পুরাণ কথা– নচিকেতা পঞ্চম পর্ব-সংহিতা

puran01 (Medium)

পর্ব ৫

নচিকেতার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চললেন যম, “জগতে যা কিছু ভালো কাজ তার ফল ভোগ করে দু ধরনের অস্তিত্ব। হৃদয়ের গহীনতম কোটরের সর্ব্বোচ্চ চূড়ায় তাদের বাস। ব্রহ্মজ্ঞ তপস্বী ব্রাহ্মণ এদেরকে আলো আর ছায়া বলেন।  আবার আচার, আচরণ দিয়ে, পঞ্চ হোমযজ্ঞ করে কিংবা তিন ধরণের নচিকেতা যজ্ঞ করে যে গৃহীরা ধর্ম পালন করেন, তাঁরাও হৃদয়ের গভীরতম কক্ষে থাকা এই দুই অস্তিত্বকে আলো আর ছায়াই বলেন।”

তিনি আরও বললেন, “আমরা যেন জানতে সক্ষম হই যে যজ্ঞাগ্নি কী। যারা এই যজ্ঞটা করে তাদের জন্য এই যজ্ঞ আসলে একটা সেতু। আমরা যেন আরও জানতে পারি যে যারা ভয়শূন্য পরপারের যাত্রী তাদের জন্য অবিনশ্বর ব্রহ্মটি আসলে কী।”

তারপর জানালেন, “নিজেকে যেন রথের মালিক বলি, যে রথ হলো দেহ, বুদ্ধি হলো তার চালক আর মন হলো তার লাগাম।”

আবার বললেন, “ইন্দ্রিয়ানুভুতি হলো সে রথের ঘোড়া। যাবতীয় অনুভব হলো পথের অভিজ্ঞতা। যদি নিজে মিশে গিয়ে থাকি শরীর, ইন্দ্রিয় আর মনের সঙ্গে, তাহলে জ্ঞানীরা ডাকবেন ভোগী বলে।”

বললেন তরবেতর পার্থক্যের কথা, “যে একটা অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরেকটা অভিজ্ঞতার ফারাক করতে পারে না, তার ইন্দ্রিয়গুলি কখনওই বশে থাকে না। তার ইন্দ্রিয়গুলি রথচালকের অবাধ্য ঘোড়ার মত।”

এই প্রসঙ্গেই বললেন, “কিন্তু যে একটা অনুভূতির সাথে আরেকটা অনুভূতির তফাত করতে পারে, তার ইন্দ্রিয়গুলি সব সময়েই বশে থাকে,তার ইন্দ্রিয়গুলি রথচালকের বাধ্য ঘোড়ার মত।”

আরও একটু বুঝিয়ে বললেন, “যার নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই, শুদ্ধি নেই, যে অনুভূতিগুলোকে আলাদা আলাদা করে চিনতে পারে না সে মৃত্যুভয়হীন পরপারের অমরত্ব পায় না। বরং সে বারবার ফিরে ফিরে আসতে থাকে সংসারের চাকায়, পিষ্ট হতে থাকে জন্ম-মৃত্যুর চক্রাকার পদ্ধতির মধ্যে, জন্মান্তর থেকে জন্মান্তরে।”

জন্মান্তর থেকে জন্মান্তরে আটকে পড়ে যে মানুষ তার সাথে মৃত্যুভয়হীন পরপারে পৌঁছে যাওয়া মানুষের তফাতটা স্পষ্ট করতে যম উল্লেখ করলেন, “আর যে অনুভূতিগুলোর মধ্যে, অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে ফারাক বোঝে, যার মন সর্বদা নিয়ন্ত্রিত ও শুদ্ধ, সে লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারে যেখান থেকে পুনর্জন্মের আবর্ত্তে পড়তে হয় না আর।”

চূড়ান্ত পরিণতির সন্ধান দিয়ে বললেন, “যার বুদ্ধিচালকের মতোনির্ণায়ক ক্ষমতার অধিকারী, যার মন লাগামের মতো নিয়ন্ত্রিত, সে এই যাত্রার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছোয়। অর্থাৎ সে পৌঁছোয় সর্বব্যাপী, অব্যয় বিষ্ণূর সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে।”

সেই পরিণতিকে বিশদে ব্যাখ্যা করে বললেন, “ইন্দ্রিয়ানুভূতির বাইরেও বস্তু আছে, বস্তুকে ছাপিয়ে আছে চিন্তা। চিন্তাকেও পেরিয়ে আছে বোধি। বোধি পেরিয়ে আত্মা।”

আরও বললেন, “আত্মা পেরিয়ে যা আছে তা অপ্রকাশিত, অপ্রকাশিত ছাপিয়ে জগতের সৃজনী, তার পরে কিচ্ছু নেই। সেই ‘নেই’-টাই শেষ, চূড়ান্ত অভীষ্ট।”

আত্মা আসলে কী তার ব্যাখ্যায় বললেন, “সমস্ত অস্তিত্বের গভীরে থাকে আত্মা। তা স্পষ্ট হয়ে দেখাও দেয় না। কেবলমাত্র সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা রাখেন যাঁরা তাঁরা প্রখর ও সূক্ষ্ম উপলব্ধি দিয়ে টের পান আত্মার উপস্থিতি।”

তারপর বোঝালেন নিয়ন্ত্রণের সূত্র, “প্রকৃত জ্ঞানীর বাক নিয়ন্ত্রিত হয় চিন্তার দ্বারা, চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হয় বোধির দ্বারা, বোধি নিয়ন্ত্রিত হয় আত্মা দ্বারা, আত্মা নিয়ন্ত্রিত হয় প্রশান্ত পরমাত্মা দ্বারা।”

তারপর নির্দেশ দিলেন, “ওঠো, জাগো! সেই আলোকপ্রাপ্ত পরমাত্মার সন্ধানে যাও, তা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করো, পর্যটনের পথটি ক্ষুরধার, অনতিক্রম্য ও দুর্গম।”

আরও বুঝিয়ে বললেন, “ যা নিঃশব্দ, স্পর্শাতীত, নিরাকার, অক্ষয়, স্বাদহীন, গন্ধহীন, চিরন্তন, নিরুৎস, নিরন্ত এবং অব্যয়,এবং যা প্রকাশ করা যায় না, তাকে জানতে পারলেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে যাওয়া যায়।”

তারপর বললেন, “যে বুদ্ধিমান মানুষ, যমের মুখে যে প্রাচীন কথা নচিকেতা শুনেছিলেন তা শোনেন এবং তা অন্যকে শোনান তিনি ব্রহ্মজ্ঞ জগতে মহিমায় বিরাজ করেন। অমরত্বলাভের সেই গোপনকথা ব্রহ্মজ্ঞদের সমাবেশে, বিশেষত পারলৌকিক ক্রিয়ার সময়, যিনি যথাভক্তি আবৃত্তি করে শোনান, তিনি চিরস্থায়ী শিরোপা পান।”

চলবে

পুরাণ কথা–সব পর্ব একত্রে