ভূতের আড্ডা

দেশবিদেশের ভূত->কানাভুলো আর গেটিসবার্গের ভূত-সংহিতা

কানাভুলোর কাজ হল পথিককে পথভ্রান্ত করা। বরং বলা ভালো উদ্‌ভ্রান্ত করা। ধরা যাক বড়ো ঘুঘুবেশের খগেন পাত্রের বড়ো ছেলের মেজ নাতির অন্নপ্রাশন। তো সেই নাতির মামাবাড়ির লোকজন আসবে ভীমকান্তপুর থেকে। তারা রাত ভোর না হতেই, অন্ধকার অন্ধকারে, বাতাসামুড়ি আর জল খেয়ে রওয়ানা দিল দুগ্‌গা বলে। আর তাদের দলের চুপচাপ নিশুতিপানা সেজ মেসোমশাই পড়ল কানাভুলোর খপ্পরে। দিন লাগতে, চিঁড়েগুড় আর জল খেয়ে জিরিয়ে নেওয়ার সময় ঝিলের ধারে সবার সাথেই গেল মেসো। তারপর সব্বাই সোজা পথে পাত্রবাড়ির দিকে গেলেও মেসো একলা সার দেওয়া তাল গাছের ছায়ায় ছায়ায় আল ধরে শর্টকাট মারার ফিকির করল। ফিকিরটাই দলের অনেকের কেমন কেমন লাগল। কিন্তু মেসো তো কারুর কথাই কানে নেয় না।

ফলে পাত্রবাড়িতে পাতা পড়া অবধি যখন মেসো পৌঁছল না তখন সব্বাইকার একটু গা ছমছম করল। কারণ, মাঠের ধারের পথের ওপরই কানাভুলো ওঁত পেতে থাকে কিনা, রাতের অন্ধকারে। আর একলা লোককে দেখলে বা দলছুট লোককে পেলে কিংবা আনমনা লোককে দলছুট করে নিয়ে টেনে যায় নিজের পছন্দের জায়গায়। মানুষটা সেখানে পৌঁছেই অজ্ঞান হয়ে যায় আর কানাভুলো তখন মানুষটাকে মেরে ফেলে। তবে মেসো পাতে চাটনি পড়ার আগেই পৌঁছে গেল। মুচ্ছোও যায় নি। কিন্তু বলে ছিল যে পথ হারিয়ে বারবার ঘুরে পৌঁছে যাচ্ছিল একটা বটগাছের সামনে। অনেকেই প্রমাদ গুনলেন। কারণ কানাভুলোও পথ ভুলিয়ে মানুষকে একই রাস্তায় বার বার ঘুরপাক খাওয়াতে থাকে। শেষ-মেষ পাত্রবাবুর বড়ো ভগ্নীপতি বাড়তি রসগোল্লা নিয়ে আসার পথে মেসোকে দেখতে পেয়ে সাইকেলের কেরিয়ারে বসিয়ে নেন…… তাই আরকি। নাহলে হয়তো অনুষ্ঠান বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসত।

bhooteraddadeshobidesherbhoot (Small)এদিকে পরিত্যক্ত শহরগুলোকে যতই আদর করে গোস্ট টাউন বলে ডাকা হোক না কেন সত্যিকারের গোস্ট টাউন কিন্তু পেনসিলভ্যানিয়ার গেটিসবার্গ। সেখানে নাকি আজও ভূতেরা লড়ে চলেছে। আসলে আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলতে যা বোঝায় দুশো উনচল্লিশ বছর আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হওয়ার সময় মোটেও তা ছিল না। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পুব উপকূলে আটলান্টিক মহাসাগর ঘেঁষা বারোটা কলোনি ১৭৭৬-এর ৪ঠা জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল আর হপ্তাদুয়েকের মধ্যে তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল আরেকটা রাজ্য। মানে স্বাধীনতা যুদ্ধ মূলত আমেরিকার পুব উপকূলের উত্তরাংশেই হয়েছিল। সে এলাকারই শহর গেটিসবার্গ। তবে গেটিসবার্গের যুদ্ধগুলো অত পুরোনো ভূতেদের নয়। আরো প্রায় আশি বছর পরেকার, গৃহযুদ্ধের সময়কার। গৃহযুদ্ধের সময়েও আজকের চেহারা নেয় নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র। কিন্তু তাতেও ক্রীতদাসপ্রথা বহাল থাকবে না যাবে এই নিয়ে দুগোছা রাজ্যের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। গৃহযুদ্ধের সময়ে গেটিসবার্গে একটা সেনা হাসপাতাল বানানো হয়েছিল হের ট্যাভার্ন নামের একটা পান্থশালাতে। সেখানে আহত সৈনিকদের চিকিৎসা হতো। অধিকাংশ সেনারই অঙ্গচ্ছেদ করতে হত। কিন্তু তাতেও হয়তো তাদের প্রাণরক্ষা করা যেত না। অঙ্গহানিজনিত ক্ষত থেকে প্রাণরক্ষা করার জন্য যে সমস্ত সৈনিককে আনা হত তাদের চার-পাঁচটা ঘরে রাখা হত। সে সব ঘরের জানলা দিয়েই নাকি ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হত ছিন্ন অঙ্গগুলো, সেগুলো পরে জড়ো করে ফেলা হবে বলে। খুব কায়দা করে ঘরগুলোতে নম্বর লাগানো হয়েছিল যাতে অশুভবাচক তের কোনো ঘরের নম্বর না হয়। তাও অঙ্গহানির চিকিৎসা চলাকালীনই যেসব ঘরে প্রাণহানি হতো সেখানে নাকি অঙ্গহীন ভূতেদের দেখা মিলত। তাছাড়া সোলজার্স অরফ্যানেজ নামের বাড়িটার মাটির তলার কুঠুরির ভূতের খবরও বেশ চাউর হয়েছে। শহরের নানান মাঠে যেখানে যেখানে সেকালের সেই যুদ্ধগুলো হয়েছিল সেখানে নাকি এখনও ভূতেদের যুদ্ধ চলতে দেখা যায়। অন্তত সম্প্রতি তেমন দাবিদাওয়াই শোনা যাচ্ছে। তাই সেখানে কমবেশি গোটা দশেক কোম্পানি ভূতভ্রমণের আয়োজন করেছে বা ব্যাবসা ফেঁদেছে।

ভূতের আড্ডার গোটাটা একসঙ্গে এই লিংকে