জয়ঢাকি খবরের কাগজ- এক অজানা ভাষা আন্দোলন, এক অনৈতিহাসিক লঙ মার্চ-19 মে 2020

এক অজানা ভাষা আন্দোলন,
এক অনৈতিহাসিক লঙ মার্চ

উমা ভট্টাচার্য

আজ ১৯ শে মে, স্বল্পখ্যাত অসম ভাষা আন্দোলনের সিপাহীদের  আত্মবলিদানের দিন। যেদিন  দৈন্যক্লিষ্ট  বাংলাভাষী এক ষোড়শী প্রাণ দিয়েছিল বাংলা ভাষার  জন্য, সঙ্গে আত্মবলিদান করেছিলেন আরও দশজন – মোট এগারোটি তাজা প্রাণ লুটিয়ে পড়েছিল শিলচর রেল চত্বরে, সেদিন কিন্তু পরাধীন ভারত ছিল না। স্বাধীন ভারতের মাটিতেই সরকারী প্ররোচনায় ঘটেছিল এক নৃশংস গণহত্যা, স্টেশন চত্বরে নীরব প্রতিবাদে ধর্ণায় বসেছিল যেসব মানুষ তাদের দোষ ছিল আসাম সরকারের ভাষানীতির বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়িয়েছিল। বাঙালিদের মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল সরকার। সেদিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেহেরু। সেদিনও বাঙালি পায়নি যোগ্য বিচার। বিনা প্ররোচনায় গুলি চলেছিল অতর্কিতে, নিথর হয়ে গিয়েছিল ১১ জন,  যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ মহিলা ভাষাশহীদ কমলা ভট্টাচার্য । 

আমরা আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস পালন করি ঢাকায় বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনের নির্মম ঘটনাটিকে খেয়াল রেখে, যেদিনটিকে সারা বিশ্ব স্বীকার করে নিয়েছিল,  মর্যাদা দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসাবে। কিন্তু সে সম্মান বা প্রচার পায়নি পূর্ব ভারতের অসমের ভাষাশহিদরা।

ঠিক তেমনভাবেই প্রচার পায়নি, বাংলা ভাষার জন্য মানভূমের মানুষের সুদীর্ঘ ভাষা আন্দোলন, যা্র সূত্রপাত  হয়েছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগ ঘোষণার ফলশ্রুতি হিসাবে। যে আন্দোলনকে বলা যায় স্বাধীন ভারতে ‘মানভূমবাসীর দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’। এই  আন্দোলন ছিল বিহারের অংশ হিসাবে থেকে হিন্দী ভাষার আগ্রাসনে গিয়ে নিজেদের বাঙালি অস্ত্বিত্বকে, ভাষাকে,সংস্কৃতিকে ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে। এই সুদীর্ঘ ভাষা আন্দোলন সক্রিয়ভাবে শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালের খন্ডিত ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে। চলেছিল প্রায় এক দশক।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের  প্রান্তিক জেলা অহল্যা-ভূমি পুরুলিয়ার জন্মই হয়নি তখনও খাতায় কলমে। তখনকার  ‘পুরুল্যা’ জেলার সদর মানভূম আগে ছিল বিশাল এলাকা নিয়ে। ইংরেজ শাসকরা  বৃহৎবঙ্গকে ভেঙে দিয়ে, উড়িষ্যা আর বিহারকে আলাদা করে দিল ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের সময়। ইংরেজ  বাংলার দেওয়ানী লাভের পর থেকেই বাংলার বিভিন্ন সম্পন্ন অঞ্চল নানা দুর্ভোগ আর অন্যায়ের মুখোমুখি হতে শুরু করেছিল। বাংলার পশ্চিম ও দক্ষিণ পশ্চিম অংশ, বিশেষত বর্তমানের পুরুলিয়ার বৃহৎ অঞ্চল অনেক বেশি দুর্ভোগ আর অবিচারের শিকার হয়েছে।  রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভের পর থেকে বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ মানভূমকে তারা তিনভাগ করেছে  ধাপে ধাপে, পাঞ্চেত গঠিত হল ১৭৭৮ সালে, জঙ্গলমহল হল ১৮০৫ সালে,আর মানভূম জেলা হিসাবে তৈরি হল ১৮৩৩ সালে।

 ৭৮৯৬ বর্গমাইল  এলাকা নিয়ে গঠিত  সেই মানভূমকে এরপরে আরও চারবার ভাঙা হল-শেষবার হল ১৮৭৯ সালে।  এলাকা কমে গিয়ে দাঁড়াল৪১১২ বর্গমাইল। বারবার অঙ্গচ্ছেদের বেদনা ভুগেছে মানভূমের আদি জনজাতি, তথা বাঙালি। সেখানকার  বাংলাভাষী উপজাতিক মানুষদের ভাগ্য  নিয়ে  খেলাটা চলছিল প্রথমে বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে। বাংলাদেশ, পশ্চিম আর পূর্ববঙ্গ দুইভাগে  বিভক্ত হওয়ার  প্রতিবাদের তরঙ্গ আন্দোলিত করেছিল ভারতের সারা পূর্বাঞ্চলকে। পূর্ব্ববঙ্গ,উত্তরবঙ্গ,আসাম, ত্রিপুরা নিয়ে যে ভাগটি হয়েছিল তাদের অধিকাংশ অধিবাসীই ছিল বাংলাভাষী। এই বিচ্ছেদের যে  অপর অংশটি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি সেটা হল বাংলার বাকি অংশকে বিহার উড়িষ্যার সঙ্গে মিলিয়ে একটি ভাগ তৈরি করার বিরুদ্ধে।  ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময়  পুরুলিয়া-মানভূমকে বাংলার অঙ্গ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে  জুড়ে দেওয়া  হল বিহারের সঙ্গে। এই ঘটনার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল মানভূমের জনজাতি আর কিছু বিশিষ্ট কংগ্রেস কর্মী।   বিহারের সঙ্গে মানভূমের সংযুক্তি হলে তাদের মুখের ভাষাটা হারিয়ে যাবে, হিন্দি হবে তাদের কথ্য ভাষা এ-বিষয়টা উপলব্ধি করেছিল তারা।

 সত্যিই সেটা শুরু হল  ১৯৪৮ সালেই, শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা ভাষার পরিবর্তে হিন্দিকে চালু করার নির্দেশিকার মাধ্যমে। ১৯৩১ সালের জনগণনা অনুযায়ী মানভূমের সদর মহকুমার  ৮৭% মানুষই ছিলেন  বাংলাভাষী। বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী তখন ডঃ বিধানচন্দ্র রায়। কেউ দাঁড়ালেন না অহল্যাজননীর পাশে।  নির্বাধায় তাকে যুক্ত হতে দিলেন বিহারের সঙ্গে, যার পরিণতি অনিবার্য ভাবেই শুরু হল  ভাষার উপর আক্রমণ দিয়ে।

মানভূম থেকে সব বাঙালি অফিসারকে বদলি করে দেওয়া হল। বিহার সরকারের  অধীনস্থ ডি আই নির্দেশ জারি করলেন অবিলম্বে সব স্কুলে হিন্দি ভাষায় লেখা নোটিস বোর্ড টাঙাতে হবে।   নির্দেশ দেওয়া হল, প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার মাধ্যম হবে হিন্দিভাষা। বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোকে হিন্দি মিডিয়াম স্কুলে বদলে দেওয়া হতে লাগল। জেলা স্কুলের বাংলা বিভাগটি বন্ধ করে দেওয়া হল। আইনি কাজকর্ম, প্রসাশনিক কাজ সব হিন্দিতে শুরু করা হতে লাগল। যেখানে অনুন্নত অঞ্চলের মূলত আদিবাসী জনজাতির মানুষেরা নিজেদের মাতৃভাষা আর  বাংলা ছাড়া কিছুই বোঝে না, সেখানে এই নির্দেশ জারি হল। বাঙালিকে আবার ভাগ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হল খন্ডিত বাংলা নিয়ে স্বাধীন ভারতের মাটিতেই।  ঠিক যেমন বাংলাদেশে উর্দুকে চাপানো হয়েছিল,আসামে অসমীয়া ভাষা চাপানো হয়েছিল তেমনটাই হয়েছিল এখানে হিন্দি চাপিয়ে।  আর এর বিরুদ্ধেই লড়াই শুরু করেছিল  মানভূমের মানুষ।

যদিও পুরুলিয়া মানভূমের অধিকাংশ মানুষই আদিবাসী। মাহাতো,কুড়মি,সাঁওতাল,খেড়িয়া,ওড়াও,মুন্ডা, মাঝি, ভূমিহার প্রমুখ জনজাতির নিজস্ব ভাষা ছিল। উপজাতীয় ভাষা ব্যবহারকারী ছিল ২,১৩,৩০১ জন, আর হিন্দি (উর্দুসমেত)ভাষী ছিল ২,৮৯,৩৫৬ জন,  অন্য ভাষাভাষী ১০,৩৭৪ জন সেখানে বাঙলা ভাষী ছিল ১০,৩৫,৩৮৬ জন ( ১৯২১ সালের জনগননায়)।  তথাপি হিন্দি চাপানোর চেষ্টা শুরু হয়েছিল।  বিহারের অন্তর্ভুক্ত থাকলে এ জ্বালা সইতেই হবে আজীবন। তাই তারা ভাষার  দাবির সঙ্গে যোগ করেছিল তৎকালীন মানভূমকে  আবার বাংলার সাথে জুড়ে দেওয়ার আন্দোলন-মানভূমের  বঙ্গভুক্তির আন্দোলন। দুটি   আন্দোলন একাকার হয়ে গিয়েছিল। আর ভাষার জন্য আন্দোলনেই স্মভব হয়েছিল বঙ্গভুক্তির আন্দোলন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ভাই প্রফুল্ল রঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে -১৯৩৫ সালেই স্থাপিত হয়েছিল মানভূম সমিতি বা বাঙালি সমিতি। এটি একটি জনসংযোগকারী দলও বটে। সমিতির কাজ ছিল এলাকায় এলাকায় বাংলা মাধ্যম স্কুল স্থাপন করা, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে খাতা,বই, পেন্সিল ইত্যাদি বিতরণ করা। সামাজিক কাজকর্ম চলছিলই।

১৯৪৮ সালেই মানভূম থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসী প্রতিনিধিরা রাজ্যের এ আই সি সি র কাছে  বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে রাখার  প্রস্তাব পেশ করলেন , কিন্তু সে প্রস্তাব সামান্য ভোটে খারিজ হয়ে গেল। প্রতিবাদে এবার রাজ্যের প্রায় ৩৪ জন  কংগ্রেস সদস্য  কংগ্রেস ছাড়লেন, গড়ে তুললেন ‘লোক সেবক সংঘ’। সে সময়ের প্রেক্ষিতে সেটা ছিল তাদের সঠিক ও সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত। তাঁরা শুরু করলেন গান্ধিজীর আদর্শে সত্যাগ্রহ। ভাষা সত্যাগ্রহ।

স্বাধীনতার পূর্বেই মানভূমে স্থাপিত জনকল্যানকারী সংস্থা শিল্পাশ্রম ছিল বিপ্লবীদের ঘাটি। ১৯৩৯ সালে  এখানে সভা করে গেছেন, গান্ধিজী,সুভাষচন্দ্র বসু, সরোজিনী নাইডু প্রমুখেরা, বক্তৃতা করেছেন। এঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাধীনতাপূর্ব ভারতছাড়ো আন্দোলনেও সক্রিয় অংশ নিয়েছেন এখানকার মানুষ। ভাবিনী মাহাতো  ১৩/১৪ বছরের কিশোরী সুভাষ বসুকে দেখে,গান্ধজীকি দেখে,তাদের বক্তৃতা শুনে হয়ে উঠেছেন দেশপ্রেমিক। চার আনা দিয়ে মেম্বার হয়েছেন কংগ্রেসের, বাপুই তার আদর্শ। দেশ হয়ে উঠেছে সেই মেয়ের কাছে প্রধান।  তাইতো ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ বিরোধী সমাবেশে স্লোগান দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে হাজারিবাগ জেলে ৬ মাস জেল খেটেছেন। এখানেই সান্নিধ্য পেয়েছেন স্বাধীনতাসংগ্রামী ‘ পুরুলিয়া জননী ‘ বলে পরিচিত ল্যাবণ্যপ্রভা দেবীর- যে মায়ের কাছে ছয় মাসের হাজতবাসের সময়টুকুর  সদ্ব্যবহার করেছেন বর্ণপরিচয় থেকে চিঠি লেখা অবধি আয়ত্ব করে। বারবার  ঝাঁপিয়েছেন নানা আন্দোলনে। ১৯৪২ সাল,ইংরেজ ভারত ছাড়ো আন্দোলনলনের  তীব্রতা মানভূমেও  জোরালো ছিল। ভারতছাড়ো আন্দোলনের জন্য নানা জায়গার স্কুলের মত এখানেও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল “মাঝিডিহা জাতীয় বুনিয়াদী বিদ্যালয়” – সেই বিদ্যালয়ের দখল নিতে গেলেন বাঙালি সমিতির সদস্যরা, মহিলা সদস্যদের মধ্যে বাসন্তী রায়ের সঙ্গে গ্রেপ্তার হলের চাষীর ঘরের সামান্য মেয়ে ভাবিনী মাহাতো। নয় মাসের জেল হল তাঁর। আবার ১৯৪৫সালে, জাতীয় পতাকা উত্তোলন সত্যাগ্রহে অংশ নিয়ে  পুঞ্চা থানার এক গ্রামে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হলেন সেই ভাবিনী- চার মাসের জেল হল। এমনই ছিল এই অঞ্চলের বর্ণ হিন্দু বাঙালি থেকে আদি জনজাতির  সব মানুষ। ভাবিনী এক আশ্চর্য ভূমিকন্যা। মানভূমে আন্দোলনের পর আন্দোলন চলেছেই স্বাধীনতার আগে থেকেই।  বহু বহু মানুষ ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন।  তেমনি আরেক মানুষ ভজহরি মাহাতো। রাজনীতি ও সমাজসচেতন সেইসব মানুষেরা মানতে চাইলেন  না বিহারের প্রভুত্ব। বাংলার পরিবর্তে হিন্দি এই স্টেট পলিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হল সত্যাগ্রহ দিয়ে।এবার তাদের দেশের মধ্যেই স্বাধীনতার দাবিতে আরেক আন্দোলন শুরু হল ১৯৪৮ সাল থেকে।

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল – প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সুদীর্ঘ এই আন্দোলনের নানা পর্যায়ের শেষে সাফল্য এল,  আরেকটি দীর্ঘ পদযাত্রার শেষে_-  সেটিও ছিল একটি  অনৈতিহাসিক লঙ মার্চ। অনৈতাহাসিক বলছি আমরা অনেকেই হয়তো জানি না সে কথা। পুরুলিয়া ভ্রমণে না গেলে হয়তো কোনদিন আমিও জানতাম এই মানহারা মানভূমের সংগ্রামের কথা। জানতাম না  ভাষার জন্য ‘টুসু সত্যাগ্রহ’ এর কথা, জানতাম না আদিম, আনপড় সমাজের চাষীর মেয়ের ভাবিনী মাহাতোর চার চারবার জেল খাটার কথা, লঙ মার্চে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার কথা, জানতাম না এম এল এ বিজয় মাহাতোর লেখা সঞ্জীবনী টুসু গানের কথা, জানতাম না তার মত সম্মাননীয়  সরকারী সদস্যের অপমানের কথা, পুরুলিয়া জননী লাবণ্যপ্রভা দেবীর ও আরও অনেকের সংগ্রামের কথা। 

আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন পুরুলিয়া কোর্টের আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার, গুণেন্দ্রনাথ রায়, শরতচন্দ্র সেন। সংসদের বাইরে, ভিতরে চলছিল তীব্র লড়াই, বাদানুবাদ। মানভূমের মানুষের এই বাঁচার লড়াইয়ের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে সংসদের ভিতরে ঝড় তুলেছিলেন কে জান?  না আমিও জানতাম না, তিনি ছিলেন বিখ্যাত বামপন্থী পার্লামেন্টেরিয়ান সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা শ্রদ্ধেয় নির্মলকুমার চট্টোপাধ্যায়- এক  অসাধারণ বাগ্মী সাংসদ। ভজহরি মাহাতো, চৈতন্য মাঝি, হীরেন মুখোপাধ্যায়, মোহিত মৈত্র প্রমুখেরা ছিলেন তার সাথীদের মধ্যে অন্যতম ।

এদিকে বাইরে থেকে গানভূম- টুসু,ভাদু,ঝুমুর গানের দেশ মানভূম এবার দেবারাধনার গান, পরবের গানকে করে তুলল আন্দোলনের ভাষা, প্রতিবাদের মাধ্যম। সরকারের নীতির বিরুদ্ধে শাণিত ভাষায় প্রতিবাদী টুসু  গান লিখে ফেললেন ভজহরি মাহাতো, জগবন্ধু ভট্টাচার্য প্রমুখ অনেকে। এদের  গানই হয়ে উঠলো মুখ্য প্রতিবাদী হাতিয়ার।  আসলে টুসু গানের মাধ্যমে যখন দাবিদাওয়ার কথাও উঠে আসতে লাগল, তখন বিহার সরকার নিষিদ্ধ  ঘোষণা করলেন টুসু গানকে। টুসু, ভাদু যে মাটির প্রাণের সঙ্গীত,যুথগীতি, সেই যুথগীতি গাইলেই গ্রেপ্তার হতে হবে।  শুরু হল নতুন আন্দোলন, যে মাধ্যমে চলবে প্রতিবাদ- নাম হল ‘টুসু সত্যাগ্রহ, সময়টা ১৯৫৪ সাল।

‘বাংলা ভাষার পদবিতে / কোন ভেদের কথা নাই।/ এক ভারতে ভাইয়ে ভাইয়ে/ মাতৃভাষায় রাজ্য যাই। এই গান ফিরত শিশু কিশোর সহ সব মানূষের মুখে মুখে,যেমনটি হয়েছিল চারণকবি মুকুন্দ দাসের গান নিয়ে। মধূসুদন মাহাতোর গান হল, মন মানে না রে হিন্দি সইতে/ ভাষা মোদের হরে নিল হিন্দিতে/ মাতৃভাষা হরে যদি/ আর কি মোদের থাকেরে/….। 

টুসু সত্যাগ্রহ দমনে বিহার সরকার অনেক চেষ্টা করতে লাগলো। ১৪৪ ধারা জারি হল জমায়েতে বিরুদ্ধে, কিন্তু টুসু- তো যূথবদ্ধ হয়ে গাইবার গান। ১৯৫৪ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে  প্রথম দফার(ফেব্রুয়ারি- মার্চ)  আন্দোলনের সময় পাঁচটি টুসু দলের ৪০ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করল বিহার পুলিশ। গ্রেপ্তার হলেন লাবণ্যপ্রভা ঘোষ,বিপ্লবী অরুণ চন্দ্র ঘোষ, সাংবাদিক অশোক চৌধুরী, লোকসভার সদস্য  ভজহরি মাহাতো।  তাঁকে তো কোমরে দড়ি বেঁধে কোর্ট থেকে জেল পর্যন্ত পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে  গেল পুলিশ। বিদেশী শাসকের নয়, আমাদের স্বাধীন ভারতের, স্বাধীন বাংলার পুলিশ,  বাংলার মানুষের ভাষার দাবি করার অজুহাতে। মনুষ্যত্বের এত অপমান ভাবা যায় না। প্রতিবাদী বাঙালি দমেও কি দমে। সেই অবস্থাতেই বন্দী অরুণচন্দ্র ঘোষ, গাইতে লাগলেন নিজের রচিত টুসু গান-” আমার বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষারে/ ও ভাই মারবি  তোরা কে তারে/ বাংলা ভাষারে….।”

ভজহরি সামন্তের দোষটা বিহার সরকারের কাছে অনেক মারাত্মক ঠেকেছিল, গানের ভাষার জন্য, সে গানের ভাষাকে হিন্দিতে অনুবাদ করে গুরুত্ব বুঝেই তার প্রতি করা হল এত অসম্মান। তাঁর গান ছিল – “শুন বিহারী ভাই,তুরা রাখত্যে লারবি ডাঙ্গ দেখাই../ পশুপক্ষীর মতন যারা, ডাঙ্গ দিখ্যে দূরে পলায়/ আমরা মানুষ নই তো পশু,স্বরাজেরি অংশ চাই।……। এ গান পরে মানভূমের নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা লাভ করে।

যত আক্রমণ বাড়ে, গ্রেপ্তার বাড়ে ততই  বেড়ে চলে আন্দোলনের তীব্রতা। সত্যাগ্রহী জনতা ও মহিলা নেত্রীদের প্রতি পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার আন্দোলন- ৯ই জানুয়ারি রঘুনাথপুরের  সত্যাগ্রহীরা  গান গেয়েই শহর  পরিক্রমা শুরু  করেন, পুলিশ তাদের গতিরোধ  করে,গান বন্ধ না করায় ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে,পরে অবশ্য ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা নিয়ে ছেড়ে দেয়। ব্যাস, পরের দিনই প্রথম সারির নেতা স্বাধীনতা সংগ্রামী অতুল চন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে ১১জন প্রতিবাদী  রাস্তায় নামলেন। নতুন লেখা রাজনৈতিক হাতিয়ার টুসু গান গেয়ে পথ পরিক্রমা করে। এদের মধ্যেও অনেকে গ্রেপ্তার হন,পরে তিন হাজার টাকা  করে জরিমানা নিয়ে ছেড়েও দেয়।  এ যেন পুলিশের টাকা  উপার্জনের নতুন পথ হল।

এবার বিহার সরকার নিরাপত্তা আইনের অজুহাতে জেলাবাসী ও আন্দোলনকারীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রনের জন্য মামলা দায়ের করে। সত্যাগ্রহীরাও বেপরোয়, তাঁরাও সিদ্ধান্ত নিলেন   স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবেন। প্রথম এগিয়ে গেলেন লাবণ্যপ্রভা দেবী, ভজহরি মাহাতো, এরপরে কারাবরণ করলেন ভাবিনী মাহাতো, মাহাতো, কালীরাম মাহাতো, সমরেন্দ্রনাথ ওঝা প্রমুখরা।

আন্দোলন, ধরপাকড়, পুলিশি অত্যাচার ও সত্যাগ্রহীদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ চলতেই থাকে। 

ইতিমধ্যে ২৩ শে জানুয়ারী ১৯৫৬ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় ও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কৃষ্ণসিংহ  স্থির করলেন (ভাষাভিত্তিক রাজ্যের গঠনের চিন্তা নেতাদের মাথায় স্বাধীনতার সময় থেকেই ছিল) যে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গকে মিলিয়ে একটা রাজ্য তৈরি হোক, যার নাম  হবে ” বিহার-পশ্চিমবঙ্গ সংযুক্ত প্রদেশ”। বাংলার মানুষ এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠল। কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হল এতদিনে। সারা পশ্চিমবঙ্গে হরতাল পালিত হল ২৪ শে ফেব্রুয়ারী। আর মানভূমের মানুষ, নেতৃবৃন্দ তখন অন্যভাবে চিন্তা করছেন।  মানভূমে হরতাল পালিত হল আরও একদিন, ১৯ শে মার্চ।

বিহার – বাংলা সংযুক্তির চক্রান্তের বিরুদ্ধে কি করা উচিত এই বিষয়ে মানভূমের নেতারা জনমত সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। টুসু গান গাইবার নিয়ম অঘ্রাণ মাসের সংক্রান্তি থেকে   শ্রীপঞ্চমী পর্যন্ত,তারপরে কিভাবে আন্দোলন চলবে তা নিয়ে মিটিং হতে লাগলো। পুরুলিয়া বার অ্যাসোসিয়েশন এ ব্যাপারে এ সময়েই জোর প্রতিবাদ করেছেন  সত্যাগ্রহীদের পক্ষে। সত্যাগ্রহীরা ঠিক করলেন এবার কলকাতায় অভিযান করতে হবে, মহানগরবাসীর কাছে পৌঁছুতে হবে। সিদ্ধান্ত  অনুযায়ী হাজারের উপর মানভূমবাসী মহিলা পুরুষ সকলে পদযাত্রা শুরু করলেন ৩০০ মাইল পথ অতিক্রম করে কোলকাতার উদ্দেশ্যে। ২০ শে এপ্রিল মানভূমের পাকবেড়িয়া গ্রাম থেকে সেই পদযাত্রীরা শুরু করলেন ‘লং মার্চ ‘।  প্রচণ্ড গ্রীষ্মের দাবদাহ উপেক্ষা করে চললেন তারা, পথে নানা জেলার স্বাধীনতকামী বাঙালি সমর্থক সেই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। মুখে তাঁদের ‘বন্দেমাতরম’ আর’ বাংলার মাটি বাংলার জল’ এই দুটি স্বদেশী গান গন্তব্য  কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ার।  সুদীর্ঘ সে মিছিলের প্রথম ভাগটা এসে কোলকাতার ডালহৌসিতে   পৌঁছল ৬তারিখে। বাকি যারা পথে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তারা ৯ তারিখে পৌছুল গন্তব্যে। বলাবাহুল্য  ১৬ দিনের দিন পর শ্রান্ত দেহে কোলকাতায় পৌঁছুলেই   বাংলার পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।

কিন্তু সারা দেশে সা ফেলে দেয় প্রতিবাদীদের এই কৃচ্ছসাধন।  অবশেষে বিহার-বাংলা সংযুক্তিকরণের সিদ্ধান্ত পরিত্যক্ত হয়। মানভূম কিছু অংশ হারিয়ে বাংলার দিকের পুরো অংশ নিয়ে গড়ে ওঠে পুরুলিয়া জেলা। অবশ্য বিধানসভা, লোকসভার পর্ব মিটিয়ে প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্রপ্রাসাদের সই-সাবুদের পর জয় হয় মানভূমবাসীর, এতদিনের এত লাঠিচার্য,পুলিশি নির্যাত,  মিথ্যা মামলার জালসাজি পার হয়ে জয়ী হয় মানভূমের ভাষা তথা বঙ্গভূক্তি আন্দোলন। তবে একটাই ভালো যে বিনা রক্তপাতে এই কাজটা করেছিল মানভূমজনতা।

 

তথ্যঋণঃ

মানভুম জেলার ভাষা আন্দোলনের   ইতিহাস- ডঃ প্রদীপ কুমার মন্ডল।
পুরুলিয়া – তরুণ দেব ভট্টাচার্য।
মানভূমের টুসু সত্যাগ্রহ এন্ড আওয়ার স্ট্যান্ড – বিভূতিভূষণ দাসগুপ্ত।
সীমান্ত রাঢ়ের সংস্কৃতি- দিলীপ কুমার গোস্বামী।
বর্তমান পত্রিকায় ২৬/০৮/২০০০ সালে- কিংকরী দাসের লেখা – স্বাধীনতা আন্দোলনে চাষীর মেয়ে ভাবিনী মাহাতো।
দি রাইজ অফ পুরুলিয়া এন  আর্টিকল, দি ডেইলি স্টার ১৪/০২/২০১৪.
পুরুলিয়া ভ্রমনে সঙ্গী বীনা মাহাতোর কাছ থেকে কিছু জানা কথা।