স্মৃতিচারণ ফিরে দেখা সর্বানী বন্দ্যোপাধ্যায় বসন্ত ২০১৯

ফিরে দেখা

সর্বানী বন্দ্যোপাধ্যায়

আমরা এখনও আকাশে। প্লেন নামব নামব করছে। সিটবেল্ট বেঁধে নিতে বলা হচ্ছে বারবার। এই একটু আগেই আকাশে উড়ছিলাম আমরা। দেখছিলাম নীচের শহর। মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করে থাকা এক বাচ্চা মেয়ে যেন। কোথাও কোন শব্দ নেই। চিকচিকে নদী, লাল টালির বাড়ি, মেঘের ফাঁকে টুকি করছিল। ছাত থেকে আকাশ দেখার মধ্যেও এই মেঘের লুকোচুরি থাকে। একদম ছোটবেলা পুজোর প্যান্ডেলে বাঁশে ঝুলে খেলা করার সময়, নীচের দিকে মাথা ঝুলিয়ে উলটো পৃথিবী দেখতাম আমরা। এ যেন তাই। ধরা ছোঁয়ার বাইরের আকশে উঠে ঝুলতে ঝুলতে চেনা পরিচিত ব্যস্ত জগতটাকে দেওয়ালে টাঙানো ছবির মতো তারিয়ে তারিয়ে অনুভব করা। এখন মাঝেমাঝেই প্লেনে চাপা হয়। এ ছবি তবু নতুনই থেকে গিয়েছে।

আজ হঠাৎ কী যে হল, ওই চেনা ছবি দেখতে দেখতে নতুন করে জেগে উঠল আর একটা ফিকে হয়ে আসা দৃশ্য। যেন ঘোরের মধ্যে হঠাৎ একঝলক দমকা হাওয়ার শিরশিরানি এসে ভাসিয়ে দিল আমায়। পুরনো সিনেমার মতো ভেসে ওঠা ছবিতে দেখলাম, প্লেনে বসে আছি অনেকদিন আগের আমি, আমার দুই বোন, ভাই, আর বাবা মা। তিন বোনেই পরেছি একরকম জামা। সাদা কালো ছাপছোপে ভরা সুতির টিউনিক আর লেসের কাজ করা সাদা ব্লাউজ। ছোট ছোট চুল ভরা মাথায় সাদা হেয়ারব্যাণ্ড আর পায়ে জুতো মোজা। প্লেনের সিটে বোনেরা বসেছি পাশপাশি। মাঝে মাঝে সিট বদল হচ্ছে জানলা দিয়ে মেঘ দেখার জন্য। করিডরের ওপাশের তিনটে সিটে বাবা, মা আর ছোট্ট ভাই। আমি সবচেয়ে বড়। বয়স বারো। সবে ক্লাস এইটে উঠেছি।

এখন বুঝতে পারি তখন বাবাকে অনেক বড়ো ভাবলেও বাবার বয়স ছিল সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ। সে সময় প্লেন ব্যাপারটাও এত মামুলি হয়ে যায়নি। প্রথম প্লেন চাপার বাড়তি উত্তেজনাটুকু জড়ো হয়েছে দুরুদুরু বুকের মধ্যে। একটা যেন কী হয় কী হয় ভাব। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্লেনে ঢোকার মুখে দরজার পাশে দাঁড়ানো বিমান সেবিকাদের “স্বাগতম” শব্দটাও মন দিয়ে শুনেছি। তাদের সাজগোজ, প্লেনের ভেতরের অন্দরসজ্জা হাঁ করে গিলছি। এমনকি জানালা দিয়ে প্লেনের গায়ে লাগানো সিঁড়িটার সরে যাওয়াও নজর এড়াচ্ছে না।

ভেতরে বসার পর লজেন্সের ট্রে হাতে হোস্টেস সামনে আসতেই আমার ছোট দুই ভাইবোন ভালো রকম খামচা দিল। সাত আটটা লজেন্স একেবারে তুলে নিয়েছে। বাবা হাঁ হাঁ করে ওঠেন, “রেখে দাও। রেখে দাও। অতগুলো নেয় না।” এয়ার হোস্টেস মুচকি হেসে ওদের গাল টিপে  দেন। ওরা এক গাল হাসে। ভাই ভারি সুন্দর। গায়ের রঙ ইষৎ লাল মেশানো সাদা। নীল রঙের একটা স্যুট পরেছে ও পায়ে লাল জুতো। বয়স সবে তিন। প্লেনের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ আমাদের হাত ছেড়ে হাঁটতে শুরু করেছে। ও ভেবেছে ওটা ওর খেলার জায়গা। এয়ার হস্টেস আবার ওকে মার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। আমরা চলেছি গৌহাটি। বাবা ওখানকার অফিসে বদলি হয়েছে। ভাইবোন, মা বাবা ছাড়াও আমার সঙ্গে চলেছে অনেকখানি দুঃখ। পুরানো স্কুল ছেড়ে আসার, প্রিয় বন্ধুদের ফেলে আসার পাড়ার খেলার মাঠ, নদীর ধার রেখে আসার সব দুঃখকে ছাপিয়ে উঠছে আমার ঠাকুমার কাছছাড়া হবার দুঃখ। গাঢ় করে শ্বাস ফেলেছি আমি। কিন্তু সেই আওয়াজ কাউকে শুনতে দিচ্ছি না।

পরে ওখানে  থাকতে থাকতে ওই দুঃখগুলো কেমন ফিকে হয়ে গিয়েছিল। তবে যেদিন বৃষ্টি পড়ত আর কোনদিন বাবা যখন আমাদের বকতেন, কিংবা কোনসময় রাতে বা ভোরে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে ওই দুঃখেরা আমায় জোর নাড়া দিত। আমি নিজের মনে ফিস্‌ফিস্‌ করতাম, চলে যাব। ঠাকুমার কাছে নিশ্চয়ই চলে যাব।

সেদিন আমরা পৌঁছলাম বিকেলে। গৌহাটি এয়ারপোর্ট থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার বাসে করে যেতে যেতে দেখছিলাম, কী সুন্দর ঝকঝকে লম্বা রাস্তা! দুধারে ছবির মতো সাজানো বাড়ি। বাসের ঠান্ডা হাওয়ায় একটু একটু শীতও করছিল।

আমার কালো কোট, বোনের লাল কোটের বোতাম বাসে ওঠার আগেই মা যত্ন করে লাগিয়ে দিয়েছেন। ছোট বোনের গায়ে লাল সাদা ডুরের আনকোরা সোয়েটার, ভাই-এর গায়েও তাই। তবে ওর সোয়েটারটা নীল আর  সাদায় বোনা। এখানে আসার আগে হঠাৎ করে ওই করে ওই গরম সোয়েটারগুলো কেনা হয়েছিল। গৌহাটিতে নাকি খুব ঠান্ডা। বেশি বেশি গরম কাপড় ব্যবহার করতে হয়।

ঠাকুমা আপত্তি করেছিলেন, “এত পয়সা খরচ করার কি দরকার ছিল? উল এনে দিলে আমিই বুনে দিতাম।”

বাবা বলেছিলেন, “না থাক। এবার ওরা প্লেনে চাপবে। নতুন পরাই ভালো।”

নতুন অনেকটার আর সোয়েটার প্রাপ্তির ঘটনাটা খুবই রোমাঞ্চকর ছিল। সেগুলো গায়ে দেবার সুখ তো পরে বোঝা যাবে, তখন চোখে দেখার আনন্দটাই বা কম কি?

ভারি কৃতজ্ঞ হয়েছিলাম, বাবার এই সুবিবেচনায়। কেননা ঠাকুমার কাছে যতদিন ছিলাম ঠাকুমার হাতে তৈরি জামাকাপড় পরেই দিন কেটেছে। একই সঙ্গে বড় আনন্দের আর দুঃখের দিন সে-সব।

পুজো কাছাকাছি এসে যেত। ঠাকুমার পা মেশিন চলত ঘড়ঘড় আওয়াজ করে। আমরা চারপাশে ঘোরাঘুরি করতাম। প্রতীক্ষা চলত, উদ্বেগও থাকত। নির্দিষ্ট সময়ের আগে জামা শেষ হবে তো? আগস্ট বা সেপ্টেম্বর নাগাদ বাবা, কাকারা ছিট এনে জমা দিতেন ঠাকুমার কাছে। সবসময় জানা যেত না কোনটা কার অঙ্গে উঠবে। ‘র’ সিল্কের, সুতির বা পপলিনের, খাদির ঘোড়া হাতি ছাপ মারা, অন্যরকম গন্ধে ভরা কাপড়গুলো, ফাঁক পেলেই আমরা নাকের কাছে এসে জোর ঘ্রাণ নিতাম। আর আস্তে আস্তে করে বলতাম, “আঃ।”

ঠাকুমা বোতাম আর লেস আনাতেন। পিসিমনিকে দিয়ে, বেশিরভাগ সময়েই আমাদের তিন বোনের তিনটি থান থেকে, তিনরকমের জামা তৈরি হত। যেগুলোর সাইজ ছাড়া সবকিছুই একরকম। যাতে কেউ বলতে না পারে তারটা বেশি সুন্দর হয়েছে।

বড়দের বিবেচনায় ভবিষ্যৎ চিন্তার ইঙ্গিত থাকত, আর আমাদের শিক্ষা ছিল সবকিছু জানিয়ে নেওয়ার। লেস দেওয়া পুরনো ফ্যাশনের সে-সব জামার মাপ গায়ে হাতে ঝুলে অনেকটা বড়ো বড়ো হত। একবছর দু’বছর পর রঙটঙ উঠে “ফিটিংস্‌-এ” পৌঁছত অবশ্যই। মানে আমার পরের বোন চিটুরটা আমি পরলে বা তার পরের বোন মিঠুরটা চিটু পরলে ঠিকঠাক দেখাত। কিন্তু সে হবার জো ছিল না। আমার জামাটা আমি ভাবতাম পিসতুতো দিদি রুমাদিকে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু ঠাকুমা যে ওটা “মিতু” অর্থাৎ আমার জন্যই বানিয়েছেন। সে-ইচ্ছের জোর বলাবাহুল্য আমার  থেকে অনেক বেশি।

পুজোর সময় ওই আলগা আলগা জামা পরে পথে বেরিয়ে পড়তাম আমরা। পায়ের জুতোও বড়ো সাইজের। আর তাতে সামনের দিকে বেশ খানিকটা তুলো গোঁজা। পুজোতে বৃষ্টি হতই। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া রাস্তায় কাদা ডিঙিয়ে ছোট ছোট লাফ দিয়ে  হাঁটতে হত  আমদের। না ওইসব জামাকাপড়ের জন্য কখনো দুঃখ হয়নি। এমনকি পাশের বাড়ির মলি পলিদের দোকান থেকে কেনা টুইঙ্কিলের জামা দেখেও না। কেননা আমরা জানতুম আমাদের এরকমই হতে হয়। ঠাকুমা অবশ্য প্রতিদিন হেসে হেসে বলতেন, “ওমা বড্ডো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। আসছে বছর ঠিকঠাক হবে। এই নাও তোমাদের রুমাল।”

প্রতিটি জামার সঙ্গে সেই একই ছিটের ম্যাচ করা রুমাল পেয়ে আমরা কী যে খুশি হতাম! আহা, এ-রকম তো আর কারো নেই।

ভাইবোনদের মধ্যে বড় হবার দরুণ আমার একটা বিশেষ সুবিধে ছিল। কোন সময় দোকানের নতুন ভালো পোশাক কেনা হলে সেটা আমাকেই কিনে দেওয়া হত। আমার ছোট হলে চিটু আর চিটুর ছোট হলে মিঠু পরত সেটা। বড়ো হওয়ার এই সুযোগটা কবেই যে হারিয়ে ফেলেছি।

যাক সে-সব কথা। মোটমাট সেবার নতুন গরম পোশাক পেয়ে কত যে খুশি হয়েছিলাম আমরা তা কি কথায় বোঝানো যায়। নতুন পোশাক পরে স্বপ্নের এরোপ্লেনে যাত্রা, খুবই মধুর হয়েছিল মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল চিমটি কেটে দেখি, সত্যিসত্যিই যাচ্ছি নাকি স্বপ্ন দেখছি।

সেদিন আকাশ ভ্রমনের শেষে এয়ারলাইন্সের বাহারি বাস আমাদের একটা কালভার্টের পাশে নামিয়ে দিল। দুহাতে দুটো সুটকেস নিয়ে বাবা, ভাই-এর হাত ধরে মা। একটা মাঝারি ব্যাগ হাতে আমি আর ওয়াটার বটল কাঁধে আমার পরের বোন চিটু নামল বাস থেকে। মিঠু আর নামে না। বাসের দরজা খোলা। দেখি ওর পুতুলটা সিটের নীচে পড়ে গিয়েছে ও কুড়িয়ে নিতেই ব্যস্ত। কোনকিছুরই খেয়াল নেই। কন্ডাকটর ওকেও যত্ন করে নীচে নামিয়ে দিলেন।

সেদিন কালভার্টের পাশে অপেক্ষায় ছিলেন একজন হাসিখুশি মানুষ। তিনি বাবার এক অফিস কলিগ। পরে আমাদের প্রিয় চৌধুরীকাকু হয়ে যান। ওঁর পিছুপিছু আমাদের ফাঁকা কোয়ার্টারের বাগানের গেট খুলে ঢুকলাম আমরা। কাঠের বাড়ি, মাথায় এ্যাসবেস্টারের ছাউনি। অবশ্য বোঝার উপায় নেই। দেয়ালের পলেস্তারার ওপর চুনের রঙ করা। ফলস্‌ সিলিঙ দেওয়া একদম পাকা ইঁটের বাড়ি যেন। দুখানা বড়োবড়ো বেডরুম, ডাইনিং, কিচেন, স্টোররুম, টয়লেট, আর সামনে খোলামেলা এক বারান্দা সমেত বাড়িটা সত্যিই সুন্দর! ঠিক গল্পের বইয়ের বাড়ির মতো। একনজরেই ভালোবেসে ফেললাম এই নতুন আস্তানাটিকে।

গেট খুলে ঢোকার সময় গেটের ওপর লতিয়ে ওঠা মাধবীলতার ঝাড় একটু নীচু হয়ে আমাকে ছুঁয়ে দিল। আমার মনে হল হঠাৎ একটা অচেনা রাজ্যের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ফেলেছি।

শুরু হল নতুন জায়গায় নতুন জীবন। প্রতিদিন গৌহাটি এয়ারপোর্টের বসতি থেকে আমাদের যেতে হয় চোদ্দ কিমি দূরের শহরের স্কুলে। সকাল সাড়ে আটটায় ত্রিপলে ঢাকা ট্রাকের লম্বা বেঞ্চে অন্য সবার সঙ্গে ঠেসাঠেসি করে রওয়ানা দিই আমরা। আর সন্ধে হয়ে আসে যখন, বড় রাস্তায় কালভার্টের পাশে নামি। স্কুল ফেরৎ বাড়ির রাস্তায় ক্লান্ত বিধস্ত দুইবোন হাঁটতে হাঁটতে নিজস্ব দূরবীনে দেখতে পাই আমাদের মা দাঁড়িয়ে আছেন গেট ধরে, মাধবীলতার ঠিক নীচে রোজই এক কথা বলেন তিনি।

“আজ এত দেরি হল কেন? আমার খুব ভয় করছিল জানিস।”

সে-সময় ওই ভীতু মাকে একটু বেশিবেশিই ভাল লাগত। সেটা মার জন্য না সারাদিনের পরে ফিরে দেখা বাড়িটার জন্য এখন আর বুঝতে পারি না।

সে-সব দিনের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে জুবিকে। সবাইকার থেকে আলাদা দেখতে ছিল ওকে। পাতলা হাল্কা লম্বাটে চেহারা বড় বড় পালক ঘেরা, ওপরদিকে টানা, কাজলপরা নরম দুচোখে সবসময় গায়ে হাল ফ্যাশানের কামিজ, পায়ে সেঁটে থাকা স্ল্যাকস্‌। ঘাড় ছাঁটা চুল। সপ্রতিভ কথাবার্তা, চাহনি, জুবি ছিল আলাদা। একদম আলাদা আমার থেকে।

জুবির পাশে আমি সবসময়ই নিজের সাজপোশাক চলাফেরার কায়দা নিয়ে কুন্ঠিত আড়ষ্ট। আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আর ভাবি আমি কখনোই অমন হতে পারব না। ক্লাসে ওর পাশে বসার তীব্র বাসনা কিন্তু ক্লাসটিচার বলেন, “মিতশ্রী তুমি পেছনে গেছ কেন? এক্ষুনি সামনে উঠে এসো।”

অপছন্দের কারণটা আমি জানি না, শুধু এটুকু ঠিকই বুঝতে পারি কেন এক রহস্যময় কারণে জুবিকে আর ওর সঙ্গীদের দিদিমনিরা একদম পছন্দ করেন না। আরো অপছন্দ করেন ওদের সঙ্গে আমার মেলামেশা। সেবার বেঙ্গলি গার্লস স্কুলের ফার্স্ট টার্মিনাল পরীক্ষায় আমি  যথারীতি চতুর্থ। প্রথম হতে পারলাম না কোনাবারই। সে জায়গাটা একান্তভাবে মালার জন্য বাঁধাধরা হয়ে আছে। একেবারে ঠান্ডা স্বভাবের। মালা সবার সঙ্গে আমার মত মিশতে পারে না। তবু আমরা দুজনে খুব বন্ধু হয়ে গিয়েছি। দুজনেরই বইপড়ার নেশা। এখান-ওখান থেকে ভালো ভালো বই জোগাড় করে নিজেদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি করে পড়ি আমরা। আর ছুটির শেষে কোনরকমে টিফিন শেষ করে চলে যাই স্কুলের সামনের বই-এর দোকানে। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রোজ নতুন নতুন স্বপনকুমার সিরিজের বই পড়ি। আমরা বাড়ি ফিরি ট্রাকের সেকেন্ড ট্রিপে। চারটেয় ছুটি অথচ সাড়ে চারটে বা পাঁচটার আগে কখনোই ফেরার গাড়ি আসে না। কখনো কখনো আবার পাঁচটাও বেজে যায়। ট্রাক এলে সবচেয়ে শেষে ধীরেসুস্থে উঠি আমি আর মালা। ত্রিপল ঢাকা ট্রাকের একদম কোনে ড্রাইভারের কেবিনের পেছনে জায়গা জোটে আমাদের। ওটা ট্রাকের অন্য সব ছেলেমেয়েদের হিসেবমতো সবচেয়ে বাজে জায়গা। কিন্তু তাতে কী-ই বা আসে যায়। তখন তো আমরা স্বপনকুমারের ডিটেকটিভ দীপক চ্যাটর্জীর সঙ্গে বনে, জঙ্গলে, পাহড়ে, সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিভিন্ন রহস্যের অনুসন্ধানে মগ্ন। আমাদের সময় কই ওসব তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মাথা ঘামানোর।

গৌহাটির প্রথম রাতটা আজও মনে পড়ে। সেই দিনটা ছিল ভারি অদ্ভুত। আমরা প্লেনে এলেও মালপত্রের বেশিটাই আসবে ট্রাকে। তাই সেদিন রাতে চৌধুরীকাকুর দেওয়া তোশক মাদুরে সুটকেসে আনা চাদর পেতে বিছানা করেছেন মা। বাবা বলছেন, “মশারিটা ভাগ্যিস সঙ্গে এনেছি। মশাকে তো আটকানো যাবে।”

প্রচন্ড শীতে যদিও মশা তেমন নেই। বড়ো নীল মশারির নীচে বিনা বালিশে একটা কম্বল সম্বল করে শুয়েছি জড়াজড়ি করে। কনকনে শীতের রাতে ছোট দুজনের গায়ের সোয়েটার খোলা হয়নি। যদি ঠান্ডা লেগে যায়! আমাদের বোনেদের গায়ে বাড়িতে পরার ফ্ল্যানেলের জামা। তবু কী শীতই না করছে! তারই মধ্যে কখন মার গা ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়েছি।

ভোর রাতে ঘুম ভেঙে আধো অন্ধকারে কানে আসে বিদঘুটে আওয়াজ! খস্‌খস্‌, খস্‌খস্‌। আওয়াজ আসছে আমাদেরই ঘরের ছাত থেকে। ভূতের ভয়ে দিনের আলো না ফোটা অবধি সিঁটিয়ে শুয়ে আছি। মনে ভাসছে রকমারি চিন্তা। আসলে ক্রমশ বড় হচ্ছি তো! তাই নতুন একটা চিন্তার ভঙ্গি তৈরি হয়েছে আমাদের। কখনই কোন ঘটনাকে সামান্য ভাবি না। সবকিছু খুঁটিয়ে দেখি সবসময়। যদি কোন “ক্লু” পাওয়া যায়। ইংরাজি শব্দটা মগজে সেঁধিয়েছে দীপক চ্যাটার্জীর রহস্য রোমাঞ্চের বই থেকে। তাই আওয়াজটার উৎস সন্ধান না হওয়া অবধি একাগ্র হয়ে আছি।

আলো ফুটতে না ফুটতেই বাবা দরজা খুলে ছুটলেন ভূত ধরতে। দেখি এ্যাসবেসটাস্‌ ছাদের ফলস্‌ সিলিং এর ফাঁক থেমে আসছে তেঢ্যাঙা একটা লোক। বাবার ধমকানীর উত্তরে আমতা আমতা করে অসমিয়া ভাষায় যা বলছে তার কিছু কিছু আমরা ওর হাত মুখ নাড়া দেখে বুঝতে পারছি।

“বাবু গো, এই ফাঁকা কোয়ার্টারে আমি পায়রা ধরতে এসেছিলাম। গরিব মানুষ, পায়রার মাংস খাই। আমি তো জানতাম না আপনারা এসেছেন। এবারের মতো মাপ করে দিন। আর কোনদিন হবে না।”

সেদিনই বুঝেছিলাম অসমিয়া ভাষাটা আমাদের বাংলার মত। ততো কঠিন নয়। পরে দেখেছি উড়িয়া ভাষাও শুনে বেশ বোঝা যায়।

একটু বেলা বাড়তে চৌধুরীকাকু এলেন। ভূতের কীর্তি শুনে মুচকি হেসে বললেন “ও তো জনা। খায় না হাতি। পায়রা ধরে নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করে। এটাই ওর ব্যাবসা। এখানে তো পায়রার মাংস অনেকেই খায়। খুব পছন্দও করে।”

শুনে আমার ছোট বোন মিঠু কেঁদেই ফেলে আরকি, “ও বাবা, তুমি ওদের পায়রা ধরতে মানা কর। আমাদের বাড়ির পায়রা আমরা কাউকে দেব না।”

এর পরের পায়রা সংক্রান্ত ঘটনাটা আরো অভিনব। এক বরিবার সকালে বাবা আমাকে নিয়ে গিয়ে রান্নাঘরের তাকে রাখা একটা ছোট্ট ডিম দেখালেন।

“এই ডিমটা খাবি? পায়রার ডিম। চলবে নাকি?”

না না  কখন নয়। পায়রার ডিম আমি মোটেই খাব না।”

বাবা বললেন, “চিটু, মিঠু, টুকু তোরা, কি করবি বল?”

ওরা চুপচাপ।

শেষে ছোট ডিমসেদ্ধর বাটিতে মাপমতো জল দিয়ে স্টোভে ডিম বসানো হল। নুন দিয়ে খোলা ছাড়িয়ে খেয়ে বাবা বললেন “মার্ভেলাস!” আমরা তখন করুণ মুখে বাবার খাওয়া দেখছি আর ঐ অপূর্ব খাদ্য না খাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হল কিনা চিন্তা করছি।

মা কোত্থেকে এসে হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন। “পায়রার ডিম না ছাই। দিশী মুরগির ডিম। তোরা তো খুব বোকা।” বাবা বলল আর সঙ্গেসঙ্গেই বিশ্বাস করলি?”

আমরা তিন বোন মুখ চাওয়া চাওয়ি করি। আমার মনে হয় মা যে কী বলে! বাবা কেন, দুনিয়াসুদ্ধ সব মানুষকেই তো আমরা বিশ্বাস করি।

ট্রাকে আমাদের সঙ্গে বেঙ্গলি বয়েজ স্কুলের ছেলেরাও যেত। ওদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্ধু ছিল বাপি আর মানিক। মাঝেমধ্যেই আমরা কামাখ্যা মন্দিরে যাই শুনে মানিক সাবধান করত, “খবর্দার অত ঘন ঘন ওখানে যাস না। কতসব তান্ত্রিক সাধু আছে। একবার ধরতে পারলেই মন্ত্র পড়ে পায়রা করে দেবে।”

কামাখ্যা মন্দিরের উৎসর্গ করা পায়রাদের কেউ খায় না। তবু কাল্পনিক এক ভয়ে শিউরে উঠি। প্রথমে তো মানুষ থেকে পায়রা হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। তারপরের ভবিষ্যৎ যেভাবেই হোক অন্ধকার। তাই ওই মন্দিরে গেলে আমি আর চিটু মায়ের পাশ ছাড়ি না। মিঠু আর টুকুকে বলি না কিছু। কেননা মিঠু সব কথা মাকে বলে দেয়। আর টুকু তো কিছু বোঝেই না। কাল্পনিক ভয়ে মন্দিরে সারাক্ষণ ওদের দুজনকে আমরা চোখে চোখে রাখি। বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া ওয়াটার বটলের জল ছাড়া কোন জলই খাওয়াই না। কে জানে কেউ পায়রা করে দেয় যদি!

আসামের আর একটা বৈশিষ্ট্য বড়ো আকর্ষণ করে। আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত তখন, বলত, “আসামের রঙ কি?” আমি  বলতাম  সবুজ। কেন না গৌহাটিতে দেখি চারপাশে সবুজ, ঘন সবুজ বনানী। গাছের পাতাগুলো এমন, হাত দিলে মনে হয় হাতে সবুজ রঙ উঠে আসবে। মাঝে মাঝে যখন আমরা ঝর্নার ধারে পিকনিকে যাই, এইসব গাছপালা, বন্ধুবান্ধব, হাজার মজার মাঝে আমার মন হঠাৎ হু হু করে ওঠে ঠাকুমার কথা ভেবে। আমাদের চার ভাইবোনকে ছেড়ে না জানি তিনি কত কষ্টে আছেন। এসব কোনকিছুর ভাগই তাঁকে দেওয়া যাচ্ছে না।

তবে সেই ফেলে আসা বাড়িতে ঠাকুমা কোনদিনই একা ছিলেন না। আমার দুই কাকা এক কাকীমা ছাড়াও আর একটা টিয়াপাখি ছিল। সে-ই ঠাকুমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। পাখিটা ছিল খুব পাজি। সারাক্ষণ বলত মিটু, মিটু। আমি মিতু আর আমার ছোটবোনের নাম মিঠু। ও কিন্তু সারাক্ষণ “ট” উচ্চার্ণ করত। ডাকাডাকি করছে হয়ত, আমি গিয়ে দাঁড়ালেই একেবারে চুপ।

মিঠু বলে দিদি, “ও তোকে ডাকে না। আমাকেই ডাকে।”

আমি হেসে বলি “যা না। দেখি তোকে ডাকছে কিনা।”

মিঠু খাঁচার পাশে দাঁড়ালেও একই ব্যাপার। পাখি বোবা হয়ে যায়।

বাটি করে অনেকটা ছোলা ওর খাঁচায় রাখতেন ঠাকুমা, মাঝেমধ্যেই আঙুল গলিয়ে দু’একটা তুলে নিই আমি। তাই ও মিটু মিটু করে চেঁচালে ভয় হয়। আমার নাম করে ও ঠাকুমার কাছে হয়ত সেই নালিশটাই করে।

পাখিটা ছেড়ে আসার সময় মিঠু খুব মুষড়ে পড়েছিল। গৌহাটিতে পাখি পোষার বায়না ধরলেও বাবা একেবারেই রাজি হয়নি।

এয়ারপোর্টের এলাকা ছোট। তবু কোয়ার্টারের বাঙালিদের ছেলেমেয়েদের জন্য একটা প্রাইমারি স্কুল ছিল। ছোটরা পড়ত সেখানে। মিঠুকে সেখানেই ভর্তি করা হয়। টুকু তখনও পড়তে শেখেনি। গানের তালে তালে টুইস্ট নাচে। অফিসের কাকুরা আমাদের পাশের কোয়ার্টারে মেস করে থাকেন। সে-সময় “ছোটিসি মুলাকাৎ” বইটা রিলিজ করেছে। তার বিখ্যাত গান “ছোটিসি মুলাকাৎ… প্যার বনগয়ি”র সঙ্গে টুইস্ট নাচে ও।

হিন্দি গান শোনা বা করা আমাদের বাড়িতে নিষিদ্ধ। যদিও ওর আধো আধো বুলির গান বা নাচ সবই  মজার  চোখেই  দেখে। তবু বাইরের  কেউ  বেড়াতে এলে আহ্লাদ করে ও সব দেখালে বাবা খুবই রেগে যান।

মেসের কাকুদের যত আবদার আমাদের বাবার কাছে। বাবা ওদের ভীষণই প্রশ্রয় দেন। ন’টায় বাবা শুয়ে পড়ার পরেও ওরা যদি ডাকে “চ্যাটার্জীদা, চ্যাটার্জীদা,” বাবা  মশারি তুলে বেরিয়ে পড়েন।

আগরতলা থেকে বাবা আনেন টিনে ভরা রসগোল্লার পায়েস। ক্ষীরের মধ্যে ভাসছে ছোট ছোট রসগোল্লা। ভারি সুন্দর তার স্বাদ। টিন খোলামাত্রই হই হই করে এসে যায় ওরা। ব্যাস্‌! নিমেষে সব শেষ।

আমাদের এলাকায় ছোট বাজার। হাটের দিন সেটা রঙিন হয়ে ওঠে। অন্য দিনে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। গৌহাটির বড় বাজার থেকে বাবা নিয়ে আসেন চেতল মাছ, ইয়া বড়ো সাইজের! রান্না হবার পরেই কাকুদের মেসে চলে যায় অনেকটা। এসব নিয়ে আমি আর চিটু ভীষণই গজ্‌গজ্‌ করি। অবশ্যই বাবার কান বাঁচিয়ে।

মা বলে, “ছিঃ! মন ছোট  করিস্‌ না।”

কাকুরাও যে আমাদের কত কিছু দেয়, সে-কথা প্রায়শই মনে থাকে না। মেসে মাংস হলেই বাটি ভর্তি করে পাঠায় ওরা। মুরগীর মাংস প্রথম ওদের সৌজন্যেই খাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তবে আমাদের ভাইকে ওরা কোলে করে নিয়ে যায়। ও ওখানেই খায়।

অঙ্ক পরীক্ষার সময় প্রতিবারই আমি ঘাবড়ে যাই। ওই সময়ে মেসের সিনহাকাকুই শেষ ভরসা। রুটিন পেলেই সিন্‌হাকাকুকে চেপে ধরি আমরা। বাড়িতে অঙ্কের কর্মশালা বসে। দুটি ছাত্রী। একটি ক্লাস সিস্কের চিটু, আর একজন এইটের আমি। মারও কাজ জোটে। বারবার চা সাপ্লাই করতে করতে তিনি হাঁফিয়ে ওঠেন। রাত বাড়ে ছাত্রীরা ঘুমে ঢুলতে থাকলেও মাস্টারমশাইয়ের চোখে ঘুম নেই। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তার হাঁকডাক শোনা যায়। মিতু, চিটু, ওঠ্‌ ওঠ বলছি। আমরা তো কোনছার হাঁকের চোটে মা অবধি কেঁপে যান। রান্নাঘর ফেলে তিনি ছুটে আসেন। ঘুম থেকে উঠে আমরা বুঝতে পারিনা কোন পৃথিবীতে আছি।

সময় দ্রুত এগোয়। অবশেষে ডিসেম্বর শেষ হয়ে আর এক জানুয়ারিতে পা দিই আমরা। এখানে ঠান্ডার কামড় বড় বেশি। পৌষ সংক্রান্তির দিন বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। ওইদিন নিজের বাড়ি ছাড়াও অন্য অন্য বাড়িতেও কত পিঠেপুলির নেমন্তন্ন খেয়েছি।

এক সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে ফিরে বলেন তাঁরই এক অসমিয়া সহকর্মী মিঃ ভারালির বাড়ি রাতে আমাদের সকলের খাবার নিমন্ত্রণ হয়েছে। উপলক্ষ বিহু উৎসব। বিহু শব্দটির সংস্কৃত বিবরণ “কৃষি উৎসব।”  ফসল তোলার পর আমাদের যেমন নবান্ন হয়। নতুন চাল, কড়াইশুঁটি, দুধ, নতুন ফল দিয়ে মা সুন্দর করে মাখেন। এ-সময়ে ওদের মাঘের বিহু বা “ভোগালি” বিহু হয়। এছাড়াও “বোহাগ” বা “রাঙালি” “বাটি” বা “কাঙালি” বিহু আছে। মা কিছু পাটিসাপটা বানিয়ে বক্সে পুরে নিলেন, ওদের বাড়িতে দেওয়া হবে।

গিয়ে দেখা গেল, অসমিয়া পিঠে একটু শক্ত ধরনের, নাকি ওরাই ওভাবে বানিয়েছে। শেষমেষ খাবার টেবিলে আমাদের পিঠেরই জয়জয়কার হল।

শীতকালটা তেমন সুবিধের গেল না। মেজবোন চিটুর “ডিপথেরিয়া” হল। গৌহাটির হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন বাবা। তাঁর ছোটাছুটিও শুরু হয়ে গেল। পাহারের ওপরে অনেকখানি জায়গা জুড়ে হাসপাতাল। বাবার সঙ্গে যাবার বায়না জুড়লেও অনুমতি পাওয়া যায় না। ছোঁয়াচে রোগ, রাতগুলো আমার দুঃসহ কাটে। চিটুকে সঙ্গে নিয়েই ঘুমোই কিনা। একা একা ঘুম আসতে চায় না।

ওখান থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসে চিটু। কেমন শুকনো চেহারা হয়ে গিয়েছে। মা ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। চোখ থেকে টপ্‌টপ্‌ করে জল পড়ে।

চিটু বলে, “রাতে আমার বড় ভয় করত রে দিদি। বাবাকে কতবার বললাম, দিদিকে আমার কাছে রেখে যাবে? বাবা কথা শুনল না।”

অনেকদিন হল চিটু আমাদের ছেড়ে একদম একা সেই অচেনা দেশে পাড়ি দিয়েছে। সেখান থেকে কেউ আর ফেরে না। এখন মাঝে মাঝেই মনে হয়, জিজ্ঞেস করি, “চিটু ওখানে একা একা তোর ভয় করছে না?”

শীত ফিরে যাবার জন্য যে তার তল্পিতল্পা বাঁধছে, বেশ টের পাই, আবার আসছে বছর আসবে। এখানে ঋতুর আসা যাওয়া স্পষ্ট বোঝা যায়। সামনের মাঠের প্রকান্ড ন্যাড়া গাছগুলো কেমন মনখারাপ করে একা একা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের প্রতীক্ষা বসন্তের জন্য। কবে এসে দু’হাত ছড়িয়ে গাইবে, “আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।”

হু হু করে দিন কাটে। আমাদের নিঃসঙ্গ তিনতলা বাড়িটি মাঝে মাঝে আমার স্বপ্নে হানা দেয়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মন কেমন করে। দেখতে পাই, আশপাশের বাড়ির নীরব-সান্ত্বনার ভঙ্গি। যেন বলছে, “কেঁদো না। ওরা আবার ফিরে আসবে।”

কিন্তু আমরা কি সত্যিই  ফিরব? মাঝেমাঝে যে মনে হয় বুঝি আর ফেরা হবে না! চারপাশে এই পাহাড় ডিঙিয়ে, এই ঘিরে থাকা বনস্থলি পার হয়ে, এই  কোয়ার্টার ছেড়ে, আর কোনদিন ফেরা হবে না।

সকালে ঘুম ভাঙলেই দেখি, দূরে পাহাড়ের সরি। গম্ভীর চেহারা নিয়ে তারা সব একে অপরে গায়ে ঠেস দিয়েছে। সিনহাকাকু একদিন বললেন, “চল তোদের দু’বোনকে পাহাড়ে নিয়ে যাব, ওই দূরের পাহাড়টায়। হেঁটে পৌঁছতে  হবে, তারপর ওঠা, ‘পা ব্যাথা করছে, বলবি না তো?’”

আমরা দু’বোন একসঙ্গে চেঁচাই “পারব, পারব।”

সকালে হতে না হতেই স্কুলের কেডস্‌ পরে  আমরা তৈরি, মা, টিফিনবাক্স ভর্তি করে আলু, ডিমসেদ্ধ দিয়েছেন। এছাড়া পাউরুটির প্যাকেট, কমলালেবু কলা আছে। শেষে দে কাকুও বললেন, “আমি যাব।”

উনি অনেক লম্বা। আমাদের থেকে জোরে জোরে হাঁটেন। তবে সিনহাকাকু আছেন যখন আমাদের ভাবনা নেই। সামলে সুমলে ঠিক নিয়ে যাবেন। মা ফ্লাস্ক গোছাচ্ছিলেন, চা দেবেন বলে। সিনহা কাকুই নিরস্ত করলেন।

“না বৌদি, আর কিছু না। ব্যাগ ভারি হয়ে যাবে। পাহাড়ে উঠব কী করে? চা রাস্তায় খেয়ে নেব।”

আমাদের দুজনের কাঁধে স্কুলের ওয়াটার বটল। দে কাকুর ব্যাগে সেই বড় দুরবীনটা। শুধু ওই দুরবীনে চোখ লাগানোর জন্য পাহাড় কেন মরুভূমি ও ডিঙোতে আমরা রাজি। এতদিনের ভেতরে মোটে একদিন, অনেক বায়না করে ওটা হাতে পেয়েছিলাম। আশায় থাকি। আজ সেই সুযোগ আবার আসবে নিশ্চয়ই।

অদ্ভুত ব্যাপার। বাড়ি থেকে যে পাহাড়টাকে একদম কাছে মনে হয়। হাঁটা শুরু করলে সে পথই আর ফুরোয় না। যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। আমাদের কোয়ার্টারের সামনে প্রকান্ড। মাঠের ওপারে এয়ারপোর্ট থেকে শহরে যাবার রাস্তা। ওই রাস্তারই ডানদিকে ঘেঁষে কাঁটাতারের বেড়া। তার গা-ঘেঁষা পথটাই সোজা গিয়েছে পাহাড়ের দিকে। ওদিকে গ্রাম আছে। মানুষজনের বাস আছে। হাটে আসা অনেক মেয়ে পুরুষই থাকে ওখানে। ওখান থেকে দিশী হাঁসের ডিম আসে, টাটকা শাক সবজি আসে, ঝোড়ায় ভরা মুরগী আসে। এখানে এসে থেকেই সে-সব খাই আমরা। তবু ওই রাস্তার, গ্রামের, কিছুই দেখিনি, চিনিনি এতদিন। আজই হঠাৎ করে সেই সুযোগ হয়েছে।

গ্রামের ধার দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তাটা পাহাড়ের পায়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। প্রায় নটা নাগাদ আমরাও পৌঁছই। পথে চিটু অনেকবার থেমেছে। পা ব্যথার বায়না করেছে। চিউইংগাম, জল দিয়ে ওকে শান্ত করা হয়েছে। সিনহা কাকু একবার জোরে ধমকালেন,  “না গেলে এখানেই বসে থাক। ফেরার সময় নিয়ে যাব। তুই এলি কেন?”

বকুনি খাবার পর চোখে জল নিয়ে বেশ জোর জোর  হাঁটছিল ও। আমার পা অবিরাম চলছে। মন চলছে আরো তাড়াতাড়ি। একসময় পাহাড়ের ঠিক নীচে পৌঁছে গেলাম আমরা।

জল আর সামান্য কিছু খাবার খেয়ে শুরু হল পাহাড়ে ওঠা। আমাদের দল এখন ভারি হয়েছে। আমাদেরই মতো ছোট একটি ছেলে রাস্তা থেকে যোগ দিয়েছে আমাদের সঙ্গে। তার কোমরে প্যান্ট থাকলেও গায়ে জামা নেই। খালি পায়ে সারাক্ষণ পথের নুড়িপাথরে লাথি মারতে মারতে চলেছে ও। পাহাড়ে ওঠার ভারি মজা। পায়েচলা পথটা একটু ঘুরে উঠেছে। কিন্তু পাকদন্ডি বেয়ে উঠলে আরও দ্রুত পৌঁছানো যায়। ওই ছেলেটির দেখাদেখি আমিও পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে উঠতে থাকি। হড়কে পড়ে যেতেই, দুপায়ের নুন ছাল উঠে যায়।

একদম চূড়োয় উঠতে চারটে বেজে পনেরো। উঁচু নীচু এবড়োখেবড়ো জায়গাটা দেখে মোটেই বোঝা যায় না সেটাই সে মাথা। তবু সেখানে একটা লাঠিফ্ল্যাগ পুঁতে দিয়ে হাসতে হাসতে জনগণমন গাই। সবই সিন্‌হা কাকুর চিন্তাভাবনার ফসল। তবে আমরা সবাই খুব খুশি হই। বেশ পাহাড় জয়ের অনুভূতি হতে থাকে!

নীচে নামার সময় দে কাকুর মোজার মধ্যে থেকে একটা বড়োসড়ো জোঁক বের করা হয়। নুন ছড়াতে তবে সেটা পা ছাড়ে। সিনহাকাকুর হাত জোঁক বার করতে গিয়ে রক্তে মাখামাখি হয়ে যায়। কাকু তখন মজা করে বলেন, “তোরা বউদিকে বলিস, আমি বাঘ মেরেছি।”

কোয়ার্টারে সব বন্ধুদের জন্মদিন হয়। মানে সবাইকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ায়, ম্যাজিক গান নাচের অনুষ্ঠান হয়। অবশ্য সবটাই বন্ধুরা মিলে। তবে কারো কারো কাকা বাবাও যোগ দেন ছোটদের আমোদ দিতে। এতবছর আমাদের জন্মদিনের বালাই ছিল না। মা পায়েস মাংস রান্না করে খাওয়াতেন শুধু। এবার আমরাও বায়না ধরি। জন্মদিন করতে হবে।

মা সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোক না।  হেড অফিসে অর্থাৎ বাবার প্রস্তাবটা রাখা হয়।

বাবা একেবারে মানা করেন না শুধু শর্ত রাখেন একটা।

কী শর্ত?

তোমরা বোনেরা সবাই আশ্বিন মাসে জন্মেছ। তাই আশ্বিন মাসের যেকোন একটা রবিবার বেছে নিয়ে জন্মদিন হবে। সবার একসঙ্গে।

আমরা এ ওর মুখের দিকে তাকাই।  তেমন মনোমত না হলেও মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী?

তখনও জানি না সবচেয়ে গোলমেলে শর্তটাই বলা হয়নি।

বাবা চশমার ফাঁকে আবার একবার জরিপ করেন আমাদের, “আর একটা কথা, নেমতন্ন করার সময় জন্মদিন-টন্মদিনের ব্যাপার বলা যাবে না কিন্তু।”

“তার মানে?”  আমরা হাঁ হয়ে যাই।

“মানে খুব সোজা। জন্মদিন বললেই সবাই উপহার আনবে। ওইসব উপহার-টুপহার নেওয়া আমার একদম পছন্দ নয়। তোমরা বন্ধুদের বলবে ওইদিন বাড়িতে আসতে। সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া আনন্দ-উৎসব হবে। এই আর কি।”

আমরা চুপচাপ হয়ে যাই। চারপাশে এক মর্মান্তিক নীরবতা। শুধু টিকটিকিটা বলে ঠিক, ঠিক।

টিকটিকি ঠিক বললে কী হবে, উপহার ছাড়া জন্মদিন, সে আবার হয় নাকি? এ যেন আম ছাড়া আমসত্ত্ব! রঙ বাদ দিয়ে দোল। তবু সায় দেওয়া ছাড়া উপায় কী আছে? প্রস্তাব তো আমরাই দিয়েছি। বন্ধুদের পাওয়া রঙিন ফিতে বাঁধা উপহারগুলো চোখের সামনে নাচতে থাকে। যাক্‌গে আমাদের ভাগ্যের করুন পরিহাস মাথায় নিয়েই  ঘাড় নাড়ি। সম্মতি দিই। উপহারের জন্য জন্মদিনটা নাকচ করলে কেমন বোকা বোকা দেখাবে না!

শেষ পর্যন্ত খুব খুশি হয়েই আমরা জন্মদিনের আয়োজন করতে থাকি। ছোট ছোট সাদা কাগজে রঙ দিয়ে ঘরবাড়ি, নদী, আকাশ, মেঘ এঁকে কার্ড তৈরি করে চিটু। ওর আঁকার হাত চমৎকার। ভেতর একটাই ছড়া,

এই রবিবার দুপুরবেলা

আসবে আমার বাড়ি

সবাই মিলে করব মজা

নইলে কিন্তু আড়ি।

কবিতাটা লিখলাম আমি, “বাড়ির” সঙ্গে “আড়ির” মিল হওয়াতে আমি বেজায় সন্তুষ্ট। বাধ সাধলেন মা। কখন বন্ধুরা আসবে, খাওয়াদাওয়া করবে, কিছুই নাকি বলা হয়নি।

আমরা বলি সে তো মুখেমুখে বলা যায়। তার জন্য ছড়া লাগে না।

তিনবোন বেরিয়ে পড়ি। সবশুদ্ধ গোটা পনেরো নিমন্ত্রিতের কোটা। মিঠু ছোট বলে ওর বন্ধু সংখ্যা আমরা বুঝিয়ে সুজিয়ে কমিয়েছি।

আমরা ছজন, চিটুরও তাই। কিন্তু বাবার সব শর্ত পুরোটাই মানা যায় না। বন্ধুদের বাবা, মা, সকলে যখন জিজ্ঞেস করেন হঠাৎ নেমন্তন্ন! কীসের জন্য? জন্মদিন?

আমরা নীরব থাকি। মুখে হালকা হাসি নিয়ে এ ওর দিকে তাকাই। প্রতিজ্ঞাভঙ্গের দায় নিই না। অথচ তাঁরা যা বোঝার বুঝে যান।

সেই বিশেষ দিনটি অবশেষে আসে। সারা সকাল বেলুন ফুলিয়ে মুখে ব্যথা হয়ে যায়। বাগানের পাতা ফুল দড়ির ফাঁসে বেঁধে বাবা চমৎকার শিকলি তৈরি করেছেন। খাবার টেবিলের ওপর সাদা চাদর পেতে সব খাবার সাজানো হয়েছে। তাতে বড় বড় চামচ দেওয়া। ছোট ছোট রঙিন কাগজের থালায় যে যার মতো তুলে নেবে। মা একপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে। অসুবিধে হলে সাহায্য করতে হবে তো!

না কেক আসেনি বা বানানো হয়নি। ওসব বিলেতি কায়দা বাবা পছন্দ করেন না। ওসব কেক কাটা বা ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ এর গানটান আমাদের বাড়িতে চলে না। বন্ধুদের বাড়িতে দেখেছে বলে চিটু একটু বলার চেষ্টা করেছিল, বাবা এক ধমকে থামিয়ে দিয়েছেন ওকে। মিঠু শুধু মায়ের পাশ ঘেঁসে একবার বলে, “আমাকে পায়েস দেবার সময় একটু বেশি করে কিসমিস দিও কিন্তু।” বেচারি মিঠু! ওর যা হাইট। টেবিলে হাতই পাবে না। তাই এসব আগাম অনুরোধ। বেশ বোঝা যায় ওকে বা ওর বন্ধুদের মায়ের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

ঠিক দশটার সময় পুজোয় পাওয়া সবচেয়ে ভালো জামাগুলো পরে আমরা তৈরি হয়ে নিই। মাথায় একটা করে নতুন লাল হেয়ারব্যান্ড। প্লাস্টিকের হেয়ারব্যান্ডটার শরীরে আবছা লতাপাতার কারুকার্য! মা শখ করে কিনে দিয়েছেন। আমরা তৈরি হয়ে বাগানের গেটে। না, মায়ের ক্ষয়ে যাওয়া লাল লিপস্টিকটা লাগানোর ইচ্ছে হলেও বকুনি খাবার ভয়ে লাগানো যায়নি।

বাড়ির বারান্দায় প্রহর গোনা চলতে থাকে। একে একে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশ, এগারো, সাড়ে এগারো পেরিয়ে যায়। আমাদের পাউডার মুছে গেছে। এ-ঘর ও-ঘর করতে করতে চুল এলোমেলো। বন্ধুরা আসতে শুরু করে যখন তখন বারোটা প্রায় বাজে।

ওদের হাতভর্তি কাগজে বাঁধা রঙবেরঙের প্যাকেট, সবাই উপহার এনেছে। সেদিকে তাকিয়ে বাবা গম্ভীর মুখে ভেতরে ঢুকে যান। আমরাও ঠিক খুশি হতে পারি না। পরবর্তী ঝড়ের আগাম সঙ্কেত বাবার চেহারায় ফুটে উঠেছে তো।

মা কেমন বিপন্ন হয়ে পড়েন। একদিকে ছেলেমেয়েদের চোখে মুখে চাপা খুশির ছটা, অন্যদিকে বাবার ভয়ঙ্কর রাগের বিপদবার্ত্তা মাকে কেমন অন্যমনস্ক করে দেয়। মা বলেন, “তোমরা সবাই বসো। আমি একটু ভেতর থেকে ঘুরে আসছি।”

আমাদের ছোট ভাই এই অভাবনীয় পরিস্থিতির যথাযোগ্য সদ্‌ব্যবহার করে। উপহারের প্যাকেটগুলো ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দেয়। আমরা ওকে থামাবার আগেই ফিতেটিতে খুলে সেগুলোর বেহাল অবস্থা হয়।

চোরা আশান্তি বুকে নিয়ে আমরা খাইদাই, গল্পগুজব করি। নাচগানের অনুষ্ঠানও বাকি থাকে না। বলাবাহুল্য বাবা সবটাই বয়কট করেছেন। এরপর মনে আছে বেশ কিছুদিন তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি। গুম হয়ে ছিলেন।

সে-সময় একটা কথা বারবার মনে হয়েছে বড়রা কেন আমাদের কথা বোঝে না। আর একটা চিন্তাও মাথায় ঘুরত, প্রকাশ করি বা না করি সব অকর্মই ধরা পড়ে যাবে। তাই মরিয়া না হলে অবাধ্যতা করতাম না।

বাবার রাগ আর মায়া মমতা দুটোই ছিল একটু বেশি বেশি। মাথায় উকুন হলে তিনবোনকে একসঙ্গে বসিয়ে তার ওষুধ মাখানোর দৃশ্যটা এখনও ভুলতে পারিনি।

আমাদের খাওয়া পরা সংক্রান্ত ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো মেটাতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। গৌহাটিতে সবার জীবনযাপনের ধরন ছিল আলাদা। সুসজ্জিত ঘরে থাকত খাট, ড্রেসিংটেবিল, আলমারির বাহার। আমাদের বাড়িতে সে-সবের বালাই ছিল না। বাইরের ঘরে একটা খাটিয়া। একটা টেবিল দুটো চেয়ার। দুটো মোড়া। ভেতরের শোবার ঘরে সারসার তিনটে খাটিয়া। তাতে যাবতীয় ঘরকন্নার সরঞ্জাম। দেওয়ালে কাঠের কুলুঙ্গিতে আয়না চিরুনী পাউডার ক্রিম সিঁদূরকৌটো। এছাড়া বড়বড় ট্রাঙ্ক, সুটকেস, ইঁটের ওপর কাঠের তক্তা পেতে ওপর ওপর সাজানো।

বাইরে ঘরের খোলা দেওয়াল আলমারিতে আমাদের বইপত্র থাকত। বাবা সেখানেই শুতেন। তবে কোন অতিথি এলে আর একটা খাটিয়া জোগাড় করে এনে তাদের শোবার ব্যবস্থা করা হয়। রান্নাঘরের পাশের বারান্দায় বড় টেবিলে খাওয়াদাওয়া হত। সেটার চারপাশে কয়েকখানা চেয়ার। সেখানে আমরা পড়তেও বসি। বাথরুমের সামনের প্যাসেজটার শেষ কোণ-এ মাচায় কয়লা। ঘুঁটের ঝুড়ি এবং বাড়ির যাবতীয় আবর্জনার স্থান। সেখানে কাঠকয়লাও থাকত। কামাখ্যা মন্দিরে গেলে বাবা সকালবেলা ভাত মাংস আর কপির তরকারি ইক্‌মিক কুকারে কাঠাকয়লার আঁচে বসিয়ে দিতেন। ফিরে এসে আমরা খেতাম। সব মিলিয়ে আমরা বেশ ছিলাম।

গৌহাটিতে, ট্রাকে করে শহরের স্কুলে পড়তে যাওয়াটাও ভালই লাগত। টাউনের ওই নতুন স্কুলে উত্তেজনার খোরাক ক্রমশ বাড়ছিল। প্রার্থনার গানটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। “মানুহে মানুহর করে” অসমিয়া গানটার বাংলা অনুবাদ, “মানুষ মানুষের জন্য” আমাদের স্কুলের প্রার্থনায় রোজ গাইতে হত। লাইনে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে গলা মেলাতে চেষ্টা করতাম। গানটা চেনা নয়, তবে সুর  ভারি মিষ্টি। তাই দুদিনেই আত্মস্থ করে নিলাম। ভূপেন হাজারিকার গলায় রেকর্ডে যখন শুনলাম, অবাক হয়ে গেলাম। বাবা বললেন ওঁর “বিস্তীর্ণ দুপারে, অসংখ্য মানুষের” গানটা নাকি আরো ভালো। পরে আরো অসমিয়া গান শুনলাম। শিখলাম। বিহুর সুরেলা গানগুলো শুনলেই শরীর নেচে ওঠে। অসমিয়ার মধ্যে গান নাচের একটা সহজাত প্রতিভা আছে। আমি নাচতে শিখেছি বাড়িতে থাকতেই। ওখানে বিহু নাচ শেখার চেষ্টা করি মন দিয়ে। কিন্তু ঠিকঠাক পারি না। ওই কোমর দোলানোর তীব্র গতি শেখা সহজ নয়।

শাড়ি পড়ার ইচ্ছা বহুদিনের। আগের স্কুলে ক্লাস এইট থেকে শাড়ি এখানেও তাই। ব্যবস্থাটা বেশ পছন্দ হল। হালকা কমলা খোলের শাড়িতে গাঢ় কমলা পাড়। বড়োসড়ো তাঁতের শাড়িটা গুছিয়ে পরতেই পারি না। অগত্যা মার দ্বারস্থ হই। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পেটের মধ্যে কুঁচি গুঁজে দিয়ে, আঁচল পাটপাট করে পিনআপ করতে শিখে যাই। ব্লাউজ বিদঘুটে ধরনের কলার দেওয়া সাদা ব্লাউজ, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ্‌ করে না। কোমরে চওড়া কমলা কোমরবন্ধনীতেও কোন ফ্যাশন নেই কিন্তু উপায়হীন হয়েই ওটা লাগাতে হয়। মাথায় দুই বেনীতে সাদা ফুল বেঁধে, বুকের ওপর ইয়াবড়ো এক ব্যাচ লাগিয়ে নিজেকে বেশ স্মার্ট মনে হয়। যদিও আধুনিক হওয়া যায় না মোটেই। জুবি আমার গদগদ হাবভাবে অখুশি হয়ে কানে কানে বলে, “আয়নায় দেখেছিস কী? শাড়ি পরে একদম ক্যাবলা দেখাচ্ছে।”

যদিও ওর কথা আমি মেনে নিই না। নতুন শাড়ির ঘোর আমায় ঘিরেছে। মনে মনে তখন এক সদ্য তরুণী হয়ে গিয়েছি। ঠিক বড়দের উপন্যাসের নায়িকার মতো। জুবিকে পাত্তা দেব কেন! তবে ছুটির পর মালা আর আমি কাপড়ের কাঁধের পিন খুলে গায়ে চাপা দিই। কটন কলেজের যেসব দিদিরা আমাদের বাসে যাতায়াত করে, যাদের সাজগোজ তারিফ করার মতো, তাদের থেকে কোন অংশে আমরাও যে খাটো না, এরকম এক উন্নাসিকতা উপভোগ করতে গেলে জুবিকে পাত্তা দেওয়া যায় না। বাড়ি এসে খুদে আয়নায় যতটা সম্ভব নিজের সাজগোজ দেখতে থাকি। রূপকথার রাজকুমারীর গল্পটা মনে পড়ে যায়। আয়নায় সেরা সুন্দরীর মুখ দেখতে বললে সেই বিম্ববতীর মুখটাই ভেসে উঠত তো। তার সৎমায়ের হিংসে হত। আমার মনে হয় গল্পটায় একটা সত্যি আছে। আয়নায় সব মেয়েই নিজেকে “সেরা সুন্দরী” ভাবতে চায়। যেমন আমি। মুখ দেখার সময় মনে হয় সবটাই ভালো। কোন খুঁত নেই। অথবা আয়নার অপূর্ণতাটুকু নিজের মনের মাধুরী দিয়ে পূরণ করে নিই।

যতদূর মনে আছে এই সময়েই “নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা” আর “আষাঢ় শ্রাবণ, মানে না তো মন” গানদুটো আমার প্রিয় হয়ে ওঠে। বাবার একটা রেকর্ড প্লেয়ারে রেকর্ড শুনলাম। তাতে মাঝেমাঝে বাজানো হত “একখানা মেঘ উড়ে এলো আকাশে, একঝাঁক বুনোহাঁস ডাক পাঠাল, একা একা বসে আছি জানালা পাশে।” ওই গানটাও ভারি পছন্দের ছিল। শেষের গানের মিষ্টি অসমিয়া সুর মন উদাস করে দিত। ঠিক বুঝতাম না। নিজেকে সুন্দর, আরো সুন্দর করে তোলার ইচ্ছেটা কেন মাঝেমাঝেই আমাকে অহেতুক উত্তেজিত করে তুলত। কোন এক সিনেমা আর্টিস্টের অনুকরণে এই সময়েই ছোট সিঁথি করে সমস্ত চুল উল্টে বাঁধার সিদ্ধান্ত নিই। আমার ভালোমানুষ মা এসব লক্ষ না করলেও পরের বোন চিটুর ড্যাবড্যাবে চোখে এসব পরিবর্তনই ধরা পড়ে। তখন আমি ওকে তেমন পাত্তা দিচ্ছিলাম না। সব মিলিয়েই বিক্ষুব্ধ চিটু মায়ের কাছে আমার নামে নালিশের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।  ওর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট সম্পর্ক হঠাৎ তিক্ততার দিকে মোড় নেয়।

ক্রমশ

জয়ঢাকের সমস্ত লেখার লাইব্রেরি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s