বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-মাথে মে ট্রিক্‌স্‌

কবুতরখানার চাল

সূর্য্যনাথ ভট্টাচার্য

bigganmathemetricks (Medium)সামান্য বারো কিলো চাল। তাই নিয়ে ধুন্ধুমার!

মানদামাসী গিয়েছিল দোকানে। বারো কিলো চাল তার নিজের,ক্ষেন্তিপিসির আর মলিনাকাকির জন্যে কিনে চার-চার কিলোর বস্তা বানিয়ে নিয়ে এসেছে। মোট বারো কিলো চাল আছে তাতে সন্দেহ নেই,কিন্তু ভাগ করা বস্তাগুলো নিয়ে গোলযোগ দেখা দিল। ক্ষেন্তিপিসি বললে,“ও পবন আড়তদারের ভাগ করা তো? ব্যাটা এক নম্বরের ফেরেব্বাজ। আমি নিজে ওজন করে আমার চাল বুঝে নেব।”

ক্ষেন্তিপিসি নিজের বাড়ির দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে চোখ পাকিয়ে বলল,“এই দ্যাকো। বলিছিলাম কিনা! একটাই চার কিলোর বস্তা। আর দুটোর একটায় পাঁচশো গ্রাম কম অন্যটায় পাঁচশো বেশি!”

মানদামাসীও ছাড়বে কেন? তেড়েফুঁড়ে বলল,”বললেই হবে? পবন আমাদের ঘরের ছেলে,ও এক্কেবারে ঠিক ওজন করেছে। আমি একটুও এদিক ওদিক কত্তে দেবোনি।”

এইসব দেখে মলিনাকাকি বললে, “তোমরা ঝগড়া করে মরো। আমি আমার ঘরের যন্তরে ওজন করে যেটা চার কিলো বা তার বেশি পাব,সেটাই নেব বলে দিলাম।”

বচসায় কথাই বাড়ে, মীমাংসা আর হয় না। কী করা যায়? পাশ দিয়ে মাস্টারমশাই চলেছিলেন বাজারে। তাঁরই ডাক পড়ল। পাড়ায় তাঁর মান্যি ছিল,যতই হোক নেকাপড়া করা মানুষ বলে কতা।

তাঁকে ধরে সমস্যাটা বুঝিয়ে বলা হোলো। তিনটে বস্তায় চাল আছে তিনজনের জন্য। মানদামাসী বলছে,সব সমান সমান। ক্ষেন্তিপিসি মানছে না,বলছে একটায় চার কিলো,একটায় সাড়ে চার কিলো আর একটায় সাড়ে তিন কিলো চাল আছে। মলিনাকাকির কারুর কথায় বিশ্বাস নেই,সে নিজে যাচাই করে সবচেয়ে বেশি ওজনের বস্তাটা নিতে চায়। মানদামাসী চাল চালা-চালি করতে দেবে না। সমাধান কী?

মাস্টারমশাই সব শুনে বললেন, “এই কথা? তা এতে তো মুশকিল কিছু দেখি না।”

ক্ষেন্তিপিসি বললে,“আমার পুরো চারকিলো চাল চাই। কমটা নেব না কিন্তু।”

মানদামাসী বললে,“কোনটাই কম নেই। পেত্তেকটাই চার কিলো করে আছে। ন্যাও না কোনটা নেবে। কিন্তু একদানাও চাল এদিক ওদিক কত্তে দেব নি।”

মলিনাকাকি বললে, “আমি আমার বাড়ীর যন্তরে মেপে তবেই নেব কিন্তু।”

“আহা তাই নাও না বাছা,” মাস্টারমশাই বললেন, “দেখো কোনটা তোমার যন্তরে ঠিক পাও।”

মলিনাকাকি নিজের যন্ত্রে ওজন করে একটা বস্তা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে চলে গেল। ক্ষেন্তিপিসি গরগর করে মাস্টারমশাইকে বললে,”ও যে বেশি ওজনের বস্তাটা নিয়ে গেল না,আপনি জানলেন কি করে?”

“তাতে তোমার কী বাছা?” মাস্টারমশাই তাকে ধমকে বললেন, “তুমি চার কিলো চাল পেলেই তো হল। নাও না এই দুটো বস্তার মধ্যে যেটা চার কিলো বা তার বেশি পাবে সেটাই নিয়ে যাও। … হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি ওজন করে পরখ করেই নাও না!”

ক্ষেন্তিপিসিও আর রা কাড়তে পারল না,দেখা গেল সে যা চাইছিল তাই পেয়ে গেছে। যে বস্তাটা রইল মানদামাসীকে সেটা দেখিয়ে মাস্টারমশাই বললেন,“এইটা তুমি নিয়ে যাও। তুমি তো জানোই,তিনটেতেই সমান সমান চাল ছিল।”

মানদামাসীরও কিছু বলার নেই। সমস্যার সমাধান। মাস্টারমশাই আবার বাজারের রাস্তা ধরলেন।

আমি গুটিগুটি পায়ে তাঁকে ধরে বললাম,”আচ্ছা মাস্টারমশাই,আপনি মলিনাকাকিকে প্রথম নিতে দিলেন কেন?”

“কারণ আমি জানতাম,যদি তিনটে বস্তায় সমান সমান চাল নাও থাকে তাহলেও অন্তত কোন একটায় চারকিলো বা তার বেশি চাল থাকবে।”

“এটা কী করে বলছেন?”

“তিনটেই চার কিলোর কম হলে তো মোট বারো কিলো হতে পারে না ভাই…”

“ঠিক কথা। কিন্তু তাহলেও তো ধাঁধা কাটল না। বললাম,”কিন্তু তারপর যে দুটো রইল, তার থেকে ক্ষেন্তিপিসি কী করে সন্তুষ্ট হলেন? দুটোই তো চারকিলোর কম হতে পারত?”

“কী করে? ক্ষেন্তি নিজেই তো ওজন করে দেখেছে,একটাই চারকিলোর কম। মলিনা যদি সবচেয়ে বেশিটাই নিয়ে থাকে,তাহলেও ক্ষেন্তির নিজের কথা অনুযায়ী বাকি দুটোর মধ্যে একটা চারকিলোর হবেই। সিম্পল পিজিওনহোল প্রিন্সিপল।”

মাস্টারমশাই বুঝিয়ে দিতে দেখি এটাও ঠিক! ক্ষেন্তিপিসি তার মনোমত হিসেব বুঝে নেবার পরে আর সমস্যা কী? যেটা পড়ে থাকল,মানদামাসীকে তা নিতেই হবে। কেননা তার মতে তিনটে বস্তার ওজন সমান সমান।

“মাস্টারমশাই, আপনি তো অদ্ভুত খেল দেখালেন। এ যেন ম্যাজিকের মতো…”

“ম্যাজিক নয়,অঙ্ক,” মাস্টারমশাই মুচকি হেসে বললেন,“ওই যে বললাম না, কবুতরখানা নীতি।”

“বুঝে গেছি,সিম্পল পিজিওনহোল প্রিন্সিপল!”

ছবিঃ মধুশ্রী