে। বাড়ি শুদ্ধু সবার মাথায় উকুন হবে তো।”
মা হাসেন, “যাঃ! গরিব মানুষদের মাথায় ওরকম একটু আধটু উকুন-টুকুন থাকে। আমরা এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি, আমাদের উকুন হবে কেন?”
মা বলেন না যেটা সেটা হল, মিঠুর মাথায় ভালোই উকুন হয়েছে। আর আমাদেরও মাঝেমাঝেই মাথা চুলকোচ্ছে।
জনাকে মা সবসময় “আহা, বাছা করেন।” জনাও মিঠু কিছু করলেই “মাইজি মাইজি” করে মাকে নালিশ করে। মিঠু ক্ষেপে গিয়ে তারস্বরে চেঁচাতে থাকে। বলাবাহুল্য বাবা বাড়ি থাকলে এসব কখনোই ঘটে না।
শীতকালের দুপুরে বাড়িতে থাকলেই আমরা একসঙ্গে কমলালেবু খাই। আমাদের বাড়ির কাছের বাজারটায় টাকায় দশটা বড় লেবু পাওয়া যায়। জনা সে-সব দিনে মায়ের কাছে ঘুমোতে যায় না। পা ছড়িয়ে বসে একটা কমলালেবু খায়। জনার মা দূরে বসে ফিক্‌ফিক্‌ করে হাসে। মা ওকে যে কোন কিছুই খেতে দেন না কেন আমাদের রাগ হয় না, এক কমলালেবু ছাড়া। ভাগে কম পড়বে যে। ফিস্‌ফিসিয়ে নিজেদের মধ্যে জনার বিবিধ হ্যাংলামী নিয়ে নিন্দেমন্দ করি।
চিটু বলে, “জোরে বলিস না দিদি। মাকে ঠিক লাগিয়ে দেবে। ও কিন্তু বাংলা ভালোই বোঝে।”

চলবে